জসিম উদ্দিন মনছুরি
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামিনি শাহাদাত বরণ করেন। বেশ কিছু বেসামরিক স্থাপনা এবং বেসামরিক লোকজন হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। প্রতিবাদে ইরান তৎক্ষণাৎ মিসাইল ছুঁড়ে হামলার জবাব দেয়। যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল আয়াতুল্লাহ আলী খামিনি নিহত হলেই যুদ্ধ থেমে যাবে এবং আমেরিকা বিজয় লাভ করবে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের পর পরিস্থিতি উল্টোদিকে গড়ায়। ইরান মারাত্মকভাবে ইসরাইলের প্রতি তৎকালীন মিসাইল আক্রমণ শুরু করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা আমেরিকার বেশ কয়েকটি ঘাঁটি লক্ষ্য করে একযোগে হামলা চালায়।মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ৭ থেকে ৮ টি দেশে ইরানের একযোগে হামলায় যুক্তরাষ্ট্র হতভাগ হয়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলকে রক্ষা করার জন্য এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বাহরাইনে অবস্থিত তাদের পঞ্চম নৌবহর আব্রাহাম লিংকনে ইরান জোরালো ভাবে হামলা চালায়। এ পর্যন্ত ইরান আব্রাহাম লিংকনের অন্তত ১০০টিরও বেশি ক্ষেপাণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এছাড়া কাতারের উদাই বিমানবন্দরে ১.১ বিলিয়নের নির্মিত আকাশ প্রতিরক্ষা সিস্টেম থার্ডের ব্যাটারি বিকল করে দেয় ইরান। এরপর থেকে যুদ্ধ পরিস্থিতি নানা দিখে মোড় নিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র তেল পরিবাহী সমুদ্রের সরুপথ হরমুজ প্রণালী ইরান নিয়ন্ত্রণ নিলে তেল পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন অন্তত তেল মওজুদের বিশ শতাংশ পরিবহন করা হয়। ইরান ইতোমধ্যে তেলবাহী জাহাজে ট্যাক্স বসিয়েছে। প্রতি ব্যারেলে অন্তত এক ডলার করে ট্যাক্স আদায় করা হচ্ছে। ইরানের কয়েক স্তরের মিসাইল আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষার দেশ ইসরাইল। ইরান মূলত আকাশ প্রতিরক্ষা সিস্টেম নষ্ট করে দিয়ে ইসরাইলের অভ্যন্তরে বিনা বাঁধায় হামলার পর হামলা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইরানের হামলা থেকে রক্ষা পায়নি তাদের গোয়েন্দা সদর দপ্তর, সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত। ইতোমধ্যে গুঞ্জন উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের কসাই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মারা গেছেন। ইরানের আধা সরকারি সংবাদ মাধ্যম তাসনিম থেকে সংবাদ প্রকাশিত হলেও ইসরাইলের সংবাদ মাধ্যম তা অস্বীকার করেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধে এ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও ইসরাইলের অভ্যন্তরসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৭টি সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করে দিয়েছে। অন্তত যুক্তরাষ্ট্রের ১৬টি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করে দেয়ার সংবাদও পাওয়া যাচ্ছে। পরাজয়ের দ্বার প্রান্তে আসা ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে বাঁচার জন্য অবশেষে ইরানকে শান্তি প্রস্তাব দিয়েছেন। পাকিস্তানের মাধ্যমে ১৫ দফা সম্বলিত শান্তি প্রস্তাব ইতোমধ্য ইরানের কাছে পাঠানো হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া প্রস্তাবকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে জানিয়ে দিয়েছে তেহরান। তারা বলেছে, এ পরিকল্পনা একপাক্ষিক এবং ইরানের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে ইরান নিজেদের শর্তে যেকোনো সম্ভাব্য সমঝোতার কথা জানিয়েছে। ইরানের প্রস্তাবে সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন এই পথ দিয়ে হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ইরান চায়, ভবিষ্যতে এ পথে চলাচলকারী জাহাজ থেকে তারা শুল্ক আদায় করতে পারবে, যেমনটি সুয়েজ খালের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।
এছাড়া তেহরান দাবি করেছে- উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি প্রত্যাহার, ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং সাম্প্রতিক সংঘাতে ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি, লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের সামরিক অভিযান বন্ধের দাবিও জানিয়েছে তারা। ইরান আরও স্পষ্ট করেছে যে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কোনোভাবেই সীমিত করা যাবে না এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের আলোচনায় তারা রাজি নয়।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের ১৫ দফা প্রস্তাবে ইরানের জন্য কঠোর শর্ত রাখা হয়। এর মধ্যে ছিল- পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিষিদ্ধ করা, বিদ্যমান মজুদ হস্তান্তর এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে পূর্ণ তদারকির সুযোগ দেওয়া। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব কমাতে ‘প্রক্সি’ গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করার কথাও বলা হয়।বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে সহায়তার প্রস্তাব দেয়।তবে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের অমিল থাকায়, এই মুহূর্তে কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও সরাসরি আলোচনা এখনও শুরু হয়নি।
ইরানে মার্কিন ও ইসরাইলী আগ্রাসনের পর শুরু হওয়া পাল্টা-পাল্টি হামলায় এখন পর্যন্ত ১৪টি দেশে আড়াই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২৬ হাজারের বেশি। গত ২৪ মার্চ আল-জাজিরা এ তথ্য প্রকাশ করেছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্যে বলা হয়েছে, সংখ্যা সরবরাহ করেছে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ। তবে বিভিন্ন সূত্রে ধারণা করা হচ্ছে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। নিহতদের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ইরানের। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেসামরিক নাগরিক। লেবাননে ইসরাইলী হামলায় মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যে এক হাজার ছাড়িয়েছে। ইসরাইলে সরকারি নিয়ন্ত্রণের কারণে যুদ্ধে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা জানা কঠিন।
২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে অপারেশন এপিক ফিউরি নামে সামরিক অভিযান শুরু হয়। ইসরায়েলও এতে অংশ নেয়। মাত্র কিছু সময়ের মধ্যে ইরান পাল্টা হামলা শুরু করে। ইরান প্রধানত ইসরাইল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়। চলমান ইরান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১৬টি সামরিক বিমান ধ্বংস হয়েছে। কুয়েতে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’-এ তিনটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। এছাড়া একটি কেসি-১৩৫ ট্যাংকার বিমান জ্বালানি রিফুয়েলিংয়ের সময় ধ্বংস হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরবের একটি বিমানঘাঁটিতে পার্ক করে রাখা অবস্থায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আরও পাঁচটি কেসি-১৩৫ ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র চালকবিহীন রিপার ড্রোনগুলোই ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূপাতিত করা সম্ভব হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, এর মধ্যে অন্তত নয়টি আকাশে ধ্বংস করা হয়েছে। এছাড়া একটি জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস হয়। বাকি দুটি রিপার ড্রোন যান্ত্রিক দুর্ঘটনার কারণে বিধ্বস্ত হয়েছে। উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ব্যবহারের জন্য তৈরি এই ড্রোনগুলো চালকবিহীন হওয়ায় এগুলোর ক্ষয়ক্ষতিকে মার্কিন সামরিক পরিভাষায় ‘অ্যাট্রিটেবল’ বা প্রতিস্থাপনযোগ্য হিসেবে গণ্য করা হয়।
সবশেষ শুক্রবার ইরানের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানে আঘাত হেনেছে ইরানি বাহিনী। বিমানটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে জরুরি অবতরণ করে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে জানানো হয়েছে, দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে যে তারা ‘ইরানের মধ্যাঞ্চলের আকাশে মার্কিন বাহিনীর একটি কৌশলগত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানে আঘাত হেনেছে।’
এ তথ্য নিশ্চিত হলে, এটি হবে মার্কিন কোনো এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানে আঘাত হানার প্রথম ঘটনা। একই সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের পক্ষ থেকে মার্কিন বিমানে হামলারও প্রথম ঘটনা হবে এটি।
যুদ্ধ পরিস্থিতির এ অবস্থার মধ্যে ট্রাম্প ইরানকে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রস্তাব দিল। ইরানও ৫ দফা সম্বলিত প্রস্তাব ছুড়ে দিয়েছে। এবার দেখার বিষয় ইরান নমনীয় হবে নাকি যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় ইরান কোন চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না। এবার দেখার বিষয় শান্তি প্রস্তাব কতটুকু এগিয়ে যায়? নাকি যুদ্ধ চলমান থাকে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দেখেই আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে ইরান এগিয়ে রয়েছে। ট্রাম্প যুদ্ধে পরাজয় এডাবার জন্য যুদ্ধবিতির প্রস্তাব দিয়েছেন কিনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ইরানের উচিত যেভাবে ফাত্তা-২ সিজ্জিল-২ মিসাইল দিয়ে আমেরিকা ও ইসরাইলকে ক্ষত বিক্ষত করে দিচ্ছে এভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং বিজয় ছিনিয়ে আনা।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।