বাংলাদেশের প্রিন্ট ও ইলেক্টনিক মিডিয়া যে খবরটি প্রাকাশ করেনি তা-ই আজ লিখতে বসেছি। দুই বাংলাদেশ বংশোদ্ভূত বৃটিশ নাগরিকের দুই কীর্তি : একজন টিউলিপ সিদ্দিকী দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে মন্ত্রিত্ব হারালেন; আরেকজন চৌধুরী মঈনউদ্দিনের কাছে বৃটিশ সরকার আদালতের পূর্ণাঙ্গ বৈঠকে ক্ষমা চেয়ে মানহানি বাবত আড়াই লাখ পাউন্ড স্টার্লিং তথা বাংলাদেশী টাকায় তিন কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিলেন।
টিউলিপ সিদ্দিকী বাংলাদেশে বিতাড়িত ও পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী বর্তমান শতাব্দীর ফেরাউন-নমরূদ নামে খ্যাত জালেম ও স্বৈরাচারী দুর্নীতিপরায়ণ শাসক শেখ হাসিনার বোনের মেয়ে ও আওয়ামী রাজনীতির চিটা ফসল। তার আত্মীয়রা দেশের রাজনীতিকে কলুষিত করেছে। তিনি দেশের অভ্যন্তরে ও তার সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও দুর্নীতির দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পিতৃভূমির মুখে কালিমা লেপন করেছেন। গতকাল সোমবার দুর্নীতির মামলায় টিউলিপের খালা শেখ হাইসনার ৫ বছর, তার মা রেহানার ৭ বছর এবং তার দুই বছর কারাদণ্ড হয়েছে। এখন তিনি এমপির পদও হারাতে বসেছেন।
পক্ষান্তরে চৌধুরী মঈনউদ্দিন ইসলামী জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করার কারণে আওয়ামী জুলুমের শিকার। তার জন্ম বাংলাদেশের ফেনী জেলার দাগনগভূঞা উপজেলায়। তিনি বিখ্যাত আতাতুর্ক হাইস্কুল, কাদরী হাইস্কুল, ফেনী কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং একজন কীর্তিমান সাংবাদিক হিসেবে দেশের পত্রিকা জগতে মেধা ও সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। ইসলামী ছাত্র আন্দোলনেও তার গতিশীল ভূমিকা ছিল। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে ১১ দিনের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর কাছে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কম্যান্ডের আত্মসমর্পণ ও নতুন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর তৎকালীন আওয়ামী লীগের ভারত প্রত্যাগত নেতাকর্মীরা এ দেশের ইসলামপন্থী দল ও তাদের নেতাকর্মী এবং আলেম-ওলামাদের ওপর ক্ষুধার্ত হায়েনার ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং লাখ লাখ লোককে হত্যা করে। আলেম-ওলামা ও ইসলামপন্থী দলগুলো ছাড়াও তাদের প্রথম ও প্রধান টার্গেট ছিল অবাঙালি বিহারী বলে কথিত এ দেশের নাগরিক ও ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা। শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন আওয়ামী সরকার শুধু গণহত্যার মধ্যেই তাদের জুলুম সীমাবদ্ধ রাখেনি, ভিন্ন মতাবলম্বী প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে উৎখাত করে তা জবর দখল করেছিল। অনেকের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছিল এবং হাজার হাজার লোক প্রাণভয়ে দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। অন্যদের সাথে চৌধুরী মঈনউদ্দিনও সে সময় প্রথমে নেপাল পরে পাকিস্তান হয়ে বৃটেনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ১৯৭৩ সাল থেকে তিনি সে দেশে বসবাস করছেন এবং ১৯৮৪ সালে দেশটি তাকে নাগরিকত্ব প্রদান করে।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মেধাবী ছাত্রনেতা ও প্রথিতযশা সাংবাদিক চৌধুরী মঈনউদ্দিন তার মেধা নিজের মাতৃভূমির কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়ে কিন্তু থেমে যাননি, বৃটেনের বুকে তার স্বাক্ষর রেখেছেন। আশির দশকের শুরুতেই তিনি দাওয়াতুল ইসলাম ইউকে ও আয়ারের মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণের পাশাপাশি সংস্থাটির মুখপত্র দাওয়াতুল ইসলাম পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বও পান। তিনি ইসলামিক ফোরাম ইউরোপেরও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা মুসলিম এইডেরও প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িত ছিলেন। বিখ্যাত ইস্ট লন্ডন মসজিদও তার অনন্য কৃর্তির একটি স্মারক। পূর্ব লন্ডনের এই মসজিদটি সৈয়দ আমীর আলী মসজিদ নামে পরিচিত ছিল। তারই উদ্যোগে পুনঃনির্মিত এই মসজিদটি এখন ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম একটি কেন্দ্র। তিনি মার্কফিল্ড ইনস্টিটিউট ফর ইসলামিক হায়ার স্টাডিজের উন্নয়ন ও প্রসারের সাথে দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন এবং যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার পরিচালক ও কম্যুনিটি লিডার হিসেবে সুপরিচিত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্তিম মাস বিশেষ করে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে রহস্যময় বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য মিথ্যা অপবাদ দিয়ে ঘটনার ৪২ বছর পর শেখ হাসিনা গঠিত আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। বৃটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই রায়ের জের ধরে তাকে সন্ত্রাসের সাথে জড়িত বলে মন্তব্য করে এবং প্রমাণ হিসেবে হাসিনার আদালতের রায়কে উল্লেখ করা হয়।
এই রিপোর্টের জন্য চৌধুরী মুঈন উদ্দিন ব্রিটিশ হোম সেক্রেটারির বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কোনরকম মানবতা বিরোধী অপরাধের সাথে তিনি জড়িত নন। বরং বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সেই মামলার প্রেক্ষিতে গত বছরের ২০ জুন সুপ্রীম কোর্ট তার পক্ষে রায় দেয়।
সেই রায়ের ধারাবাহিকতায় গতকাল সোমবার চৌধুরী মঈনুদ্দিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধে সংশ্লিষ্টতা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের যে অভিযোগ হোম অফিস ইতোপূর্বে প্রকাশ করেছিল, তা মিথ্যা ছিল বলে উল্লেখ করে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে বৃটিশ সরকার। একইসাথে তাকে ব্রিটিশ মুদ্রায় ২ লক্ষ ২৫ হাজার পাউন্ড (বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৩ কোটি ষাট লক্ষ টাকা) অর্থ ক্ষতিপূরণ প্রদান করেছে।
মামলা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায় যে, এটা ব্রিটিশ সরকারের কোনও বিভাগ কর্তৃক তার নাগরিককে প্রদত্ত সর্বোচ্চ মানহানি ক্ষতিপূরণগুলোর একটি। যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি লর্ড রি-এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বিচারক প্যানেল ২০২৪ সালে ঐ মামলায় মঈনুদ্দিনের পক্ষে সর্বসম্মত রায়ে মন্তব্য করেছিলেন: যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের চেয়েও গুরুতর অভিযোগ নিজের নাগরিকের বিরুদ্ধে কল্পনা করা কঠিন। এখন এই ধরনের অভিযোগ সরকারের পক্ষ থেকে তার নিজের নাগরিকের বিরুদ্ধে আনা হয়, তখন তা বিশেষভাবে গুরুতর।
চৌধুরী মঈনুদ্দিন ১৯৭৩ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন এবং ১৯৮৪ সাল থেকে যুক্তরাজ্যের নাগরিক। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে সবসময়ই সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে তিনি দাবি করেছেন বিভিন্ন সময়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার চার দশকেরও বেশি সময় পর তার “দোষী সাব্যস্তকরণ” আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, আইনপ্রণেতা এবং বৈশ্বিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নিকট সর্বজনীনভাবে নিন্দিত হয়েছিল। কারণ এটি ন্যূনতম বিচারিক ন্যায্যতার নীতিও অনুসরণ করেনি।
চৌধুরী মঈনুদ্দিনের আইনজীবী টিউর আদালতে বলেন, প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে মানবজাতির সবচেয়ে জঘণ্য অপরাধের অভিযোগ তুলে ধরে তাকে তীব্র মানসিক যন্ত্রণা দেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগ দায়েরের সময় মঈনুদ্দিন আশা করেছিলেন যে, হোম সেক্রেটারি দ্রুতই বুঝতে পারবেন যে এই প্রকাশনা অন্যায় ও অযৌক্তিক ছিল এবং দ্রুত সংশোধন করবেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে হোম অফিস দাবি খারিজের চেষ্টা করে যা বহু শুনানি এবং শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। এতে ছয় বছর ধরে মঈনুদ্দিনের মানহানি ও মানসিক চাপ অব্যাহত থাকে। এই ছয় বছরে কখনোই হোম অফিস অভিযোগ সত্য বলে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি, কারণ তার কোনো ভিত্তিই ছিল না।
ছয় বছরের আইনি লড়াইয়ের শেষে ২০২৪ সালের জুনে যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট তার পক্ষে সর্বসম্মত রায় দেয়। সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের পর, হোম সেক্রেটারি/হোম অফিস ‘অফার অব অ্যামেন্ডস’ প্রদান করে, যার ভিত্তিতে হোম অফিস তাদের ওয়েবসাইটে ক্ষমাপ্রার্থনা প্রকাশ করে। এর প্রেক্ষিতে গতকাল মঙ্গলবার উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা আদালতে একটি যৌথ বিবৃতি পড়ে শোনান ।
শুনানির পর মঈনুদ্দিন বলেন: এই ফলাফল আমার জন্য আনন্দের, গৌরবের। সত্যের প্রভাব যে চিরস্থায়ী- তা আবারো প্রমাণিত হলো। আমি স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলাম যে অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি আশা করেছিলাম, হোম সেক্রেটারি দ্রুত ভুল সংশোধন করবে এবং ক্ষমা চাইবে। ন্যায়বিচার পাওয়ার এই দীর্ঘ পথে অনেক সময়ই আমার জন্য হতাশাজনক ও মানসিকভাবে কষ্টদায়ক হয়েছে। তবে আমি আনন্দিত যে, বৃটিশ আইনব্যবস্থা, আদালত ব্যবস্থা এবং এই দেশের সরকার আমার প্রতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে।
চৌধুরী মঈনুদ্দিন’র পক্ষে বিখ্যাত ল’ফার্ম কার্টার-রাকের আইনজীবী অ্যায্রাম টিউর ও নাতাশা গ্রোলির নেতৃত্বে জ্যাকব গ্রিন ও লিলি ওয়াকার-পার-এর সমন্বয়ে গঠিত একটি আইনজীবী দল প্রতিনিধিত্ব করেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, শেখ হাসিনার একই আইসিটি আদালত জামায়াত নেতা জনাব এটিএম আজহারুল ইসলামকে ১৯৭১ সালে রংপুরে ১২৫৬ ব্যক্তিকে হত্যা, ১৭ ব্যক্তিকে অপহরণ ও ১৩ জন মহিলাকে ধর্ষণ ও লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের মিথ্যা অভিযোগের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যু দণ্ডে দণ্ডিত করে। তিনি ২০১২ সাল থেকে কারারুদ্ধ ছিলেন। ১৯৭১ সালে তার বয়স ছিল ১৯ বছর। জুলাই অভ্যুত্থানের পর তিনি এই রায় তথা তার মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টে রিভিউ আবেদন করেন। সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রিফাত আহমদের নেতৃত্বে গঠিত ৭ সদস্যের একটি বেঞ্চ তার মামলাটি বিবেচনা করেন এবং তার মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে তাকে মুক্তির নির্দেশ দেন। মহামান্য আদালত তার দণ্ড মুওকুফের অনুকূলে চারটি কারণ উল্লেখ করেন। কারণগুলো হচ্ছে; ১) দণ্ড দাতা আদালত এতদঞ্চলের প্রতিষ্ঠিত ফৌজদারী অপরাধ বিচার পদ্ধতি পরিবর্তন করেছে। ২) সাক্ষ্য-প্রমাণ বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ড দেয়নি। ৩) পৃথিবীর ইতিহাসে এটি ছিল বিচারের নামে অবিচারের একটি প্রহসনের রায় এবং সর্বশেষ ৪) পূর্ববর্তী আপিলেট ডিভিশন তাদের কাছে উত্থাপিত যাবতীয় তথ্য প্রমাণ বিবেচনায় নিয়ে মামলাটি নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হওয়া।
জামায়াত নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে সর্বজনাব মতিউর রহমান নিজামী, আবদুল কাদের মোল্লা, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, মীর কাশেম আলী, মাওলানা আবদুস সোবহান, মাওলানা এ কে এম ইউসুফ, মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী, অধ্যাপক গোলাম আজম এদের সকলেই শেখ হাসিনার জুডিশিয়াল কিলিং-এর শিকার এবং তাদের প্রত্যেকটি বিচার পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
জনাব এটিএম আজহারুল ইসলামের রিভিউ মামলার রায় এবং চৌধুরী মঈন উদ্দিনের বৃটিশ সুপ্রীম কোর্টের রায় ও ক্ষতিপূরণ এ ব্যাপারে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করতে পারে। আমার জানা মতে, শেখ হাসিনার জুলুম ও অবিচারের শিকার আরো কয়েকজন ব্যক্তি বিশেষ করে জামায়াত নেতা অধ্যাপক শরীফ হোসেন, মাওলানা আশ্রাফুজ্জামান খান এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদ মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাদের প্রতি সুবিচার প্রতিষ্ঠা করাও আমাদের দায়িত্ব। এদের মধ্যে যারা এখনো কর্মক্ষম আছেন দেশ গঠনে তাদের সেবা বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারে।