১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক প্রতীক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি। এই সময়জুড়ে গণতন্ত্র, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও আস্থার সংকট নিয়ে বিতর্ক ও আন্দোলন চলেছে, তার এক প্রতীকী সমাপ্তি যেন ঘটল এই নির্বাচনের মাধ্যমে। এই নির্বাচন শুধু প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া নয়; এটি ছিল গণতান্ত্রিক আস্থার পুনর্গঠনেরও পরীক্ষা। দেশের প্রায় ৫১টি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এবং ভোটকেন্দ্র ঘিরে আগ্রহ-সব মিলিয়ে গণতন্ত্র যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। সড়ক, রেল ও নৌপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ গ্রামে ফিরেছে-শুধু ভোট দেয়ার জন্য। এই দৃশ্য নিঃসন্দেহে গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের গভীর আস্থার প্রতীক। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়- বিএনপি পেয়েছে মোট ভোটের ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং এনসিপি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অধিকাংশ দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক এবারের নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক ও গ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছে। তবু কিছু ব্যত্যয়, কিছু অভিযোগ এবং কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে-যা গণতন্ত্রের স্বার্থেই রাষ্ট্রের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা.শফিকুর রহমান কয়েকটি আসনে কারচুপি ও বিভিন্ন স্থানে হামলার অভিযোগ তুলেছেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং নিরপেক্ষ তদন্ত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কারণ গণতন্ত্রের প্রাণ হলো স্বচ্ছতা; আর স্বচ্ছতা ছাড়া বিজয় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। যে বিজয়ের ওপর সন্দেহের ছায়া পড়ে, তা স্থায়ী বৈধতা পায় না। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-নির্বাচনের পরও সহিংসতার ছায়া কাটেনি। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে যখন মানুষের মনে আতঙ্ক কাটে না, যখন প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা, দোকানপাটে লুটপাট ও অফিসে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে- তখন অনিবার্যভাবেই প্রশ্ন জাগে: আমরা কি সত্যিই গণতন্ত্র চর্চা করছি, নাকি কেবল ক্ষমতার পেশীশক্তি প্রদর্শনেই মত্ত? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাড়ে চার মাসে দেশে প্রায় সাত শতাধিক সহিংসতার ঘটনায় ১০ জন নিহত, ২৫০৩ জন আহত হয়েছে। পাঁচ শতাধিক বাড়িঘর, যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ভোটকেন্দ্রে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)’ জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। পরিসংখ্যানের এই শীতল সংখ্যা আসলে অসংখ্য পরিবারের কান্না, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার গল্প বহন করে। বিশেষ করে যখন অভিযোগ ওঠে যে, সরকারি দলের কিছু অংশ প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালাতে কুন্ঠাবোধ করেনি তখন রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ক্ষমতার থাকা মানে কেবল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে সংযম, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধ। বিজয়ী দলের দায়িত্ব হওয়া উচিত পরাজিতদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কারণ গণতন্ত্রে প্রতিপক্ষ থাকে, কিন্তু শত্রু নয়।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে শতভাগ স্বচ্ছ ও প্রশ্নাতীত নির্বাচন হয়েছে এমনটি দাবি করা কঠিন। তবে এতটুকু বলা যায়, এবারের নির্বাচনে পূর্ববর্তী বিতর্কিত অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি হয়নি। কিন্তু ফল ঘোষণার পরই দেশের অন্তত ৩০টি জেলায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ সদরদপ্তরের ভাষ্যনুসারে নির্বাচন পরবর্তী চার দিনেই ৮৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে; এতে চারজন নিহত ও অন্তত ২০৩ জন আহত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়- এগুলো ভাঙা ঘরের কান্না, পোড়া দোকানের ছাই, আতঙ্কে দিন কাটানো পরিবারের দীর্ঘশ্বাস। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের ব্যধি। ক্যান্সারের মতো এটি সমাজের শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে। নির্বাচন এলেই আমরা শান্তি ও সহনশীলতার কথা শুনি, কিন্তু ফলাফল ঘোষণার পর সেই ভাষা রাতারাতি উন্মত্ততায় রূপ নেয়, তখন পরাজিত পক্ষের ঘরবাড়ি, অফিস কিংবা কর্মীদের ওপর হামলা যেন এক অঘোষিত বৈধতায় পরিণত হয়। বিবেক তখন নীরব দর্শক। এ নীরবতা কেবল ব্যক্তির নয়, সমাজেরও। এ এক বিপজ্জনক সংস্কৃতি যা গণতন্ত্রের শরীরে ধীরে ধীরে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে। গণতন্ত্র কেবল ব্যালট বাক্সের ভেতরে বন্দি কোনো প্রক্রিয়া নয়; এটি ভিন্নমতকে সম্মান করার সাহস এবং পরাজিতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নৈতিক অঙ্গীকার। বিজয়ী দলের মহত্ত্ব তখনই প্রকাশ পায় যখন পরাজিত দলের অধিকার রক্ষা হয়। কারণ আজ যে দল পরাজিত- আগামীকাল সে-ই দল হতে পারে বিজয়ী।

বাংলাদেশে রাজনীতি যেন এক অদ্ভুত মানসিকতার নাম- যেখানে মতভেদ মানেই বিভক্তি, প্রতিপক্ষ মানেই শত্রু। অথচ আমরা একই মাটিতে জম্মেছি, একই ভাষায় কথা বলি, একই আকাশের নিচে স্বপ্ন দেখি। তবু রাজনৈতিক বিরোধীতার কারণে মানুষ মানুষকে হিংস্র প্রাণীর মতো আক্রমণ করে। ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, সরকার বদলায়, কিন্তু প্রতিহিংসার রাজনীতি বদলায় না। ফলে একটি শাসনের পতন হলেও প্রতিশোধের সংস্কৃতি অটুট থেকে যায়। রাজনৈতিক সংঘাতে কত মানুষের প্রাণ যে ঝরে গেছে না ফেরার দেশে- তার হিসাব কেউ রাখে না। কত মা সন্তান হারিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে পথ চেয়ে থাকে, কত বোন ভাই হারিয়ে বুকভরা আর্তনাদ লুকিয়ে রাখে, কত শিশু বাবার রক্তমাখা স্মৃতি নিয়ে বড় হয়-সেসব কেবল ভুক্তভোগী পরিবারই জানে। এই কান্না সংবাদের শিরোনাম হয় না। মতভেদ থাকবে, প্রতিযোগিতা থাকবে- এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু তা হতে হবে সভ্যতার ভেতরে, নৈতিকতার সীমারেখায়। গণতন্ত্রের শক্তি প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার মধ্যে নয়; বরং তাকে সম্মান দিয়ে পাশাপাশি বাঁচতে শেখার মধ্যেই। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বন্ধে রাজনৈতিক দলগুলোকেই প্রথম এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে সরকারি দলের ভেতর যদি সংযম, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে দৃঢ় না হয়, তবে এই সংঘাত থামবে না। সরকারের পক্ষ থেকে মাঠের কর্মীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা যেতে হবে-সহিংসতার কোনো স্থান নেই। বিজয় মানে প্রতিপক্ষকে পুড়িয়ে দেয়া নয়; বরং বিজয় মানে উদারতা দেখানো। রাজনীতি ক্ষমতার খেলা নয়- এটি মানুষের জীবন, রক্ত আর ভবিষ্যতের প্রশ্ন। আর যে রাজনীতি মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে না, তাকে গণতন্ত্র বলা চলে না। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমানের একটি বক্তব্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন, ‘শুধু দলীয় পরিচয়ে কারণে কেউ যেন জুলুমের শিকার না হয়। আমরা দেশ ও দেশের নাগরিকদের ভালোবাসি। যদি কেউ জুলুমের শিকার হয়, আমরা প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলব’ এই বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক অবস্থানের নয়; এটি একটি মানবিক অঙ্গীকারও বটে। কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি ক্ষমতা প্রদর্শন নয়-মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে তার গণতান্ত্রিক পরিচয় কাগজে-কলমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক দীর্ঘদিনের ব্যাধি হলো-নির্বাচনে বিজয়ের পর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠা। অথচ গণতন্ত্রে বিজয় মানে দায়িত্বের সূচনা, প্রতিশোধের লাইসেন্স নয়। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর সহনশীলতার বদলে প্রতিপক্ষকে দমন করার প্রবণতাই বেশি দেখা যায়। এই প্রতিশোধস্পৃহাই রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও অবিশ্বাসের চক্রকে দীর্ঘায়িত করছে। আজ যারা জয়ী, কাল তারা পরাজিত হতে পারে। ক্ষমতা কারও জন্য চিরস্থায়ী হয় না। প্রতিহিংসার রাজনীতিও কল্যাণ বয়ে আনে না। প্রকৃতির নির্মম প্রতিশোধ কালবৈশাখীর ঝড়ের মতো হাজারো স্বপ্নকে বর্ষার বাদলে ডুবিয়ে দেয়। যার ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। সে জন্য প্রয়োজন নিজ দলের অন্যায়কে অন্যায় বলা, অন্ধ আনুগত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, রাজনৈতিক স্বার্থের উর্ধ্বে মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেয়া। বিজয় মানে প্রতিশোধ নয়; বিজয় মানে দায়িত্ব। পরাজিত পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিজয়ী দল ও প্রার্থীর নৈতিক কর্তব্য।

নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ভালোবাসা ও সহমর্মিতার বার্তা দেয়ার পরিবর্তে যদি ঘৃণা ছড়ানো হয়, তবে গণতন্ত্র কেবল কাগজে থাকবে-বাস্তবে নয়। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কেবল ভোট গ্রহণে নয়, ফলাফল মেনে নেয়ার সংস্কৃতিও। কারণ ভোটের দিনটি একদিনের-কয়েক ঘণ্টার আয়োজন। অথচ সহিংসতার ক্ষত থেকে যায় বছরের পর বছর, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। সুতরাং রাষ্ট্রের উচিত দ্রুত, নিরপেক্ষ দৃশ্যমান তদন্তের মাধ্যমে সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা। দোষী যে-ই হোক, তার রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই থাকুক- তার অপরাধই বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত। সুতরাং আজ প্রয়োজন এক নতুন রাজনৈতিক চুক্তি- যেখানে বিজয় মানে প্রতিপক্ষের নিরাপত্তা। আর পরাজয় মানে সম্মানজনক বিরোধিতা। আমরা এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখতে চাই? যেখানে ভোটের দিন উৎসব থাকবে, আর ভোটের পরও উৎসবের আমেজ সর্বত্র বিরাজ করবে। পরাজিতের ঘরে আগুন জ¦ালিয়ে কোনো গণতন্ত্র টেকে না; প্রতিপক্ষের কণ্ঠ রোধ করে কোনো রাষ্ট্র স্থিতিশীল হয় না। প্রকৃত গণতন্ত্রের সৌন্দর্য তখনই ফুটে ওঠে যখন বিজয়ের মিছিলের পাশ দিয়ে পরাজিত মানুষটি নিরাপদে হেঁটে যেতে পারে।