মেশকাতুন নাহার

বাইরে তুষার ঝরে। হাওয়ার প্রতিটি শ্বাসে জমে ওঠে শীতের ছুরি-ধার। হিমেল রাত শহর ও গ্রামকে ঢেকে দেয় এক অদ্ভুত নীরবতায়-যেন প্রকৃতি নিজেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শৈত্যপ্রবাহে প্রভাত আসে ঠিকই, কিন্তু সে সকাল আর উষ্ণ আশ্বাস বয়ে আনে না; বরং কুয়াশার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য অদৃশ্য কষ্টের গল্প।

শীত কেবল একটি ঋতু নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক বাস্তবতা। হাওয়ার ছোঁয়ায় কাঁপে শুধু প্রকৃতি নয়-কাঁপে মানুষের মন। নীরব এ শীতে সবচেয়ে বেশি কাঁপে যারা, তারা কোনো শিরোনাম হয় না-পথশিশু, ছিন্নমূল মানুষ, বয়স্ক দরিদ্র, আর শ্রমজীবী মানুষজন। রাতের ঠাণ্ডায় শিশু কাঁপে মায়ের বুক আঁকড়ে ধরে, বৃদ্ধের গড়ন কাঁপে বয়স আর অসহায়তার ভারে। অথচ আমাদের শহরের আলো, ব্যস্ততা আর উষ্ণ ঘরের ভেতর এসব দৃশ্য প্রায়ই চোখ এড়িয়ে যায়।

শীত আমাদের মানবিকতাকে পরীক্ষা করে। আমরা কতটা দেখতে পাই অন্যের কাঁপুনি? কতটা অনুভব করি সেই ঠাণ্ডা, যা কেবল তাপমাত্রায় মাপা যায় নাÑযা মাপা যায় অবহেলা, বৈষম্য আর নির্লিপ্ততায়? সমাজ হিসেবে আমরা কী কেবল নিজের উষ্ণতা রক্ষা করেই দায়িত্ব শেষ করি, নাকি অন্যের শরীর-মনের শীতটুকুও ভাগ করে নিই?

প্রতিবছর শীত আসে, আবার চলে যায়। কিন্তু শীতের সময় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের কষ্ট অনেক সময় থেকেই যায়-অদৃশ্য, অনালোকিত। রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তি-তিন পক্ষের সম্মিলিত দায় এখানেই। ত্রাণ, শীতবস্ত্র বা সাময়িক সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সংবেদনশীলতা।

হিমেল রাত আমাদের শুধু কাঁপায় না, প্রশ্নও তোলে। আমরা কি কেবল দর্শক হয়ে থাকব, নাকি নীরব শীতের ভেতর দাঁড়িয়ে মানুষের পাশে উষ্ণ হাত বাড়াব? শীত যদি আমাদের হৃদয়টুকু না জমিয়ে দেয়, তবেই এ ঋতুর সঙ্গে আমাদের মানবিক সম্পর্ক রয়ে যাবে।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।