॥ মুঃ শফিকুল ইসলাম ॥
নির্বাচন কোনো শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা নয়; এটি জনগণের আমানত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য হলো-জনগণের ইচ্ছা ও কল্যাণকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে স্থাপন করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে এই মৌলিক দর্শন থেকে বিচ্যুত। ক্রমেই নির্বাচন মানে হয়ে উঠছে আধিপত্য বিস্তার, পেশিশক্তির ব্যবহার এবং কালো টাকার দাপট।
নির্বাচনের মাঠে আজ আদর্শ ও নৈতিকতার বদলে প্রাধান্য পাচ্ছে প্রভাব প্রতিপত্তি ও অর্থবল। ভোটারদের অনেকেই মনে করেন-ভোট দিলেও প্রকৃত মতামতের প্রতিফলন ঘটে না। ফলে ভোটকেন্দ্র বিমুখতা বাড়ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। নির্বাচন যদি জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারে, তবে সেই নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে।
কালো টাকার প্রভাব নির্বাচনী ব্যবস্থাকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অস্বাভাবিক ব্যয় নির্বাচনে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের জন্য অংশগ্রহণ কঠিন করে তুলেছে। যারা বিপুল অর্থ ব্যয় করে ক্ষমতায় আসে, তারা ক্ষমতাকে জনসেবার দায়িত্ব হিসেবে নয়; বরং বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে। এর ফলশ্রুতিতে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় এবং রাষ্ট্রীয় সেবার নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
পেশিশক্তির ব্যবহার এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। নির্বাচনী সহিংসতা ও ভয়ভীতি সাধারণ মানুষকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এতে নতুন প্রজন্ম রাজনীতিকে কল্যাণের পথ নয়, বরং ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে-যা জাতির ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।
এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন নৈতিক ও মানবিক রাজনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হলো-অর্থশালী নয়, বরং সৎ, যোগ্য ও জনবান্ধব নেতৃত্বকে মনোনয়ন দেওয়া। নির্বাচন কমিশনকে হতে হবে কার্যকর ও দৃঢ়-কালো টাকা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। ভোট কেবল অধিকার নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ব। সাময়িক প্রলোভন ও ভয় নয়, ন্যায় ও জনকল্যাণের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে। গণমাধ্যম ও সচেতন সমাজকে সত্য উচ্চারণে অবিচল থাকতে হবে।
বাংলাদেশের মানুষ আজ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চায়-আধিপত্য বিস্তার, পেশিশক্তি ও কালো টাকার নির্বাচন তারা আর চায় না।
তারা চায় মানবতা, ন্যায়বিচার ও জনকল্যাণভিত্তিক নির্বাচন। এই দাবি উপেক্ষা করলে গণতন্ত্র কাঠামো হিসেবে টিকে থাকলেও তার প্রাণ হারাবে।
এখনই সময় মূল্যবোধের রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার-এটাই জাতির কল্যাণের পথ।