একটি অকুতোভয় বীরের আদর্শের মহিমান্বিত পদযাত্রা ঘটে গেল নতুন দিগন্তের দিকে। যা এক আধ্যাত্মিক দর্শনের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার প্রস্থান কেবল একটি জীবনের অবসান নয়, একটি দৈহিক অবকাঠামো নয়, বরং এক অকুতোভয় আদর্শ সৈনিকের মহিমান্বিত প্রস্থান। আমি বলছি, সত্যের ওপর আমৃত্যু অটল থাকা আততায়ীর হাতে গুলীবিদ্ধ হয়ে সদ্য শহীদ হওয়া ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদীর কথা।

জন্ম ও শিক্ষা: শহীদ ওসমান বিন হাদী ১৯৯৩ সালের ৩০ জুন ঝালকাঠি জেলার অন্তর্গত নলছিটি উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। তিনি একজন মাদরসার শিক্ষক ও স্থানীয় মসজিদের ইমাম ছিলেন। ৬ ভাই-বোনের মধ্যে শহীদ ওসমান বিন হাদী ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন নলছিটির একটি মাদরাসায়। সেখানে তিনি তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তারপর তিনি ঝালকাঠির এন এস কামিল মাদরাসায় চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন। উক্ত মাদরাসা থেকে তিনি অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে দাখিল ও আলিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর তিনি একটি ইংরেজি শিক্ষার প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা পেশার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। এছাড়া ইউনিভার্সিটি অব স্কলারস নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন।

কর্মময় জীবন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন সফলভাবে সমাপ্ত করার পর শহীদ ওসমান হাদী একটি ইংরেজি শিক্ষার প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে কাজ করে জাতি গঠনের কারিগর হিসেবে ভূমিকা পালন করেন এবং পরবর্তীতে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন জুলাই যোদ্ধা। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে পতিত স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ করার দাবিতে হওয়া আন্দোলনে হাদীকে তরুণ নেতৃত্বের অন্যতম একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার ছিলেন। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র জনতার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক “প্লাটফর্ম ইনকিলাব মঞ্চ”- শরীফ ওসমান হাদীর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়। যার লক্ষ্য ছিল সমস্ত আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করে একটি “ইনসাফভিত্তিক” রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে গণতান্ত্রিক ন্যায়বিচার ও মূল্যবোধের অংশগ্রহণ থাকবে।

রাজনৈতিক কর্মকা-: মূলত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি রক্ষা, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাসহ অপরাধীদের বিচার, আহত-নিহতদের স্বীকৃতি ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ভূমিকায় শরীফ ওসমান গনি বিন হাদী ছিলেন সোচ্চার ও উচ্চ কণ্ঠস্বর। যা তাকে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। তিনি আসন্ন জাতীয় ত্রায়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ছিলেন, যেখানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বীতা করার কথা ছিল। তার আগেই তিনি জুম্মাঘর নামাজের পর নির্বাচনি প্রচার চালানোর সময় বিজয়নগর এলাকায় কালভাট ব্রিজের নিকট সন্ত্রাসীদের গুলীতে ১২ ডিসেম্বর মারাত্মকভাবে মাথায় আঘাত পান এবং ১৮ ডিসেম্বর রাত পনে ১০টার সময় সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নেন। ২০২৫ সালে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রদ্রোহী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার জন্য শহীদ ওসমান হাদী ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে তীব্র আন্দোলন করেছেন এবং দাবি আদায়ে “ন্যাশনাল অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ইউনিট” ব্যানারের অধীনে দেশব্যাপী যে আন্দোলন গড়ে ওঠে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষে শহীদ ওসমান হাদী সে আন্দোলনে আপোষহীন বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন।

বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব : শহীদ ওসমান হাদী এমন একজন বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যার দুনিয়া থেকে প্রস্থান কেবল একটি জীবনের অবসান নয়, একটি দৈহিক অবকাঠামোর অবসান নয়, বরং এক অকুতোভয় আদর্শ সৈনিকের মহিমান্বিত নতুন পদযাত্রা। মৃত্যুর ঠিক আগে সামাজিক ফেসবুক ও যোগাযোগমাধ্যমে তার দেওয়া বক্তব্য ও বার্তাগুলো আজ এক আধ্যাত্মিক দর্শনের প্রতিচ্ছবি হয়ে দেখা দিয়েছে। তার প্রতিটি ভবিষ্যৎ বাণীর শব্দচয়ন যেন আজ লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে সত্যের শিখা হয়ে প্রজ্জ্বলিত হচ্ছে। তার কথাগুলোর ফল্গুধারা যেন হাজার হাজার ইসলাম ও গণতন্ত্রকামী মানুষের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুর ধারা হয়ে। একই সাথে বাংলার কোটি জনতার হৃদয়ে জোগাচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহসী চেতনা ও বলিষ্ঠ অনুপ্রেরণা।

সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী: শহীদ ওসমান হাদী ছিলেন খুব সাহসী এবং আত্মবিশ্বাসী। এ বিশ্বাসের কারণেই তিনি দুষ্কৃতিকারীদের বুলেটের সামনে ছিলেন অবিচল। তিনি মনে করতেন, মৃত্যু যদি আসমানেই নির্ধারিত থাকে, তবে জমিনের কোনো শক্তিকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তিনি প্রায়ই বলতেন যে শাহাদাতের উদ্দেশ্যেই তিনি পৃথিবীতে এসেছেন। তাই মৃত্যুর হুমকি তাকে সত্যের পথ থেকে কখনো বিচ্যুত করতে পারেনি। ওসমান হাদীর যে কথাটি মানুষকে সবচেয়ে বেশি কাঁদাবে এবং চিরকাল স্মরণে থাকবে, তা হলো তার শেষ যাত্রার সাধারণত্বের আকুতি-মিনতি। তিনি লিখেছিলেন, “হারাম খাইয়া আমি এত মোটাতাজা হই নাই, যাতে আমার স্পেশাল কফিন লাগবে। খুবই সাধারণ একটা কফিনে হালাল রক্তের হাসিমুখে আমি আমার আল্লাহর কাছে হাজির হবো।” তার এ একটি বাক্য আধুনিক সমাজের বস্তুবাদ ভোগবাদ আর দুর্নীতির মুখে এক বড় চপেটাঘাত। তিনি বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন যে, তার দেহ হারাম খাদ্যে পরিপূর্ণ ও পুষ্ট নয়, তাই তার জন্য বিশেষ কোনো আড়ম্বরের কোনো প্রয়োজন নেই। অনাড়ম্বরই তার জীবনের সৌন্দর্য। শহীদ ওসমান হাদীর হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় ‘হালাল রক্তের হাসি’ শব্দটি এক গভীর আবেগের জন্ম দেয়। এক বিস্ময়কর অনুভূতির জন্ম দেয়। তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে নিজের রক্ত বিসর্জন দেয়াকেই শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেছেন। তিনি বলেছিলেন, “কোনো রাজনীতিবিদের মৃত্যু ঘরের মধ্যে এসির মধ্যে হতে পারে না। রাজনীতির মাঠেই রাজনীতিকদের সংগ্রামের মাধ্যমেই মৃত্যু হওয়া উত্তম”। সাধারণ এক কফিনের ভেতরে তার এ বীরত্বপূর্ণ কথা এবং একগুচ্ছ হাসি আজ প্রতিটি বিবেকবান মানুষের অন্তরে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। যে রক্তের ফিনকি শেষ হবার মতো নয়।

দুষ্কৃতকারীরা শহীদ হাদীকে গুলী করার পর প্রথমে ঢাকা মেডিকেল তারপর এভারকেয়ার এবং সর্বশেষ সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার পর এ মহিমান্বিত বীরের লাশ শুক্রবার ১৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বাংলাদেশে ফিরেছে। বাংলাদেশ বিমানের বিজি ৪৫৮ ফ্লাইটটি স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে সিঙ্গাপুর ত্যাগ করে এবং বাংলাদেশ টাইম সন্ধ্যা ৬টা ০৫ মিনিটে লাশবাহী কফিনটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। তারপর ২০ ডিসেম্বর শনিবার বিকাল ২টায় রাজধানীর ঐতিহাসিক মানিক মিয়া এভিনিউয়ে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে শহীদ ওসমান হাদীর জানাযা নামাজ আদায় করা হয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের আঙ্গিনায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। শহীদ ওসমান হাদীর জানাযায় লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয় যা ইতিহাসে বিরল। তার ৮ মাস বয়সের শিশু সন্তানটি জানাযা স্থলে বার বার আকুতি করছিল, “আমার আব্বু কই”। কিন্তু নিষ্পাপ এ শিশুটি তখনও বুঝতে পারেনি যে, তার আব্বু না ফেরার দেশে চলে গেছে। সেখান থেকে কখনোই তিনি আর ফিরে আসবেন না।

ওসমান হাদীর মূল্যবান কথামালা: শহীদ ওসমান হাদীর মূল্যবান কথাগুলো কেবল রাজনীতির স্লোগান নয়, এগুলো জীবনের ধ্রুব সত্য। তার অকুতোভয় আদর্শের তেজ বিমানবন্দর থেকে শাহবাগগামী রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো মানুষের চোখে অশ্রু হয়ে ঝরেছে। মানুষ তাকে মনে রাখবে কারণ তিনি মৃত্যুকে আসমানের ফয়সালা মেনে জমিনের লড়াইয়ে জয়ী হয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে ‘হারাম’ বর্জন করলে সাধারণ কফিনই হয়ে ওঠে জান্নাতের বাহন। তার রেখে যাওয়া ‘হালাল রক্তের হাসি’ আজীবন এক অনুপ্রেরণার নাম হয়ে থাকবে। যা তৌহিদবাদী জনতার উৎসাহের উৎসস্থল। ওসমান হাদীর তামান্না ছিল শাহাদাতের পেয়ালা পান করার। তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশে একটি দুর্নীতিমুক্ত ফ্যাসিবাদমুক্ত ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম হোক। শহীদ ওসমান হাদী সাধারণ এক কফিনে ফেরার যে আকাক্সক্ষা করেছিলেন, তা আজ তাকে ইতিহাসের পাতায় অসাধারণ এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। শহীদ ওসমান হাদী, ‘মৃত্যুর ফয়সালা আসমানে হয়’- এই ধ্রুব সত্যকে বুকে ধারণ করে বিদায় নেয়া এমন একজন অকুতোভয় বীর, যার নতুন গন্তব্যে পদযাত্রা চিরকাল বাঙালি জাতির হৃদয়ে মর্যাদার আসনে অমর হয়ে থাকবেন এবং তার এ মহিমান্বিত পদযাত্রা জাতির মানসপটে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক: শিক্ষাবিদ গবেষক ও কলামিস্ট।