‘সুরাকাভ’ পাখি ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলানোর মাধ্যমে নিজের সৌন্দর্য, স্বকীয়তা ও ইতিবাচক বৈশিষ্ট প্রকাশ করলেও রাজনীতিকদের প্রতিনিয়ত রঙ বদল নেতিবাচক বার্তাই বহন করে। মূলত, বর্ণচোরা রাজনীতিকদের প্রাবল্যে রাজনীতির কক্ষচ্যুতি ঘটেছে। নেতিবাচক ও স্বার্থান্ধ রাজনীতির কারণেই দেশ ও জাতি বারবার সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে বা এখনো হচ্ছে। প্রতিনিয়ত বর্ণবিন্যাস ও অন্তসারহীন রাজনৈতিক বক্তব্যের ছদ্মাবরণে বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা, কপটতা, মিথ্যাচার, শঠতা সহ নানাবিধ আমলযোগ্য অপরাধকে অবলীলায় বৈধতা প্রদান করা হয়েছে। ফলে তাদের অপরাধবোধও একবারে প্রান্তিক পর্যায়ে নেমে এসেছে। রাজনীতির ওপর আত্মসচেতন মানুষ; এমনকি সাধারণ জনগণও বীতশ্রদ্ধ হতে শুরু করেছেন। সাধারণ মানুষ আর আগের মত রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামান না, বরং তারা লাঙ্গল-জোয়ালের মধ্যেই নিজেদের কর্মতৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন।
তাদের সরল অভিব্যক্তি ‘যে কুতুব যা-ই হোক আমাদের লাঙল-জোয়ালে কেউ ভাগ বসাতে পারবে না’। এমন আত্মঘাতি ও অসহায় অভিব্যক্তিই ইংরেজ ও মীরজাফরের জন্য পলাশী বিজয় সহজ হয়েছিলো। এজন্য আমাদেরকে প্রায়শ্চিত্য করতে হয়েছিলো প্রায় ২শ বছর। তবে একথা বলা ঠিক হবে না যে, রাজনীতির সকল পাত্র-মিত্রই একই মুদ্রাদোষে দুষ্ট বরং এখনো রাজনীতিতে ভালো মানুষের উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু অসৎদের প্রাবল্যে তারা খুবই অসহায় ও কোনঠাসা। মূলত, একশ্রেণির মূল্যবোধহীন ও কপট রাজনীতিকের কারণেই আমাদের দেশে পুরো রাজনীতি আসামীর কাঠগড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। জনমনে এমন ধারণা এখন বদ্ধমূল হতে শুরু করেছে যে, রাজনীতিবিদ মানেই সন্ধিগ্ধ ও অসৎপ্রবণ ব্যক্তি। যদিও এমন ধারণা পুরোপুরি সত্য নয়; প্রযোজ্যও নয় সকল ক্ষেত্রে।
রাজনীতিকে সাধারণভাবে রাজার নীতি মনে করা হলেও এমনটা পুরোপুরি বাস্তবসম্মত নয় বরং আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তকগণ রাজনীতির নতুন সংজ্ঞা দিয়ে সেবামূলক এ কাজকে অধিকতর প্রাণবন্ত ও হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছেন। তাই রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা রাজনীতিকে ‘নীতির রাজা’ তথা ‘শ্রেষ্ঠনীতি’ বলতে বেশি পুুলকবোধ করেন। কারণ, এ নীতিকে ভিত্তি করেই জাতির উত্থান-পতন ঘটে; মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। তাই এ সংজ্ঞাকেই অধিকতর যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা হয়।
রাজনীতির সূচনা অতি প্রাচীনকাল থেকেই; যখন মানুষ দলবদ্ধভাবে বসবাস করতে শুরু করে এবং নেতৃত্ব ও ক্ষমতার ধারণা সৃষ্টি হয়। তবে আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তাধারার সূচনা ঘটে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের হাত ধরে। যেমন প্লেটো ও অ্যারিস্টটল এবং আধুনিক রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্ভব হয় মূলত ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ঊনিশ শতকে। সাম্প্রতিক কালের রাজনীতি সে ধারাবাহিকতারই অঙ্ক।
কালের বিবর্তনে ও সময়ের প্রয়োজনে বৈশ্বিক রাজনীতিতে সংস্কার, পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন হয়েছে। মানুষের বোধ-বিশ্বাস, আবেগ-অনুভূতি ও মূল্যবোধে অভিনত্ব এসেছে; এসেছে চিন্তার বৈপরিত্য ও পরিশীলতাও। সবকিছুতেই লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া ও বিপ্লবের ঢেউ। বস্তত, আধুনিক রাজনীতি বলতে সাধারণত বর্তমান কালের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, মতাদর্শ ও প্রক্রিয়াকে বোঝায়; যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব, বহুদলীয় ব্যবস্থা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলোর প্রভাব দেখা যায়। এটি একটি গতিশীল ক্ষেত্র যেখানে প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক পরিবর্তন, সামাজিক ও আদর্শিক চিন্তাধারার প্রভাব প্রতিফলিত হয়।
রাজনীতির সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক খুবই নিবিড়; পরস্পর পরষ্পরের পরিপূরক। একটি উপেক্ষা করে অপরটির অস্তিত্ব কোনভাবেই কল্পনা করা যায় না। রাষ্ট্র বলতে এমন এক রাজনৈতিক সংগঠনকে বোঝায়, যা কোন একটি ভৌগোলিক এলাকা ও তৎসংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার সার্বভৌম ক্ষমতা সংরক্ষণ করে। রাষ্ট্র সাধারণত একগুচ্ছ প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ভৌগোলিক সীমার ভেতর বসবাসকারী সমাজের সদস্যদের শাসনের জন্য নিয়ম-কানুন তৈরি করে। একথা ঠিক যে, রাষ্ট্র হিসেবে মর্যাদা পাওয়া বা না পাওয়া বহুলাংশে নির্ভর করে রাষ্ট্র হিসেবে তার উপর প্রভাব রাখা ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির উপর। ম্যাক্স ওয়েবারের প্রভাববিস্তারী সংজ্ঞানুযায়ী রাষ্ট্র হচ্ছে এমন এক সংগঠন যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে আইনানুগ বলপ্রয়োগের সব মাধ্যমের উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রাখে, যাদের মধ্যে রয়েছে সশস্ত্রবাহিনী, নাগরিক, সমাজ, আমলাতন্ত্র, আদালত এবং আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সাম্প্রতিককালে রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ার বিষয়ে মতভিন্নতার কারণে তাত্ত্বিক মহলে বেশ বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রাচীন রাষ্ট্র বলতে সাধারণত সুপ্রাচীন সভ্যতাগুলোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রকে বোঝানো হয়। যেমন মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক), মিশর, গ্রিস (নগর-রাষ্ট্র), এবং চীন। বিশ্বের প্রাচীনতম দেশ হিসেবে ইরানের নামও উল্লেখ করা হয়, যার প্রভাব খ্রিস্টপূর্ব ৬৭৮ সাল থেকে ছিল। প্রাচীন গ্রিসের রাষ্ট্রগুলো ছিল একেকটি নগর-রাষ্ট্র বা ‘পোলিস’। আধুনিক রাষ্ট্র বলতে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সুসংগঠিত জনসমষ্টিকে বোঝানো হয়, যার নিজস্ব সরকার রয়েছে। এ ধারণাটি ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ ধারণ করে এবং এর মধ্যে বৈধতা, আঞ্চলিকতা ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের মতো বৈশিষ্ট্যগুলো বিদ্যমান, যা একে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার থেকে আলাদা করে।
একথা কারো অজানা নয় যে, রাজনীতি ও রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে সবকিছু আবর্তিত হয়। এর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি রাজনীতিকদের হাতে। বস্তত, ‘রাজনীতিক’ বলতে বোঝায় যিনি রাজনীতি করেন বা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, অর্থাৎ রাজনীতিবিদ। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যেখানে রাজনীতিবিদরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ক্ষমতা ও সম্পদের বণ্টন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত থাকেন। রাজনীতিক বা রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক দল গঠন এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সরকার পরিচালনায় অঙ্ক নেন। তারা নীতি ও কর্মসূচির ভিত্তিতে কাজ করেন এবং সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজনীতি শুধু সরকারি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বেসরকারি বিভিন্ন ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক কার্যকলাপ বিদ্যমান।
উপরের আলোচনা থেকে একথায় প্রতীয়মান হয় যে, রাষ্ট্র ও রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ রাজনীতিকদের হাতেই। তাই রাজনীতিকরা শুধু জাতীয় ক্ষেত্রে নন; বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথা এলিট শ্রেণি। তাই যেকোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদেরকে বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপট উপলদ্ধি; প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব সর্বোপরি মানুষের কল্যাণ ও অকল্যাণের বিষয়টি মাথায় রাখতে হয়। তিনি যদি প্রকৃত পক্ষেই আদর্শ রাজনীতিক হয়ে থাকেন, তাহলে তার ও সংশ্লিষ্টদের পক্ষে আত্মস্বার্থ, ব্যক্তিস্বার্থ, সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থ ও গোষ্ঠীস্বার্থ বিবেচনার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু বাংলাদেশ সহ সাম্প্রতিক বিশ্ব রাজনীতিতে একশ্রেণির রাজনীতিক নিজেদের স্বকীয়তা হারানোর কারণেই রাজনীতির গণমুখী চরিত্র বিনষ্ট হয়েছে। তাই গণমানুষের কল্যাণকামীতা থেকে যে রাজনীতির পথচলা শুরু হয়েছিলো তা এখন একশ্রেণির স্বার্থান্ধ ও মূল্যবোধহীন মানুষের হাতে পড়েছে। ফলে প্রচলিত রাজনীতি স্বকীয়তা হারিয়ে বসেছে।
বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে একশ্রেণির রাজনীতিক গণমানুষের কল্যাণকামীতার পরিবর্তে রাজনীতিকে নিজেদের আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করার হাতিয়ার বানিয়েছে। এজন্য তারা ‘সুরাকাভ’ পাখির মত ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলের যোগ্যতাকেও বেশ রপ্ত করেছেন। তারা তাদের ক্ষমতা নির্বিঘ্ন চর্চার জন্য প্রতিপক্ষ সহ মানুষের ওপর জুলুম, নির্যাতন, হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, গুম, অপহরণ, গুপ্তহত্যা সহ নানাবিধ অপকর্ম ও অপরাধের আশ্রয় নেন। পতিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদীর প্রায় ১৬ বছরের অপশাসন-দুঃশাসন তার বাস্তব প্রমাণ। এরা জোর করে ক্ষমতায় থেকে দেশ ও জাতির সেবার পরিবর্তে নিজেদের অর্থ-বিত্ত বাড়িয়েছে। দেশ থেকে প্রভূত অর্থ পাচার করে জাতীয় অর্থনীতিকে একেবারে ফোকলা বানিয়ে দিয়েছে। তারা ধরেই নিয়েছিলো যে, ক্ষমতা তাদের জন্য একেবারে চিরস্থায়ী হয়ে গেছে। তাদের কেশাগ্র কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। কিন্তু তারা একথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলো সত্য ও ইতিহাসের গতি কখনো রুদ্ধ করা যায় না বরং এক নির্মম বাস্তবতায় তা একদিন মানুষের মধ্যে কোন না কোনভাবেই উদ্ভাসিত হয়। কারণ, সত্য ও বাস্তবতা কখনো চাপা থাকে না বরং ইতিহাসের নির্মম প্রতিশোধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। এরা ক্ষমতার দম্ভে ইতিহাসের গতিকে রুদ্ধ করার চেষ্টা করলেও সত্য সব সময় সমহিমায় উদ্ভাসিত হয়। এমনকি আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেও সত্যকে ধামাচাপা দেয়া যায় না। কারণ, সত্যটা কোথাও না কোথাও লেখা হয়ে যায়। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা হয়তো খেয়ালই করতে পরে না।
যার প্রমাণ পাওয়া তৃতীয় মোঘল সম্রাট আকবরের সমসাময়িক কবি শ্রী মুকুন্দরাম চক্রবর্তী কালকেতু উপাখ্যানে। তিনি তার উপাখ্যানে ‘মুসলমানগণের আগমন’ শিরোনামীয় কবিতায় মুসলিম সম্প্রদায়ের ভূয়সী প্রশংসা করে লিখেছেন-
‘বড়ই দানিসবন্দ/না জানে কপট ছন্দ
প্রাণ গেলে নাহি রোজা নাহি ছাড়ি
যারে দেখে খালি মাথা/তার সনে নাহি কথা
সাড়িয়া মারয়ে ডাঁড়া বাড়ি’।
তিনি তার পুরো কবিতায় তদানীন্তন মুসলমানদের নির্মোহ প্রশংসা করলেও ‘মুসলমানদিগের শ্রেণিবিভাগ’ উপাখ্যানে এক রূঢ় বাস্তবতা প্রকাশ করতে মোটেই কসুর করেন নি। তিনি তার কবিতায় মুসলিম মৎসজীবিদের বৈশিষ্টের কথা উল্লেখ করেছেন কাব্যিক দ্যোতনায়। হয়তো মৎসজীবিরা উপলব্ধিই করতে পারেন নি যে, তাদের সম্পর্কে এমন নেতিবাচক কথা লেখা হচ্ছে। কবির ভাষায়-
‘মৎস্য বেচিয়া নাম ধরল্যা কাবাড়ি
নিরন্তর মিথ্যা কহে নাহি রাখে দাড়ি’।
বৈশ্বিক রাজনীতি যে সর্বসাম্প্রতিক সময়ে কক্ষচ্যুত হয়েছে এমন নয় বরং রাজনীতির একটি কদর্যরূপ অতীতে ছিলো, এখনো আছে এবং আগামী দিনেও থাকবে। একথা সর্বজনবিদীত যে, একশ্রেণির রাজনীতিকরা বড় বড় কেলেঙ্কারীর জন্ম দিয়েছেন বরং ইতিহাসে তাদের এ ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা কালের গর্ভে হারিয়ে গেলেও রয়ে গেছে তাদের কৃতকর্ম। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে এ ধরনের কিছু রাজনৈতিক কেলেঙ্কারীর কথা উল্লেখ করছি-
ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারি : ইতিহাসের বহুল আলোচিত কেলেঙ্কারির কথা বললে প্রথমেই আসে ‘ওয়াটার গেট’ কেলেঙ্কারির নাম। এ কেলেঙ্কারির খলনায়ক ছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। ১৯৭২ সালের ১৭ জুন ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি ও ফেডারেল প্রশাসনের ৫ জন ব্যক্তি ওয়াটার গেট অফিস কমপ্লেক্সে অবস্থিত বিরোধী দল ড্যামোক্র্যাট পার্টির সদরদপ্তরে চুরি করে প্রবেশ করে এবং নির্বাচনী প্রচার ও রাজনৈতিক তথ্য শোনার জন্য আড়িপাতার যন্ত্র বসায়। এ ঘটনাটি ফাঁস করে দেন ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার সাবেক সম্পাদক দু’জন সাংবাদিক বেঞ্জামিন ব্র্যাডলি এবং বব উডওয়ার্ড। এর জের ধরে পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালের ৯ আগস্ট প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে পদত্যাগ করতে হয়।
হাওয়ালা কেলেঙ্কারি : হাওয়ালা অর্থ হুন্ডি অর্থাৎ এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদান-প্রদানের উপায়। এ কেলেঙ্কারির মূল হোতা ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও। এছাড়া আর যেসব রাজনীতিবিদ এ কেলেঙ্কারির দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন তারা হলেন বিজেপির এল. কে. আদভানি, ভি. সি. শুক্লা, পি. শিব শঙ্কর, শারদ যাদব, মদন লালা খুরানা। এ রাজনীতিবিদরা জেইন ভাইদের নিকট হতে ১৮ মিলিয়ন রূপি উৎকোচ গ্রহণ করেন। এ ঘটনা ফাঁস হওয়ায় সারা ভারতজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।
বোফোর্স কেলেঙ্কারি : অত্তাভিও কুয়াত্রচি নামক গান্ধী পরিবারে ঘনিষ্ট একজন ইতালীয় ব্যবসায়ীর মাধ্যমে সুইডেনের অস্ত্র নির্মানকারী প্রতিষ্ঠান বোফোর্সের নিকট থেকে ১৯৮৭ সালে অস্ত্র ক্রয়ের দুর্নীতিই বোফোর্স কেলেঙ্কারি নামে পরিচিত। এ কেলেঙ্কারির নায়ক হলেন ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। গান্ধীর অর্থমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহ এ ঘটনা প্রকাশ্যে আনেন। এ ঘটনা প্রকাশ্যে আনার জন্য সিংহকে মন্ত্রিত্ব থেকে বরখাস্ত করা হয় এবং পরে কংগ্রেস থেকেও বহিস্কার করা হয়। পরে দ্য হিন্দু সংবাদ পত্রের নর্সিমহান রাম ও চিত্রা সুব্রামানিয়াম যখন এ ব্যাপারে অনুসন্ধান জারি রাখেন তখন জানা যায় রাজীব গান্ধী নিজেও ব্যক্তিগত ভাবে এতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এ ঘটনা তার ‘দুর্নীতি মুক্ত রাজনীতিক’-এর ভাবমূর্তি কে ছিন্ন-ভিন্ন করে দিয়ে ছিল। অবশ্য পরে ২০০৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর নির্দোশিতা প্রমাণিত হয়।
ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি : এ কেলেঙ্কারির মূল হোতা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান। যুক্তরাষ্ট্র অবৈধভাবে ইরানের নিকট অস্ত্র বিক্রি করে এবং বিক্রয়ের টাকা নিকারাগুয়ার কন্ট্রা বিদ্রোহীদের সাহায্য হিসেবে প্রদান করে। এ কেলেঙ্কারির সাথে কর্ণেল অলিভার নর্থ বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ইতিহাসে নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা একেবারে নতুন কিছু নয়। প্রায় ক্ষেত্রেই একশ্রেণির রাজনৈতিকের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষই দায়ি। কিন্তু ইতিহাসের দায় থেকে তারা কেউই মুক্তি পাননি।
মহাত্মা গান্ধী : পৃথিবীর আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম আধ্যাত্মিক নেতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর হত্যাকাণ্ড। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারিতে নয়া দিল্লীর বিরলা ভবনে তাকে গুলী করে হত্যা করা হয়। নাথুরাম গডসে নামের একজন হিন্দু উগ্রপন্থী পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলী করে। এর কয়েক ঘন্টা পরেই সত্যাগ্রহ আন্দোলনের এ প্রতিষ্ঠাতা মৃত্যুবরণ করেন। জানা যায়, নাথুরাম গডসে ব্রিটিশদের সহিংস কাজের বিরুদ্ধে গান্ধীর অহিংস বাণী এবং সত্যাগ্রহের বিপক্ষে ছিলেন।
আব্রাহাম লিংকন : ১৮৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন। রাত ১০টা ১৫ মিনিটে নাট্যাভিনেতা জন উইলকেস বোথ পিস্তল দিয়ে লিংকনের মাথার পেছনে গুলী করেন। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কনফেডারেট রাষ্ট্র তৎকালীন অস্বীকৃত উত্তর আমেরিকার সমর্থকদের ভূমিকা ছিল।
মার্টিন লুথার কিং : মার্টিন লুথার কিং যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় জীবন উৎসর্গ করেছেন। ১৯৫০ মধ্যবর্তী সময় থেকে আমৃত্যু তিনি ছিলেন আমেরিকান সিভিল রাইট মুভমেন্টের নেতা। ১৯৬৮ সালের ৪ এপ্রিল মেমফিসে অবস্থিত লরাইন মোটেলে অবস্থান করছিলেন মার্টিন। আর মোটেলের ৩০৬ নম্বর কামরার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় জেমস আর্ল রে নামের শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদী যুবকের গুলীতে নিহত হন তিনি।
জিয়াউর রহমান : শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে কতিপয় বিপথগামী সেনাদের হাতে শাহাদাত বরণ করেন। এছাড়াও শুধুমাত্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট রাণাহিংসে প্রেমাদাসা ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টো গুপ্তহত্যার শিকার। সকল ঘটনার সাথেই সম্পর্ক ছিলো রাজনীতি ও প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ।
অবৈধ ক্ষমতালিপ্সা ও নিজেদের বিত্ত-বৈভব বৃদ্ধির জন্য এক শ্রেণির রাজনীতিকের নৈতিক অধঃপতন বৈশ্বিক ইতিহাসকে বারবার কলঙ্কিতই করেছে। মহাভারতে বর্ণিত পৌরাণিক কাহিনী কুরুক্ষেত্র মহাসমর ছিলো রীতিমত ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধ। ক্ষমতার জন্য এ যুদ্ধ এতোই ভয়াবহ ও প্রাণঘাতি হয়েছিলো যে, এ যুদ্ধে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ছাড়া আর কেউ জীবিত ছিলেন না। মৌর্য বংশের তৃতীয় সম্রাট অশোক ক্ষমতা দখলের জন্য ৯৯ ভাইকে হত্যা করেছিলেন বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। আর ক্ষমতার জন্য শহীদ নবাব সিরাজের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন তারই নিরটাত্মীয় মীর জাফর আলী খান। কিন্তু ইতিহাসের প্রাপ্তি, প্রতিশোধ ও দায় থেকে কেউই রেহাই পাননি।
মূলত, স্বার্থান্ধ, মূল্যবোধহীন ও রঙ বদলের রাজনীতির কারণেই প্রচলিত রাজনীতি পুরোপুরি গণমুখী হয়ে উঠেনি। এভাবেই কেটে গেছে রাজনীতির প্রাচীনকাল ও মধ্যযুগ। আমরা এখন আধুনিক যুগের সর্বাধুনিক রাজনীতিতে প্রবেশ করেছি। সভ্যতাও উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে। তাই রাজনীতি নিয়ে রাজনীতিকদের নতুন করে ভাবনার অবকাশ সৃষ্টি হয়েছে। তাই রাজনীতিবিদদের উচিত অতীতের অশুভ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে ইতিবাচক ও গণমুখী রাজনীতি চর্চার সূচনা করা। অন্যথায় ইতিহাস কাউকেই দায়মুক্তি দেবে না। www.syedmasud.com