মনসুর আহমদ
আল্লাহর প্রতি ঈমানের মজবুতি অর্জনে সর্বপ্রথম মহাবিশ্বের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর ঘোষণা ঃ “আমি এরূপভাবেই ইবরাহীমকে নভোমণ্ডল ও ভূণ্ডলের অত্যাশ্চার্য বস্তু সমূহকে দেখাতে লাগলাম- যাতে সে দৃঢ় বিশ্বাসী হয়। অনন্তর যখন রজনীর অন্ধকার তার উপর সমাচ্ছন্ন হল, তখন সে একটি তারকা দেখতে পেল। বলল: এটি আমার প্রতিপালক। অতঃপর যখন তা অস্তমিত হল, তখন বলল: আমি অস্তগামীদের ভালবাসি না। অতঃপর যখন চন্দ্রকে ঝলমল করতে দেখল, বলল: এটি আমার প্রতিপালক। অনন্তর যখন তা অদৃশ্য হয়ে গেল, তখন বলল: যদি আমার প্রতিপালক আমাকে পথ প্রদর্শন না করেন, তবে অবশ্যই আমি বিভ্রান্ত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। অতঃপর সূর্যকে যখন চক চক করতে দেখল, বলল: এটি আমার পালন কর্তা, এটি বৃহত্তর। অতঃপর যখন তা ডুবে গেল, তখন বলল: হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা যেসব বিষয়ে শরিক কর, আমি ওসব থেকে মুক্ত। আমি একমুখী হয়ে স্বীয় আনন ঐ সত্তার দিকে করছি, যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল স্রষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিক নই। (আনয়াম-৭৫- ৭৯)
মহাবিশ্বের সামান্য অংশ দেখেই হযরত ইবরাহীম [আঃ] তাঁর স্রষ্টার পরিচয় লাভে সামর্থ হয়েছিলেন। আর রসুল করীম (সঃ) কে মহাবিশ্বের বিভিন্ন স্তরের রহস্য দেখিয়ে দিগন্ত রেখার ঊর্ধে নিয়ে আল্লাহ তাঁর নিজের পরিচয় সহ জান্নাত জাহান্নাম সহ বিভিন্ন গায়েবের বিষয়ে অবগত করালেন। তাই মহাবিশ্বের জ্ঞান যে ঈমানের পরিপক্কতা অর্জনের জন্য একান্ত প্রয়োজন তাতে সন্দেহ নেই। আল্লাহ নিজেই ঘোষণা করেন : “নিশ্চয় আসমান ও জমীন সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিনের আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে বোধ সম্পন্ন লোকদের জন্যে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা গবেষণা করে আসমান জমিন সৃষ্টির বিষয়ে (তারা বলে), পরওয়ার দিগার, এ সব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি।” (আল ইমরান-১৯০-১৯১) এ আয়াত থেকে স্পষ্ট যে মহাবিশ্ব নিয়ে গবেষণা করা এবং এসব সৃষ্টির স্বার্থকতা অনুসন্ধান করা মুমিনদের দায়িত্ব। ‘মানুষের তাই উচিত আল্লাহর নিদর্শনসমূহ সম্পর্কে চিন্তাকরা এবং এভাবে তার প্রকৃতি-বিজয়কে একটি বাস্তব সত্যে রূপায়িত করে তোলার উপায় আবিষ্কার করা। ...সন্দেহ নেই, কুরআনের আশু উদ্দেশ্য হল প্রকৃতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ দ্বারা মানুষের মধ্যে সেই সচেতনতা জাগিয়ে দেয়া, যাতে প্রকৃতি তার কাছে প্রতীক বলে মনে হয়। তবে প্রত্যক্ষবাদী মনোভাবই হচ্ছে কুরআনের প্রধান লক্ষ্যণীয় বিষয়। এ মনোভাবই কুরআন অনুসারীদের মনে বাস্তবের প্রতি করেছিল গভীর শ্রদ্ধার সৃষ্টি। তার ফলেই পরিণামে তারা হয়েছিল আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা। যে যুগে মানুষ আল্লাহর অনুসন্ধান করতে পরিদৃশ্যমান বস্তুসমূহকে মূল্যহীন মনে করে বর্জন করেছিল, সেই যুগে এ প্রত্যক্ষবাদের ঊন্মেষ সাধন প্রকৃতই এক মহান ব্যপারছিল।’ কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে আব্বাসীয় যুগের অবসানের পর প্রকৃতিকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ ব্যাপারে মুসলিম জগত নীরব।
যখন মহাকাশ গবেষণা নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রচুর গবেষণা চলছে তখন আমরাতো গবেষণা করছিই না, আমরা যেন তাদের গবেষণা লব্ধ জ্ঞান নিয়েও এতটুকু মাথা ঘামাবার কষ্ট টুকু করতে আগ্রহী নই। এ কথা চরমভাবে সত্য যে মহাবিশ্বের জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর সত্তা ও শক্তির প্রতি এবং পরকাল সংগঠিত হওয়ার প্রতি ঈমান অধিকতর মজবুত হতে বাধ্য। মহা বিশ্বের জ্ঞান দিয়ে আল্লাহ ও পরকালের স্বরূপ ও অবস্থা অনুধাবন করা মানব বুদ্ধি অক্ষম, শুধু মাত্র কিছু অনুমান করা যেতে পারে। তাই যে সব আয়াতে আল্লাহ তায়ালার সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে বর্ণিত রয়েছে, সেগুলের প্রতি যেভাবে আছে সেভাবে রেখেই কোনরূপ ব্যাখ্যা ও সদর্থ ছাড়াই বিশ্বাস স্থাপন করা উচিত। কারণ মহান আল্লাহ কোন জড় পদার্থ নন। কোন জড় পদার্থ বা জীব থেকে তিনি উদ্ভুত নন, কোন জড় বা জীবও তার থেকে উদ্ভুত নয়। ‘লাম ইয়ালিদ, ওয়া লামইউলাদ’। তাই তার মৌল সত্তা সম্পর্কে চিন্তা করা মানুষের উচিত নয়। তবে আল্লাহর কুদরতের একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আংশিক ধারণা হয়ত সৃষ্টি হতে পারে যদি আমরা মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও তার বি¯তৃতি সম্পর্কে কিছুটাও ধারণা অর্জন করতে পারি।
বিজ্ঞানীরা বলেন, ৩০০ কোটি বছর আগে : বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল মহাবিশ্ব। মহাজগত সৃষ্টির এ তত্ত্ব নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে খুব একটা দ্বিমত পাওয়া যায় না। কিন্তু যে মহাবিস্ফোরণেরে মাধ্যমে মহাবিশ্বের সদস্য হিসাবে আমাদের এ পৃথিবী সৃষ্টি হলো, সেখানে প্রাণের আবির্ভাব হলো কি ভাবে? এ নিয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত কোনো তত্ত্ব আজও দাঁড় করাতে পারেনি বিজ্ঞানীরা। তবে এক নতুন গবেষণায় জানা গেছে, মহা বিশ্ব সৃষ্টির মতোই হঠাৎ একটি বিস্ফোরণের মাধ্যমে এই পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাব ঘটেছিল। আর এটি ঘটে ছিল ৩০০ কোটি বছর আগে।
যুুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনষ্টিটিউট অব টেকনোলজির (এম আইটি) একদল বিজ্ঞানী গবেষণাটি পরিচালনা করেন। পৃথিবীতে এখনো অস্তিত্বমান এক হাজার মৌলিক জিন (জীবদেহের বংশগতি সংক্রান্ত উপাদান) এবং সুদূর অতীতে কিভাবে তাদের আবির্ভাব ঘটেছিল তার উপর এ গবেষণা চালান তারা। বিজ্ঞানী এরিক আম ও লরেন্স ডেভিডের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। বিজ্ঞানীরা জানান, পৃথিবীতে বিদ্যমান ২৭ শতাংশ জিনের আবির্ভাব ঘটেছিল ৩৩০ কোটি থেকে ২৮০ কোটি বছর আগে কোন এক সময়। তাঁদের মতে, ৫৮০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে দ্রুত গতিতে প্রাণের রূপান্তর ঘটতে থাকে, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘ক্যামব্রিয়ান এক্সপোশন’ বলে থাকেন। এ ক্যামব্রিয়ান এক্সপোশনের আগে পৃথিবীতে থাকা অনুজীবগুলো তখনই বিকশিত হতে থাকে, যখন তারা বেঁচে থাকার জন্য সূর্য থেকে পাওয়া অক্সিজেন ও শক্তির ব্যবহার করতে শেখে। বিজ্ঞান এরিক আম ও লরেন্স ডেভিড পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাব সংক্রান্ত তাঁদের তত্ত্বটিকে ‘অ্যারখিয়ান এক্সপ্যানসন’ বলে নামকরণ করেছেন।
আমাদের সৌরজগত যে ছায়া পথে অবস্থিত তার বিস্তৃতিও অনেক। আমাদের সৌরজগত থেকে ছায়া পথের কেন্দ্রের দূরত্ব ২৫ হাজার আলোক বর্ষ, তেমনি ছায়া পথের শেষ প্রান্তের দূরত্ব একই ভাবে ২৫ হাজার আলোক বর্ষ। অর্থাৎ গোলাকার ছায়া পথের ব্যাস এক লক্ষ অলোক বর্ষ। ছায়া পথের তুলনায় সৌর জগতের আয়তন গোটা ইউনাইটেড এস্টেটের তুলনায় আমেরিকান একটি মুদ্রার সমান। “আমাদের এ পৃথিবী যে সৌরলোকে অবস্থিত তা এতই বিরাট ও বিশাল যে, এর কেন্দ্র-এ সূর্য আকারে পৃথিবীর তুলনায় তিন লক্ষ গুণ বড়। তার দূরতম গ্রহ নেপচুন সূর্য থেকে অন্তত ২ শত ৭৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল দূরে অবস্থিত। আর পুটোকে যদি দূরতম নক্ষত্র ধরা হয়, তবে তা সূর্য থেকে ৪ শত ৬০ কোটি মাইল দূরে অবস্থিত। এ বিরাটত্ব ও বিশালতা সত্ত্বেও এ সৌর লোক আরও অনেক বড় ছায়াপথের একটা ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া কিছু নয়। যে ছায়াপথে আমাদের এই সৌরলোক অবস্থিত তাতে প্রায় তিন হাজার মিলিয়ন (তিন শত কোটি) সূর্য রয়েছে। এর নিকটতর সূর্য আমাদের এই পৃথিবী হতে এতখানি দূরে অবস্থিত যে, তার আলো এখানে পৌঁছতে ৪ কোটি বছর অতিবাহিত হয়। বলাবাহুল্য এ ছায়া পথই সমগ্র বিশ্বলোক নয়, বর্তমান কালের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে অনুমান করা হয়েছে যে এটি প্রায় ২০ লক্ষ নীহারিকা পুঞ্জের মধ্যে মাত্র একটি। তন্মধ্যে নিকটবর্তী নিহারিকা আমাদের থেকে এত বেশি দূরত্বে অবস্থিত যে, তার আলো দশ লক্ষ বছরে আমাদের এই জমিনে এসে পৌঁছে। আর দূরবর্তী যে সব গ্রহ- উপগ্রহ আমাদের বর্তমান যন্ত্রপাতিতে ধরা পড়ে তার আলো পৃথিবীতে পৌঁছতে দশ কোটি বছর প্রয়োজন।” সব চাইতে দূরের ছায়াপথের দূরত্ব এক হাজার ৩২০ কোটি আলোক বর্ষ। নাসার বিজ্ঞানীরা এটিকেই সবচেয়ে দূরের গ্যালাক্সি বলে নিশ্চিত করেছেন। যুক্ত রাষ্ট্রের জন হপকিংস ইউনিভার্সিটির পদার্থ বিজ্ঞান ও জ্যেতির্বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক উই জেন বলেন, “আমাদের খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে দূরের গ্যালাক্সি এটি।” এ সামান্য আলোচনা থেকে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, মহাবিশ্বের বি¯তৃতি সম্পর্কে ধারণা করা মানুষের জ্ঞানের বাইরে, আর তার একমাত্র স্রষ্টা আল্লাহ। আল্লাহর ঘোষণা : “আকাশ জগত এবং পৃথিবী ও তার মর্ধবর্তী সমস্ত কিছুই আমি যথাযথ ভাবে নির্দিষ্ট কালের জন্য সৃষ্টি করেছি।” [সুরা আল আহকাফ] “প্রশংসা আল্লাহরই যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, আর উৎপত্তি ঘটিয়েছেন অন্ধকার ও আলোর।” [আল আনয়াম-১]
মহাবিশ্বের সুসামঞ্জস্য ব্যবস্থাপনা আমাদেরকে জানিয়ে দেয় যে, “এ সমগ্র বিশ্বলোক -সৃষ্টিলোক একই খোদার সৃষ্টি ও একই মহা সম্রাটের রাজত্বও সাম্রাজ্য। তা ছাড়া এ লক্ষ লক্ষ ছায়াপথ এবং তার মাঝে আবর্তনশীল শত কোটি নক্ষত্র ও গ্রহ উপগ্রহের মাঝে যে নিয়ম তান্ত্রিকতা, যে যুক্তি কৌশল, যে সূক্ষ্ম শিল্প বুদ্ধি এবং যে সামঞ্জস্য বর্তমান, তা দেখে কোন বুদ্ধিমান মানুষই কি ধারণা করতে পারে যে, এসব কিছু আপনা আপনিই হয়েছে? এ বিশাল শৃঙ্খলা - ব্যবস্থার পশ্চাতে কি কোন শৃঙ্খলা স্থাপনকারী পরিচালক নেই? এ সৃষ্টি কুশলতার পেছনে কি কোন সুবিজ্ঞ বুদ্ধিমান কুশলী, এই সূক্ষ্ম শিল্প কর্মের পেছনে কোন শিল্পী এবং পারস্পরিক সামঞ্জস্যের পেছনে কি কোন মহান পরিকল্পনাকারী বাস্তবিকই নেই?” কোন বুদ্ধিমান মানুষ বিশ্বব্যবস্থাপনার এই সব ব্যপার সামনে রেখে যদি চিন্তা ভাবনা করে, তা হলে এই সৃষ্টিলোক কোন সৃষ্টি কর্তা ছাড়াই এবং কোন মৌল পরিকল্পনাকারীর প্রতিষ্ঠিত এই সব সামঞ্জস্যতা একটি দুর্ঘটনার ফল হিসাবে স্বতঃই কায়েম হয়েছে বলে ধারণা করতে পারবে না।
এ মহাবিশ্বের মর্যাদা আল্লাহর সামনে কতটুকু তা অনুমান করা চলে নিম্নবর্তী আয়াত খানা থেকে। এরশাদ হচ্ছে: “এ লোকেরাতো আল্লাহর কোন কদরই করল না, তাঁর কদর যতখানি করা উচিত। [তাঁর পূর্ণ মাত্রায় কুদরতের অবস্থা এইযে] কেয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী তাঁর মুঠির মধ্যে হবে এবং আকাশ মণ্ডল তাঁর ডান হাতের মধ্যে পেচানো অবস্থায় থাকবে। [আল জুমার- ৬৭] এত বড় মহাবিশ্ব যে আল্লাহর কুদরতী হাতের মুঠোয় থাকবে সেই আল্লাহ কতবড় শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান তা মানুষের বোধাতীত।
নবী করীম (সঃ) একবার মসজিদে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন। ভাষণ দান কালে এ আয়াতটি তিনি পাঠ করলেন এবং বললেন: “আল্লাহ তায়ালা আকাশ মণ্ডল এবং ও জমিন অর্থাৎ গ্রহ উপগ্রহ গুলিকে স্বীয় মুঠির মধ্যে নিয়ে এমনভাবে ঘুরাবেন যেমন একটি বালক ফুটবলটিকে নাচায় ঘুরায়। আর বলতে থাকবেন, আমিই এক খোদা, অমিই সর্বাধিনায়ক সম্রাট, আমিই জব্বার, সমস্ত শ্রেষ্ঠত্বের একাধিপতি আমিই।...কোথায় পৃথিবীর মালিক বাদশা হয়ে বসা লোকেরা, কোথায় দুনিয়ার অত্যাচারী শাসকেরা, কোথায় সেই অহংকারীরা? [বোখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমদ, নাসায়ী ইবনে জরীর ও ইবনে মাজাহ]
আধুনিক বিজ্ঞান প্রকৃতিকে অসীম শূন্যে অবস্থিত নিশ্চল কিছু মনে করে না বরং পরস্পর সম্পৃক্ত ঘটনাবলীর বিন্যাস বলেই মনে করে। মহাবিশ্বের সমস্ত গ্রহ তারকা সহ সব কিছুই বিশেষ লক্ষ্য পানে দ্রুত গতিশীল হয়ে রয়েছে। আমাদের পৃথিবী ১৮.৬ মাইল বা ৩০ কি.মি বেগে সুর্যকে প্রদক্ষিণ করে চলমান। সূর্য সেকেণ্ডে কয়েক শ’মাইল বেগে ছায়াপথ প্রদক্ষিণ করে চলমান। স্থায়ী তারকা সমূহের গতি অনুমান করা হয়েছে প্রতি সেকেণ্ডে ১০ মাইল হতে ১০০ মাইল। আর সূর্য সম্পর্কে এ যুগের জ্যোতির্বিদরা বলেন, তা সমস্ত সৌরলোক সহ প্রতি সেকেন্ডে ২০ কিলোমিটার- প্রায় ১২ মাইল গতিতে চলমান রয়েছে। শুধু তাই নয়, ১৯২৯ সালে এডুইন হাবল আবিষ্কার করলেন : দূরের ছায়াপথ গুলি আমাদের কাছ থেকে সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ মহাবিশ্ব প্রসারমান। এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা বলেন: The red shifted wavelength of radiation from distant supernovae affirms that space in the universe is expandingat an acclerated rate, which the outermost regions moving farther away with high velocities.
মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি সম্পর্কে ভবিষ্যৎ বাণী করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রদান করেছেন “Big crunch theory. ’It states that one day in the future, our universe will not only stop expanding, but also reverse due to the immense pull of gravity and eventually will collapse into itself and eventually will run into a super- hot super -dense singularity.” অর্থাৎ ভবিষ্যতে এমন একদিন আসবে যে দিন মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ শুধু বন্ধই হয়ে যাবে না বরং উল্টাটাই হবে। প্রচণ্ড অভিকর্ষের ফলে মহাবিশ্ব চুপসে গিয়ে প্রচণ্ড -উত্তপ্ত প্রচণ্ড ঘনত্বের অনন্যতায় উপনীত হবে। এর ইঙ্গিত রয়েছে পবিত্র কুরআনে। কুরআনের ভাষায়: “সেদিন আমি আকাশকে গুটিয়ে নেব, যেমন গুটানো হয় লিখিত কাগজ পত্র।” [আম্বিয়া-১০৪] এভাবে আকাশ মণ্ডলের ধারণা যত সুস্পষ্ট হবে আল্লাহর শক্তির বিশ্বাস তত পরিপক্ক হবে। মহাবিশ্বের জ্ঞান কেয়ামতের প্রতি আমাদের ঈমানকে অধিকর দৃঢ় করে। আধুনিক গবেষণায় বলে সমস্ত সৃষ্টি এক সময় লয় হয়ে যাবে। যেমন:- আমাদের সৌরজগৎ যে ছায়া পথে অবস্থিত তার নাম মিল্কি ওয়ে। আর এ ছায়াপথের পার্শ্ববর্তী ছায়াপথের নাম এন্ড্রোমিডা। মিল্কি ওয়ে ও এন্ড্রোমিডা ছায়াপথের মধ্যকার দূরত্ব প্রায় ২৫ লক্ষ আলোক বর্ষ। এ দুই ছায়াপথ নিয়ে সম্প্রতি চমৎকৃত তথ্য দিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। তাঁরা জানিয়েছেন আমাদের মিল্কি ওয়ে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে কাছের এন্ড্রোমিডাকে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন আগামী চার বিলিয়ন বছরের মধ্যেই এন্ড্রোমিডার পুরোটাই দখল করে ফেলবে মিল্কি ওয়ে। এর পরের দুই বিলিয়ন বছরের মধ্যেই উভয় ছায়াপথ অভিন্ন অস্তিত্বের হয়ে যাবে বলে তাঁরা মনে করেন। এ বিষয়ে তখন আমাদের সূর্যের কী হবে? বিজ্ঞানীদের জওয়াব, সূর্য নামের হলুদ রঙের বামন তারাটি এবং তার গ্রহ উপগ্রহ সমূহ দাঁড়িয়ে আছে একটি ধ্বংসের মুখে।
আমেরিকার বাল্টিমোরের স্পেস টেলিস্কোপ সাইন্স ইনিস্টিটিউটের প্রধান গবেষক রোনাল্ড ভ্যান ডার মারেল বলেছেন, এন্ড্রোমিডা এখনো আকাশে আমাদের কাছে ঝাপসাভাবে লক্ষ্যণীয়। যা এখন থেকে হাজার বছর আগেই প্রাচীন জ্যোতির্বিদগণ দেখেছিলেন। তাই কিছু জিনিস মানুষকে সব সময় আলোড়িত করছে। যেমন- মানুষের মহাজাগতিক নিয়তি ও ভবিষ্যতে বেচে থাকা না থাকা। তবু দূর আকাশের এন্ড্রোমিডা যদি আমাদের সোলার সিস্টেম ও সূর্যকে গ্রাস করতে আসে তা হবে দারুণ ঘটনা। তা হলে মানুষ কি ধ্বংসের সম্মুখীন? উত্তরে বিজ্ঞানীরা বলেন, মিল্কিওয়ের এন্ড্রোমিডার পুরো পুরি দখলের এখনো ৪ বিলিয়ন বছরের বাকী। তখন পর্যন্ত মানুষ বেচে থাকুক, তার পরে বাকিটা ভাবা যাবে।
মহাবিশ্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানী নিউটন বলেছিলেন যে, এ মহাবিশ্ব শাশ্বত; মহাবিশ্ব অনন্ত কাল ধরে বিশেষ কোন পরিবর্তন ব্যতিতই টিকে থাকবে। কিন্তু ১৮২৬ সালে ভিয়েনার পদার্থবিদ হেনরিখ ওলবার্স বৈজ্ঞানিক যুক্তি পেশ করে বলেন যে, নিউটনের ধারণা ঠিক নয়। মহাবিশ্ব অসীম নয়, নয় শ্বাশ্বত ও নিশ্চল। তিনি আরও বললেন: মহাবিশ্ব দূরবর্তী তারকা ও ছায়া পথ সহ অতি দ্রুত গতিতে আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তিনি অতি দৃঢ়তার সাথে অভিমত পেশ করলেন যে মহাজাগতিক দিগন্তের বাইরে অসংখ্য তারকারাজি রয়েছে যাদের আলো এখনও পৃথিবীতে এসে পৌঁছেনি। তিনি আরও বললেন যে, তারকাগুলো এক নির্দিষ্ট সময় কাল টিকে থাকে। কয়েক বিলিয়ন বা তদ্রুপ সময়কাল পরে তারকাগুলো তাদের পারমানবিক জ্বালানী খরচ করে কাল হয়ে যায় এবং অবশেষে মৃত্যুবরণ করে। মৃত্যুবরণকারী তারকাগুলো থেকে গ্যাস ও ধূলিকণা মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে নতুন নতুন তারকার জন্ম দেয়। কিন্তু এ ধারা অনন্ত কাল চলতে পারে না। এক সময় মহাবিশ্বের সমস্ত জ্বালানী পুড়ে শেষ হয়ে যাবে, পরিণতিতে কোন নতুন তারকার জন্ম হবে না।
লেখক : প্রবীণ প্রকৌশলী ও প্রবান্ধিক