ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৫৮ কোটি ৯০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। অর্থাৎ, পৃথিবীতে প্রতি ৯ জনের মধ্যে একজন ডায়াবেটিসে ভুগছেন। এর মধ্যে প্রায় ২৫ কোটি মানুষ জানেনই না যে তারা এ রোগে আক্রান্ত। বিশ্বব্যাপী আক্রান্তদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে বাস করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ৬৪ কোটি ছাড়িয়ে যাবে এবং ২০৪৫ সালে গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ৭৮ কোটি। এ রোগের কারণে প্রতিবছর চিকিৎসা, ওষুধ ও ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হচ্ছে প্রায় এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমমূল্য অর্থ-যা পুরো বিশ্বঅর্থনীতির জন্য এক বিরাট বোঝা। অর্থাৎ, ডায়াবেটিস এখন কেবল ব্যক্তিগত নয়-এটি একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও উন্নয়নসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভয়াবহ পরিস্থিতি : দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল এখন ডায়াবেটিস বৃদ্ধির কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা মিলিয়ে এখানে প্রায় ১০ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। গড়ে প্রতি দশজন প্রাপ্তবয়স্কের একজনের শরীরে রয়েছে এই নীরব রোগ। ২০৪৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১৫ কোটি ছাড়িয়ে। অর্ধেকেরও বেশি আক্রান্ত ব্যক্তি জানেনই না যে, তারা এই রোগে ভুগছেন। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইনসুলিন প্রতিরোধের প্রবণতা জন্মগতভাবেই বেশি। তাছাড়া দ্রুত নগরায়ন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, মানসিক চাপ ও অল্প বয়সে স্থূলতা- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হচ্ছে।

বাংলাদেশের বর্তমান চিত্র : বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৩ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। সংখ্যায় তা প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ মানুষ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো- প্রতি তিনজনের একজন জানেন না যে তাঁর ডায়াবেটিস আছে। গ্রামীণ এলাকাতেও এখন ডায়াবেটিসের বিস্তার দ্রুত বাড়ছে, যা আগে শহরকেন্দ্রিক ছিল। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো- শিশু ও কিশোরদের মধ্যেও এখন টাইপ-২ ধরনের ডায়াবেটিস দেখা দিচ্ছে, যা আগে কেবল বয়স্কদের রোগ হিসেবে ধরা হতো।

বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ নীতিমালা থাকলেও তা বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। সীমিত পরীক্ষা ব্যবস্থা, চিকিৎসা ব্যয়ের উচ্চতা ও সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা-এ তিন কারণেই রোগ নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।

ডায়াবেটিস কী এবং কীভাবে হয় : ডায়াবেটিস বা মধুমেহ হলো শরীরের হরমোনজনিত একটি জটিল রোগ, যেখানে অগ্ন্যাশয় পর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারে না অথবা উৎপাদিত ইনসুলিন সঠিকভাবে কাজ করে না। ফলে রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায় এবং তা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ক্ষতি করতে থাকে। ডায়াবেটিস সাধারণত তিন প্রকার-

১. টাইপ-১ ডায়াবেটিস : সাধারণত শিশু বা তরুণ বয়সে হয়। এতে ইনসুলিন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, ফলে রোগীকে ইনসুলিন নিতে হয়।

২. টাইপ-২ ডায়াবেটিস : এটি সবচেয়ে সাধারণ রূপ, যেখানে ইনসুলিন তৈরি হলেও শরীর তা ব্যবহার করতে পারে না।

৩. গর্ভকালীন ডায়াবেটিস : গর্ভবতী নারীদের মধ্যে সাময়িকভাবে দেখা দেয়, তবে ভবিষ্যতে স্থায়ী ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকির কারণ : ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায় এমন কিছু প্রধান কারণ হলো-

পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস, অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা, অস্বাস্থ্যকর ও অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, মানসিক চাপ ও ঘুমের অনিয়ম, ধূমপান ও মদ্যপান, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, বয়স ৪০ বছরের বেশি। বিশেষ করে আমাদের দেশে অতিরিক্ত ভাত, আলু, মিষ্টি ও তেলযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস ডায়াবেটিস বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

রোগের জটিলতা : ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে তা শরীরের প্রায় সব অঙ্গের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সাধারণত যেসব জটিলতা দেখা দেয়।

হৃদরোগ ও স্ট্রোক, কিডনি বিকল হয়ে যাওয়া, চোখের রেটিনা নষ্ট হয়ে অন্ধত্ব, পায়ের রক্তনালী বন্ধ হয়ে ক্ষত সৃষ্টি বা গ্যাংগ্রিন, স্নায়ু ক্ষতি বা অবশ ভাব, সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ৬৭ লাখ মানুষ ডায়াবেটিস ও এর জটিলতায় মারা যায়-অর্থাৎ প্রতি পাচ সেকেণ্ডে একজনের মৃত্যু।

প্রাথমিক লক্ষণ : ডায়াবেটিসের প্রাথমিক পর্যায়ে উপসর্গগুলো খুব সাধারণ হলেও তা অবহেলা করা যায় না। যেমন-

ঘন ঘন প্রস্রাব, অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও ক্ষুধা, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, দুর্বলতা ও ক্লান্তি, চোখ ঝাপসা দেখা, ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া, ত্বকে চুলকানি বা সংক্রমণ। এগুলোর যেকোনোটি দেখা দিলে দ্রুত রক্তে শর্করার পরীক্ষা করানো উচিত।

প্রতিরোধই সর্বোত্তম ব্যবস্থা : ডায়াবেটিস সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য নয়, তবে নিয়মিত জীবনযাপন ও খাদ্যনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। প্রতিরোধের মূল উপায়গুলো হলো-

১. সুষম খাদ্যাভ্যাস : আঁশযুক্ত শাকসবজি, ফলমূল, সম্পূর্ণ শস্য, ডাল, মাছ ও মুরগি খাওয়া। অতিরিক্ত ভাত, আলু, মিষ্টি ও তেলচর্বিযুক্ত খাবার কমানো।

২. শরীরচর্চা : প্রতিদিন অন্তত আধা ঘণ্টা দ্রুত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করা।

৩. ওজন নিয়ন্ত্রণ : স্থূলতা কমালে ইনসুলিন কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।

৪. নিয়মিত পরীক্ষা : বছরে অন্তত একবার রক্তে শর্করার পরীক্ষা করা উচিত, বিশেষ করে পরিবারে কারও ডায়াবেটিস থাকলে।

৫. ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার : এগুলো রক্তনালীর ক্ষতি করে ও জটিলতা বাড়ায়।

চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ : ডায়াবেটিস চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো রক্তে শর্করা, রক্তচাপ ও চর্বির মাত্রা স্বাভাবিক রাখা। চিকিৎসার তিনটি স্তম্ভ-

১. খাদ্য ও জীবনধারা নিয়ন্ত্রণ

২. প্রয়োজনে ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহার

৩. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পরামর্শ

রোগীর নিয়মিতভাবে রক্তে শর্করার মাত্রা, কিডনির কার্যকারিতা, চোখ, পা ও স্নায়ুর অবস্থা পরীক্ষা করা জরুরি।

বাংলাদেশে করণীয় : ১. উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিনামূল্যে ডায়াবেটিস পরীক্ষা ও পরামর্শ সেবা চালু করা।

২. ইনসুলিন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সহজলভ্য ও স্বল্পমূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করা।

৩. স্কুল, কলেজ ও কর্মক্ষেত্রে সচেতনতামূলক শিক্ষা কর্মসূচি চালু করা।

৪. গ্রামীণ পর্যায়ে মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বাড়ানো।

৫. ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা।

১৪ নভেম্বর-সচেতনতার প্রতীক : বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের প্রতীক হলো নীল বৃত্ত, যা ঐক্য ও জীবনের প্রতীক। এটি মনে করিয়ে দেয় সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এ নীরব মহামারি রোধ করতে। প্রতি বছর এ দিনে পৃথিবীর নানা দেশে অনুষ্ঠিত হয় র‌্যালি, সেমিনার, বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওয়াকাথন ও সচেতনতামূলক সভা। বাংলাদেশেও বিভিন্ন হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, ক্লিনিক ও সামাজিক সংগঠন নানা আয়োজনে দিনটি পালন করে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে হোমিওপ্যাথি : ডায়াবেটিস আজকের আধুনিক জীবনের একটি সাধারণ সমস্যা। রক্তে সুগারের মাত্রা বেড়ে গেলে শুধু শরীর নয়, মানসিক স্বাস্থ্যও প্রভাবিত হয়। হোমিওপ্যাথিতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য অনেক প্রমাণিত ওষুধ রয়েছে, যা রক্তে সুগারের মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে এবং শরীরের শক্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে হোমিওপ্যাথি শুধুমাত্র সমর্থক চিকিৎসা; এটি চিকিৎসকের পরামর্শ, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত ব্যায়ামের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহার করতে হবে। অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক রোগীর লক্ষণ অনুযায়ী ওষুধ নির্বাচন করেন। উদাহরণস্বরূপ, ফিউকাস টাইপ-২ ডায়াবেটিসে কার্যকর, যা রক্তে সুগারের মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। সাইলেসিয়া, দীর্ঘ মেয়াদী ডায়াবেটিসে খুব উপকারী; এটি শরীরের দুর্বলতা কমায় এবং রক্তে চিনি নিয়ন্ত্রণে রাখে। ক্রোমিয়াম ইন্সুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায়, ফলে রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে।

যাদের অতিরিক্ত প্রসাব, বারবার প্রস্রাব বা দুর্বলতা থাকে, তাদের জন্য আর্সেনিকাম আলবাম কার্যকর। গ্লুকোনিয়াম রক্তে গ্লুকোজের অনিয়মিত মাত্রা ও ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিসে রক্তনালীর দুর্বলতা বা চামড়ার সমস্যা থাকলে ফ্লুমারিয়ান ওষুধ উপকারী। তবে এই সব ওষুধ নিজে নিজে ব্যবহার করা ঠিক নয়; সব সময় বিশেষজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।

হোমিওপ্যাথি ব্যবহার সংক্রান্ত নির্দেশনা : ওষুধ খাওয়ার আগে অন্তত ২০-৩০ মিনিট কিছু না খাওয়া ভালো। গরম পানিতে বা চায়ে ওষুধ নিলে কার্যকারিতা কমতে পারে। রক্তে সুগারের নিয়মিত পরীক্ষা জরুরি। খাদ্যাভ্যাসে নিয়ন্ত্রণ (কম চিনি, কম তেল, বেশি সবজি ও ফল) এবং হালকা ব্যায়াম অপরিহার্য।

সতর্কতা : শিশু, গর্ভবতী মা বা অন্য গুরুতর শারীরিক সমস্যা থাকলে হোমিওপ্যাথির উপর এককভাবে নির্ভর করা ঠিক নয়। রক্তে সুগার অত্যধিক বেড়ে গেলে বা কেটোন উপস্থিত থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

হোমিওপ্যাথি ডায়াবেটিসের জন্য সহায়ক, তবে সঠিক চিকিৎসা ও জীবনধারার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়াই কার্যকর নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি।

পরিশেষে বলতে চাই, ডায়াবেটিস আজ শুধু একটি “চিনির রোগ” নয়- এটি এক জীবনব্যাপী শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ।

কিন্তু এ রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি সম্ভব যদি আমরা সচেতন হই, সময়মতো পরীক্ষা করি এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণ করি। ১৪ নভেম্বর শুধু একটি দিবস নয়-এটি আমাদের নিজেদের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রতিজ্ঞার দিন। সুস্থ খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম ও সচেতনতা-এ তিন অস্ত্রই পারে আমাদের জীবন থেকে ডায়াবেটিসের ভয় দূর করতে।

লেখক : প্রাবন্ধিক।