জালাল উদ্দিন ওমর

দেশে দেশে কিছু মানুষ মহিলাদের হিজাব পরিধানের বিরোধীতা করে চলেছে। তারা হিজাব পরিধানকে নারী স্বাধীনতার অন্তরায়, প্রগতি ও আধুনিকতা বিরোধী বলে অভিহিত করে। অথচ হিজাব পরিধান নারীর ব্যক্তিগত অধিকার এবং ধর্মীয় নির্দেশ। হিজাব পরিহিত নারীরা আধুনিক, উচ্চ শিক্ষিত এবং কর্মক্ষেত্রে দক্ষ। হিজাব পরিধান করায় নারীদের পিছিয়ে থাকার কোনো প্রমাণ নাই। হিজাব ইসলামের বিধান, ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতীক। তাই হিজাব বিরোধীতা ইসলাম বিরোধীতারই অংশ এবং ইসলাম বিদ্বেষ থেকেই হিজাব বিরোধীতার জন্ম। হিজাব পরিধান এবং সমর্থন না করার অধিকার এবং স্বাধীনতা প্রত্যেকের রয়েছে। তবে হিজাবের বিরোধীতা এবং হিজাব পরিধান করায় কোন নারীকে কটাক্ষ করার অধিকার কারো নাই। এটা ব্যক্তির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, অপরের ধর্মীয় মূল্যবোধকে অবজ্ঞা এবং অধিকারকে অসম্মানের শামিল।

হিজাবের পরিচয় : ইসলাম নারীকে পুরো শরীর আবৃত করে পোশাক পরিধানের নির্দেশ দিয়েছে। এটাকে পর্দা বলে এবং হিজাব পর্দার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলাম ধর্ম মতে পর্দায় নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, ইজ্জতের হেফাজত হয় এবং যৌন নির্যাতন থেকে রক্ষা হয়। ইসলাম শর্টকার্ট পোশাক পরিধানের অনুমতি দেয়নি, শালীন পোশাক পরিধানের নির্দেশ দিয়েছে। ইসলাম নারীকে মাথায় এবং বুকে কাপড় দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এটাকে হিজাব বলে। বিভিন্ন দেশের ধর্মপ্রাণ নারীরা পর্দার অংশ হিসাবে বিভিন্ন ধরনের কাপড় মাথা এবং বুকে ঝুলিয়ে দেয়। ইসলাম কী ধরনের কাপড় দিয়ে হিজাব পরিধান করবে তা নির্দিষ্ট করেনি এবং এক্ষেত্রে কোন বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেয়নি। এটা যে কোন ধরনের এবং যে কোন রঙের কাপড় হতে পারে। ইসলাম এক্ষেত্রে নারীকে পছন্দ মত কাপড় দিয়ে হিজাব পরিধানের অধিকার দিয়েছে। একেবারে ছোট্ট মেয়েদের বেলায় হিজাব পরিধান বাধ্যতামূলক নয়। এটা ইসলামের সার্বজনীন সৌন্দর্যের অংশ ।

পর্দা এবং হিজাব নিয়ে ইসলামের নির্দেশনা : আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন—হে বনি আদম ! তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকিবার ও বেশভুষার জন্য আমি তোমাদেরকে পরিচ্ছদ দিয়াছি এবং তাকওয়ার পরিচ্ছদ, ইহাই সর্বোৎকৃষ্ট। ইহা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম, যাহাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর (আরাফ-২৬)। তোমরা প্রাচীন যুগের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করিয়া বেড়াইবে না (আল আহযাব-৩৩)। হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে এবং মুমিনদের নারীদেরকে বল, তাহারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টানিয়ে দেয় । উহাতে তাহাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাহাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু (আহযাব : ৫৯)। মুমিনদেরকে বল, তাহারা যেন তাহাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাহাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে; ইহাই তাহাদের জন্য উত্তম। উহারা যাহা করে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত (নুর-৩০)। আর মুমিন নারীদেরকে বল, তাহারা যেন তাহাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাহাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে; তাহারা যেন যাহা সাধারণত প্রকাশ থাকে তাহা ব্যতীত তাহাদের আভরণ প্রদর্শন না করে,তাহাদের গ্রীবা এবং বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে, তাহারা যেন তাহাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতা¯পুত্র, ভগ্নিপুত্র, আপন নারীগণ, তাহাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন কামনা রহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত কাহারও নিকট তাহাদের গোপন আভরণ প্রকাশ না করে, তাহারা যেন তাহাদের গোপন আভরণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তণ কর, যাহাতে তোমরা সফলকাম হইতে পার (নুর-৩১)। হযরত মুহাম্মদ (স.) বলেছেন : যে ব্যক্তি কোন অপরিচিত নারীর প্রতি যৌন লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, কিয়ামতের দিন তার চোখে উত্তপ্ত গলিত লোহা ঢেলে দেয়া হবে (ফাতহুল কাদির)।

পর্দা করতে ইসলামের নির্দেশনার কারণ : আল্লাহ মানুষকে পুরুষ এবং নারী রূপে সৃষ্টি করেছেন। তাদের মধ্যে প্রেম, প্রীতি, ভালবাসা সৃষ্টি করেছেন। পুরুষ এবং নারী একে অপরের পরিপূরক, তাদের শারীরিক মিলনেই নতুন মানুষের জন্ম হয়। এভাবেই বংশবৃদ্ধির ধারা চলে আসছে। আল্লাহ কেবল বিয়ের মাধ্যমেই নারী পুরুষের যৌন সম্পর্ককে বৈধ করেছে। মানবকল্যাণ এবং শান্তিই এর মূল উদ্দেশ্য। নিয়ম মত ব্যবহারে যা ভাল ফলাফল দেয়, নিয়ম বহির্ভূত ব্যবহারে তা খারাপ ফলাফল দেয়। বিদ্যুতের সঠিক ব্যবহার মানুষের উপকার করে এবং ভুল ব্যবহার মৃত্যু ঘটায়। নিয়ম মানলে পুরুষ এবং নারীর সম্পর্ক শান্তি আনে এবং নিয়ম না মানলে অশান্তি সৃষ্টি করে। স্রষ্টা শান্তির স্বার্থেই নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা নিষিদ্ধ এবং নারীদের জন্য শালীন পোষাক ও হিজাবের প্রবর্তন করেছে। পুরুষকেও দৃষ্টিকে সংঘত এবং শালীন পোশাক পরার নির্দেশ দিয়েছে। পুরুষ ও নারীর স¤পর্কে ইসলামের বিধানসমূহ বিজ্ঞানসম্মত এবং কল্যাণকর। তাই ইসলামের অনুসারী নারীরা যৌন নিপীড়নের শিকার এবং পুরুষরা নারী নির্যাতনে লিপ্ত হয় না। নারী নির্যাতনের হার মুসলিম সমাজেই সবচেয়ে কম। যেখানে ধর্ম আছে সেখানে পারিবারিক কাঠামো বিদ্যমান। বিবাহ ছাড়া পুরুষ-নারীর মাঝে বন্ধুত্বের স¤পর্ক হতে পারে না। কারণ এখানে পার¯পরিক শারীরিক এবং মানসিক আকর্ষণ ও আবেদন রয়েছে।

পর্দা বা হিজাববিহীন সমাজের চিত্র : পশ্চিমা সমাজে পর্দা এবং হিজাব নাই। সেখানে নারীরা বেশি স্বাধীন , লিভ টুগেদার এবং পুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশা করে। অথচ সেখানেই নারীরা বেশি নির্যাতিত, দা¤পত্য জীবন ক্ষনস্থায়ী এবং ডির্ভোসের হার বেশি। সিএনএনের খবরে বলা হয়-২৯ শতাংশ আমেরিকান পুরুষ জীবনে ১৫ জন বা ততোধিক নারীর সংগে যৌন সম্পর্ক করেছেন। ৯ শতাংশ নারী জীবনে ১৫ বা ততোধিক পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করেছে। ১৫ বছর বয়সের আগে যৌনতার স্বাদ পাওয়াদের সংখ্যা ১৬ শতাংশ। মাত্র ২৫ শতাংশ নারী এবং ১৭ শতাংশ পুরুষ বলেছে-তাদের ১ জনের বেশি জীবন সঙ্গী নেই। ২৬ শতাংশ পুরুষ এবং ১৭ শতাংশ নারী কোকেনও অন্যান্য মাদক গ্রহণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর হেলথ স্ট্যাটিস্টিকস ১৯৯৯ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত ২০ থেকে ৫৯ বছর বয়স্ক ৬২৩৭ জন নর-নারীর ওপর জরীপ চালিয়ে এ রেজাল্ট পায় (২৫/০৬/০৭ আমার দেশ)। ব্রিটেনের অফিস ফর ন্যাশনাল স্টাটিস্টিকস পরিচালিত গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৩১ সাল নাগাদ ব্রিটেনে বৈধ মা বাবার সংখ্যা ব্যাপক হারে কমে যাবে। রিপোর্টে বলা হয় এক দশকে অবৈধ জুটির সংখ্যা ৬৫ ভাগ বেড়ে ২.৩ মিলিয়ন হয়েছে । লন্ডনে সিঙ্গেল মাদার পরিবার ২২ভাগ, যা ব্রিটেনের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি। লন্ডনে ল্যামবেথের পরিমাণ ৪৮ ভাগ। ইসলিংটনেও টিনএজ প্রেগন্যান্সির হার সর্বোচ্চ। ম্যানচেস্টারে ৪৬.৮, গালাসগোতে ৬.৪, লিভারপুলে ৪৪.৮, সাউথওয়ার্কে ৪৫.৭ এবং বেলফোস্টে ৪২.৪ ভাগ(০৬/০১/০৮ যায় যায় দিন)। সিবিএস নিউজ জানিয়েছে শিকাগো শহরের ‘পল রবিসন হাইস্কুলের’ ৮০০ ছাত্রীর ১১৫ জনই ‘কিশোরী মা’ হয়েছে। স্কুলটির প্রতি সাতজন ছাত্রীর একজন কিশোরী মা। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হয়তো আরো অনেক ছাত্রী নিজেদের ভেতর সন্তান বয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সেগুলো শনাক্ত হবার আগ পর্যন্ত আমরা সঠিক সংখ্যা বলতে পারছি না (২৩.১০.০৯ ইত্তেফাক)। সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রে অবিবাহিত মায়ের সংখ্যা বেড়ে গেছে। ২০০৭ সাল থেকে জন্ম নেয়া ১০ টি শিশুর মধ্যে ৪ টিই অবিবাহিত মায়েরা জন্ম দিয়েছে (১০.০৫.০৯ ইত্তেফাক)। অথচ আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন-আর যিনার নিকটবর্তী হইও না, ইহা অশলীল ও নিকৃষ্ট আচরণ (বনি ইসরাইল-৩২)।

হিজাব বিরোধীতার যৌক্তিক কোনো কারণ নাই : হিজাব বিরোধীরা না বুঝেই হিজাবের বিরোধীতা করছে। পৃথিবীর কয়েক কোটি মুসলিম নারী হিজাব পরিধান করে, এরা উচ্চ শিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত। দিন দিন এই সংখ্যা বাড়ছে। হিজাব পরিধান করে নারীরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, বিচারক, আইনজীবী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা, রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী, ব্যবসায়ী, ক্রীড়াবিদ-সবই হয়েছে। সবাই কর্মক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে এবং দিচ্ছে। হিজাব পরিধান করেই ইলহাম ওমর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য হয়েছেন, ইয়েমেনের তাওয়াক্কুল কারমান শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন এবং হালিমা ইয়াকুব সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রুমানা আহমদ হিজাব পরিধান করেই হোয়াইট হাউজে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ নাগরিক নাদিয়া জমির হোসাইন হিজাব পরিধান করেই বিবিসির জনপ্রিয়” দ্য গ্রেট ব্রিটিশ বেক অফ” প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন ,বিজয়ী হয়েছেন। ২০১৬ সালের ২১ এপ্রিল ব্রিটিশ রানী এলিজাবেথের ৯০ তম জন্মদিনের কেকটি নাদিয়াই বানিয়েছেন। হিজাব কখনোই এদের কর্মক্ষেত্রে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি বরং সব সময় সহযোগিতা করেছে। হিজাবধারিদের দ্বারা সমাজে এবং কর্মক্ষেত্রে কারো কোন ক্ষতিও হয়নি। হিজাবধারী নারীদের জীবন কোনভাবেই পশ্চাদপদ নয়। এরা সময়ের সাথে আধুনিক, মার্জিত, পবিত্র এবং শান্তির জীবন যাপন করে। এদের সংসার অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী, দা¤পত্য জীবন অনেক বেশি সুখী। খ্রিষ্ট ধর্মের প্রধান ব্যক্তি হযরত ঈসা (আ.)-এর মা বিবি মরিয়মও হিজাব পরিধান করেছেন। শান্তিতে নোবেল জয়ী মাদার তেরেসা ও হিজাব পরিধান করেছেন। সুতরাং হিজাব বিরোধীতা করতে গিয়ে ইসলামের বিরোধীতা নয়। মূলতপক্ষে ধার্মিকরা হিজাবের পক্ষে এবং ধর্ম বিরোধীরা হিজাবের বিপক্ষে কথা বলে ।

হিজাবের বিশ্বজয় খুব বেশি দূরে নয় : বিশ্বজুড়ে হিজাব আজ আলোচিত বিষয়। হিজাবের বিরোধীতা যত বাড়ছে, হিজাবের প্রতি নারীদের আগ্রহ ও তত বাড়ছে। হিজাব পরিধানে নারীদের উৎসাহিত করতে ২০১৩ সাল থেকে প্রতি বছরের ১ লা ফেব্রুয়ারি বিশ্বজুড়ে বিশ্ব হিজাব দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নাজমা খান দিবসটির সুচনা করেন। সুন্দর, আত্ববিশ্বাসী এবং ক্ষমতায়ন-দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয়। বাস্তবেও তাই। হিজাব নারীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, নারীদেরকে আত্ববিশ্বাসী এবং ক্ষমতায়ন করে। প্রকৃতপক্ষে হিজাব হচ্ছে নৈতিকতা, আধুনিকতা এবং আভিজাত্যের প্রতীক। তাই হিজাব পরিধানে দিন দিন নারীরা উৎসাহিত হচ্ছে। এখন অন্য ধর্মের অনেক নারীও হিজাব পরিধান করছে। তারা এর মাঝে শান্তি, পবিত্রতা এবং নিরাপত্তা খুজে পাচ্ছে। হিজাব পরিধানে নারী নির্যাতন কমবে এবং নারীর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। সুতরাং হিজাবের বিরোধীতা না করে হিজাবের পক্ষে কাজ করুন।

লেখক : প্রকৌশলী ও নির্বাহী পরিচালক, মুভমেন্ট ফর হিজাব।