মুঃ শফিকুল ইসলাম
আমাদের দেশে ‘গণভোট’ শব্দটি পুরনো, কিন্তু ২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যে গণভোটের প্রস্তাব সামনে এসেছে, তা নিছক একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়-এটি রাষ্ট্রক্ষমতার চরিত্র বদলে দেওয়ার এক ঘোষিত দাবি। দীর্ঘ দেড় দশকের একদলীয় কর্তৃত্ব, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ এবং মৌলিক অধিকার সংকোচনের বাস্তবতায় এ গণভোট প্রস্তাব জনগণের সামনে একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে-রাষ্ট্র কি এবার সত্যিই জনগণের কাছে ফিরবে, নাকি ক্ষমতার কৌশলগত পুনর্বিন্যাসই ঘটবে?
প্রস্তাবিত গণভোটের মাধ্যমে বলা হচ্ছে-তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, পিএসসি গঠন থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ, সংসদের উচ্চকক্ষ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, এমনকি ইন্টারনেট বন্ধ না করার মৌলিক অধিকার-সবই জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে নিশ্চিত করা হবে। কথাগুলো শুনতে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তব রাষ্ট্রকাঠামোতে কতটা কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য?
বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ ব্যবস্থা বাতিলের পর থেকে একের পর এক নির্বাচন হয়েছে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে, ভোটারবিহীন কেন্দ্রে, প্রশাসনিক প্রভাবের অভিযোগে। ফলে সংসদ হয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ, সরকার হয়েছে একতরফা।
গণভোটের প্রস্তাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে সরকারি ও বিরোধী দলের যৌথ অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে বাস্তবতা হলো-যে রাজনৈতিক শক্তি এককভাবে ক্ষমতায় থাকতে অভ্যস্ত, তারা কি সত্যিই ক্ষমতা ভাগাভাগিতে রাজি হবে? এ প্রশ্নের উত্তর না থাকলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারও কাগুজে আশ্বাসে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশন-এ দু’প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। কিন্তু বাস্তবে এরা দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছানির্ভর কাঠামোয় আবদ্ধ। বিতর্কিত কমিশনের অধীনে ভোট হয়েছে, প্রশ্নবিদ্ধ পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ হয়েছে-যা প্রশাসনের নিরপেক্ষতাকে ধ্বংস করেছে।
গণভোটে এসব প্রতিষ্ঠান গঠনে সরকারি ও বিরোধী দলের যৌথ ভূমিকার কথা বলা হলেও এখানেও মূল প্রশ্ন রয়ে গেছে- এ যৌথতার কাঠামো কী? সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমতা থাকবে, নাকি সংখ্যাগরিষ্ঠের ছদ্মবেশে আধিপত্য বজায় থাকবে? দৈনিক সংগ্রাম বহুবার লিখেছে প্রতিষ্ঠান বাঁচাতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই প্রথম শর্ত।
বাংলাদেশের সংবিধান বহুবার সংশোধিত হয়েছে, কিন্তু জনগণের মতামত ছাড়াই। ক্ষমতাসীন দল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ব্যবহার করে সংবিধানকে দলীয় দলিলে পরিণত করেছে-এ অভিযোগ অমূলক নয়। গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোট চালুর প্রস্তাব এক্ষেত্রে একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক দাবি। এটি কার্যকর হলে সংসদ আর সর্বময় ক্ষমতার মালিক থাকবে না; জনগণ হবে চূড়ান্ত নির্ণায়ক। তবে এখানেও সতর্কতা প্রয়োজন‘গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন’ শব্দটির ব্যাখ্যা যদি সরকারই নির্ধারণ করে, তাহলে গণভোটও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন ও গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার প্রস্তাব সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনের একটি শর্ত। বাস্তবতা হলো-বাংলাদেশের সংসদ কার্যত বিরোধীশূন্য। প্রশ্ন, বিতর্ক, জবাবদিহি-সবই অনুপস্থিত।
এ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সংসদ কেবল আইন পাসের কারখানা না হয়ে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তবে বিরোধী দল যদি স্বাধীন ও শক্তিশালী না হয়, তাহলে কাঠামোগত সংস্কারও নিষ্ফল হবে।
একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না-এ প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য যুগান্তকারী। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে যে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা গড়ে ওঠে, তা প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।
মেয়াদ সীমা রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে পারে, দলীয় গণতন্ত্রকে জোরদার করতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো-এ সীমা কি ভবিষ্যতে সংশোধন করে বাতিল করা যাবে? এখানেই গণভোটের বাধ্যবাধকতা অপরিহার্য।
সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর কথা বহু বছর ধরে বলা হলেও বাস্তবে তা সীমাবদ্ধ সংরক্ষিত আসনে। গণভোটে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও সরাসরি নির্বাচনের নিশ্চয়তা না থাকলে এটি ক্ষমতায়নের বদলে প্রতীকী উপস্থিতিতেই আটকে থাকবে। একইভাবে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে পারে, যদি তা আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব ও আইন পর্যালোচনার কার্যকর ভূমিকা পালন করে। অন্যথায় এটি হবে আরেকটি ব্যয়বহুল অলংকার।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ইন্টারনেট বন্ধ না করার মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা ক্ষমতায় সীমা সবই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু বাংলাদেশে সমস্যা আইন না থাকা নয়, সমস্যা আইনের প্রয়োগ না হওয়া। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য প্রশ্নেও একই কথা প্রযোজ্য। একক নির্বাহী কর্তৃত্ব ভাঙা না গেলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপ ফিরবে না।
গণভোট ২০২৬ বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগÑ যদি এটি সত্যিই ক্ষমতাকে সীমিত করে, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে এবং জনগণকে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে আনে। কিন্তু যদি এটি হয় পুরোনো ক্ষমতা কাঠামোর নতুন প্যাকেজিং, তাহলে জনগণের হতাশা আরও গভীর হবে।
আমরা বিশ্বাস করি- গণতন্ত্র কেবল ভোট নয়, গণতন্ত্র মানে ক্ষমতার লাগাম। গণভোট ২০২৬ সে লাগাম জনগণের হাতে তুলে দেবে কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
লেখক : প্রাবন্ধিক।