॥ জাফর আহমাদ ॥

“যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তার কাজ সম্পূর্ণ করে থাকেন।” সূরা তালাক : ৩) ঈমান ও তাওয়াক্কুল পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অর্থাৎ যিনি সত্যিকারের ঈমানদার তিনিই সবকিছুতেই আল্লাহর ওপর নির্ভর করেন। তিনি মনে প্রাণে বিশ^াস করেন যে, আল্লাহ আমার রব, তিনি সর্বক্ষণ আমার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। তায়াক্কুল ছাড়া যে ঈমান তা সাদামাটা স্বীকৃতি ও ঘোষণা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। এই ধরণের ঈমানদার থেকে ইসলামের গৌরবময় ফলাফল অর্জিত হতে পারে না। প্রকৃত ঈমানদার সার্বক্ষণিক আল্লাহ ওপর নির্ভরশীল হবে। কারণ তায়াক্কুল গভীর ঈমান থেকেই সৃষ্টি হয়। এই ঈমান তাকে এ প্রেরণা যোগায় যে, তোমার সকল অবস্থা মহান আল্লাহ সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছেন। মহুর্তের জন্যও তিনি তোমাকে তার পর্যবেক্ষণ থেকে দূরে রাখেন না। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“যা-ই তোমাদের দেয়া হয়েছে তা কেবল দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের উপকরণ মাত্র। আর আল্লাহর কাছে যা আছে তা যেমন উত্তম তেমনি চিরস্থায়ী তা সেই সব লোকের জন্য যারা ঈমান এনেছে এবং তার উপর নির্ভর করে।” (সূরা শূরা : ৩৬) এখানে আল্লাহর প্রতি ভরসাকে ঈমানের অনিবার্য দাবি এবং আখিরাতের সফলতার জন্য একটি জরুরি বৈশিষ্ট্য বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

তায়াক্কুল কিভাবে করতে হয় তা শিক্ষা লাভের জন্য আমরা একজন মহিয়সী নারী, হযরত ইবরাহিম (আ:)-এর প্রিয়তমা স্ত্রী, হযরত ইসমাইল (আ:) ¯েœহময়ী মাতা, আল্লাহর একজন বিশেষ বান্দী হযরত হাজেরা (আ:)-এর কাছে যেতে পারি। আপনারা সকলেই জানেন, আল্লাহর প্রতি তার অগাধ তায়াক্কুল বা নির্ভরশীলতা ও ধৈর্যশীলতাকে এতটাই ভালবাসেন যে, সারা পৃথিবীর মুসলমানদের জন্য সাফা-মারওয়ার সাঈকে হজে¦র একটি গুরুত্বপূর্ণ হুকুমে পরিণত করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমুহের অন্তর্ভুক্ত।” (বাকারা : ১৫৮) একজন নিঃসঙ্গ নারী জনমানবহীন এ মরুভূমিতে কিভাবে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করেছিলেন, কিভাবে তিনি নিজেকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে দিয়েছিলেন। কিভাবে তিনি শুস্ক ধূলি-ধূসর মরুভূমি ও পাথরসমৃদ্ধ দুটো পাহাড়ে ছুটোছুটি করে আল্লাহর অনুগ্রহের তালাশ করেছিলেন। সকলের জানা আছে যে, হযরত ইব্রাহীম (আ:)-তার প্রানপ্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আ:) ও প্রিয়তমা স্ত্রী হাজেরাকে আল্লাহ তা’আলার নির্দেশে এ নির্জন স্থানে রেখে যান। তবে এটিও মনে করার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই যে তিনি তার স্ত্রী-সন্তানের ভালবাসা ছিল না। এটিও তার প্রতি কতগুলো পরীক্ষার একটি। তিনি তার সন্তান ও স্ত্রীকে কতটুকু ভালবাসতেন তা তার দো’আ থেকে আমরা বুঝতে পারি।

তিনি তার স্ত্রী ও সন্তানের দৃষ্টি সীমার বাইরে পাহাড়ের আড়ালে গিয়ে মহান রবের কাছে আবেদন করলেন,“হে আমাদের প্রতিপালক! আমি তৃণলতাহীন উপত্যকায় নিজের বংশধরের একটি অংশকে আপনার ঘরের কাছে অভিবাসিত করলাম। এ জন্য যে, তারা যেন নামায কায়েম করে। তুমি মানুষের অন্তরকে তাদের প্রতি অনুরাগী করে দাও এবং ফল-মূল দিয়ে তাদের রিযিকের ব্যবস্থা করে দাও। যাতে তারা তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।” (সূরা ইবরাহীম : ৩৭)

অভিবাসিত মা হাজেরা তার শিশুকে বুকে জড়িয়ে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে এ অভিবাসনকে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিয়েছিলেন। যখন তাদের পানি ও খাদ্য শেষ হয়ে গেল, তখন মা ও শিশু ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর হয়ে গেলেন। শিশু ইসমাঈলকে উপত্যকায় রেখে মা পানির জন্য সাফায় দৌঁড়ালেন, চারদিকে দৃষ্টি মেলে পানির সন্ধান পেলেন না। দৌঁড়ালেন মারওয়ায় সেখানেও পানির সন্ধান মেলেনি। এভাবে সাফা-মারওয়া ও মারওয়া-সাফা দু-পাহাড়ের মাঝে বেশ কয়েকবার দৌঁড়ানোর পর প্রিয় সন্তানের অবস্থা অবলোকন করার জন্য শিশুর কাছে এলেন। এসে দেখেন শিশুর অনতিদূরে মাটি ফুঁড়ে আল্লাহর রহমতের বারিধাঁরা প্রবলবেগে উতলে উঠছে। মা হাজেরা পানির উৎসের চারদিকে বাঁধ দিলেন এবং মশক পুরে শিশুকে পান করান এবং নিজেও পান করেন। এভাবে আল্লাহ তা’আলা তার ধৈর্য ও নির্ভরশীলতার ফলস্বরূপ তার দুঃখ, চিন্তা, কষ্ট ও দূর্ভাবনা দুর করে দিলেন। এখানে হযরত ইবরাহিম (আ:) এর ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুলও প্রকাশিত হয়েছে। স্ত্রী-সন্তানকে তৃণলতাহীন ধূসর ও নির্জন মরুভূমিতে রেখে যান মুলত: আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রেখেই। তিনি জানতেন তার প্রভু এঁদের বিনাশ করবেন না। তার এ নির্ভরশীলতা প্রকাশ পেয়েছে মহান প্রতিপালকের কাছে করা তার দো’আ থেকে। দো’আটিতে তিনি বলেছেন, “তুমি মানুষের অন্তরকে তাদের প্রতি অনুরাগী করে দাও এবং ফল-মূল দিয়ে তাদের রিযিকের ব্যবস্থা করে দাও। যাতে তারা তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।”

মা হাজেরা-এর আল্লাহর প্রতি নির্ভশীলতাকে এতটাই পছন্দ করলেন যে. এই নির্ভরশীলতা অনাগত মু’মিন-মুসলমানগণ যাতে নিজেদের মধ্যে অনুশীলন করতে পারে সে জন্য এই দু’টো পাহাড়ের মাঝে দৌঁড়াদৌড়িকে আল্লাহ মু’মিনদের জন্য কর্তব্য হিসাবে ধার্য করেছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। কাজেই যে ব্যক্তি বাইতুল্লাহ হজ্জ বা উমরাহ করে তার জন্য এই দু’পাহাড়ের মাঝখানে সাঈ করায় কোন গুনাহ নাই। আর যে ব্যক্তি স্চ্ছোয় ও সাগ্রহে কোন সৎ কাজ করে আল্লাহ তা জানেন এবং তার যথার্থ মর্যাদা ও মূল্য দান করবেন।” (সূরা বাকারা : ১৫৮)

তাই এখানে প্রদক্ষিণকারী সম্মানিত মেহমানগণের গভীর দৃষ্টি ফেলতে হবে যে, আমরা কিসের জন্য এবং কি কারণে দৌড়াচ্ছি, সাফা থেকে মারওয়া-মারওয়া থেকে সাফা কেন এই কসরত? মুলত: এখান থেকে যে শিক্ষাটুকু আমাদের নিতে হবে, তাহলো আমরা আল্লাহর রহমতের জন্য দৌড়াচ্ছি। যারা একান্তই আল্লাহর ওপর ভরসা করেন, তাদের জন্য এ দৌড়টুকু আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতাকে আরো বৃদ্ধি ও আরো সুদৃঢ় করে দিবে। এ পূণ্যময় স্মৃতি মন্থনকারী হৃদয় একমাত্র আল্লাহর জন্য উন্মুখ থাকবে, তার ভরসাস্থল হবে একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা। তার যা কিছুর প্রয়োজন, তা আল্লাহকেই বলবে। সম্মানিত আল্লাহর মেহমানগণ যেন অত্যন্ত দারিদ্র ও বিনয়ের সাথে প্রদক্ষিণ করেন এবং মহান আল্লাহর নিকট নিজেদের অভাব, প্রয়োজন এবং অসহায়তার কথা পেশ করেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আর হে নবী! আমার বান্দা যদি তোমার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাস করে, তাহলে তাদেরকে বলে দাও, আমি তাদের কাছেই আছি। যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি এবং জবাব দেই, কাজেই তাদের আমার আহ্বানে সাড়া দেয়া এবং আমার ওপর ঈমান আনা উচিত, এ কথা তুমি তাদের শুনিয়ে দাও, হয়তো সত্য-সরল পথের সন্ধান পাবে।” (সূরা বাকারা : ১৮৬) যদিও আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে আমাদের বাস্তব চক্ষু দ্বারা দেখতে পাই না এবং ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে অনুভবও করতে পারি না, তথাপি তাকে দূরে মনে করা ঠিক নয়। আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক বান্দার অতি নিকটেই অবস্থান করেন। প্রত্যেক মানুষ ইচ্ছা করলে সব সময় তার কাছে আর্জি পেশ করতে পারে। এতে তিনি সবকিছু শুনেন। কারণ তিনি সামিউম বাছির বা শ্রবণকারী ও মহাদ্রষ্টা। এমন কি মনে মনে যা আবেদন করা হয় তাও তিনি শুনতে পান। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ মনের গোপন কথাও জানেন।” (সূরা ইমরান : ১১৯) শুধুমাত্র শুনতে পান না বরং সে সম্পর্কে তিনি সিদ্ধান্তও ঘোষণা করেন। মানুষ অজ্ঞতা ও মূর্খতার কারণে যে সমস্ত অলীক, কাল্পনিক ও অক্ষম সত্তাদের উপাস্য ও প্রভু গণ্য করে তাদের কাছে দৌড়ে যায়, অথচ তারা তার কোন আবেদন নিবেদন শুনতে পায় না। এবং আবেদনের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও তাদের নেই। আল্লাহ গভীর ও প্রখর দৃষ্টি সম্পন্ন। তিনি তার বান্দাদের কার্যাবলী, সংকল্প ইচ্ছা পুরোপুরি ভালোভাবেই জানেন। কারণ তিনি বাছিরুম বিল ইবাদ। তিনি লাতিফ বা সুক্ষ্মদর্শী। সুতরাং তায়াক্কুল একমাত্র তার ওপরই করতে হবে এবং যা কিছুর প্রয়োজন তাকেই বলতে হবে।

লেখক : ব্যাংকার।