॥ মুন্সী আবু আহনাফ ॥
বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হলো। বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতা আর কয়েকটি দুঃখজনক মৃত্যুর ঘটনাকে বাদ দিলে সামগ্রিক চিত্র তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ। অনেক কেন্দ্রে দেখা গেছে ভোটারদের উৎসাহ-উদ্দীপনা; দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকেরাও বেশ খোলামেলাভাবে মাঠ ঘুরে ভোট পর্যবেক্ষণ করেছেন। নির্বাচনের ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে ‘জালিয়াতি’ করে অন্তত ৩২টি আসনে ১১ দল সমর্থিত প্রার্থীদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) অভিযোগ দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটটি। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইসি বলেছে, নির্বাচিতদের গেজেট প্রকাশ হওয়ায় এখন তাদের করার কিছু নেই। তবে আইনের দরজা খোলা আছে। তড়িঘড়ি করে গেজেট প্রকাশ করায় প্রশ্ন উঠছে মন্তব্য করে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় জোটের লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ইসি অভিযোগ আমলে না নেওয়ায় তাদের অধিকার ক্ষুণœ হয়েছে। এ জন্য আইনি প্রক্রিয়ায় যাবেন তারা। প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশের বেশি (২০৯) আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। জামায়াত-এনসিপির ১১ দলীয় জোট (৭৭ আসন পেয়ে) দ্বিতীয় শক্তি; ইসলামী আন্দোলন ও কয়েকজন স্বতন্ত্রসহ কিছু ছোট শক্তিও সংসদে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ক্ষমতার লড়াইয়ে বিএনপি স্পষ্ট বিজয়ী, আর জামায়াত সংখ্যার হিসাবে উল্লেখযোগ্য অর্জন করেও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফলে ৫৩টি আসনে ৭০ থেকে ৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। এই ৫৩টি আসনে রিটার্নিং কর্মকর্তার পাঠানো সীটে ঘষামাজার অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসেছে যদিও জামায়াত ৩২টি আসনে সুনির্দিষ্ট কারচুপির অভিযোগ ইসিতে দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় জোটের ভোট প্রাপ্তির পরিসংখ্যান অনেক শক্তিশালী বার্তা বহন করে। প্রদত্ত প্রায় ৭ কোটি ভোটের মধ্যে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট ৩৮ দশমিক ৫০ শতাংশ ভোট পেয়েছে। আর বিএনপি পেয়েছে ৫১.০৯% ভোট। জামায়াত জোটের প্রতি প্রায় ২ কোটি ৮৮ লাখ নাগরিক আস্থা স্থাপন করেছেন। এটি একটি বিশাল ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ জনরায়। এখানে আরেকটি জিনিস মনে রাখা দরকার; বাংলাদেশের ভোটারের বড় একটা অংশ এখনো সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরে। বয়স্ক ভোটার, গ্রামীণ সমাজ, কম সংযুক্ত মানুষ, এদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এখনো মুখের কথা, স্থানীয় নেটওয়ার্ক, পাড়াপড়শির আড্ডা, মসজিদের ইমাম, স্থানীয় শিক্ষক, এ সবকিছুর ওপর নির্ভর করে। সোশ্যাল মিডিয়ার ঝড় সেখানে পৌঁছায় খ-খ-ভাবে, অনেক সময় বিকৃত হয়ে। ফলে ফেসবুকে ‘ল্যান্ডস্লাইড’ দেখে যে উচ্ছ্বাস, ভোটবাক্সে গিয়ে তার মাত্রা অনেক কম দেখা গেছে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার জামায়াত জোটের সাফল্য ধরে রাখতে হলে সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরে দেশের যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আছে তাদের কাছে জামায়াতকে যেতে হবে, তবেই আসবে বড় সাফল্য। এই প্রবদ্ধে আমরা অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো কিভাবে জামায়াত হেরে গিয়েও জিতে গেল।
এক. ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে দেশ-বিদেশে ছিল ব্যাপক আলোচনা। বিশেষ করে, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার টকশো ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন প্রচার-প্রোপাগান্ডায় জামায়াত ছিল অপরিহার্য বিষয়। এসব মাধ্যমে ‘জামায়াতে ইসলামী ২০০ আসনে জিতবে, তা না হলেও ১৫১ আসনে জিতে সরকার গঠন করবে এমনটাও বেশ জোরেসোরে আলোচিত হয়েছে। আলোচিত এই দলটির এমন পরাজয় কতটা স্বাভাবিক বা যৌক্তিক? এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আসলে এ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী হেরেও জয়ী হয়েছে। তাদের মতে, ইতিহাসের আলোকে দেখা যায় যে, জামায়াতে ইসলামী ১৯৯১, ১৯৯৬ (জুন) ও ২০০১-এর নির্বাচনে যথাক্রমে ১৮, ৩ ও ১৭টি আসনে জিতে ছিলো। এককভাবে নির্বাচন করে ১৯৯৬-এ তাদের অর্জন মাত্র ৩টি আসন। সেখান থেকে এগিয়ে এসে তারা প্রায় ৭০টি আসন পেয়েছে এবং আরও ১৫৩টি আসনে জামায়াতের ভোটের ব্যবধান খুবই কম। এছাড়াও প্রায় সব আসনেই জামায়াত দ্বিতীয় পজিশনে ছিল। এটি এ দলটির জন্য এক বিরাট বিজয়। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামীর প্রাপ্ত ভোট এবার অনেক বেড়েছে। তারা আগের নির্বাচনগুলোতে যে সব আসনে ২০ থেকে ৩০ হাজার ভোট পেত এবার সে সব আসনে লক্ষাধিক ভোট পেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। বিএনপির সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে জামায়াতের প্রার্থী পরাজিত হয়েছে এমন সংখ্যাও ৬০টিরও অধিক। আগে যে দলটি তৃতীয় বা চতুর্থ স্থানের জন্য লড়াই করতো এবার সে দলটি মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারাও জয়ী হয়ে ক্ষমতায় যেতে পারে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করতে পেরেছে এটাই জামায়াতে ইসলামী দলের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সফলতা। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর জামায়াত এই সাফল্য অর্জন করেছে।
দুই. সোস্যাল মিডিয়াতে নানান অভিযোগ ঘুরে ফিরে আসছে নির্বাচন নিয়ে যে, বড় অভিযোগ ইলেকশনে ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। যখন রাত গভীর হলো এবং মানুষ প্রশাসনের ওপর আস্থা রেখে ঘরে ফিরলো, তখনই তা শুরু হয়।
তিন. বাংলাদেশে গত প্রায় পাঁচ দশকের দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জামায়াত কখনোই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেনি। এর পাশাপাশি ১৭ বছরে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের জুলুম-নির্যাতনের মধ্যে রাজনীতি করেছে জামায়াত-ছাত্রশিবির। তাতে তারা ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার শক্তি অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এ ছাড়া অতীতের কোনো নির্বাচনেই ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেকর্ড জামায়াতের নেই। ১৯৯১-এর নির্বাচনে তারা লড়েছিল ২২২টি আসনে, যা তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সেবার জামায়াতে ইসলামী ১৯৯৬ (জুন)-এর নির্বাচনে এককভাবে ৩৯টি এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোটের শরিক হয়ে ২০০১-এর নির্বাচনে ৩১টি ও ২০০৮-এ ৩৮টি আসনে প্রার্থী দেয়। ২০১৮-এর নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ২৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। হার-জিত যাই হোক, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি রাজনৈতিক দলের জন্য আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে নির্বাচনী এলাকায় দল সংগঠিত হয়, কর্মী-সমর্থক বাড়ে। ৩৫ বছর আগে ১৯৯১-এর নির্বাচনের অভিজ্ঞতা ছাড়া কোনো নির্বাচনে ৪০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেকর্ডও জামায়াতের নেই। আর সে কারণে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় জামায়াতের সেই শক্তিশালী সংগঠনও আগে গড়ে ওঠেনি, কর্মী-সমর্থক তৈরি হয়নি। যেভাবে গড়ে উঠলে নির্বাচনে জিতা যায়। ভোটারদের কাছেও জামায়াত এবং তার দাঁড়িপাল্লা মার্কার গ্রহণযোগ্যতা আগে তৈরি হয়নি এবার যেটা হয়েছে। এবারের মতো ১৯৯১ সালে যদি জামায়াত জনপ্রিয়তা পেত তবে অনেক আগেই জামায়াত সরকার হঠানোর সক্ষমতা অর্জন করতো। ৫ আগস্ট ২০২৪ ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর জামায়াত ও দলটির ছাত্রসংগঠন শিবির খুব অল্প সময়ের মধ্যে বড় মাপের সংগঠিত শক্তি নিয়ে মাঠে চলে আসে। স্বৈরাচারী হাসিনা আমলে টানা দমন-পীড়নের পরে তারা অনেক ক্ষেত্রেই গোপনে বা ‘লো প্রোফাইলে’ রাজনীতি করত; সেই তুলনায় তাদের প্রত্যাবর্তন ছিল বেশ জোরালো। ফ্যাসিস্ট মুক্ত বাংলাদেশে ২০২৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী সারাদেশে তাদের দলীয় কর্মকান্ডেরও ব্যাপক বিস্তার ও পরিচিতি ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবারের নির্বাচন জামায়াতকে আগামীর জন্য বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে তৈরি করেছে।
চার. প্রশ্নটা তাই দাঁড়ায়: জামায়াত আসলে জিতেছে, না হেরেছে? আমার মনে হয়, বিষয়টা বোঝার জন্য আগস্ট ৫-এর সরকার পতনের পরের সময়টা একটু ফিরে দেখা জরুরি। কালচারাল ওয়্যার স্বাভাবিকভাবেই এক বড় অংশের ভোটারের জন্য ‘অস্তিত্বের প্রশ্ন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লিবারেল, সেক্যুলার, মধ্যপন্থী যারা একে অন্যের সঙ্গে একমত নন, তাঁরাও এই ইস্যুতে অনেক ক্ষেত্রে একজোট হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ভালো ফল করল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) এবারের নির্বাচন এতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও উত্তেজনাপূর্ণ হবে, তা ছিল অভাবনীয়। মূলত চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানই সেটি সম্ভব করেছে। একইভাবে নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের যে ভূমিধস বিজয়, সেটিও ছিল অভাবনীয়, অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিতও। ডাকসুর বিজয়ের ধারাবাহিকতায় জাকসু, জকসু, রাকসু এবং চাকসুতে ইসলামী ছাত্রশিবির বিশাল বিজয় পায়। অনেকের মতে, ক্যাম্পাসগুলোতে শিবিরের সাংগঠনিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী ছিল, সেটি অধিকাংশের কাছে স্পষ্ট ছিল না। ফলে শিবিরের এই সাফল্য অনেকের কাছে অকল্পনীয় মনে হচ্ছে, অনেকে মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে, বিশেষ করে রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক বাম ছাত্র সংগঠনগুলো। প্রশাসন, পুলিশ, আনসার সবকিছু প্রায় ভেঙে পড়া অবস্থায় একধরনের রাজনৈতিক ভ্যাকুয়াম তৈরি হয়েছিল; সেখানে জামায়াত দ্রুত সংগঠিত উপস্থিতি দেখাতে পারল। গণমাধ্যমে, টক শোতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই বলতে শুরু করলেন, ‘জামায়াত খুব অর্গানাইজড দল, সবচেয়ে প্রস্তুত তারাই।’ শেষ সপ্তাহগুলোতে সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন ধারণাও ছড়াতে থাকল যে তারা এককভাবে সরকার গঠন করে ফেলতে পারে। ছাত্র সংসদগুলো জয়ের সেই ধারাবাহিকতায় জামায়াত জাতীয় নির্বাচনে ভালো ফল করেছে।
পাঁচ. কেন জামায়াত হেরেও জিতে গেছে, তার কিছু কারণ নিচে দেওয়া হলো। ১. ঐতিহাসিক শক্তিবৃদ্ধি করেছে জামায়াত। সংসদীয় আসনে তারা এককভাবে ৬৮টি আসনে জয় পেয়েছে (জোটগতভাবে ৭৭টি), যা তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের সর্বোচ্চ অর্জন। সেই তুলনায় এই ফলাফল তাদের জন্য একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ‘কামব্যাক’। ২. শক্তিশালী ভোটব্যাংক ও জনসমর্থন অর্জন করেছে জামায়াত। জামায়াত এবার প্রায় ৩৮.৫০% ভোট পেয়েছে। যেখানে বিএনপি প্রায় ৫০.০৯% ভোট পেয়ে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিশ্চিত করেছে, সেখানে জামায়াতের এই বিপুল শতাংশ ভোট প্রমাণ করে যে তারা এখন দেশের রাজনীতিতে একটি অনিস্বীকার্য তৃতীয় শক্তি (বা প্রধান বিরোধী শক্তি) হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জামায়াত এবারের নির্বাচনে বিশাল ভোট ব্যাংক অর্জন করতে পেরেছে। এটা যদি ধরে রাখতে পারে তবে আগামী নির্বাচনে জামায়াত সরকার গঠনের সক্ষমতা অর্জন করবে।
৩. ঢাকা বিভাগে ও শহরাঞ্চলের আসনগুলোতে জামায়াত বড় জয় পেয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতকে উত্তরাঞ্চল বা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দল মনে করা হতো। কিন্তু এবার তারা ঢাকা মহানগরের ১৫টি আসনের মধ্যে ৬টিতে জয় পেয়েছে এবং জোটগতভাবে ৭টি আসন পেয়েছে। রাজধানীর রাজনীতিতে এই শক্তিশালী অবস্থান তাদের জন্য একটি বড় নৈতিক বিজয়। এছাড়াও বিভিন্ন জেলা ও মহানগর যেমন নারায়নগঞ্জ ও গাজীপুরে বিজয় অর্জন করেছে জামায়াত। এটা গত ৫৫ বছরের নির্বাচনের ইতিহাসে জামায়াতের বড় অর্জন। ৪. স্বাধীনতার ৫৫ বছর যেখানে বিএনপি ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তার দোসর জাতীয় পার্টি মধ্যে ঘুরে ফিরে চলেছে সরকারি ও বিরোধী দলের রাজনীতি সে অবস্থা থেকে বেরিয়ে জামায়াত প্রথন কোনো ইসলামপন্থী দল হিসেবে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল হচ্ছে। ‘লিডার অব দ্য অপজিশন’ বা প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় জামায়াত কি রোল প্লে করে তা দেখতে দেশের মানুষ উৎসুক হয়ে অপেক্ষা করছে। সরকার গঠন করতে না পারলেও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এখন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসতে যাচ্ছেন। একটি দল যখন দীর্ঘ সময় নিষিদ্ধ হওয়া বা চরম দমন-পীড়নের মুখে থাকে, সেখান থেকে ফিরে এসে সরাসরি প্রধান বিরোধী দল হওয়া তাদের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক জয়। আশাকরি জামায়াত দায়িত্বশীল বিরোধীদল হিসাবে ভূমিকা পালন করবে, অযথা সরকারকে কোন ডিস্টার্ব না করে গঠনমূলক সমালোচনা করবে। জুলাইয়ের তরুণদের উপর কোন প্রকার রাজনৈতিক জুলুম আসলে ঢাল হয়ে দাঁড়াবে। বাংলাদেশে সেন্টার রাইট হিসাবে জামায়াতের রাজনীতি করা শুরু মাত্র। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের অনেক কিছু করার আছে। দেশের জন্য বিরোধী দলের ভূমিকাও জরুরি। জামায়াতের সুযোগ আছে বিএনপিকে চেক-এ রাখার। বিএনপি ভাল করলে ডিস্টার্ব করা যাবে না, খারাপ করলে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। ৫. তরুণ ও নারী ভোটারা জামায়াতকে বিপুল ভাবে ভোট দিয়েছে ও নতুন জোটগত ভাবে নির্বাচন করে জামায়াত বড় সক্ষমতা অর্জন করেছে। এনসিপি ও কওমী ঘরানার দলগুলো যেমন মাওলানা মামুনুল হক জামায়াত জোটে থেকে নির্বাচন করা এটা জামায়াতের বড় রাজনৈতিক অর্জন। তারা জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের একটি অংশের সমর্থন এবং নারী ভোটারদের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়েছে জামায়াত। কওমী ঘরানার রাজনৈতিক দল এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (NCP) মতো নতুন শক্তির সাথে জোট করে নিজেদের ইমেজ পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে। ৬. জামায়াতের সবচেয়ে বড় সফলতা হল, জামায়াত পরিবর্তন চাওয়া মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। জুলাই সনদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। অনেক পলিসির ক্ষেত্রে উদার অবস্থান নিয়েছে। জামায়াত এখন সুযোগ পাইল প্রমাণ করার যে, এইগুলো শুধু নির্বাচনে জেতার জন্য ছিল না। বরং জাতির প্রতি কমিটমেন্ট ছিল। সংখ্যালঘু, নারী, শরীয়া আইন ইত্যাদি ইস্যুতে জামায়াত তার পজিশন এখন আরও ক্লিয়ার করার সুযোগ পাবে, যাতে সামনের নির্বাচনের আগে কেউ অস্পষ্টতার অভিযোগ আনতে না পারে।
পরিশেষে, এবারের নির্বাচনে তরুণ ও নারী ভোটারদের একটি অংশ জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছে-এমন আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাফল্যকেও কেউ কেউ এর প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখছেন। গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী তরুণদের দল এনসিপির সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য বা জোটও একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। জামায়াত রক্ষণশীল ডানপন্থী পরিচয় থেকে মধ্য-ডানপন্থী দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করেছে এবং অনেকাংশে সফল হয়েছে। এত দিন বিএনপিকে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী ঘরানার ভোটগুলোর প্রধান জিম্মাদার মনে করা হতো। এই ক্ষেত্রে জামায়াতকে সহযোগী মনে করা হতো। এবার সেই ভোটে জামায়াত ভাগ বসাতে পেরেছে। এ ছাড়া দলটি নিজেদের ‘ক্ষমতামুখী নয়, পরিবর্তনের পক্ষে’ শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। এর প্রভাবও তরুণদের মধ্যে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ভোটের রাজনীতিতে জামায়াতের এই উত্থান প্রত্যাশিত ছিল। এখন দেখা যাক তারা প্রধান বিরোধী দল হিসেবে কি ভূমিকা রাখে?