আল শাহারিয়া

বাংলাদেশের উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড় যেন লণ্ডভণ্ড ঘরবাড়ি, উপড়ে থাকা গাছপালা আর অথৈ পানির এক চিরচেনা চিত্রপট। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে ঘূর্ণিঝড় কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, প্রতিবছর আঘাত হানা এক আজন্ম অভিশাপ। বিশেষ করে বছরের বর্ষা মৌসুমের আগে এবং পরে আকাশে মেঘ দেখলেই তাদের মনে দানা বাঁধে এক চেনা ভয়, এই বুঝি হারালাম সবকিছু।

এ ভয়ের একটি ভৌগোলিক এবং বৈশ্বিক কারণও রয়েছে। পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলাদেশের উপকূলীয় ভূখণ্ড প্রাকৃতিকভাবেই নিচু এবং সমতল। অসংখ্য নদী-নালা জালের মতো ছড়িয়ে থাকায় এ অঞ্চল যেমন উর্বর, তেমনই অরক্ষিত। বঙ্গোপসাগরের ফানেল আকৃতির উপকূলরেখা সামুদ্রিক ঝড়কে দানবীয় শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ করে দেয়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন নামক বৈশ্বিক অভিশাপ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি ঘূর্ণিঝড়গুলোকে আরও শক্তিশালী ও ঘন ঘন আঘাত হানার পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে, যা ছিল প্রকৃতির এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া তা এখন এক বিধ্বংসী ও নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। উপকূলের সাধারণ মানুষ, যারা এ জলবায়ু পরিবর্তনে সামান্যতম ভূমিকাও রাখেনি, তারাই এর সবচেয়ে নিষ্ঠুর শিকার।

তবে প্রকৃতির এ রুদ্র রূপের বিপরীতে উপকূলকে মাতার মতো আগলে রেখেছে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। সিডর, আইলা বা বুলবুলের মতো প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের সামনে সুন্দরবনই যেন হয়ে উঠেছিল এক প্রাকৃতিক বর্ম। এর অসংখ্য গাছপালা, শ্বাসমূল আর নদ-নদীর ঘন নেটওয়ার্ক ঝড়ের গতিকে অনেকাংশে কমিয়ে দেয়, জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা শোষণ করে নেয় এবং উপকূলের মূল ভূখণ্ডকে সরাসরি আঘাত থেকে রক্ষা করে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দূষণ এবং বনখেকোদের আগ্রাসনে সুন্দরবন নিজেই আজ বিপন্ন। এই প্রাকৃতিক রক্ষাকবচকে রক্ষা করতে না পারলে ভবিষ্যতে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত বাংলাদেশের জন্য আরও কত ভয়াবহ হবে, তা কল্পনাও করা যায় না। সুন্দরবনকে বাঁচানো তাই কেবল একটি পরিবেশগত বিষয় নয়, এটি উপকূলের কোটি মানুষের জীবন বাঁচানোর সমার্থক।

উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ প্রতিবছর হারায় তাদের স্ত্রী-সন্তান, মা-বাবা, নিকটাত্মীয়, ঘর-বাড়ি ইত্যাদি। সিডর, আইলা, ফণী, আম্ফান-এসব নামের সাথে মিশে আছে হাজারো মানুষের কান্না আর হারানোর বেদনা। তবে এ দুর্যোগগুলোই তাদের আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তিও জোগায়। এই হারানোর যন্ত্রণা কেবল বস্তুগত বা শারীরিক নয়, এর একটি গভীর মানসিক প্রভাবও রয়েছে। প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলের শিশুদের চোখে যে আতঙ্ক জমা হয়, তা ভোলার নয়। ঝড়ের রাতে বাতাসের হুংকার আর জলোচ্ছ্বাসের গর্জন তাদের শিশু মনে যে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে, তা সারাজীবনেও শুকায় না। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে তৈরি হয় এক ধরনের উদ্বেগ। বারবার ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারিয়ে তারা একসময় মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এ মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি প্রায়শই ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।

এ সংকটের সবচেয়ে নীরব শিকার হয় নারী ও শিশুরা। দুর্যোগের সময় এবং পরে তাদের দুর্ভোগ পৌঁছায় চরমে। আশ্রয়কেন্দ্রে অপরিসর ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নারীরা তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন। বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের অভাবে তারা নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন, বিশেষ করে তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্যোগ পরবর্তী সময়েও সংসারের হাল ধরতে নারীদেরকেই সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় ধরে স্কুল বন্ধ থাকায় শিশুদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়, যা তাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়। দুর্যোগের এ লিঙ্গভিত্তিক এবং বয়স-ভিত্তিক প্রভাবগুলো আমলে না নিলে কোনো পুনর্বাসন কার্যক্রমই পুরোপুরি সফল হতে পারে না।

এখানে ঘুর্ণিঝড় বৃষ্টি ও বাতাস এর সাথে সাথে নিয়ে আসে লোনা পানির বিশাল ঢেউ আর জলোচ্ছ্বাস মানুষ কেবল তার শেষ আশ্রয় হারায় না, খাদ্য-বস্ত্র-পানির অভাব তখন সবচেয়ে প্রকট হয়। বাঁধ ভেঙে নদীর লোনা পানি উপকূলে ঢুকে পুকুর, টিউবওয়েল সহ অন্যান্য পানির উৎস নষ্ট করে ফেলে। দীর্ঘমেয়াদে ডেকে আনে খাদ্য সংকট এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি। সমস্ত ফসল নষ্ট হয়ে যায় লবণাক্ততা আর তীব্র বাতাসের তোড়ে। জেলে হারায় তার মাছধরা জাল ও নৌকা। অনেকেই হারায় তাদের জীবিকার অনুসঙ্গ, যার ফলে বেড়ে যায় অপরাধপ্রবণতা। লোনা পানির এ আগ্রাসন কেবল তাৎক্ষণিক সংকট তৈরি করে না, এটি উপকূলের কৃষি অর্থনীতি এবং বাস্তুতন্ত্রকে স্থায়ীভাবে বদলে দেয়। যে জমিতে একসময় সোনার ধান ফলত, লবণাক্ততার কারণে তা আজ বন্ধ্যা। বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক তাদের শতবর্ষের পেশা ছেড়ে চিংড়ি চাষ বা অন্য পেশায় ঝুঁকছে। চিংড়ি চাষ লাভজনক হলেও এটি মাটির উর্বরতা আরও কমিয়ে দেয় এবং লবণাক্ততা বাড়িয়ে তোলে। এর ফলে মিষ্টি পানির মাছ ও দেশীয় প্রজাতির উদ্ভিদ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এটি একটি চক্রাকার সংকট তৈরি করে। ঘূর্ণিঝড় লবণাক্ততা বাড়ায়, আর সেই লবণাক্ততা কৃষিকে ধ্বংস করে মানুষকে এমন পেশার দিকে ঠেলে দেয় যা পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে। এর ফলে উপকূলের খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর এক নীরব আঘাত নেমে আসে।

বেশিরভাগ মানুষ সঠিক খবর ও সচেতনতার অভাবে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহণ করতে পারে না। যারা আশ্রয় গ্রহণ করে তারা ফিরে এসে বাড়ির খোঁজ নেয়, হারিয়ে যাওয়া গবাদিপশুটির খোঁজ নেয়। বড়ো বড়ো ঘূর্ণিঝড় বাড়িঘর আস্ত রাখে না, অনেকসময় মেরে ফেলে তাদের সম্বল গবাদিপশুগুলি। কিন্তু, এই অদম্য মানুষগুলো আবার ঘুরে দাঁড়ায়। চোখের পানিকে আড়াল করে ঘাম ঝরিয়ে পরিশ্রম করে, গড়ে তোলে আরেকটা বাড়ি, মাছে ভরা পুকুর, গোয়ালভরা গবাদিপশু-পাখি। কিন্তু, এসব আয়োজন যেন আবার ঘূর্ণিঝড়ের কাছে সঁপে দেওয়ার জন্য।

তবে এ ঘুরে দাঁড়ানো এখন আর কেবল ভাঙা ঘর নতুন করে গড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রকৃতির সাথে লড়াই করতে করতে উপকূলের মানুষ শিখে নিয়েছে অভিযোজনের নিজস্ব কৌশল। তারা এখন সামাজিক জ্ঞানের সাথে আধুনিক প্রযুক্তিকে মিলিয়ে টিকে থাকার নতুন পথ খুঁজছে। অনেকেই মাটির ভিটার উচ্চতা বাড়িয়ে ঘর তৈরি করছেন। বর্ষাকালে বাড়ির চারপাশে ভাসমান সবজির বাগান তৈরি করছেন কেউ কেউ, যা জলোচ্ছ্বাসেও নষ্ট হয় না। লবণাক্ততা-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও চাষাবাদ বাড়ছে। কমিউনিটি-ভিত্তিক দুর্যোগ প্রস্তুতি দল গঠন করে তারা নিজেরাই নিজেদের সুরক্ষার দায়িত্ব নিচ্ছে। এ ছোট ছোট উদ্যোগগুলোই প্রমাণ করে, উপকূলের মানুষ কেবল প্রকৃতির খেলার পুতুল নয়, তারা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের সক্রিয় কারিগর।

উপকূল রক্ষায় বেড়িবাঁধগুলোই প্রথম প্রতিরোধ ব্যবস্থা। কিন্তু অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ, দুর্নীতি এবং নদী ভাঙনের কারণে অনেক বাঁধই দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ। একটি শক্তিশালী জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা তাদের থাকে না। আবার নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। যেগুলো আছে, তার অনেকগুলোই মূল বসতি থেকে দূরে হওয়ায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য সেখানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। দুর্যোগের সময় সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে আশ্রয়কেন্দ্রের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। টেকসই ও পরিকল্পিত অবকাঠামো ছাড়া উপকূলের মানুষের এই অদম্য সংগ্রাম বারবার প্রকৃতির কাছে অসহায়ভাবে হেরে যেতে বাধ্য।

এমন অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে জন্ম নেয় আরেকটি নীরব সংকট বাধ্যতামূলক অভিবাসন। যখন একজন কৃষক তার জমি হারায়, একজন জেলে তার নৌকা হারায়, এবং একজন দিনমজুর তার কাজ হারায়, তখন নিজের গ্রামে টিকে থাকার আর কোনো উপায় থাকে না। জীবন ও জীবিকার তাগিদে হাজার হাজার পরিবার প্রতি বছর উপকূল ছেড়ে শহরের দিকে পাড়ি জমায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম বা খুলনার মতো বড় শহরের বস্তিগুলোতে আশ্রয় নেয় তারা, যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করে এক ভিন্নধর্মী সংগ্রাম। মাটির সঙ্গে বেড়ে ওঠা এই মানুষগুলো শহরের ইট-পাথরের জীবনে খাপ খাওয়াতে পারে না। তারা তাদের পরিচিতি হারায়, সামাজিক বন্ধন হারায় এবং প্রায়শই ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। এ জলবায়ু-শরণার্থীদের গল্পগুলো জাতীয় পরিসংখ্যানে প্রায়শই হারিয়ে যায়।

ঘূর্ণিঝড় চলাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের পাশে দাঁড়ায়, ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করে, এমনকি ঘর মেরামতের ব্যবস্থা করে দেয়। কিন্তু, স্থানীয় রাজনীতির চক্করে পড়ে অনেকসময় মূল ক্ষতিগ্রস্তরা এসব সাহায্যের বাইরে থেকে যায়। ত্রাণ কার্যক্রম প্রায়শই তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন, যেমন-টেকসই জীবিকার ব্যবস্থা করা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, অথবা জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ-এসব দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয় না। ফলে, একটি দুর্যোগের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই আরেকটি এসে আঘাত হানে, এবং মানুষগুলো এক ত্রাণ-নির্ভরতার দুষ্ট চক্রে আটকা পড়ে যায়।

এখন প্রশ্ন হলো, এই অন্তহীন সংগ্রামের শেষ কোথায়? কেবল ত্রাণ বা তাৎক্ষণিক সাহায্য দিয়ে এই সমস্যার মূল উৎপাটন করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। একদিকে যেমন টেকসই ও মজবুত বেড়িবাঁধ, পর্যাপ্ত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র এবং উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী তৈরি করতে হবে, তেমনই অন্যদিকে লবণাক্ততা-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা ও বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা ক্ষয়ক্ষতি পূরণের তহবিল আদায়ে সোচ্চার হতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সকল পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, কারণ তারাই এই সংকটের প্রধান ভুক্তভোগী এবং তারাই জানে টিকে থাকার সেরা উপায়। উপকূলকে বাঁচাতে হলে তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে সম্মান জানাতেই হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।