‘মাতৃভূমি’, এ বিশেষ শব্দের সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের আবেগ ও বেড়ে ওঠা। বাংলাদেশ আমাদের মাতৃভূমি। মাতৃভূমির কতরূপ! বাংলাদেশ পলল গঠিত একটি আর্দ্র অঞ্চল। এ ভূখ- মূলত গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীগঠিত সুবৃহৎ বদ্বীপের সমন্বয়ে সৃষ্ট। বঙ্গীয় বদ্বীপ পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বদ্বীপগুলোর একটি। এ বিস্তৃত সমতল ভূমির সৌন্দর্যে আমরা মুগ্ধ। এখানে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছে দেশের মধ্যঅঞ্চলের মধুপুর গড়, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্রভূমি এবং উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত কিছু পর্বতসারি। দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ ভূমিই সমুদ্র সমতল থেকে মাত্র তিন মিটারের চাইতেও কম উঁচু। ফলে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়ে বাঁচতে শিখেছে বাংলাদেশের সংগ্রামী মানুষ। শুধু তা-ই নয়, রাজনৈতিক সংকট ও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে সাহসী লড়াইয়ের উজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে এ দেশের মানুষের। মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই বিপ্লব এর বড় প্রমাণ।

এখন আমরা জ্ঞানের কথা বলছি, কিন্তু জন্মের পর তো মায়ের কোলে অবস্থান করে ফ্যালফ্যাল করে চারদিকে শুধু তাকাচ্ছিলাম, কোনো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রশ্ন করতে শিখলাম। এক সময় গৃহ থেকে আঙ্গিনায় পা রাখলাম। সে আঙ্গিনা তো প্রশস্ত হয়ে এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে স্পর্শ করছে। বাংলাদেশর নাগরিক হয়েও আমরা নিজেদের এখন আন্তর্জাতিক মানুষ হিসেবে বিবেচনা করছি। তবে এতকিছুর পরও আমরা আমাদের শৈশবকে ভুলতে পারিনি, যার শুরু হয়েছিল আমাদের মাতৃভূমিতে মায়ের কোলে। এখানে এসে কৃতজ্ঞতা জানাই মহান ¯্রষ্টাকে-যিনি আমাদের ¯েœহময়ী মা দিয়েছেন এবং দিয়েছেন বেড়ে ওঠার মত একটি সুন্দর দেশ। শৈশবে পুকুরে ঝাঁপ দেওয়া, বর্ষায় পা পিছলে পড়ে যাওয়া, শাপলা তুলতে বিলে যাওয়া, আম কুড়ানো বাও, হাডুডু ও ফুটবল নিয়ে মাতামাতি-এসব শুধু মাতৃভূমিতেই সম্ভব। শৈশবে নির্মল আনন্দের মধ্যেই আমরা বেড়ে উঠেছি, তবে এসবের জন্য আমাদের টিকেট কাটতে হয়নি, কোনো অর্থও লাগেনি। কর্পোরেট কোম্পানির দূষণ থেকে আমরা ছিলাম মুক্ত। অবশ্য এসব কোম্পানির ভালো-মন্দ নিয়ে আরও কথা আছে, তবে সেটা আজকের বিষয় নয়।

বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ হলেও এখানে নানা ধর্মের মানুষও বাস করেন। হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টান, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীসহ সবাইকে নিয়ে আমাদের জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ। শৈশবেই এ জাতিরাষ্ট্রের রূপ আমরা দেখেছি, বৈচিত্র্যের ঐক্যসুর শ্রবণ করেছি। গ্রামের বাড়িতে আমার এক কাকা যখন অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন মদন কবিরাজের আগমন ঘটলো। তিনি শুধু ঔষধই দিলেন না, দোয়া ইউনুসটাও শুদ্ধ করে দিলেন কৃষক পরিবারের সদস্যদের? বললেন, ‘কুনতুম’ হবে না, হবে ‘কুনতু’। আর এক দৃশ্য দেখেছি নানা বাড়িতে। বেড়াতে গিয়ে দেখলাম, প্রতিবেশি কয়েকজন হিন্দু এসে নানার কাছে আব্দার করছেন-আমাদের রামায়নটা একটু পড়ে শোনান না মাস্টার মশাই। এসব কিসের উদাহরণ?

এসব কি সবাই মিলে বসবাসের ‘ইনক্লুসিভ’ উদাহরণ নয়? বাংলাদেশ আসলে একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে আরো কথা আছে। কখনো কখনো তো এদেশে সাম্প্রদায়িক অনাচার লক্ষ্য করা যায়, এর কারণ কী? বৃহত্তর জোনগোষ্ঠী এ অনাচারের সাথে সম্পৃক্ত নয়। চরিত্রে যারা দুর্বুত্ত তারা সংখ্যালঘুদের সম্পদের দিকে হাত বাড়ায়, কখনো কখনো এখানে ক্ষুদ্র রাজনীতিও লক্ষ্য করা যায়। এদের শায়েস্তা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ প্রশাসন তথা সরকারই যথেষ্ট। কিন্তু যথাস্থানে যথাকাজ সবসময় লক্ষ্য করা যায় না। এর মূল কারণ কিছু লোভ, তথা নৈতিক অধপতন। এমন অধপতন এখন পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই লক্ষ্য করা যায়। এটা একদিকে যেমন জাতীয় সমস্যা, তেমনি বৈশি^ক সমস্যাও বটে। জবাবদিহিতার চেতনা ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এ চেতনার সংকট তো এখন প্রায় সর্বত্র। ধর্ম, বর্ণ ও ভাষার কারণে এখানে তেমন কোনো তারতম্য ঘটছে না। অনেকেই এখন সেক্যুলার। পরকালে জবাবদিহিতার ভয় এখন মানবম-লীর মধ্যে প্রায় অনুপস্থিত। সেক্যুলার মানুষ তো ইহলোকিকবাদী। পরকাল নিয়ে তারা তেমন মাথা ঘামান না। দুনিয়ার সুখ-শান্তি, সম্পদ তাদের কাছে মুখ্য বিষয়। লোভ অথবা চাপ তাদের তথাকথিত মানবিক মূল্যবোধকে সহজেই পরাস্ত করে ফেলে। এ জন্যই নবী-রাসূলরা যুগে যুগে মানুষের কাছে পরকালে জবাবদিহিতার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছেন। ¯্রষ্টায় বিশ^াসী মানুষ পরকালের জবাবদিহিতাকে ভয় করে যদি অন্যায় ও পাপ থেকে দূরে থাকে, তাহলে সংখ্যালঘু নির্যাতনসহ যাবতীয় বঞ্চনা ও বৈষম্য থেকে মানুষ রক্ষা পেতে পারে। আমাদের বিবেচনায় বর্তমান সভ্যতায় সবচেয়ে বড় সংকট হলো, জবাদিহিতার অনুপস্থিতি। এর মূলে রয়েছে মহান ¯্রষ্টাকে ভুলে যাওয়া। ¯্রষ্টার সব নেয়ামত ভোগ করেও মানুষ এখন বড় অকৃতজ্ঞ। অকৃতজ্ঞ মানুষজন নিজেরাই এখন প্রভু হয়ে উঠেছে। এসব প্রভু এতটাই ক্ষুদ্র ও সার্থান্ধ যে, তারা কোয়ালিশন করে গোটা পৃথিবীটাকেই মানুষের বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে। তাদের ভূরাজনীতি, অর্থনীতি, জ¦ালানি নীতি, কৃষিনীতি, পারমাণবিক নীতি মানুষকে, পৃথিবীকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। আস্থার সংকটে মানবজাতি হতাশার গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে হলে মানুষকে প্রভুর বদলে বান্দা হতে হবে। ছোট-বড় সবাইকে কর্ম সম্পাদনার ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার চেতনাকে ধারণ করতে হবে। মন্দকর্ম থেকে বাঁচার জন্য সচেষ্ট থাকতে হবে সবসময়। এভাবেই হয়তো আবার আমরা মানুষ হয়ে উঠতে পারবো।

বর্তমান সেক্যুলার সভ্যতার একটি বড় বিষয় হলো, আত্মপ্রবঞ্চনা। চাতুর্য করতে গিয়ে মানুষ এখন নানাভাবে নিজকে ঠকাচ্ছেন। সমাজের প্রাগ্রসর মানুষদের অনেকেই নিজেকে সংস্কৃতিমান মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে চাইছেন, এর প্রকাশও নানাভাবে ঘটাচ্ছেন। বিভিন্ন বিষয়কে উপলক্ষ করে তারা পার্টির আয়োজন করে থাকেন। আয়োজন করে থাকেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরওÑ যেখানে নাচ-গানের বিষয়টাই হয়ে ওঠে মুখ্য। এভাবে তাঁরা নিজেদের সংস্কৃতিমান মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে গর্ববোধ করেন। প্রশ্ন হলো, তাদের এসব আচরণে মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনের কতটুকু প্রকাশ পায়? তারা যা করেন, তা মানষের বিনোদন জীবানের ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। বিষয়টিকে ‘বিনোদন সংস্কৃতি’ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এখানে ওইসব অনুষ্ঠানের বিষয় আসয়, মান ও নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া ওইসব বিনোদন অনুষ্ঠানের চালচিত্র দেশের মানুষের বোধ-বিশ্বাস ও আশা-আকাক্সক্ষার সাথে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ, সে প্রশ্নও করা যায়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষের পুরো জীবনে বিনোদন সংস্কৃতির পরিসর কতটুকু? সংস্কৃতি যদি হয়, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে মানুষের বোধ-বিশ্বাস ও আশা-আকাক্সক্ষার রূপময় প্রকাশ, তাহলে বিনোদন-সংস্কৃতি তো সেখানে একটি যৎকিঞ্চিত বিষয়। আর প্রচলিত বিনোদন সংস্কৃতি দেশের মানুষের অনুভূতি ও উপলব্ধিকে সেভাবে ধারণও করতে পারছে না। কৃত্রিম ও আরোপিত এ বিনোদন সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে আছেন বিশেষ ঘরানার কিছু মানুষ, যারা দেশের মূল ধারার সাথে তেমন সম্পৃক্ত নন।

মূল ধারা বলতে আমরা দেশের জনগণের মূল ¯্রােতকে বুঝে থাকি। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এখানে মূল স্রোত হলো নব্বই ভাগ মানুষের ইসলামী জীবনধারা। এ কথার অর্থ আবার এটা নয় যে, অন্য ধর্ম ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জীবন ধারা ও সাংস্কৃৃতিক প্রকাশ এখানে ব্যাহত হবে। বাংলাদেশে সবাই আপন আপন দর্শন ও মননে বিকশিত হতে পাারবেন। জবরদস্তি ও বর্বরতার চর্চা এখানে প্রশ্রয় পাবে না। সবাই যার যার ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন ও লালন করবেন। এটাই তো ঁহরঃু রহ ফরাবৎংরঃু বা ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’। এমন ভাবনায় ঈঁষঃঁৎধষ ভবফধৎধঃরড়হ হতে পারে, তবে ঈঁষঃঁৎধষ ভঁংরড়হ নয়; অর্থাৎ সাংস্কৃতিক মিশ্রণ থেকে আমাদের মুক্ত থাকতে হবে। সম্মানীত নাগরিকরা আপন আপন রঙে রঙিন হবেন। এখানে গোঁজামিলের প্রয়োজন নেই।

সঙ্গত কারণেই এখানে একটি বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এখানে মূল ¯্রােত হলো, নব্বই ভাগ মানুষের ইসলামী জীবনধারা। কিন্তু এ জীবনধারার কথা আমাদের মিডিয়ায়, সাংস্কৃতিক মঞ্চে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে? সরকারের কর্মতৎপরতায়ও দেশের মূলধারার প্রতিফলন তেমন হয় না। প্রায় সব জায়গাতেই সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো ‘সেক্যুলারিজম’ তথা ইহলোকিকবাদিতা চেপে বসে আছে। ইসলামী জীবধারা সম্পর্কে আমাদের সমাজে বিভ্রান্তিও কম নয়। বিষয়টিকে কেউ ‘সাম্প্রদায়িক’, কেউবা ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’ বলে ভুল ব্যাখ্যা দেন। ইসলামী জীবনধারা আসলে ইসলামী জীবনদর্শনের সাথে জড়িত। এখানে সাম্প্রদায়িকতা কিংবা উগ্রজাতীয়তাবাদের কোনো স্থান নেই। এখানে অন্য জীবনদর্শনের চাইতে আরো সুষ্ঠু ও সঙ্গতভাবে সব মানুষের অধিকার ও মক্তির কথা বলা হয়েছে। অনেকেই না জেনে, ধারণা ও প্রোপাগান্ডার শিকার হয়ে ইসলামী দর্শন ও জীবন ধারার বিরুদ্ধে নেতিবাচক কথা বলে থাকেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই কলহটা আরো বেশি। ভাবতে অবাক লাগেÑ অনেকে মানবরচিত জীবনদর্শনের চর্চায় বেশ আগ্রহী হলেও ¯্রষ্টা প্রেরিত জীবনদর্শনের চর্চায় তেমন আগ্রহী নন। ফলে প্রশ্ন জাগে, ¯্রষ্টা ও মানুষের মধ্যে কার জ্ঞান নির্ভুল।