মো: আকতার হোসাইন
প্রাচীনকালে প্রচলন শুরু হয় মুদ্রা ব্যবস্থার। তবে চীনের হাত ধরে শুরু হয় কাগজের মুদ্রার। কাগজের মুদ্রা প্রচলনের পর পৃথিবীর অর্থনীতি বিকাশ আরো দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পায়। যদিও বর্তমান বিশ্বে চিত্রটা উল্টো। কারণ উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশগুলো কাগজের মুদ্রার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ক্যাশলেস লেনদেনের প্রতি আগ্রহী হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো মুদ্রা ছাপানো, মুদ্রা সরবরাহ এবং আগুনে পোড়ানো বাবদ খরচ অনেক বেশি। যেমন বাংলাদেশে প্রতিবছর শুধু টাকা পুড়াতে খরচ হয় প্রায় পাঁচ থেকে সাত শত কোটি টাকা। তাই বাংলাদেশও বর্তমানে ক্যাশলেস লেনদেনের কথা ভাবছে। বিগত কয়েক বছর হতেই নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করছে সরকার। যদিও এখনো দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ কার্যকর হয়নি। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কি আদৌ পারবে ক্যাশলেস লেনদেন করতে?
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের অর্থনীতির গুমোট ভাবটা কাটাতে নানা কার্যক্রম হাতে নিয়েছে এবং নিচ্ছে। ব্যাংক ব্যবস্থা প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, ব্যাংক ব্যবস্থাকে চাঙ্গা করতে এবং ছন্দহীন অর্থনীতিকে ছন্দে ফেরাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। যেমন: বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, সংকোচন মূলক জাতীয় বাজেট প্রণয়ন, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একভূতি করা এবং ক্যাশলেস লেনদেন বিহীন বাংলাদেশ তৈরি করা ইত্যাদি। এর মধ্যে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিষয়টি হলো ক্যাশলেস লেনদেন বিহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা। যদিও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ৩৬৫ দিন’শীর্ষক সংলাপে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, “টাকা ছাপানো, সংরক্ষণ, সারা দেশে পরিবহন ও বণ্টনে প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়”। তিনি মনে করেন, ”রাষ্ট্রের এ বিপুল খরচ বাঁচাতে হলে নগদ অর্থ ব্যবহারের প্রবণতা কমিয়ে আনতে হবে। ক্যাশলেস বা নগদ অর্থ ছাড়াই লেনদেন বাড়াতে হবে”। এ খরচ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন জনপ্রিয় করতে নীতিগত সহায়তা ও প্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরির কাজ করছে। বাংলাদেশ পূর্ব থেকে RTGS, BEFTN,NPSB এবং BACHএর মাধ্যমে ক্যাশলেস লেনদেন পরিচালিত হচ্ছে। এসব লেনদেনগুলো বেশিরভাগই কর্পোরেট লেনদেন। এ লেনদেনের ফলে ব্যাংকের প্রতি কর্পোরেট লেনদেনের একটা চাপ কমেছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় হাজার হাজার কোটি টাকা প্রতিদিন আন্ত ব্যাংক লেনদেন হচ্ছে এ মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে। ফলে ব্যাংকগুলোর প্রতিদিনের লেনদেনের গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। মজবুত হচ্ছে ব্যাংকিং ব্যবস্থা। এসব লেনদেনের ক্ষেত্রে অনেক সময় গ্রাহককে ব্যাংকে যেতে হয় না, ঘরে বসেই লেনদেনগুলো করতে পারে। সুতরাং খুব সহজেই বলা যায়, এ লেনদেনগুলো শুধু ক্যাশলেস নয়, প্রতিদিনের জীবনটা কেউ আরো সহজ করেছে। এবার প্রশ্ন হলো খুচরা লেনদেনগুলো নিয়ে, খুচরা লেনদেনগুলো কি আদৌ সম্ভব ক্যাশলেস করা। যদিও মানুষ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন শো-রুমে POS মেশিন ব্যবহার করে কেনাকাটা করছে। কেনাকাটার ক্ষেত্রে দিনদিন মোবাইল ব্যাংকিং জনপ্রিয়তা অর্জন করছে।
বাংলাদেশ আদৌ ক্যাশলেস হওয়া সম্ভব কিনা এর পূর্বে একটু জানা যাক, ক্যাশলেস হলে বাংলাদেশের লাভ কী। বাংলাদেশের যেহেতু প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘুষ দুর্নীতি একটি সংক্রামক ব্যাধির ন্যায় সমাজে প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিরাজমান। সুতরাং ক্যাশলেস হলে ঘুষ দুর্নীতি, টেবিলের নিচে লেনদেন, কিভাবে কত উপায়ে ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া যায়, দেশের অর্থ বিদেশে পাচার সবই বন্ধ হবে। এটা অনেকটাই নিশ্চিত যে শতভাগ বন্ধ না হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা বন্ধ হবে, সরকারের রাজস্ব খাত বৃদ্ধি পাবে। কারণ ব্যাংক হিসেবে যখন লেনদেন হবে তখন অর্থের উৎস আপনাকে নিশ্চিত করতেই হবে। আর এসব অবৈধ লেনদেনের ক্ষেত্রে দু’জনেই বিপদে পড়বে, বিপরীত দিকে রাষ্ট্র উপকৃত হবে। শুধু কি তাই, দেশের অর্থ বিদেশে আর পাচার হবে না। যেমনটা হয়েছিল করোনা মহামারীর মধ্যে। মহামারীর মধ্যে শত অসুবিধার মধ্যেও দেশ ডিজিটালের ক্ষেত্রে কয়েক দশক অগ্রসর হয়েছে। ফলে দেশের রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং দেশের রিজার্ভ তখন সর্বোচ্চ হয়েছিল। সুতরাং দেশ যদি ক্যাশলেস হতে পারে, তাহলে দেশ একশত বছর অগ্রসর হবে। গত ০২ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে, দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকায় “টাকা ছাপাতেই কত টাকা” শিরোনামে একটা প্রতিবেদনে বলা হয়, টাঁকশালের পুরনো মেশিনে ছাপা হচ্ছে নতুন টাকা, ১৫ বছর আয়ুষ্কালের যন্ত্রে ছাপা হচ্ছে ৪০ বছর পরও। ব্যয় বেশি হলেও কমছে মান ও স্থায়িত্ব, পুরনো যন্ত্র মেরামতে গচ্চা যাচ্ছে বিপুল অর্থ। এছাড়াও টাকা নিয়ে আরো খুটিনাটি বিষয় তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটিতে একটি বিষয় পরিষ্কার, টাকা ছাপাতে কত খরচ এবং কি পরিমাণ দুর্নীতি।
ক্যাশলেস বাংলাদেশে সামিট ২০২৫ অনুষ্ঠানে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ধারণা দেন, “বাংলাদেশ ক্যাশলেস করতে গেলে, কি কি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে সে বিষয়ে একটি চিত্র তুলে ধরেন, তিনি বলেন বাংলাদেশের অর্থনীতি নগদ বিহীন লেনদেন করতে গিয়ে যেন আয় বৈষম্য তৈরি না করে বা আয় উপার্জনের পথ বন্ধ না হয়”। আরো একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো, বাংলাদেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ নগদ লেনদেনের উপর নির্ভরশীল। সুতরাং এ বিষয়টি অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং এবং স্বল্পশিক্ষিত লোকদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হবে, যার ফলে সুযোগসন্ধানীরা সুযোগ নেয়ার অপেক্ষায় থাকবে। তাই সরকারকে অবশ্যই এ দিকটাকে অধিকতর সতর্কতার সহিত নজর দিতে হবে। নজর দিতে হবে একটি মানুষও যেন এক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার না হয়। অন্যথায় গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ডিজিটাল লেনদেন থেকে বঞ্চিত হবে। এ ছাড়া দেশের ৬০-৭০ শতাংশ মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি না ঘটলে ক্যাশলেস ইকোনমির সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। বিপরীতদিকে বাংলাদেশকে ক্যাশলেস লেনদেনে পরিণত করতে হলে, সহজ করতে হবে নিয়ম-নীতি, যেমন কেনাকাটা আইন, সাইবার নিরাপত্তা আইন, ব্যক্তিগত সুরক্ষা আইন, ইত্যাদি। তবে এখানে রয়েছে ঝুঁকি। এই ঝুঁকিগুলো বিবেচনায় নিয়ে আইনগুলো কতটুকু শিথিল করা যায় বিশেষ করে চার্জের বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনায় নিয়ে আসতে হবে।
বাংলদেশ সরকার ক্যাশলেস লেনদেন গড়ে তুলতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো বাংলা কিউআর কোড। এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স অনুমোদনের ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর কোড গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক, অতি শীঘ্রই ডিজিটাল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করা, একটি নির্দিষ্ট সময়ে লক্ষ্য নির্ধারণ করা, যে সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাবে। বাংলাদেশ সরকারকে ক্যাশলেস বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে আরো কিছু পদক্ষেপ হাতে নেওয়া প্রয়োজন, যার মধ্যে অন্যতম হলো পস মেশিনের মাধ্যমে লেনদেন উৎসাহিত করতে বিক্রেতার ক্ষেত্রেও চার্জটি মওকুফ করা। এছাড়াও, প্রথমেই যেটি করতে হবে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, তাদেরকে বোঝাতে হবে নগদ লেনদেনের ঝুঁকি বেশি, জাল জালিয়াতি, ছেঁড়াফাটা নোট, ছিনতাই হওয়ার ঝুঁকি, এমন কি জীবন নাশেরও হুমকি হতে পারে। দ্বিতীয়ত : আরেকটি কাজ করা যেতে পারে, একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে সরকার থেকে শুধু ঘোষণা দেয়া যে আগামী দিন থেকে কাগজের মুদ্রা বন্ধ ঘোষণা করা হলো, নির্দিষ্ট তারিখের পরে কারো কাছে কাগজের মুদ্রা পাওয়া গেলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। তাহলেই কাজটি সহজ হবে। ক্যাশলেস বাংলাদেশ হলে একদিকে যেমন ঝুঁকি কমবে অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির গতি বৃদ্ধি পাবে। সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়বে, দুর্নীতিও হ্রাস পাবে। লেখক : ব্যাংকার