মনে বড় আশা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনে শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে নিরপেক্ষ ও অবাধে ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন। এ প্রত্যাশার তিনটি মৌলিক কারণ ছিল। এক. চব্বিশের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশের মালিক-মুখতার ও জমিদার দাবিদার আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সদলবলে পলায়ন, আইন ও আদল প্রতিষ্ঠায় মানুষের সীমাহীন ত্যাগ ও প্রতিশ্রুতি; দুই. দল ও রাজনীতিনিরপেক্ষ একটি সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং ফ্যাসিবাদ বিরোধী বন্ধুভাবাপন্ন অতীতের জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলসমূহের নেতাকর্মীদের উন্মুক্ত ও সমমসৃণ ময়দানে নির্বাচনে অংশগ্রহণ। আমার দৃষ্টিতে স্বাধীনতার গত চুয়ান্ন বছরের ইতিহাসে এবারের ন্যায় অনুকূল পরিবেশ আর কখনো দেখা যায়নি। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে যে, শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থানের ভিত্তিতে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশগ্রহণ আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হতে পারে। আগে মনে করতাম নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানই সুষ্ঠু নির্বাচনের চাবিকাঠি। এখন মনে হচ্ছে এর জন্য রাজনৈতিক শিষ্টাচার এবং ক্ষমতা-বিত্তের ব্যাপারে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের নির্লোভ ও নির্মোহ থাকাও সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্যতম প্রধান শর্ত।

অতীতে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত কোনো কোনো দলের নিষ্ক্রিয় ও শ্লথ আচরণে হতাশ আমরা অনেকেই বলতাম যে, এরা ভদ্র এবং এ ভদ্র লোকদের দিয়ে আওয়ামী ষাণ্ডা-গুণ্ডাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন অশোভনীয় বলে হয়তো তারা সক্রিয় হতে পারছে না। কিন্তু এখন আমাদেরই ছেলেরা মা-বোন ও মুরুব্বীরা নিজের জানমাল ও অঙ্গহানি করে দেশকে ফাসিবাদমুক্ত করে যাদের কারামুক্তি ও স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দরজা খুলে দিলেন তারাই আওয়ামী জালেমদের থেকে বড় জালেম ও চাঁদাবাজ-দখলবাজের নতুন চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছে। সারাা দেশের মানুষ তাদের অত্যাচারে এখন অতীষ্ঠ। অনেকে বিস্মিত হয়ে ভাবছেন, ক্ষমতায় যাওযার আগেই যাদের চেহারা এত কদর্য ক্ষমতায় গিয়ে তারা কি করবে? ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের হাতে তারা ছিল মজলুম, এখন মুক্ত হয়ে তারা মানুষের ওপর জুলুমের প্রচণ্ডতা আরো কয়েকগুণ বৃদ্ধি করেছে। ফিলিপাইনের জাতীয় বীর ড. রিজালের ন্যায় অনেকে প্রশ্ন করছেন, ‘Why liberty if the Slavce of today become the tyrants of tomorrow?’ কেন এ মুক্তি ও স্বাধীনতা যা আজকের গোলামদের আগামী দিনের জালেমে পরিণত করে?’ বারো ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনে এ প্রশ্নের কি জবাব পাওয়া যাবে?

আমরা অনেকেই রাজনীতিকে বিনা মূলধনের লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করতে গিয়ে চক্ষুলজ্জা হারিয়ে ফেলেছি। যার লজ্জা নেই তার ঈমান নেই, ছোটকালে স্কুল জীবনে একটি উর্দু কবিতা পড়েছিলাম নাম ছিল ‘হায়া’, কবিতার দুটি লাইন আমার এখনো মনে আছে। ‘আও হায়া আও পাছবানে আব্রু, নেকউকি কূয়তে বাজু হায় তু’। অর্থাৎ ওহে লজ্জা ওহে ইজ্জত ও আব্রুর রক্ষক, তুমি নেক কাজের বাহুবল। কুয়তে বাজু আসলে উর্দুতে ব্যবহৃত একটি ফারসী শব্দাংশ, যাকে ইংরেজিতে Strength of the Ara বলা হয়। লজ্জা-শরম হারিয়ে আমরা এত নীচে নেমে গেছি যে, কার সম্পর্কে কি বলছি, সে জ্ঞানও এখন আমাদের অনেকের মধ্যে নেই। জামায়াতের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় দিশেহারা একটি দল নারীরেদর নিয়ে আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চালাচ্ছে তা বিদগ্ধজনের দৃষ্টি এড়ায়নি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস অবাধে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলে আমাদের মা-বোনসহ দেশের ভোটাররা এর উপযুক্ত জবাব দেবেন।

এবার মুক্ত পরিবেশ বিবেচনায় আমি আমার নিজ এলাকায় নির্বাচনী অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য গত শুক্রবার ফেনী সফর করেছিলাম। ঐদিন ফেনীতে আমীরে জামায়াপতর আগমন উপলক্ষে একটি বিশাল সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সকাল ৭টায় রওয়ানা হয়েও আমি দুর্ভাগ্যবশত ট্রাফিক জামে পড়ে আমীরে জামায়াতের সমাবেশে অংশগ্রহণ করতে পারিনি। তবে বাদজুমা ফেনী-৩ আসনের দাগনভুইঞা উপজেলার ওমরাবাদ, সাপুয়া, ক্রোশ মুন্সিরহাট, সুজাতপুর, দরবেশের হাট, রাজাপুর, বিরলী প্রভৃতি এলাকা সফর করে নির্বাচনী পরিবেশ কিছুটা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছি। অনেক আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সহপাঠী, সহকর্মী এবং জামায়াত-বিএনপির সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকের সাথেই আলোচনার সুযোগ হয়েছে। এলাকাটি অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এবং প্রবাসীদের উপার্জন ও বিনিয়োগে সমৃদ্ধ। অপরিকল্পিতভাবে রাস্তার ধারে ও মাঠের মাঝখানে বাড়িঘর তৈরি করার ফলে এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় সর্বত্র জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।

পক্ষান্তরে যে কয়টি খাল আছে সেগুলো প্রায় শুকিয়ে গেছে। একটি দলের নেতাকর্মীরা ব্যাপক চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী তৎপরতায় জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভোটের আগে-পরে এসব এলাকায় গোলমালের আশঙ্কা প্রচুর। এখানে বিএনপির তরফ থেকে বিশিষ্ট শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী আবদুল আউয়াল মিন্টু মনোনীত প্রার্থী। তার দলের নেতাকর্মীদের একটা বিশেষ অংশ এখনো চাঁদাবাজি করছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রবাসীরা তাদের টার্গেট। জামায়াত কর্মী; বিশেষ করে মহিলা কর্মীরা অনেক ক্ষেত্রেই হেনস্তার শিকার। পতিত আওয়ামী লীগের একটি অংশ এদের সাথে যুক্ত হয়েছে এবং একটি সংঘবদ্ধ চক্র সন্ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে গমনে বাধা প্রদান এবং ভোট গণনাকালে শক্তি প্রয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও জানা গেছে। আওয়ামী আমলে আওড়ানো অভিযোগ ছাড়াও সাম্প্রতিককালে জামায়াতের বিরুদ্ধে একাত্তরের গণহত্যার মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এবং ‘মৌলবাদের’ তথাকথিত বয়ান ছাড়াও মিলাদে কেয়াম না করা এবং সংস্কৃতি কর্মীদের বাজনাসহ নির্বাচনী মিছিল ও সমাবেশে গান গাওয়ার ন্যায় ‘শরিয়া পরিপন্থী’ কাজে জড়িত হবার অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। যা হাস্যকর। দাগনভুইঞার গ্রামাঞ্চলে আবদুল আউয়াল মিন্টু কর্তৃক উপজেলা সদরে ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনকে বিরাট অবদান হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু জামায়াতের দাগনভুইঞা একাডেমি, এতিমখানা, ফেনীর শাহীন স্কুল, ফালাহিয়া মাদরাসা ও এতিমখানাসহ অগণিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং হাসপাতাল স্থাপনের বিষয়টিসহ মানবসৃষ্ট বিপর্যয় ও দৈবদুর্বিপাকে জামায়াতের অসামান্য ত্রাণ তৎপরতা খুব একটা প্রচারণা পাচ্ছে বলে মনে হয় না। ফেনী-৩ আসনে ডা. মানিকের তৎপরতা ও ক্লিন ইমেজ মানুষের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছে বলে মনে হয়। অবশিষ্ট দিনগুলোয় জামায়াত-শিবিরের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা সতর্কতার সাথে তৎপর থাকলে মানুষ নব্য চাঁদাবাজদের তাড়িয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হবে বলে আমার বিশ্বাস।

রাজনৈতিক শিষ্টাচার রক্ষা এবং নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার ব্যাপারে সরকারি করণীয় সম্পর্কে কিছু কথা বলা দরকার, প্রথমত ফেনী-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থীর দ্বৈত নাগরিকত্বকে গ্রহণ করে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেশের সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন এবং পুঁজিপতির পুঁজির কাছে আত্মসমর্পণ করে একটি খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। দাগনভুইয়া এমন একটি উপজেলা যার সদর দফতর সর্বদক্ষিণে নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জ সংলগ্ন। উত্তরে চৌদ্দগ্রামের সীমানা পর্যন্ত এটি বিস্তৃত। দক্ষিণ মাথা থেকে উত্তর মাথা পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে পুলিশ বাহিনীকে আসতে হলে কয়েক ঘণ্টা প্রয়োজন। এ অবস্থায় উত্তরাঞ্চলের গ্রাম ও নির্বাচন কেন্দ্রে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার্থে নির্বাচনকালে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ, আনসার, বিজিবি ও সেনাবাহিনী সদস্য মোতায়েন রাখা অপরিহার্য। এ ব্যাপারে নির্বাচন প্রার্থীদের সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই।

নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ৯/১০ দিন। নির্বাচনী শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে কোনো প্রার্থী অথবা তার বা তাদের দলীয় নেতাকর্মীরা হিংস্রতার পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকার কথা থাকলেও কার্যত তার বাস্তবায়ন দেখা যায় না। এটা নিশ্চিত না করলে অবস্থার পরিবর্তন হবে না।