হারুন-আর-রশিদ
দেশের ইতিহাসে ৫৫তম বাজেট। বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব প্রাপ্তির লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি, বাজেটে ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। স্বৈরাচার হাসিনার ভারতে পলায়ন ও অন্তর্বতী সরকারের দীর্ঘ দেড় বছর দায়িত্ব পালন এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পররাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ফিরে এসেছে সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি সরকার। রাজনৈতিক নেতৃত্বেও এসেছে বড় পরিবর্তন। সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক জঠিলতা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক বিনিয়োগের স্থবিরতা, দুর্বল ব্যাংকিং খাত,বৈদেশিক ঋণের চাপ। সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যেই সরকারকে তার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথ খুঁজতে হচ্ছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার চার মাসের মাথায় এটি তাদের প্রথম বাজেট।
সরকার আগামী অর্থ বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা গতবারের থেকে ২৫ হাজার বৃদ্ধি পেয়ে পৌনে চার লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার কারণে করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করার বিবেচনায় আনা উচিত। প্রস্তাবিত ২০২৬ -২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৪২ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে যা দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের সামরিক ভারসাম্য রক্ষায় পর্যাপ্ত নয় বলে প্রতিয়মান হয়। এ ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা বাজেট আরো বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনায় আনা যেতে পারে । এবারের বাজেটে সরকারের সুচিন্তিত পরিকল্পনায় ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ট্রেন ভাড়া লাগবে না,এবং মেট্রোরেলেও ছাড় দিয়েছে ২৫ শতাংশ এদুটো ছিল সরকারের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী সেই হিসেবে নারী ও শিশু উন্নয়নে বাজেট বাড়ানো উচিত। ২০২৫ -২০২৬ ছিল ৫ হাজার ৩৭১ টাকা সেটা ১৭৫ টাকা কমিয়ে ধরা হয়েছে ৫হাজার ১৯৬ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে বাজেট বাড়ানো উচিত।
২০২৬-২৭ অর্থ বছরে ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করেছে। তবে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব খুলতে এই টিআইএন সনদ দেখাতে হবে না। সরকারের ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ধরে রাখার চেষ্টা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়,মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার আরো বেড়ে ১৬ মাসের সর্বোচ্চ হয়েছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে ৯ দশমিক শতাংশ সার্বিক মূল্যস্ফীতির অর্থ দাঁড়ায় গত বছর মে মাসে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় মিলেছে, তা চলতি বছরে মে মাসে পেতে খরচ করতে হয়েছে ১০৯ দশমিক ৪২ টাকা। সেই হিসেবে মূল্যস্ফীতির লাগাম ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে টেনে ধরা সম্ভব নয়। বাজেটে যে ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা কিভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় এডজাস্ট হবে সেটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে আছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) সন্মানিত ফেলো ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড.দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বাজেট প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন বাজেট চিন্তাশীল হলেও এর আর্থিক ভিত্তি খুবই দূর্বল। বাজেটে যে অর্থের পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয় এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তিনি আরো বলেন,আগামী দিনে বাজেট বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এবং সংস্কারের মাধ্যমে তা কীভাবে কার্যকর করা হয় সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বরাদ্দ বাড়ছে ১৭,৩৪৫ কোটি টাকা: সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। বাজেটে বিদ্যুৎ খরচ কমেছে। শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ উপকরণ আমদানি। ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য। নতুন অর্থ বছরে বরাদ্দ বাড়ছে ৩৯৩ কোটি টাকা। শুল্ক তুলে দিতে যে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে, এতে গড়ে ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক থেকে রেহাই পাবে সৌরবিদ্যুৎ খাত এর মধ্যে দিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিনিয়োগে ইতিবাচক সাড়া দিতে হবে। ফলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন ধারা শুরু হবে। প্রতি মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অন্তত ৬০ জনের কর্মসংস্থান তৈরী হয়। এখন এ খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে। এতে আগামী ৫ বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হতে পারে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। ১২জুন ২০২৬ বৃহস্পতিবার প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় এই বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি চলমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে দেশের অর্থনীতিতে সৃষ্ট বহুমুখী চাপের চিত্র তুলে ধরেন।
বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ধাক্কাঃ অর্থমন্ত্রী জানান বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১০ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংকট শুরু হয়,যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি আকস্মিক ও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। সেটাকে সরকারের সামাল দিতে হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনায়’ বাজেটে সুখবর আছে। এর আগে বিগত সরকারগুলো নির্বাচনের সময় তিস্তা মহাপরিকল্পনা ব্যস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা ব্যস্তবায়ন করেনি বরং তিস্তা পারের মানুষ ভাগ্যবদল্ ও জীবনযাত্রা নিয়ে তালবাহানা করেছে।অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যবদল ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রী জানান আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। ইতোমধ্যে ৬ হাজার ৫৯৮ কিলোমিটার খাল খননের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩০৯ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, পূণঃনির্মাণ ও মেরামত এবং ফ্লাড ওয়াল নির্মাণ করা হবে।
অর্থমন্ত্রী জানান, ৪৮৪ কিলোমিটার নদ-নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি ও ডুবোচর অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নদী পুনরুদ্ধার কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি নদী বা জলাশয় দখলমুক্ত ও পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। মন্ত্রী জানান, ধলেশ্বরী, লৌহজং, আলাইকুড়ি, মগড়া, সালতা, সুতাং, বাঁখালী, বারনই নদী পুনরুদ্ধার এবং পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। হাওড়-বাওর অঞ্চলের সমন্বিত উন্নয়ন এবং উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা নিরসন করার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। পদ্না ব্যারেজ প্রকল্প একনেক কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে আগামী ৭ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এ প্রকল্পের আয়তায় দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। চারটি বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০ টি উপজেলা সুবিধা ভোগ করবে। (অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা ১২/০৬/২০২৬)
বাজেটে মন্দ দিকও আছে যেমন-দেশে উচ্চমূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার শ্লথ, বিদেশী ঋণের বোঝা বৃদ্ধি, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতিও বাড়ছে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বহির্বিশ্বে অর্থ পাচার অর্থনৈতিকে ভঙ্গুর অবস্থার দিকে নিয়ে গেছে গত সাড়ে ১৫ বছরে। এর সঙ্গে আছে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও মন্দা অবস্থা পরস্পর জড়িত। খাদের কিনারে থাকা অর্থনীতিকে এমনি জটিল অবস্থা থেকে টেনে তুলতে সামনে রয়েছে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রবৃদ্ধির মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) উচ্চ প্রবৃদ্ধি আশা করছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসেবে মোট দেশজ উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। সেই হিসেবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক্কলনে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা অনেকটাই অসম্ভব।তারপরও অর্থমন্ত্রী ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্য প্রাক্কলন করেছেন জিডিপির ৭ শতাংশ ও ২০২৮-২৯ অর্থবছর সাড়ে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। যেটা অনেকটা অসম্ভব বলে ধরে নেওয়া যায়।
বাজেটে জনবান্ধব, সুপরিকল্পিত এবং বাস্তবায়নমুখী অর্থনৈতিক রূপরেখার প্রতিফলন ঘটেনি। জীবনমান উন্নয়ন, স্বনির্ভরতা ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের কোনো দিকনির্দেশনা পরিলক্ষিত হয়নি। জুলাই সনদভিত্তিক কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।বাজেটে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার কীভাবে পূরন করা হবে সে ব্যাপারে বাজেট বক্তৃতায় অর্থ মন্ত্রীর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। এই বাজেট গত অর্থ বছরের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বড় হলেও বর্তমান ভঙ্গুর ও ঋণনির্ভর অর্থনীতির বাস্তবতায় এটি ‘কাল্পনিক ও অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী’। বাজেটটি সংখ্যাভিত্তিক বাস্তব পরিকল্পনার চেয়ে ইশতেহারনির্ভর প্রতিশ্রুতির ওপর বেশি দাঁড়িয়ে আছে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। দেশীয় ব্যাংক ও বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা প্রবৃদ্ধি অর্জনকে আরও জঠিল করে তুলবে।বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান ব্যয়, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে বলে প্রতীয়মান হয়। তাছাড়া রাজস্ব আদায়ে তরিৎ দিকনির্দেশনা নেই। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রধান প্রতিবন্ধকতা দুর্বল রাজস্ব আহরণ। দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বেশ উচ্চাভিলাষী। এ লক্ষ্য পূরণে কর কাঠামো আরও যৌক্তিকীকরণ করা প্রয়োজন।
লেখক : গ্রন্থকার, গবেষক এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষক।