মুঃ শফিকুল ইসলাম
ইবাদত মানুষের আত্মার আলো, হৃদয়ের প্রশান্তি এবং ঈমানের শক্তির প্রধান উৎস। তবু বাস্তবতায় আমরা এমন এক সময় অতিক্রম করছি, যখন বহু মানুষ নিয়মিত নামাজ, রোজা, কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া করেও ইবাদতের প্রকৃত তৃপ্তি অনুভব করতে পারছেন না। ইবাদত যেন অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বে সীমাবদ্ধ, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে পৌঁছায় না। কেন এই শূন্যতা? কেন ইবাদত কখনো আত্মাকে আলোড়িত করে, আবার কখনো যান্ত্রিক হয়ে পড়ে?
ইসলামী আধ্যাত্মিকতা ও কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় ইবাদতের মিষ্টতা নির্ভর করে হৃদয়ের পবিত্রতা, আত্মসংযম এবং হালাল জীবনের উপর। বিশেষত তিনটি মৌলিক বিষয়-চোখের হেফাজত, গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং হারাম থেকে দূরে থাকা-ইবাদতের তৃপ্তির মূল ভিত্তি। এই তিনটি স্তম্ভ ভেঙে গেলে ইবাদতের বাহ্যিক কাঠামো থাকলেও তার প্রাণশক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়।
চোখের হেফাজত: আত্মিক আলোর প্রথম দ্বার : মানুষের অন্তরের ওপর সবচেয়ে দ্রুত প্রভাব ফেলে চোখ। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন-এটি শুধু নৈতিক বিধান নয়, বরং আত্মিক পরিশুদ্ধির মূলনীতি। চোখ হলো হৃদয়ের দরজা; যা দেখা হয়, তা-ই অন্তরে প্রবেশ করে এবং চিন্তা, আবেগ ও আমলকে প্রভাবিত করে।
আজকের ডিজিটাল যুগে চোখের হেফাজত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মোবাইল স্ক্রিন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিনোদনের নামে অশ্লীলতা-সবই ধীরে ধীরে মানুষের হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। অবাধ দৃষ্টি শুধু নৈতিক অবক্ষয়ই ঘটায় না; বরং ঈমানের নূর কমিয়ে দেয়, ইবাদতের স্বাদ নষ্ট করে।
ইসলামী মনীষীরা বলেছেন-অবাধ দৃষ্টি কামনার জন্ম দেয়, কামনা গুনাহের দিকে ঠেলে দেয়, আর গুনাহ হৃদয়কে কঠিন করে দেয়। তখন নামাজে মনোযোগ থাকে না, কুরআনের আয়াত হৃদয় স্পর্শ করে না, দোয়া নির্জীব হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে দৃষ্টি সংযত রাখে, তার অন্তরে এক ধরনের প্রশান্তি ও নূর জন্ম নেয়। এই নূরই ইবাদতের প্রাণশক্তি।
গুনাহ থেকে বিরত থাকা : হৃদয়ের আয়না পরিষ্কার রাখার শর্ত : ইবাদতের তৃপ্তি না পাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো-গুনাহ। গুনাহ মানুষের হৃদয়কে অন্ধকার করে দেয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-প্রতিটি গুনাহ হৃদয়ে কালো দাগ ফেলে; তওবা করলে তা মুছে যায়, আর গুনাহ বাড়লে দাগও বাড়তে থাকে।
এই আধ্যাত্মিক বাস্তবতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। অপরাধবোধ, আত্মগ্লানি ও মানসিক অস্থিরতা মানুষের মনোযোগ ও স্থিরতা নষ্ট করে। ফলে ইবাদত তখন আত্মিক প্রশান্তির উৎস না হয়ে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়।
গুনাহ ছোট-বড় যাই হোক, তার প্রভাব গভীর। বারবার ছোট গুনাহ বড় গুনাহের মতোই হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে। তাই ইবাদতের তৃপ্তি পেতে হলে গুনাহ থেকে দূরে থাকা অপরিহার্য।
গুনাহ থেকে বাঁচার কিছু বাস্তব পথ রয়েছে : প্রথমত, নিয়মিত তওবা ও ইস্তেগফার। তওবা হৃদয়ের জং দূর করে, আত্মাকে সতেজ করে।
দ্বিতীয়ত, সৎ মানুষের সঙ্গ। পরিবেশ মানুষের চরিত্র গঠন করে; ভালো সঙ্গ ইবাদতের আগ্রহ বাড়ায়।
তৃতীয়ত, আত্মসমালোচনা। প্রতিদিন নিজের আমল পর্যালোচনা করা গুনাহ কমাতে সহায়তা করে।
যখন গুনাহ কমে, হৃদয় স্বচ্ছ হয়; আর স্বচ্ছ হৃদয়েই ইবাদতের প্রকৃত মিষ্টতা অনুভূত হয়।
হারাম থেকে দূরে থাকা: ইবাদতের নূর সংরক্ষণের অপরিহার্য শর্ত : ইসলামে হালাল-হারামের প্রশ্ন শুধু ফিকহি বিধান নয়; বরং এটি আধ্যাত্মিক জীবনের মূল ভিত্তি। হারাম জীবিকা, হারাম খাদ্য ও অবৈধ লেনদেন মানুষের ইবাদতের নূর কেড়ে নেয়। হাদিসে এসেছে-হারাম খাদ্যে লালিত ব্যক্তির দোয়া কবুল হয় না।
হালাল উপার্জন ইবাদতের অংশ। কারণ হালাল জীবিকা হৃদয়কে কোমল রাখে, দোয়া কবুলের পথ খুলে দেয় এবং জীবনে বরকত আনে। অন্যদিকে, হারাম জীবিকা হৃদয়কে কঠিন করে, ইবাদতকে নির্জীব করে এবং জীবনে অশান্তি বাড়ায়।
আজকের সমাজে সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, অন্যায় লেনদেন-এসব শুধু অর্থনৈতিক অন্যায় নয়; বরং আত্মিক ধ্বংসের কারণ। যে ব্যক্তি হালালকে আঁকড়ে ধরে, আল্লাহ তার জীবনে রহমত নাজিল করেন এবং ইবাদতে প্রশান্তি দান করেন।
ইবাদতের তৃপ্তি: ঈমানের গভীরতার প্রতিফলন : ইবাদতের তৃপ্তি কোনো আবেগমাত্র নয়; বরং এটি ঈমানের গভীরতার পরিচায়ক। যখন ইবাদতে তৃপ্তি আসে, তখন মানুষের জীবনে এক ধরনের স্থিরতা ও প্রশান্তি জন্ম নেয়। দুনিয়ার কষ্ট ছোট মনে হয়, গুনাহ থেকে দূরে থাকা সহজ হয়, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।
ইবাদতের তৃপ্তির কিছু লক্ষণ রয়েছে-নামাজে গভীর মনোযোগ, কুরআন তিলাওয়াতে হৃদয়ের নম্রতা, দোয়ার সময় চোখে পানি, গুনাহ থেকে দূরে থাকার শক্তি এবং আল্লাহর স্মরণে প্রশান্তি অনুভব করা। আত্মশুদ্ধি: ইবাদতের প্রাণশক্তি ইসলামের আত্মশুদ্ধির শিক্ষায় বলা হয়-অন্তর পবিত্র না হলে ইবাদত প্রাণহীন হয়ে পড়ে। আত্মশুদ্ধির জন্য প্রয়োজন-নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, বেশি বেশি ইস্তেগফার, নফল ইবাদত, দুনিয়ার মোহ কমানো এবং আল্লাহর স্মরণে থাকা।
আত্মশুদ্ধি মানে শুধু গুনাহ ত্যাগ নয়; বরং অন্তরকে আল্লাহমুখী করা। যখন হৃদয় আল্লাহর দিকে ঝুঁকে যায়, তখন ইবাদত দায়িত্ব নয়-ভালোবাসা হয়ে ওঠে।
ইবাদত ও জীবনের সমন্বয় ইসলামে ইবাদত শুধু মসজিদে সীমাবদ্ধ নয়। জীবনের প্রতিটি হালাল কাজই ইবাদত হতে পারে-যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়। সৎ উপার্জন, ন্যায়পরায়ণতা, মানুষের উপকার-সবই ইবাদতের অংশ।
যে ব্যক্তি ইবাদতকে জীবনের কেন্দ্র বানায়, তার জীবনে হতাশা থাকে না। কারণ সে জানে-তার প্রতিটি কষ্ট, প্রতিটি ত্যাগ আল্লাহর কাছে মূল্যবান।
উপসংহার: ইবাদতের মিষ্টতার পথে প্রত্যাবর্তন ইবাদতে তৃপ্তি কোনো রহস্য নয়; বরং এটি আত্মসংযম ও পবিত্রতার ফল। চোখের হেফাজত, গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং হারাম থেকে দূরে থাকা-এই তিনটি ভিত্তি মজবুত হলে হৃদয় আলোকিত হয়, আত্মা প্রশান্ত হয় এবং ইবাদত প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। আজ প্রয়োজন বাহ্যিক আমলের সাথে অন্তরের পরিশুদ্ধির সমন্বয়। দৃষ্টিকে সংযত করা, গুনাহ থেকে ফিরে আসা এবং হালাল জীবনের পথে দৃঢ় থাকা-এই পথেই ইবাদতের প্রকৃত মিষ্টতা ফিরে আসবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নিজেকে সংযত রাখে, আল্লাহ তার হৃদয়কে প্রশান্তি দিয়ে ভরে দেন। তখন ইবাদত দায়িত্ব নয় ভালোবাসা, শান্তি ও জীবনের সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা হয়ে ওঠে। আসুন, আমরা আত্মশুদ্ধির পথে ফিরে আসি-ইবাদতের তৃপ্তির পথে ফিরে আসি।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।