অধ্যাপক এবিএম ফজলুল করীম

আরবি বছরের অষ্টম মাস শাবান। মুসলমানদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস। অথচ এই মাসে আমাদের সমাজে সময়ের বহুলাংশ কাটে অবহেলায়। রজব ও রমযানের মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে অনেকেই এই মাসকে কেবল একটি “অপেক্ষার মাস” হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আমল, সাহাবায়ে কেরামের অনুশীলন এবং ইসলামের মৌলিক শিক্ষার আলোকে স্পষ্টভাবে বলা যায়-শাবান মাসকে অবহেলা করা মানেই রমযানের প্রস্তুতি দুর্বল করে দেওয়া। আর দুর্বল প্রস্তুতির পরিণতি কখনোই সফল ইবাদত হতে পারে না।

ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, শাবান মাস কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মাস নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর আদর্শিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। হিজরতের প্রায় দেড় বছর পর এই মাসেই মুসলমানদের কিবলা পরিবর্তিত হয়-বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে কাবা শরিফ।এই ঘটনা মুসলিম জাতিসত্তার জন্য ছিল এক যুগান্তকারী অধ্যায়। কাবাকেন্দ্রিক ইবাদত ও ঐক্যের মাধ্যমে মুসলমানরা একটি স্বতন্ত্র পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করে। তাই শাবান মাস আমাদের কাছে আত্মপরিচয়, ঐক্য ও আনুগত্যের এক স্মরণীয় বার্তা বহন করে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে উম্মতের জন্য আদর্শ স্থাপন করেছেন। শাবান মাসও এর ব্যতিক্রম নয়। উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসূল (সা:) রমযান ছাড়া অন্য কোনো মাসে পূর্ণ মাস রোজা রাখেননি; তবে শাবান মাসে সবচেয়ে বেশি নফল রোজা পালন করতেন। কখনো এত বেশি রোজা রাখতেন যে মনে হতো তিনি আর রোজা ছাড়বেন না, আবার কখনো বিরতি দিতেন-যাতে উম্মতের জন্য ভারসাম্য ও সহজতার শিক্ষা থাকে’।

এই আমল আমাদের একটি গভীর সত্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মাস হলো রমজান মাস। এই মাসটি হঠাৎ করে এসে যায় না, বরং এর জন্য ধাপে ধাপে প্রস্তুতি প্রয়োজন। শাবান মাস সেই প্রস্তুতির বাস্তব প্রশিক্ষণকাল। অথচ আমাদের সমাজে দেখা যায়, অনেক মানুষ রমযান শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত ইবাদতের কোনো পরিকল্পনাই করে না। ফলে রমযানের প্রথম কয়েক দিন আবেগ ও উৎসাহ থাকলেও মাঝামাঝি সময়ে এসে ক্লান্তি, অবসাদ ও শৈথিল্য দেখা দেয়। এর মূল কারণ-শাবান মাসকে গুরুত্ব না দেওয়া।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাস সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটি এমন একটি মাস, যা রজব ও রমযানের মাঝখানে অবস্থান করে এবং অধিকাংশ মানুষ এ মাসে গাফেল থাকে। অথচ এই মাসেই মানুষের আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়’। এই হাদিস আমাদের আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়-আমরা কি সেই গাফেলদের দলে পড়ে যাচ্ছি না?

শাবান মাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-রমযানের জন্য মানসিক ও আত্মিক প্রস্তুতি। রমযান শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়; এটি আত্মসংযম, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মাস। আর আত্মশুদ্ধির এই দীর্ঘ সাধনা হঠাৎ করে শুরু করা সম্ভব নয়। শাবান মাসে নফল রোজা, নফল নামাজ ও যিকির-আজকারের মাধ্যমে নিজেকে অভ্যস্ত করে তোলাই হলো রমযানের জন্য সর্বোত্তম প্রস্তুতি।

রমযান হলো কুরআন নাজিলের মাস। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক মুসলমান রমযানে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করেন, অথচ শুদ্ধ পাঠ, অর্থ অনুধাবন বা জীবনে প্রয়োগের কোনো পূর্বপ্রস্তুতি থাকে না। ফলে কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক সীমাবদ্ধ থাকে শুধু তিলাওয়াতের সংখ্যায়। শাবান মাস হতে পারে সেই সময়, যখন কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা যায়-সহিহ তিলাওয়াত শেখা, অর্থ ও ব্যাখ্যা বোঝা এবং কুরআনের আলোকে জীবন পরিচালনার সংকল্প গ্রহণ করা।

শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত, যা শবে বরাত নামে পরিচিত, সে রাত নিয়েও আমাদের সমাজে ব্যাপক বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা যায়। হাদিসে এ রাতের ফজিলতের কথা থাকলেও এ রাতকে কেন্দ্র করে পটকা ফোটানো, আতশবাজি, আলোকসজ্জা ও নানা ধরনের বিদআত কর্মকাণ্ডের প্রচলন দেখা যায়। এসব কাজ শবে বরাতের প্রকৃত শিক্ষা ও উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। এই রাতের মূল বার্তা হলো-তাওবা, ক্ষমা প্রার্থনা, বিদ্বেষ পরিহার এবং আত্মশুদ্ধি। বাহ্যিক উৎসব নয়, বরং অন্তরের সংশোধনই হওয়া উচিত এ রাতের মূল চেতনা।

এছাড়াও শাবান মাসে রমযানের সামাজিক প্রস্তুতি ও ব্যক্তি পর্যায়ের ইবাদতের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে রমযানের পবিত্র পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। দিনের বেলায় প্রকাশ্যে পানাহার, অশালীনতা ও অসংযমী আচরণ রমযানের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করে। এসব বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা এবং নৈতিক পরিবেশ তৈরি করা শাবান মাস থেকেই শুরু হওয়া উচিত।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রজব ও শাবান মাসে যে দোয়া পাঠ করতেন-“হে আল্লাহ! রজব ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন এবং আমাদের রমযান পর্যন্ত পৌঁছে দিন”-তা আজ শুধু ব্যক্তিগত দোয়া হিসেবে নয়, বরং সামষ্টিক চেতনার অংশ হওয়া প্রয়োজন। কারণ রমযানে পৌঁছানোই যথেষ্ট নয়; বরং রমযানের হক আদায় করে সফল হওয়াই আসল উদ্দেশ্য।

পরিশেষে বলতে হয়, শাবান মাস কোনো আনুষ্ঠানিক সময় নয়; এটি দায়িত্ববোধ, আত্মসমালোচনা ও প্রস্তুতির মাস। যে ব্যক্তি ও সমাজ শাবান মাসকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়, তাদের জন্য রমযান হয়ে ওঠে আত্মশুদ্ধি ও পরিবর্তনের বাস্তব সুযোগ। আর যারা শাবানকে অবহেলা করে, তাদের রমযান অনেক সময় ক্লান্তি, আনুষ্ঠানিকতা ও অভ্যাসগত ইবাদতেই সীমাবদ্ধ থাকে।

এখন সময় এসেছে-শাবান মাসকে তার প্রকৃত মর্যাদায় ফিরিয়ে আনার। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ যদি শাবান মাস থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করে, তবে রমযান শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং একটি জীবন পরিবর্তনকারী অধ্যায়ে পরিণত হবে এবং আমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারবো। আল্লাহ তাআলা আমাদের সেই উপলব্ধি ও প্রস্তুতির তৌফিক দান করুন-আমিন।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সিনেট সদস্য।