ভোটাধিকার মানুষের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। এ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের মানুষ জীবন দিয়েছে। অথচ দঃখজনক বাস্তবতা হলো, সে ভোটাধিকারই গত এক দশকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, জনগণ ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, নির্বাচনের নামে হয়েছে তামাশা। এবার সুযোগ এসেছে ভোটের কলংকমোচন করার। ভোটের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে এ অঞ্চলে যে নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু ছিল তা ছিল সীমিত ভোটাধিকারভিত্তিক। শিক্ষিত ও করদাতা শ্রেণির মধ্যেই ভোটাধিকার সীমাবদ্ধ ছিল। এর বাইরের জনগোষ্ঠী ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারতো না। পাকিস্তান আমলের শুরুর দিকেও কিছু সময় সে ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা দেখা যায়। পরবর্তীতে তীব্র গণআন্দোলনের মুখে প্রতিষ্ঠিত হয় সার্বজনীন ভোটাধিকার। অথচ সে অধিকার বেশিদিন টিকেনি। আইয়ুব খান সে অধিকার হরণ করলে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ তা আবার পুনরুদ্ধার করে। কিন্তু ভোটের রায় কার্যকর হতে দেয়নি। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম নির্বাচনে সে ভোটাধিকার আবার কলংকিত হয়। সে ধারাবাহিকতায় ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ৩টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রহসনের তকমা পায়। হাসিনার শাসনামলে অনুষ্ঠিত এসব নির্বাচন দেশ ও বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা, বিতর্ক ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। ফলে ভোট সংস্কৃতি ভেঙে পড়ে, জনগণ ভোটের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। এ অবস্থা থেকে ভোটের সংস্কৃতিকে ফিরে আনার লক্ষ্যে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের গণতান্ত্রিক মানুষের দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের দিকে। ৫ আগস্ট ২০২৪ ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। দেশের মানুষ তাকে আশা ও আস্থার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে। গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তিতে ৫ আগস্ট ২০২৫ প্রধান উপদেষ্টা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। তারই ধারাবাহিকতায় ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম নাসির উদ্দিন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ঢাকা ৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ড ও কয়েকজন প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ভোটের দিন ঘনিয়ে আসলেও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা সেভাবে চোখে পড়ছে না। প্রতিনিয়ত হামলা ভাংচুর চলছে। তফসিল ঘোষণার পর গত ৩৬ দিনে সারা দেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এ মুহূর্তে প্রয়োজন দেশের সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যেন সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত হয়।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে মোট ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুঠিত হয়েছে। এসব নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, দলীয় সরকারের অধীনে যতগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে কোনটিই বিতর্কমুক্ত ছিল না। যার দৃষ্টান্ত প্রথম সংসদ নির্বাচন। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। সে সংবিধানের আলোকে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে পছন্দের দল এবং নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনিয়ম আর কারচুপি মানুষের সব ধারণাকে পাল্টে দেয়। কুমিল্লা-৯ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী খন্দকার মোশতাককে বিজয়ী করতে ব্যালট পেপার হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনার অভিযোগ আজও ইতিহাসের কালো অধ্যায় হিসেবে স্মরণ করা হয়। অথচ ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ে জনপ্রিয় কোন দলই ছিল না। ৩০০ সংসদীয় আসনের ভেতর আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসনে জয়লাভ করেছিল। নির্বাচনে অনিয়ম না করলেও আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে সরকার গঠন করতো। কিন্তু সে নির্বাচনে সারা দেশে ব্যাপক অনিয়ম-কারচুপির ঘটনা ঘটেছিল। স্বাধীনতার প্রথম নির্বাচনের গায়ে এমনভাবে কালিমা লেপন করা হবে, তা কেউ ভাবতেই পারেনি। সেদিন থেকেই বাংলাদেশ প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের বীজ বোপন করে। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয় হলেও গণতন্ত্রের গায়ে কলঙ্কের দাগ লেগে যায়।
বাংলাদেশের জনগণ আর একতরফা ভোটারবিহীন নির্বাচন দেখতে চায় না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা ভোটারবিহীন নির্বাচনে ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫৪ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিল। সে নির্বাচনে তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের আগের দিন পর্যন্ত প্রায় ১২৩ জন মানুষ নিহত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একাই ২৫৮টি আসনে জয়ী হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচন রাতের ভোট হিসেবে তকমা পায়। ভোটের পরিস্থিতি ও ফলাফল স্বাভাবিক ছিল না। এ নির্বাচন সম্পর্কে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার তার বই নির্বাচনামাতে লিখেছেন ওই নির্বাচনে ভোট হয় রাত ১০ টা থেকে ভোর ৩ টার মধ্যে। সে সময় প্রায় ২২ জন নিহত এবং দুই হাজারের মতো মানুষ আহত হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২২৫টি আসনে বিজয়ী হয়। এ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী অংশগ্রহণ করেনি।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় প্রায় ১৫ জন নিহত এবং ২ হাজার ২০০ জনের বেশি আহত হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ বলে উল্লেখ করেছে। অথচ তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল দাবি করেছিলেন- এটি প্রত্যাশার চেয়েও ভালো নির্বাচন। শেখ হাসিনার শাসনামলে অনুষ্ঠিত ৩টি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিশন ১২ জানুয়ারি ২০২৬ প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদন অনুসারে দেশের জাতীয় দৈনিক কয়েকটি পত্রিকার শিরোনাম দেখলেই বুঝা যায় নির্বাচনগুলো কেমন ছিল? দৈনিক নয়া দিগন্তের শিরোনাম-কলুষিত নির্বাচন ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ তদন্ত প্রতিবেদন অনুসন্ধানে ভোটাধিকার হরণ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভাঙনের চিত্র-(১৬ জানুয়ারি, ২৬) বিতর্কিত ৩ নির্বাচন নিয়ে প্রতিবেদন, প্রশাসন, পুলিশ, ইসি ও গোয়েন্দা সংস্থার একাংশ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহৃত হয়। তদন্ত কমিশনের পর্যবেক্ষণে ভয়াবহ অনিয়ম ও জালিয়াতির বিষয়টি উঠে এসেছে। কমিশনের ভাষ্যমতে বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে ৩টি নির্বাচন কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকবে।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য কেবল একদিনের ভোট নয়; বরং জনগণের অবাধ মত প্রকাশের স্বাধীনতাকেও নির্দেশ করে। নির্বাচন শুধু করলেই হয় না, নির্বাচনটি দেশে ও দেশের বাইরে গ্রহণযোগ্য হতে হয়। একটি দেশের নির্বাচন তখনই অর্থবহ হয় যখন দেশটির জনগণ নির্ভয়ে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে আবার নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসতে পারে। নির্বাচনে সকল প্রার্থী সমান সুযোগ পায়। প্রশাসন থাকে নিরপেক্ষ। এ মানদণ্ড পূরণ না হলে নির্বাচনটি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয় তখন গণতন্ত্রের সুফল জনগণ পায় না। তামাশার নির্বাচন হয়ত কোনো দলকে সাময়িক ক্ষমতা দেয়। কিন্তু একটি দেশকে দীর্ঘমেয়াদে গভীর ক্ষতের দিকে ঠেলে দেয়। যার ভুরি ভুরি উদাহারণ আছে। সুতরাং দেশের স্বার্থে সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প কিছু নেই। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সকল রাজনৈতিক দলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। একটি নির্বাচন তখনই কেবল সুষ্ঠু বলা যায়- যখন নির্বাচন কমিশন থাকে নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত, সব রাজনৈতিক দলের সমানসুযোগ নিশ্চিত হয়, সঠিক ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হয়, সকল প্রার্থীকে সমান নিরাপত্তা দেয়া হয়, ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা থাকে, প্রশাসনের ভূমিকা হয় নিরপেক্ষ ইত্যাদি। হাসিনা মার্কা নির্বাচন এবারও হলে জনগণ তা কোনোভাবেই মেনে নেবে না। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং যে কোন মূল্যে বন্ধ করতে হবে। বিগত ৩টি নির্বাচনে প্রশাসনের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা ছিল। নির্বাচন কমিশন বিতর্কিত ছিল।
প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের ক্ষমতার মেয়াদ দীর্ঘায়িত হয়েছিল। নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছিল না। নির্বাচনের সুষ্ঠুতা প্রমাণিত হয় প্রশাসনের নিরপেক্ষ আচরণের মধ্য দিয়ে। নির্বাচন শুধু আয়োজন করলেই হয় না; সেটি দেশে ও দেশের বাইরে গ্রহণযোগ্য হতে হয়। কারণ নির্বাচন শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়! এটি একটি প্রক্রিয়া, যেখানে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ও জনগণের সার্বভৌমত্ব একই সুতোয় গাঁথা। এ সুতো ছিঁড়ে গেলে নির্বাচন থাকে, কিন্তু গণতন্ত্র হারিয়ে যায়। আর প্রহসনের নির্বাচন হলে গণতন্ত্র ভেঙে পড়ে, সংসদ দুর্বল হয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আস্থা হারায়, সামাজিক সহিংসতা বাড়ে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আন্তর্জাতিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, নিষেধাজ্ঞা, ভিসা নীতি, বিনিয়োগ সংকট-সবকিছুর বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধে গিয়ে পড়ে। এবারের নির্বাচনও যদি ইঞ্জিনিয়ারিং, পক্ষপাতিত্ব ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের শিকার হয় তাহলে হাজারো শহীদের রক্তের সাথে বেঈমানি করা হবে। তবে আশার কথা হচ্ছে ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যুক্তরাষ্ট্রের দুই সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক অ্যালবার্ট গম্বিস ও মর্স ট্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে বলেছেন-নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেও নয়, এক দিন পরেও নয়, ঠিক ১২ ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে, অন্তর্বর্তী সরকার থাকবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং প্রশাসন হবে পক্ষপাতমুক্ত। দেশবাসী তার এ অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দেখতে চায়। ১২ ফেব্রুয়ারি শুধু একটি নির্বাচনের দিন নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্জন্মের দিনও হতে পারে! তাই এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশের মানুষের একটাই প্রত্যাশা-প্রহসনের নির্বাচন নয়, রক্তপাতহীন, অবাধ, সুষ্ঠু ও সত্যিকার অর্থে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, এমনটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
লেখক : প্রাবন্ধিক।