আসিফ আরসালান
বাংলাদেশের সব মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বেগম খালেদা জিয়া চির বিদায়। বিদায়ের সময় সাথে নিয়ে গেছেন বাংলাদেশের জনগণের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও সম্মান। তার মৃত্যু এবং জানাযা নিয়ে নতুন করে আর বলার কিছু নেই। এক কথাতেই বলা যায় যে, সমগ্র পৃথিবীর কথা বলতে পারবো না, কিন্তু দু’বাংলার যত মানুষ এবং নেতার জানাযা হয়েছে তার মধ্যে এ মহিয়সী নারীর জানাযা বৃহত্তম। প্রতিটি মানুষের হৃদয়ের নিভৃত কন্দরে তিনি স্থান করে নিয়েছেন। আমরা চাই তার এ স্থানটি চিরদিন অম্লান এবং অমলিন থাকুক। তিনি দলমত বা গোষ্ঠীর ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন। আমাদের সকলের চেষ্টা হবে, তিনি যেনো সেই জায়গাতেই চিরদিন অধিষ্ঠিত থাকেন। তবে বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য এই যে, এ ধরনের বিরল সম্মান এবং উচ্চ আসন যারা লাভ করেন তাদেরই জ্ঞাতিগোষ্ঠী এবং দল তাদেরকে সে জায়গায় থাকতে দেয় না। মহানায়ক বা মহানায়িকার এ শ্রেষ্ঠতম আসনকে কেউ কেউ রাজনৈতিক পুঁজি হিসাবে ব্যবহার করে তাদের সে উচ্চ আসনকে ধুলার ধরণীতে নামিয়ে এনেছেন। এর একটি জ¦লন্ত প্রমাণ এখনো আমাদের চোখের সামনেই ভাসছে। সে ব্যক্তিটি হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবকে তার সুউচ্চ আসন থেকে তারই আপনজন এবং দলীয় নেতাকর্মীরা নামিয়েছেন। সেটি এখন আলোচনা করবো। কিন্তু তার আগের পর্বটি সম্পর্কে দুটো কথা না বললেই নয়।
মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতায় শেখ মুজিবের অবদান ও ভূমিকা সম্পর্কে ’৭১-এর আগেও বেশকিছু বিতর্ক ছিলো। তদসত্ত্বেও একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, শেখ মুজিব ১৯৪৯ সালের পর থেকেই তৎকালীন পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কে সরব হন। যতই দিন যায় ততই তার কণ্ঠ আরো উচ্চকিত হতে থাকে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যেখানে ছিলো স্বায়ত্তশাসনের দাবি, সেটিই ১৯৬৬ সালে ৬ দফার মধ্য দিয়ে কনফেডারেশনের দাবিতে রূপান্তরিত হয়। অবশ্য ৬ দফা যে কোনো ফেডারেল এ্যারেঞ্জমেন্ট ছিলো না, সেটি যে ছিলো কনফেডারেল এ্যারেঞ্জমেন্ট সেকথা শেখ মুজিব প্রকাশ্যে বলেননি।
মরহুম ড. নুরুল ইসলাম ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান। পরবর্তীতে তিনি শেখ মুজিবের প্রধান অর্থ উপদেষ্টা হয়ে ওঠেন। তার একাধিক নিবন্ধ আমার কম্পিউটারে সংরক্ষিত আছে। তিনি দ্ব্যার্থহীন ভাষায় বলেছেন যে, ৬ দফা কোনো একটি রাষ্ট্র বা ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামোর চৌহদ্দির মধ্যে পড়ে না। এটি ছিলো পরিষ্কার একটি স্বাধীনতার সনদ। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিব ড. নুরুল ইসলামকে পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেন। শেষ জীবনে তিনি আমেরিকার মেরিল্যান্ডে সেটেল করেন। ৯২ বছর বয়সে সেখানেই তিনি ইন্তিকাল করেন।
আমি নিজে অর্থনীতির ছাত্র ছিলাম। ড. নুরুল ইসলামের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিন্তাধারা আমার জানা ছিলো। এছাড়া অর্থনীতির ছাত্র হিসাবে ৬ দফার পোস্ট মর্টেম করে আমি দেখেছি যে, ঐ ৬ দফা এবং তার অধীনস্থ অনেকগুলো উপ দফা অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে সেটিকে একটি ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে ঢুকানো যায় না।
শেখ মুজিব ৬ দফা শুধুমাত্র সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের জন্যই চাননি, তিনি ৬ দফা চেয়েছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের ৪টি প্রদেশের জন্যও। ড. নুরুল ইসলামের একটি অগ্রন্থিত রচনা থেকে একটি তথ্য জানা যায়। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো যে, ৬ দফা যদি পাকিস্তানের ৫টি প্রদেশে প্রয়োগ করা হতো তাহলে অবস্থা কি দাঁড়াতো? উত্তরে তিনি বলেন, পাকিস্তানে ৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হতো, যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর তার গর্ভ থেকে ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। এ প্রসঙ্গটি নিয়ে আমি আরো বিস্তারিত এবং দীর্ঘ আলোচনা করতে পারি। কিন্তু আমার আজকের লেখার উপজীব্য ভিন্ন।
স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত শেখ মুজিব অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে ২৪ ঘন্টার জন্যও কোনো অবদান রাখেননি। কারণ ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১০টায় পাকিস্তান বাহিনীর হাতে স্বেচ্ছায় বন্দী হওয়ার জন্য তিনি অপেক্ষা করছিলেন এবং তিনি বন্দী হয়ে ঐ দিন ভোর রাতে পাকিস্তান চলে যান।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পর যেসব শক্তি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলো তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের একটি অংশ ছাড়া অবশিষ্ট সকলেই চেয়েছিলেন যে, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশে সব দল-মতকে নিয়ে একটি বিপ্লবী সরকার অথবা জাতীয় সরকার গঠন করা হোক। বিপ্লবী সরকারের দাবিটি উঠেছিলো আওয়ামী লীগের সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বাধীন তুর্কি তরুণদের অংশ থেকে। পক্ষান্তরে জাতীয় সরকারের দাবি উঠেছিলো মনি সিংয়ের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি এবং অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের নেতৃত্বাধীন ন্যাপের মস্কোপন্থী অংশ থেকে। তারা সকলেই চেয়েছিলেন, শেখ মুজিব নিজেকে আর আওয়ামী লীগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বাংলার সব মানুষের নেতা হোন। কিন্তু শেখ মুজিব এদের সকলের দাবি অগ্রাহ্য করে আওয়ামী লীগের নেতাই থেকে যান। ফলে প্রথম থেকেই তিনি বিতর্কিত হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে অর্থাৎ ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের অগাস্ট মাস পর্যন্ত আওয়ামী লীগের যত কুশাসন, অপশাসন, দুর্নীতি, লুন্ঠন এবং ভারতের কাছে বশ্যতা স্বীকার-এসব কিছুর দায় প্রধানত শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগের ঘাড়েই চাপে। তাই দেখা যায় যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট যে রক্তাক্ত পরিবর্তন ঘটে তার ভিক্টিম হয় শুধুমাত্র আওয়ামী শাসকগোষ্ঠী। মনি সিংয়ের সিপিবি এবং মোজাফফর আহমেদের ন্যাপ ১৫ অগাস্টের ভয়াবহ ঘটনা থেকে অক্ষত থেকে যান। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতার অব্যবহিত পূর্বে এবং অব্যবহিত পরে যে শেখ মুজিবের ছিলো হিমালয়ের উচ্চতা সম জনপ্রিয়তা, সে শেখ মুজিবের করুন পরিণতিতে কেউই সহানুভূতি জানায়নি। রাজনীতিতে ভুল পদক্ষেপ নিলে তার পরিণতি যে কত মর্মান্তিক হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট তার জ¦লন্ত প্রমাণ।
আমি এবং আমার মতো অসংখ্য মানুষ বাংলাদেশে আছেন যারা কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সাথে নেই। কিন্তু বেগম জিয়া এখন আমাদের সকলের সম্মানের পাত্র। শুধু তাই নয়, বেগম জিয়ার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন জামায়াতে ইসলামীসহ সমস্ত রাজনৈতিক দল। সম্মান ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন দেশের কোটি কোটি মানুষ যারা কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সুনির্দিষ্টভাবে সংযুক্ত না হলেও বাংলাদেশের ৯২ শতাংশ মানুষের ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি গভীরভাবে বিশ্বাসী, যারা রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সাচ্ছা গণতন্ত্রে আস্থাশীল এবং বাংলাদেশের ওপর ভারতীয় প্রভুত্ব হটিয়ে দেয়ায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী ঘরানার হাতেগোনা কয়েকটি গোষ্ঠী বা মহল ছাড়া আর সকলেই উপরে উল্লেখিত মতাদর্শে বিশ্বাসী। বেগম জিয়া ঐ সব মতাদর্শের প্রতীক ছিলেন বলেই লক্ষ লক্ষ মানুষের অসীম জনসমুদ্র তার রুহের মাগফেরাতের জন্য গত ৩১ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা, মানিক মিয়া এভিনিউ এবং এই এলাকার পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণে সমবেত হয়েছিলেন।
বেগম জিয়ার জনপ্রিয়তা, সম্মান ও শ্রদ্ধার এ অতলান্তিক গভীরতাকে ধরে রাখতে হলে তাকে দলীয় গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। আওয়ামী লীগ যেমন শেখ মুজিবকে পুঁজি করে রাজনীতি করতে চেয়েছিলো তেমনি বেগম জিয়াকে পুঁজি করে বিএনপির রাজনীতি করা উচিত হবে না। আমরা উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, বেগম জিয়ার দাফনের ২৪ ঘণ্টা পার হতে না হতেই সে ধরনের অনাকাঙ্খিত প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। আজ আমরা এ ব্যাপারে নিজেরা বেশি কথা বলবো না। আমরা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি উদ্ধৃতি এখানে উল্লেখ করতে চাই।
গত ১ জানুয়ারি দৈনিক ‘বাংলাদেশ প্রতিদিনের’ অনলাইন সংস্করণে ফলাও করে যে সংবাদ ছাপা হয়েছে তার শিরোনাম হলো, “নিবার্চনে দেশের পক্ষের শক্তি বিএনপিকে বিজয়ী করবে”। ১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার দুপুরে গুলশানে চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সাংবাদিক সন্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, “বেগম জিয়ার প্রতি মানুষের যে ভালোবাসা, সেটি জাতীয়তাবাদী দলকে আরও শক্তিশালী করবে। তারেক রহমানের নেতৃত্বই স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে সুসংহত করবে এটি মানুষ বিশ্বাস করে”। বেগম জিয়ার প্রতি মানুষের যে ভালোবাসা সেটি মির্জা ফখরুলের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র বিএনপিকেই আরো শক্তিশালী করবে না বরং বেগম জিয়ার ফ্যাসিস্ট, স্বৈরাচার ও ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী আদর্শের অনুসারীদেরকেও শক্তিশালী করবে। আমরা মনে করি, মির্জা ফখরুলের এ মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত অপরিপক্ক। এটি বেগম জিয়ার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার প্রতি অশুভ সংকেত। আমরা আজ এর চেয়ে বেশি আর আলোচনা করলাম না।
এটি মনে রাখা দরকার যে, বেগম জিয়ার বিদেহী আত্মাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়েছে, জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে, ৩১ ডিসেম্বর সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পীকার, নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আগমন, অসংখ্য কূটনীতিকের শ্রদ্ধার্ঘ-ইত্যাদি সব কিছুই বিএনপির চেয়ারপার্সন হিসাবে নয়, বরং বাংলাদেশের সব মানুষের প্রতীক হিসাবে বেগম জিয়াকে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। জয়শঙ্কর বা পাকিস্তানের স্পীকারের তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ এবং এ শোকের মুহূর্তে তার পাশে দাঁড়ানো বিএনপি চেয়ারপার্সন হিসাবে নয়, বরং সদ্য মাতৃহারা সন্তান তারেক রহমানকে শান্ত্বনা দেয়া এবং তার ক্ষণজন্মা মাতার প্রতি সশ্রদ্ধ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্যই করা হয়েছে।
আমরা আশা করি, ভবিষ্যতে বেগম জিয়াকে বিএনপি চেয়ারপার্সন হিসাবে নয়, বরং তাকে দেশমাতা হিসাবেই ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত করা হবে।