পর পর তিনটি সংসদীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার বঞ্চিত বাংলাদেশের ভোটাররা গত ১২ ফেব্রুয়ারি শান্তিপূর্ণ ও অনুকূল একটি পরিবেশে ভোট দিয়ে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য তাদের নির্বাচিত দলকে দেশ শাসনের ম্যান্ডেট প্রদান করেছে। ত্রয়োদশ এ সাধারণ নির্বাচনে দেশের মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার। এতে ৫১টি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে ২০৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশগ্রহণ করেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্ট দল আওয়ামী লীগসহ ৯টি রাজনৈতিক দল ভোটে অংশগ্রহণ করেনি। সারাদেশে ৪২,৯৫৮টি ভোট কেন্দ্রে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ৭, ৮৫,২২৫ জন নির্বাচনী কর্মকর্তা ভোট গ্রহণের সাথে ছিলেন। প্রথমবারের ন্যায় বাংলাদেশে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রদানের পদ্ধতি চালু হয়েছে এবং ১৫,৩৩,৬৮৪ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে নিজেদের নিবন্ধন করেছেন। এ নির্বাচনে ১ লাখ সেনাসদস্য, ৫ লাখ ৭৬ হাজার আনসার-ভিডিপি সদস্য এবং ১ লাখ ৪৯ হাজার পুলিশ সদস্যসহ ৯ লাখ ৫৮ হাজার ১১৭ জন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। বিএনপি প্রার্থী ছিলেন ২৯১ জন। দলটির বিদ্রোহী ৯২ জন, জামায়াতে ইসলামী ২২৯ জন, এনসিপি ৩২ জন, ইসলামী আন্দোলন ২৫৮ জন, এবি পার্টি ৩০ জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৩৪ জন, জাতীয় পার্টি ১৯৮ জন প্রভৃতি। নির্বাচনে কোথাও কোনো অঘটন ঘটেনি। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী বিএনপি ২০৯ আসনে জয়লাভ করেছে এবং জামায়াত ৬৮টি আসনে জয়রাভ করেছে। এক বছরেরও কম বয়সি রাজনৈতিক দল এনসিপি পেয়েছে ৬টি আসন। বাকী ১৬টি পেয়েছে অন্যান্য দল। সংসদ নির্বাচন ছাড়াও গণভোটে জুলাই সনদের অনুকূলে হ্যাঁ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন এবং না ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন ভোটার।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী এ নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের ৪৯.৯৭ শতাংশ এককভাবে পেয়েছে বিএনপি, জামায়াত পেয়েছে ৩১.৭৬ শতাংশ। চারটি বাদে ৪৬টি দল পেয়েছে ১ শতাংশের নীচে। এ নির্বাচনের ফলাফল চমকপ্রদ। দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের মধ্যে জনাব তারেক রহমান ১৭ বছর নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে নির্বাচন করে শুধু জয়ীই হননি দেশ পরিচালনার দায়িত্বও পেয়েছেন। ফ্যাসিবাদী আমলে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত জামায়াত নেতা মাওলানা নিজামীর পুত্র ব্যারিস্টার মোমেন, মীর কাশেম আলীর পুত্র গুমের শিকার ব্যারিস্টার আরমান, মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামী ও পরে সুপ্রিম কোর্টের রিভিউতে খালাপ প্রাপ্ত নেতা জনাব এটিএম আজহারুল ইসলাম, মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পুত্র গুমের শিকার হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও সাকা চৌধুরীর ভাই গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীও নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। আবার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিষয়টিও বিস্ময়কর। এ দলটির নেতাকর্মীরা এত বেশি নির্যাতনের শিকার ছিলেন যে, তারা প্রকাশ্যে তৎপরতা চালাতে পারেননি।

প্রায় দেড় যুগ ধরে তাদের সর্বস্তরের অফিসসমূহ ছিল তালাবদ্ধ; নেতারা নিজ বাড়িঘরে থাকতে পারেননি; গোপনে দল পরিচালনা করেছেন। এই অবস্থায় আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের বলিষ্ঠ ও গতিশীল নেতৃত্বে মাত্র দেড় বছরের প্রকাশ্য রাজনৈতিক পরিবেশে জামায়াত বাংলাদেশের বুকে একটি অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এটা অনেকটা জিরো থেকে হিরোতে পরিণত করার মতো।

নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে জামায়াত ও জামায়াতবহির্ভূত অনেক ভোটারের মধ্যে বেশ কিছু অসন্তোষ পরিলক্ষিত হচ্ছে। ফলাফলে অনেকেই মানুষের প্রকৃত অনুভূতি ও রায়ের প্রতিফলন না দেখে হতাশা ব্যক্ত করছেন। কেউ কেউ প্রশাসনিক ক্যু-এর মাধ্যমে ফলাফল পরিবর্তনের অভিযোগও করছেন। তারা বলছেন যে, আমরা ভোট দিলাম কোথায় আর কাউন্ট হলো কার পক্ষে। এটাকে ষড়যন্ত্র অথবা কারচুপি যাই বলা হোক, আমার ধারণা, বাস্তবতা অবশ্যই মেনে নিতে হবে। মহান আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। তার হিকমতের কাছে কোনো কিছুই টিকে থাকতে পারে না। আগস্ট-পরবর্তী সময়ে সারাদেশে বিএনপি নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন ও ধর্ষণ-ব্যাভিচারের যে নজির স্থাপন করেছে তা অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকেও ছাড়িয়ে গেছে। নির্বাচন-উত্তরকালেও তা অব্যাহত আছে। তারেক রহমান বিএনপির দায়িত্ব নিয়ে দলটির অপরাধী নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে এনে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাস, সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কতটুকু সাফল্য আনতে পারেন, তার ওপর আগামী বাংলাদেশের অনেক কিছুই নির্ভর করবে বলে আমার বিশ্বাস। জুলাই সনদের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের ওপর তার সাফল্য বা ব্যর্থতার অনেক কিছুই নির্ভর করবে। আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান পার্লামেন্ট ও তার বাইরে দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে ভালো কাজে সরকারকে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নির্বাচনে হেরে বিরোধী দল কর্তৃক বিজয়ী দলকে ‘এক দিনও শান্তিতে থাকবার দিবো না’ এই অতীত ঘোষণার বিপরীতে তার এই অবস্থান রাজনৈতিক শিষ্টাচারের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।

নির্বাচনে নির্বাচিত সকল গণপ্রতিনিধি এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিতব্য নতুন সরকারকে আমরা অভিনন্দন জানাই। আমরা বিশ্বাস করি তার পিতা স্বাধীনতার ঘোষণক শহীদ জিয়া ও তার মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার ন্যায় দেশপ্রেমিক ও আধিপত্যবাদ বিরোধী নেতৃদ্বয়ের রক্ত যার শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত তিনি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বার্থকে অবশ্যই সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। দেশের মানুষ অতীতের কলঙ্কিত রাজনীতিতে ফিরে যেতে চান না, পরিবর্তন চান যেখানে শান্তি ও সমৃদ্ধি থাকবে। এখন অন্য প্রসঙ্গে আসি।

নির্বাচনে জনরায় পরিবর্তন নিয়ে যে ধারণা দেশ-বিদেশে বিস্তৃতি লাভ করেছে তাতে বলা হয়েছে যে, প্রশাসনিক ক্যু-এর মাধ্যমে স্বল্প ব্যবধানের আসনগুলোর ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে গৃহীত কৌশলগুলো হচ্ছে:

১। ভোটের আগের রাতে জামায়াতকে বিভিন্ন জায়গায় ব্যস্ত রেখে প্রতিপক্ষ নির্বিঘ্নে টাকা বিতরণ করেছে।

২। ভোটের দিন বিভিন্ন স্থানে মিডিয়াকে দিয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে কাল্পনিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে।

৩। আওয়ামী লীগ কর্মীরা ভোটের আগে, ভোটের দিন ও ভোটের পর বিএনপিকে অপকর্মে সহায়তা করেছে।

৪। গণভোটে হ্যাঁ জিতলেও যাতে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা যায়, তার জন্য দ্ইু-তৃতীয়াংশ আসনে বাছাইকৃত দলকে বিজয়ী করে সাংবিধানিক সুযোগ তৈরি করে রাখা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে।

৫। ভবিষ্যতে জুলাই গণআন্দোলনের স্পিরিটকে বিনষ্ট করার জন্য পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে এটা করা হয়েছে, যা ভোটের দিনের জনরায় ও জনপ্রত্যাশার পুরোপুরি বিপরীত চিত্র।

৬। আওয়ামী ভোটকে নির্বাচনে ফ্যাক্টর হিসেবে তুলে ধরে, ভোটের কম কাস্টিং হার ও বিএনপির বিজয়কে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হচ্ছে বিভিন্ন মিডিয়ায়, যা মাঠের বাস্তব চিত্র নয়।

৭। দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন, সামরিক আমলাতন্ত্র, ভারতীয় আধিপত্য ধরে রাখার প্রচেষ্টা, আওয়ামী কালো টাকা, বাম-রামের মিডিয়া ও লন্ডন সমঝোতা এবং জামায়তের সততার শাসনের ভয় নির্বাচনে অবৈধ প্রভাব বিস্তার করেছে কৌশলে। জামায়াতের সততার রাজনীতি রাজনীতিক ও আমলাদের জন্য অত্যন্ত ভীতিকর।

৮। ১০ ফেব্রুয়ারি বিজয়ী দলের কর্মকর্তাদের কপালে যে চিন্তার ভাঁজ দেখা গেছে, জনমত যেমন দেখা গেছে, ভোটের ফলাফল তার সাথে মিলে না। এতটা পার্থক্য ভোটের মাঠের প্রকৃত বাস্তবতা বিবর্জিত।

৯। নির্বাচনের আগেই পুরো প্রশাসনের বিজয়ী দলের দিকে ঝুঁকে যাওয়া, ঘোষিত ফলাফলে সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ভুমিকা রেখেছে।

১০। পতিত ফ্যাসিবাদ, নতুন বিজয়ী ও জামায়াত বিরোধী মিডিয়ার এক ঐক্যবদ্ধ অপপরিকল্পনার অনিবার্য ফল নির্বাচনের এই ফলাফল। এর সাথে বিদেশি শক্তির যোগ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।

অবশ্য অনেকেই মনে করেন, এ নির্বাচন জামায়াতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। তাহলো এখন থেকে যে কোন কর্মসূচি দেওয়ার ক্ষেত্রে জামায়াতকে নিজের জনশক্তির পাশাপাশি সাধারণ জনগণের কথা ভাবতে হবে। দেশে-বিদেশে জামায়াতের ও দেশের ভাবমুর্তির কথা ভাবতে হবে। বিরোধীদল হিসেবে ভূমিকা ধরে রাখা কঠিন। অতীতে জাসদ রব ও জাতীয় পার্টি বিরোধীদল হয়েও রাজনীতিতে টিকতে পারেনি, এটা মাথায় রাখতে হবে। এখনই কেউ কেউ এ নির্বাচনকে আমরা আর মামুরা তকমা দিচ্ছেন। এটা মিথ্যা প্রমাণ করতে হবে কাজের মাধ্যমে। সামনে নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের এ অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। সরকার গঠন করতে না পারলেও এ নির্বাচন জামায়তের দায়িত্ব বাড়িয়ে দিলো। এর মাধ্যমে জামায়াতকে প্রমাণ করতে হবে যে, দলটি সত্যিকার অর্থেই দেশ পরিচালনায় সক্ষম। আর জামায়াত বিরোধীদের মধ্যে জামায়াতের প্রতি ঘৃণা দূর করে শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করতে হবে, প্রশাসনে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে হবে। ভারতে বিজেপি এভাবে এগিয়েছিলো। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, “অন্তত ত্রিশ-চল্লিশটা আসনে পরাজয়ের ব্যবধান ৫-১০ হাজার ভোটের কম। ইসলামপন্থীরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে এইগুলো সহজেই জেতা যেতো। তবে জামায়াত জোট ওভারঅল দুর্দান্ত ফাইট দিয়েছে। নিজের চেয়ে ৫ গুণ বড় প্রতিপক্ষের রীতিমতো ঘাম ছুটিয়ে দিয়েছে। আসনের ব্যবধান অনেক হলেও ভোটের ব্যবধান সামান্য। একটা অজ্ঞাত লোক এসে প্রতিপক্ষের সিপাহসালার তারেক রহমানকে ঢাকা আসনে প্রায় ধরাশায়ী অবস্থা করেছে।

সবচেয়ে বড় কথা জামায়াত জোট লিটারেলি বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাপার ভোট ব্যাংক ও বিপুল অর্থ-সম্পদের বিরুদ্ধে একা ফাইট দিয়েছে। লীগের একাংশ ভোট দেয়নি, বাকি বড় অংশ ভোট দিয়েছে এবং সিংহভাগ বিএনপিকেই দিয়েছে। তার পরেও জামায়াত শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে। মেইনস্ট্রিম মিডিয়া থেকে নিয়ে গোটা ওল্ড এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। জামায়াতের কার্যত কোন মিডিয়া ছিল না, না প্রিন্ট না ইলেক্ট্রনিক।

জামায়াতের প্রতি বিপুল জনসমর্থন ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এটাকে ভোটে কনভার্ট করার জন্য যে বিপুল লজিস্টিক্স ও ম্যানপাওয়ার দরকার হয় সেটা জামায়াতের ছিল না। ঠিকমতো সব কেন্দ্রে পাহারা দেয়ার লোকবল ও জামায়াতের ছিল না। এত দুর্বল অবকাঠামো দিয়ে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন বের করে আনা সহজ না। যারা ছিলেন তাদের মধ্যে ভোটের কোন অভিজ্ঞতা ছিল না।

বিএনপি বিপুল আসন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ভেতরে ভেতরে এ জয় তাদের জন্য এলার্মিং। লীগের ভোট বাদ দিলে বিএনপির নিজস্ব রাজনীতিটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? বিএনপিকে হয়তো জামায়াতকে মাইনাস করে দিতে হবে, নচেৎ আওয়ামী লীগকে পার্মানেন্টলি, তা নাহলে বিএনপির জন্য সমীকরণ জটিল হয়ে পড়বে বলে আমার ধারণা।