ঈদুল ফিতর এক স্নিগ্ধ, মহিমান্বিত ও হৃদয়ছোঁয়া উৎসব, যা মানুষের অন্তরে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধকে জাগিয়ে তোলে। প্রতিবছর নাড়ির টানে লাখো-কোটি মানুষ ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার উদ্দেশ্যে ছুটে চলেন গ্রামের পথে। কিন্তু সেখানে কারও দীর্ঘশ্বাসে ঈদের আনন্দটুকুও ফিকে হয়ে মেশে শোকের নোনা জলে। প্রতিবছর ঈদের আনন্দ যখন দুয়ারে কড়া নাড়ে, তখনই সড়ক, রেল কিংবা নৌপথের নির্মম দুর্ঘটনায় ঝরে যায় অসংখ্য তাজা প্রাণ। মুহূর্তেই পরিবারের রঙিন স্বপ্নগুলো ধূলিসাৎ হয়ে যায়। আর ঈদের আকাশজুড়ে নেমে আসে এক অন্তহীন বিষাদের ছায়া। পরিতাপের বিষয় হলো, ২০২৬ সালের ঈদও এর ব্যতিক্রম হতে পারেনি। উৎসবের ঠিক দু’দিন আগে, ১৮ মার্চের দু’টি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা অসংখ্য মানুষের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেয়। একটি রাজধানীর সদরঘাটে এবং অন্যটি বগুড়ার শেরপুরে। সদরঘাটে দুই লঞ্চের ধাক্কায় এক নিমিষেই চুরমার হয়ে যায় একটি সাজানো সংসার। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান যুবক সোহেল, আর বুড়িগঙ্গার বুকে নিখোঁজ হয়ে যান তাঁর বাবা মিরাজ ফকির। অথচ তাঁদের সাথেই থাকা সোহেলের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আজ হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় ছটফট করছেন- যার অনাগত সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই বাবা আর দাদাকে হারালো।

একই দিন সকালে বগুড়ার শেরপুরের ছোনকায় ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কে একটি মাইক্রোবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডিভাইডারে ধাক্কা দিলে তাতে আগুন ধরে যায়। মাইক্রোবাসটির যাত্রীরা ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঢাকা থেকে রংপুরের কাউনিয়ায় যাচ্ছিলেন। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের সেই লেলিহান শিখা কেড়ে নেয় ৪টি তাজা প্রাণ। স্বজনদের জন্য কেনা নতুন পোশাক আর বর্ণিল সব স্বপ্ন মুহূর্তেই ভস্মীভূত হয়ে পথের ধুলোয় মিশে যায়। আগুনের সেই তীব্রতা কেবল একটি গাড়িকেই পোড়ায়নি, বরং একটি পরিবারের ঈদ আনন্দকে চিরস্থায়ী অম্লান শোকে পরিণত করেছে। তবে সেই ধ্বংসস্তুপের মধ্য থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় দেড় বছরের এক শিশুকন্যা। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সব হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া এই শিশুটির পাশে পরম মমতায় দাঁড়িয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার এই সহমর্মিতা যেন এক শোকাতপ্ত জনপদে স্বস্তির পরশ; যা প্রমাণ করে, বিপন্ন মানুষের চোখের পানি মোছানোই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অঙ্গীকার। অসহায় এক শিশুর ভবিষ্যৎ রক্ষায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই মানবিক উদ্যোগ কেবল কর্তব্য নয়, বরং মমতায় এক আগামীর প্রতিচ্ছবি। এই মহানুভবতার জন্য তার প্রতি রইল শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

বাংলাদেশের রাজপথে আজ যেন এক মৃত্যুপুরী, যেখানে নিত্যনৈমিত্তিক দুর্ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং এক নিষ্ঠুর নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। এবারের ঈদুল ফিতরের ছুটির মাত্র কয়েক দিনেই সারাদেশে সড়ক ও রেলপথে ঝরে গেছে অন্তত ২৭টি তাজা প্রাণ। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ঘটে ২২ মার্চ ২০২৬ ভোরের কুয়াশায়। কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে একটি যাত্রীবাহী বাস রেললাইনে উঠে পড়লে চট্রগ্রাম থেকে আসা ‘ঢাকা মেইল’ ট্রেনের প্রচণ্ড ধাক্কায় মুহূর্তেই ১২ জন যাত্রী না ফেরার দেশে চলে যান। আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরার সেই আকুলতা নিমিষেই চাপা পড়ে যায় ট্রেনের লোহার চাকায় আর দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বাসের ধ্বংসস্তুপে। এর মাত্র কয়েক দিন আগে, ১২ মার্চ ২০২৬ তারিখে বাগেরহাটের রামপালে বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঝরে যায় নবদম্পতিসহ ১৪টি তাজা প্রাণ। বিয়ের আনন্দটুকু ঘরে পৌঁছার আগেই সড়কে এক নির্মম ট্র্যাজেডি পুরো পরিবারকে স্তব্ধ করে দেয়। নববধূর হাতের মেহেদির রং তখনও অম্লান। অথচ সেই রং মুছে যাওয়ার আগেই বর-কনেসহ একই পরিবারের ৯ জনের চিরবিদায় কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়- বরং একটি সাজানো সংসারের করুণ অপমৃত্যু। রামপালের এই হাহাকার হয়তো সময়ের স্রোতে সাধারণ মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে, কিন্তু স্বজনহারা মানুষগুলো এই ক্ষত সারা জীবনেও ভুলতে পারবে না। কারণ, প্রিয়জন হারানোর এই অসহ্য যন্ত্রণা কেবল তারাই বোঝেন, যাদের পৃথিবীটা এক নিমেষেই অন্ধকার হয়ে গেছে।

একটি দেশের উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল সুউচ্চ অট্টালিকা নয়, বরং তার নিরাপদ সড়ক ও যাতায়াত ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত দৃশ্যমান উন্নয়ন অনস্বীকার্য- এক সময়ের সরু পথকগুলো আজ প্রশস্ত মহাসড়কে রূপ নিয়েছে। কিন্তু মানুষের প্রাণের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। রূঢ় বাস্তবতা হলো, সড়কের সেই অভিশপ্ত মৃত্যুমিছিল থামেনি; বরং দিন দিন তা আরও রক্তক্ষয়ী ও দীর্ঘ হচ্ছে। সড়কে প্রতিনিয়ত তাজা প্রাণ ঝরে পড়া এখন যেন এক স্বাভাবিক নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নির্মম হাহাকার আমাদের বিবেককে আর আগের মতো নাড়া দেয় না; আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি লাশের মিছিলে। কেবল কোনো পরিচিত মুখ বা প্রভাবশালী কেউ দুর্ঘটনার শিকার হলেই সাময়িক শোরগোল ওঠে। গঠিত হয় তদন্ত কমিটি, দায়ের হয় মামলা- কিন্তু সময়ের আবর্তে সবকিছুই অতল গহ্বরে তলিয়ে যায়। সড়ক নিরাপদ হয় না। নিশ্চিত হয় না কারো দায়বদ্ধতাও। ফলে মৃত্যুর এই অন্তহীন হাহাকার থামার কোন লক্ষণ আজও নেই। উৎসবের আনন্দ যখন ঘনিয়ে আসে, রাজপথের এই মরণখেলা তখন আরও হিংস্র হয়ে ওঠে। ফাঁকা সড়কে গতির উন্মাদনা, চালকদের চরম অসতর্কতা, লক্কড়ঝক্কড় যানবাহনের দাপট আর রেলক্রসিংয়ে সিগন্যাল অমান্য করার আত্মঘাতী প্রবণতা- সব মিলিয়ে প্রতিটি যাত্রা যেন এক অনিবার্য মৃত্যুর হাতছানি। মুহূর্তেই ঘরে ফেরার আনন্দ পরিণত হয় শেষযাত্রায়। পরিসংখ্যানের খেরোখাতায় এই মৃত্যুগুলো কেবল কিছু সংখ্যা হয়েই ধরা দেয়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, গত তিনবছরে (২০২৩-২০২৫) সড়ক, রেল ও নৌপথের ১৯,৯৬৪টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ২৬,২৫০ জন মানুষ। গড়ে প্রতিদিন চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে নিভে যাচ্ছে অসংখ্য তাজা প্রাণ। এই বিশাল সংখ্যার প্রতিটি অংক আসলে একেকটি পরিবারের কান্না, একেকটি স্বপ্নের অপমৃত্যু। এই পরিসংখ্যান রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঙ্কালসার নগ্ন চিত্রকেই উন্মোচিত করে।

দেশে সড়কপথের চেয়েও অনেক সময় বীভৎস হয়ে ওঠে রেলরাইনের মৃত্যুফাঁদ। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং যেন সেই যমদূত হয়েই হানা দিয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যেই বিশালাকার ট্রেনটি যাত্রীবাহী বাসটিকে অবলীলায় অনেক দূর পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে যায়-সেখানে মানুষের আর্তনাদ চাপা পড়ে যায় লোহার ঘর্ষণে। দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বাসের ধ্বংসস্তুপ আর প্রিয়জনদের নিথর দেহগুলো কেবল কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং চরম অব্যবস্থাপনার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। তিক্ত বাস্তবতা হলো, আধুনিকায়নের এই যুগেও দেশের অধিকাংশ রেলক্রসিং এখনো অরক্ষিত ও অভিভাবকহীন, যা প্রতিনিয়ত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। রেলওয়ের পরিসংখ্যান আজ এক ভয়াবহ বাস্তবতাকে উন্মোচিত করছে। সারাদেশে ৩,১০৪টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশ বা ১১২৩টি ক্রসিংই অবৈধ ও অনুমোদনহীন। এই বিশাল সংখ্যক অরক্ষিত ক্রসিং এখন যেন একেকটি সুপ্ত মরণফাঁদ। কার্যকর উদ্যোগের অভাব আর গেটম্যানদের চরম গাফিলতি প্রতিনিয়ত মানুষের জীবনকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিচ্ছে। ফিরে তাকালে দেখা যায়, রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলেই গত আট বছরে অন্তত আটটি বড় দুর্ঘটনা প্রাণ হারিয়েছেন ৬৭ জন নিরপরাধ মানুষ। ২০১৮ সালের বারইয়ারহাটে ‘বিজয় এক্সপ্রেস’ ট্রেন ধাক্কায় ঘটনাস্থলে দুই বাসযাত্রীর মৃত্যু হয়। ২০১৯ সালে কসবায় ‘উদয়ন এক্সপ্রেস’ ও তূর্ণা নিশিতার ভয়াবহ সংঘর্ষে ১৬ জনের মৃত্যু, কিংবা ২০২২ এ মিরসরাইয়ে মহানগর প্রভাতী ট্রেনটি পর্যটকবাহী মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দিলে ১১ জন নিহত হন। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর ভৈরবে আন্তনগর ‘ এগারসিন্দু এক্সপ্রেস’ ও একটি মালবাহী ট্রেনের সংঘর্ষে প্রাণ হারান ১৯ জন। প্রতিটি ঘটনাই আমাদের অব্যবস্থাপনার রক্তাক্ত দলিল। সর্বশেষ কুমিল্লার এই ট্র্যাজেডিও যেন সেই একই ধারার পুনরাবৃত্তি, যা কেবল কিছু সংখ্যা নয় বরং রেলওয়ের রন্দ্রে রন্দ্রে মিশে থাকা দায়িত্বহীনতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

প্রতিটি রক্তক্ষয়ী দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন আর আশ্বাসের যে চেনা নাটক আমরা দেখি, তাতে কার্যকর পরিবর্তনের প্রতিফলন নেই বললেই চলে। মূলত জবাবদিহিতার অভাব আর অবহেলার এই সংস্কৃতিই আমাদের সড়ক ও রেলপথকে একেকটি অভিশপ্ত মরণফাঁদে পরিণত করেছে। উন্নয়নের সকল চাকচিক্যই ম্লান হয়ে পড়বে যদি আমরা প্রতিটি অমূল্য জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারি। তাই এখনই সময় কেবল কাগজি আনুষ্ঠানিকতা পরিহার করে সমন্বিত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়ার। চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, দীর্ঘ সময় বিরতিহীন ড্রাইভিং বন্ধ এবং পথচারীদের সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকার, রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ‘জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল’ গঠন করা এখন সময়ের দাবি। আমাদের সম্মিলিত সদিচ্ছাই পারে এই ধারাবাহিক মৃত্যুমিছিল থামিয়ে একটি নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। একটি দুর্ঘটনা মানে কেবল একটি প্রাণ হারানো নয়, বরং একটি সাজানো পৃথিবীর অকাল সমাপ্তি। লেখক : প্রাবন্ধিক।