শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর উত্থান এবং সবশেষ রাজকীয় বিদায় অনেকের কাছেই কল্পনার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতিতে তার পদচারণা সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে। তিনি একজন শহীদ, সর্বোপরি বিপ্লবী। জুলাই অভ্যুত্থানে তার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয় ও ঐতিহাসিক। সাহস ও বলিষ্ঠতা দিয়ে তিনি অসংখ্য ছাত্র-জনতাকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সংগঠিত করেছেন, উজ্জীবিত করেছেন, সক্রিয় রেখেছেন। তিনি বিপ্লব পরবর্তী সময়ে অন্য বিপ্লবীদের মতো সুবিধা নিতে চাননি। বড়ো কোনো পদ-পদবী অর্জন করার চেষ্টাও করেননি বরং বিপ্লবকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে গেছেন। ওসমান হাদী বিপ্লবের চেতনা সমুন্নত রাখার, অসংখ্য শহীদের কুরবানির প্রতিদান দেয়ার, আহত গাজীদের পাশে থাকার চেষ্টা করে গেছেন জীবনের শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত। ‘জান দেবো, তবু জুলাই দেবো না’- এভাবে তিনি ছাড়া আর কেউ এত স্পষ্ট করে বলতে পারেননি।

শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদীর জীবন শুরু হয় ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার থেকে। ধর্মীয় পরিবেশে ও চেতনায় জীবনযাপন করেছেন তিনি। তার পিতা মাওলানা শরীফ আব্দুল হাদী ঝালকাঠি জেলার প্রসিদ্ধ একজন আলেম ছিলেন। পুরো এলাকায় ‘হাদী হুজুর’ নামে তিনি আজও পরিচিত। ওসমান হাদীর বড়ো ভাই একটি কামিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল এবং মসজিদের খতিব হিসেবে কর্মরত আছেন। এ ভাইটি মাদরাসায় পড়াকালীন সময়ে বোর্ড স্ট্যান্ড করেছিলেন আবার উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও গোল্ড মেডেল অর্জন করেছেন। পরবর্তীতে সেখান থেকে তিনি পিএইচডিও সম্পন্ন করেছেন। তার আরেক ভাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে গ্রাজুয়েশন শেষ করেছেন। তার বোন একজন শিক্ষিকা যিনি আলিম পরীক্ষায় সারাদেশে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন। শহীদ শরীফ ওসমান হাদী একাধিক সাক্ষাতকারে বলেছেন, তিনি যেভাবে ইনসাফ সম্বন্ধে ধারণা পেয়েছেন এবং যা বিশ্বাস করেন তা সাহসের সাথে বলে ফেলার যে শক্তিটি রপ্ত করেছেন-এর পুরোটাই তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে তার পিতার কাছ থেকেই অর্জন করেছেন। প্রকৃতপক্ষে শরীফ ওসমান বিন হাদীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত পুরোটাই ছিল দেশপ্রেম।

শরীফ ওসমান বিন হাদী মাদরাসা থেকে আলিম পাশ করেছেন। দাখিল পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণীতে টেলেন্ট ফুলে বৃত্তি পেয়েছেন। দাখিল পরীক্ষায় মাদরাসা বোর্ড থেকে তিনি প্রথম স্থান অর্জন করেন এবং আলিম পরীক্ষার দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। তিনি মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং অস্ট্রেলিয়ার সিডনী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ পেয়েছেন, কিন্তু দেশাত্ববোধে উজ্জীবিত হাদী ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পলিটিক্যাল সায়েন্সে ভর্তি হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি পড়াশোনা শেষ করেন। শেষদিকে এসে তিনি দেশের একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন এবং পাশাপাশি দেশের একটি ইংরেজি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও তিনি শিক্ষকতা করতেন।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে আসার আগে ঝালকাঠিতে থাকা অবস্থাতেই বক্তৃতা, কবিতা আবৃত্তি, কুরআন তেলাওয়াতসহ নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ৫ বার জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছিলেন। এ কারণেই, বিপ্লবী হওয়ার পাশাপাশি তিনি একজন সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবেও পরিচিত। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা তাকে সমাজ ও রাজনীতির প্রতি গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপের সক্ষমতা দেয়। একইসাথে বলিষ্ঠ বক্তব্য দেয়ারও সাহস জোগায়। এক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত দেয়া প্রাসঙ্গিক হবে। আমি এ ঘটনাটি একটি টকশোতে তার দেয়া বক্তব্য থেকেই সংগ্রহ করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যায়নরত অবস্থাতেই একদিন তাকে খুব বাজে অভিজ্ঞতার শিকার হতে হয়। হাদী সেখানে পলিটিক্যাল সায়েন্সের ছাত্র ছিলেন।

সেশনের দ্বিতীয় দিনের একটি ঘটনা। তখনো ক্লাসের সেকশনগুলো পর্যন্ত ভাগ করা হয়নি। ক্লাসে তিনশ’র বেশি ছাত্র ছিলেন। সে অবস্থায় একবার একজন শিক্ষক তাকে কোনো একটি বিষয়ে প্রশ্ন করলেন। হাদী যথাযথ উত্তরও দিলেন। উত্তরের মাঝে দু’একটি ইংরেজি শব্দ ছিল। ওসমান হাদী খুবই স্পষ্ট ভাষায় সেই শব্দগুলো উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু শিক্ষক তাতে সন্তুষ্ট হননি। যেহেতু হাদী মাদরাসায় পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন এবং সেদিন তিনি পাঞ্জাবি পায়জামা পরিহিত ছিলেন; তাই উক্ত শিক্ষক অনেকটা টিপ্পনির সুরে বলেছিলেন যে, ‘মুন্সি মৌলভীরা ইংরেজি উচ্চারণ করতে পারে না।’ এ কথাটা ওসমান হাদীকে খুব ধাক্কা দিয়েছিল। প্রথমে তিনি চুপ করে বসে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার ব্যাগে অক্সফোর্ডের ডিকশনারি ছিল আর সে ডিকশনারি থেকে তিনি ঐ শব্দটা বের করে দেখলেন, তিনি যেভাবে উচ্চারণ করেছিলেন ফোনেটিকালি (উচ্চারণগতভাবে) তাই সঠিক ছিল। সঙ্গত কারণেই তিনি শিক্ষকের কাছে ডিকশনারি নিয়ে যান এবং তাকে দেখান যে, তার উচ্চারণটাই সঠিক ছিল। এরপর উক্ত শিক্ষক যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন এবং তিন শতাধিক ছাত্রের সামনে ওসমান হাদীকে অপমান করেন এবং তাকে সামনের সারির বেঞ্চ থেকে একদম পেছনের বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন। অর্থাৎ ভার্সিটিতে দ্বিতীয় দিন গিয়েই ওসমান হাদী বুঝে গেলেন যে, সাধারণ ছাত্র তো বটেই শিক্ষকরা পর্যন্ত ধর্মীয় ভাবধারার ছাত্রদের সাথে বে-ইনসাফী করতে অভ্যস্ত।

আরেকটি ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান যে, ছাত্রলীগের কিছু ছেলে একবার তাকে তুই করে বলেছিলেন। তিনি খুব আফসোস করে উক্ত সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যদি আদর করে বা স্নেহবশবর্তী হয়ে কেউ তাকে তুই করে বলে, তাহলে তিনি তা বরণ করে নেন। কিন্তু ছাত্রলীগের ছেলেরা তাকে নতুন ছাত্র বিশেষ করে মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের হওয়ার কারণে প্রচণ্ড অপমান করে ‘তুই’ সম্বোধন করেছিল যা তিনি সহ্য করতে পারেননি। এ ঘটনার জেরে তিনি আর বিশ্ববিদ্যালয় হলে থাকতে পারেননি বরং পুরো শিক্ষাবর্ষগুলোই তিনি হলের বাইরে থেকেছেন। এ ঘটনা তার ভেতরে প্রবলভাবে রেখাপাত করেছিল। এসব ঘটনাবলীর কারণে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একদম প্রথম থেকেই যে তিনি ফ্যাসিবাদকে চিনতে সক্ষম হন।

আমার মতে এরকম ঘটনাগুলোই শরিফ ওসমান হাদীকে জীবনের উপলব্ধি সম্পর্কে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের কোনঠাসা করে রাখার প্রক্রিয়াটি তিনি নিজের জীবনেই অনুধাবন করার কারণে শাহাদাতের চুড়ান্ত ক্ষণ পর্যন্ত তিনি এর প্রতিবাদ করেছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, প্রশাসনসহ প্রতিটা প্রতিষ্ঠানের ভেতর ইসলামপন্থীদের দুর্বল করে রাখার প্রয়াসের বিরুদ্ধে তিনি সরব হয়েছেন। তার জায়গা থেকে তিনি এর প্রতিকার করার চেষ্টাও করেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত ইনকিলাব মঞ্চে সকল ধারার মানুষকে স্পেস দেয়ার চেষ্টা করেছেন। একদম নেকাব বা হিজাব পরিহিতা নারীদের তিনি যেমন পরিবারের অংশ বলে তিনি মনে করতেন আবার একইসাথে জেনারেল যে কোনো নারী বা পুরুষকেও তিনি একইভাবে ওয়েলকাম করতেন, সমীহ করতেন। আরেকটি বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ কতটা ভয়াবহভাবে ফ্যাসিবাদ চর্চা করে এবং এ অপশক্তি বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকলে সাধারণ মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন যে বিপন্ন হবে এটা তিনি ছাত্রজীবনের শুরুতে বুঝে যাওয়ার কারণে ফ্যাসিবাদ বিরোধী যে কোন প্রয়াস বা আন্দোলনে ওসমান হাদী প্রচণ্ড সক্রিয় থাকতে পেরেছেন।

আরেকটি বিষয় না বললেই নয়। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে অন্য সবাই যখন কেবলমাত্র রাজনৈতিক হিসেব-নিকাশ ও রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন এবং রাজনৈতিকভাবেই ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করবার ভাবনায় মশগুল ছিলেন; সেখানে শরিক ওসমান হাদী একটা ভিন্ন চিন্তা নিয়ে অগ্রসর হয়েছেন। তিনি প্রথম থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে শুধু রাজনৈতিকভাবেই প্রতিষ্ঠিত নয় বরং এ দেশে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের অনেকগুলো স্তর আছে; যার মধ্যে সবচেয়ে বড়ো ও শক্তিশালী স্তর হলো কালচারাল ফ্যাসিবাদ। অথচ কোনো রাজনৈতিক দল বা তাদের উইং সংগঠন এই বিষয়টি নিয়ে ফোকাস করেনি। কিন্তু ওসমান হাদী বরাবরই এই একটি বিষয় নিয়েই সরব ছিলেন। তিনি ইনকিলাব মঞ্চ ও ইনকিলার কালচারাল সেন্টার চালু করেছিলেন এবং কালচারাল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একটি আপোষহীন লড়াই শুরু করেছিলেন যা তাকে অনন্যসাধারণ একটি উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করে দেয়।

ইনকিলাব মঞ্চ সাদামাটা কোনো প্লাটফর্ম নয় বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক জাগরণ এবং তরুণদের অন্তর্নিহিত শক্তি, সামগ্রিক সমাজিক অবস্থান ও স্বাধীনতার আকাক্সক্ষার প্রতীক। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিগত এক বছরে ইনকিলাব মঞ্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায়, অন্যায় ও নিপীড়নের বিপরীতে একটি ন্যায্য রাষ্ট্র গঠনে কাজ করে আসছে। ফ্যাসিবাদী আমলে ভিনদেশী যে সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল ইনকিলাব মঞ্চ তা বলিষ্ঠতার সাথে প্রত্যাখান করে এবং এর পরিবর্তে আমাদের মাটি ও মানুষের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে প্রাসঙ্গিক একটি সংস্কৃতিকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করে।

ওসমান হাদী নিজেও এ মঞ্চের মুখপাত্র হয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, জনসমর্থন ও দৃঢ় মনোবল দিয়েও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া যায়। যে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে তিনি ন্যায্যতা, ইনসাফ ও সমতা প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন এবং এভাবেই তিনি বিপুল সংখ্যক মানুষের মন জয় করে নেন।

পরিশেষে বলি। শরীফ ওসমান হাদী নিয়ে আমার ভিন্ন কিছু মুল্যায়নও আছে। প্রথমত, সময় অনেকটাই পাল্টে গেছে। এ সময়ে যদি কারো কোনো পলিটিকাল ব্যাকগ্রাউন্ড বা পরিচিতি না থাকে তাহলে গ্রহণযোগ্যতা পেতে তার সুবিধা হয়। পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড থাকলে জনগণ আগে থেকেই জাজমেন্টাল হয়ে যায়। শহীদ ওসমান হাদী এ সুবিধাটি পেয়েছেন। হাদীর চেয়ে ভালো ন্যারেটিভ অনেকের থাকতে পারে। কিন্তু তাদের কথা জনগণ সেভাবে নেবে না, নিচ্ছে না। কারণ তাদের ন্যারেটিভ তাদের পুরনো ব্যাকগ্রাউন্ডকে ছাপিয়ে যেতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, ট্রেডিশনাল রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের বাইরে থেকেও কাজ করা যায়।

হাদী এনসিপি বা পুরনো কোনো রাজনৈতিক দলে গেলে অনেকটাই ম্মান হয়ে যেতেন। সেদিকে না যাওয়ায় তিনি বড়ো একটা ক্যানভাস পেয়েছেন। সাধারণ মানুষ তো বটেই, প্রতিটি দলের ভেতরেই তার গুণমুগ্ধ সমর্থক তৈরি হয়েছে যেটা একটি অভিনব ঘটনা। তার জানাজা বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ জানাজা এবং এ জানাজায় লাখ লাখ মানুষের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ এরই প্রমাণ বহন করে।

তৃতীয়ত, মানুষের সমর্থন লাভের জন্য কাজের ক্ষেত্র ভিন্ন হতে হয়। হাদী রাজনৈতিকভাবে ভোকাল ছিলেন তবে তার নিয়মিত কাজের জায়গা ছিল কালচারাল ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ। হাদী ও তার ইনকিলাব মঞ্চ এ কারণে অনন্য। কেননা তিনি ছাড়া আর কেউ এভাবে কালচারাল ফ্যাসিজম নিয়ে ভাবেননি। তার দু’রুমের অফিসটি হয়তো আয়তনে ছোট কিন্তু তার চিন্তার ব্যাপকতা অনেক বিস্তৃত। আর চতুর্থত, শহীদ ওসমান হাদী জনগণের ইস্যুতে, জাতীয় ইস্যুতে সরব ছিলেন। নিরবচ্ছিন্নভাবে তিনি গণমানুষের স্বার্থে কথা বলেছেন। রাজনৈতিক দলগুলো তেমনটা পারে না। তারা এক ইস্যুতে সরব হয়, আবার আরেকটা চেপে যায়। কারণ, তাদের বহুকূল সামলাতে হয়। অনেকের সমর্থন জোগাতে হয়। আবার সমর্থন হারানোর ভয়ও তাদেরকে দুর্বল করে দেয়। হাদী এগুলোর পরওয়া করতেন না। তাই জনগণ তাকে নিজেদের আপনা লোক ভেবেছে। আমার বিবেচনায়, ওসমান হাদী নিছক কোনো ব্যক্তি নন, বরং একটি কনসেপ্ট। এ সময়ের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক যে অস্থিরতা, কোনো কিছুকেই পুরোপুরি ভালো না লাগার যে মানসিকতা, সেখানে হাদীর কার্যক্রম ও তৎপরতা ছিল খুবই মানানসই। আগামীতে এভাবে ভূমিকা পালন করেও অনেকে কিছু করার কথা ভাবতে পারেন। তবে শেষ কথা হলো, অনেককিছু উপলব্ধি করলেও, বা অনেক কিছু করতে চাইলেও সবাই শরীফ ওসমান হাদী হতে পারবে না।

ওসমান নামের অর্থ ছোট পাখি। আল্লাহ শহীদ ওসমান গণি বিন হাদীকে জান্নাতের পাখি হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন। তার পরিবার নিশ্চয়ই হজরত উসমান বিন আফফান (রা.) এর নামের সাথে মিল রেখে তার নাম এমনটা রেখেছিলেন। হজরত ওসমান (রা.) এর নামটি মুসলিমদের কাছে বরাবরই সম্মান, তাকওয়া ও আমানতদারিতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। আর গনি আল্লাহ তাআলার সিফাতী নাম। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে “গনি” বলতে দানশীলতা, আত্মসম্মান ও প্রাচুর্যপূর্ণ চরিত্র বোঝানো হয়। বলা হয়ে থাকে যে, মানুষের নাম সুন্দর হলে তার কর্মের মধ্য দিয়ে এর বারাকাহ প্রতিফলিত হয়। আল্লাহ তাআলা তাই হয়তো ওসমান হাদীকে এত বেশি সম্মানিত করলেন। শাহাদাতের মর্যাদায় সিক্ত করলেন।

শহীদ ওসমান হাদী গুলীবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে একের পর এক বক্তব্য দেখছি আর ভাবছি শহীদ ওসমান হাদী মাত্র দেড় বছরে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যত কথা বলেছেন, যেভাবে আমাদের শত্রুকে চিনিয়েছেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ শিখিয়েছেন- অনেকে গোটা এক জীবন সময় পেয়েও এভাবে পারেন না। প্রকৃত ক্ষণজন্মা একেই বলে। বিপ্লবটা কেন হয়েছিল আর কেন এর দরকার পড়লো আর বিপ্লবকে ধারণ কীভাবে করা যায়; এটা তার মতো স্পষ্ট করে আর কোনো বিপ্লবী বলতে পারেনি। তাই ঠেকে গেলে তার কাছে বারবার আমাদের ফিরতে হবে। আর ঠিক এ কারণেই শহীদ শরীফ ওসমান হাদী আমাদের জাতীয় জীবনে প্রাসঙ্গিক থেকে যাবেন ইনশাআল্লাহ।