‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না’- ভূপেন হাজারিকার এ অমর পঙক্তি আমাদের সমাজে বহুল পরিচিত। অথচ আমরা অনেকেই ছিন্নমূল মানুষের দুঃখ-কষ্টগুলো বুঝি না; বরং না বুঝেই তাদের দেখলে নাক ছিটকাই। অথচ সমাজের অসহায়, দরিদ্র, দুঃস্থ পথশিশুরাও আমাদের মতোই মানুষ। আমাদের শরীর কাটা পড়লে যেমন লাল রক্ত বের হয়, তাদের শরীর থেকেও ঠিক তেমনই লাল রক্ত বের হয়। পার্থক্য কোনো মানবিকতায় নয়, পার্থক্য শুধু সামাজিক অবস্থানে। আমরা প্রচণ্ড শীতে ঘরের ভেতরে হিটার চালিয়ে উষ্ণতা খুঁজি, আর তারা কনকনে শীতে রাস্তায় রাত কাটায়। আমরা শীত নিবারণের জন্য দামি স্যুট পরি, আর তারা জীর্ণ-শীর্ণ, ময়লা-ছেঁড়া পোশাকেই কোনোমতে শীত পার করে। আমাদের বাসাবাড়ি ঠিকানা আছে, ওদের নেই কোনো স্থায়ী ঠিকানা। ফুটপাত, রেলস্টেশন, পার্ক কিংবা রাস্তার ধারের খোলা আকাশই তাদের শেষ ভরসার আশ্রয় স্থল। দারিদ্র্য, পরিচয়হীনতা আর নিরাপত্তাহীনতাই তাদের জীবনের নিয়তি। এ মানুষগুলো জীবনের তাগিদে কখনো দিনমজুর, কখনো ভাঙারি সংগ্রহকারী, কখনো ভিক্ষাবৃত্তি করে টিকে থাকে। দারিদ্র্য আর বঞ্চনা তাদের জীবনকে সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে তারা মানুষ হয়েও ‘‘ছিন্নমূল” উপাধিতে ভূষিত হয়। অথচ ওরাও আমাদের মতোই মানুষ। তাঁরা কেউ পরিবার হারিয়ে, কেউ নদীভাঙনে ঘরহারা হয়ে, কেউ অভাবের তাড়নায়, কেউ সৎ মায়ের নিপীড়নের শিকার হয়ে ফুটপাতে, রেলস্টেশনে, মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে রাস্তায় আশ্রয় নেয়। খোলা আকাশের নিচে কনকনে শীতে কাঁপতে থাকা মানুষগুলো কি মানুষ নয়? নাকি তারা কেবল উন্নয়নের পথে ফেলে দেয়া ‘অপ্রয়োজনীয় সংখ্যা’ এ প্রশ্নটি বার বার উঁকি দেয়।

প্রতিটি মানুষের জন্ম হওয়ার সাথে সাথে তার নাগরিক অধিকার সংবিধান অনুসারে সৃষ্টি হয়। কিন্তু সবার ভাগ্যে নাগরিক অধিকার সমান হয় না-ছিন্নমূল মানুষ তার বড় প্রমাণ। হাড়কাঁপানো শীতে দেশ কাঁপছে। ৪৪ জেলায় মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। কয়েকটি জেলায় শীতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। নিম্নআয়ের মানুষ খড়কুটো জ¦ালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। শীতবস্ত্রের অভাবে ছিন্নমূল মানুষগুলো চরম কষ্টে দিনাতিপাত করছে। কিন্তু কেউ হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে না। সবাই নিজের সুখের সন্ধানে ছুটছে। অথচ তারা প্রচণ্ড এ শীতে কাঁপতে কাঁপতে রাতের প্রহর কখন শেষ হবে সে চিন্তায় বিষণ্ন মন নিয়ে একটু গরম কাপড় পাওয়ার প্রত্যাশা করছে। কিন্তু কাপড় কপালে জুটছে না, তবু তারা আন্দোলন করছে না। সব কিছু মেনে নিয়েই দিনের পর দিন, রাতের পর রাত রাস্তায় কাটিয়ে দিচ্ছে। রাষ্ট্রের নথিতে তারা কেবল সংখ্যা, মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি নেই, নেই নাগরিক অধিকার, আছে শুধু তুচ্ছ তাচ্ছিল্য আর ছিন্নমূলের তকমা। আকাশছোঁয়া উন্নয়নের রোলমডেল যখন বাংলাদেশ তখনও তাদের ঘর-বাড়ি হয় না। কারণ উন্নয়নের ছোঁয়া তাদের জীবনকে স্পর্শ করে না। ফলে লাল নীল রং বাতির নিচে ছিন্নমূল মানুষের কান্নার আওয়াজ কেউ শুনতে পায় না।

রাজধানী ঢাকায় বসবাসরত পথশিশুদের পলিথিনের মধ্যে নেশাদ্রব্য গ্রহণের দৃশ্য নিত্যদিনের ঘটনা। এরকম দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। চলার পথে আসাদ গেট এলাকায় এক পথশিশুকে জিজ্ঞেস করছিলাম- এটা কী? তুমি কেন খাচ্ছ? সে উত্তর দিয়ে বলছিল ভাই এটা ড্যান্ডি। এটা খেলে মনে সুখ পায়। দুঃখ, কষ্ট ভুলে যায়। এ শহরে আমি একা এগুলো খাই তা কিন্তু নয়; আরও বহু শিশু এ ড্যান্ডিতেই আসক্ত। ছিন্নমূল শিশুদের জীবনের গল্প শুনলে গা শিউরে ওঠার মতো। সকাল বেলায় অফিসে আসার সময় সংসদ ভবনের পাশে সংসদ সদস্যদের বাসভবন এর সামনের ফুটপাতে অসংখ্য ছিন্নমূল মানুষ ঘুমানোর দৃশ্য দেখা যায়। দেখা যায় সাত-আট বছরের ছেলে-মেয়ে কাগজে ঢাকা শরীর নিয়ে ঘুমাচ্ছে। তাদের অভিভাবকরা রাতজাগা শ্রমিক, কখনো ভিক্ষুক, কখনো ফেরিওয়ালা, কখনো দিনমজুর, কখনো রিকশাচালক, কখনো ভাঙারি সংগ্রহকারী বা ভিক্ষার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। আবার তাদের ছিন্নমূল শিশুরা কখনো প্লাস্টিকের জিনিসপত্র সংগ্রহ, কখনো ফুল বিক্রি, কখনো হকারি, কখনো গাড়ির কাচ মুছার কাজ করে পরিবারকে সহযোগিতা করছে। যে সময়ে ওদের স্কুলে যাওয়ার কথা, সে সময় তারা রাস্তায় হকারির কাজ করে। এসব পথশিশু সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে না দিলে দিনকয়েক-এর ব্যবধানে তারাও হয়ত রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং জরুরিভিত্তিতে এসব ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে শান্তির সুবাতাস আসেনি। ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে গত দেড় দশক ধরে মানুষ লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, অপমানিত, অত্যাচারিত, নিষ্পেষিত হয়েছিল। এখনও সে ধারা বইছে। মানুষ সুখের দেখা পায়নি। সংবিধান অনুযায়ী মানুষের মৌলিক চাহিদা ও অধিকার নিশ্চিত হয়নি। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেছে। সরকার বদলেছে, শাসক বদলেছে, স্লোগান বদলেছে। বদলায়নি ছিন্নমূল মানুষের ভাগ্য। অবকাঠামোগত উন্নয়ন বেশুমার। বিশেষ করে রাস্তার, সেতুর, মেট্রোরেলের। কিন্তু সে উন্নয়নের পিলারের নিচেই রাত কাটায় শত শত গৃহহীন ছিন্নমূল মানুষ। উন্নয়ন যদি মানুষকে বাদ দিয়ে হয়, তবে সে উন্নয়ন কিসের? এত উন্নয়ন তবু কেন ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা বাড়ছে? সে বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী দেশে ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার বলা হলেও বেসরকারি সংস্থাগুলোর ভাষ্যমতে এ সংখ্যা কয়েক লাখ। ইউনিসেফ ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের গবেষণা অনুযায়ী দেশে ৩৪ লাখের বেশি শিশু বাবা-মা ছাড়া একা রাস্তায় বসবাস করছে। আরেক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে সারাদেশে শুধু পথশিশুর সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ লাখ। তারা ন্যূনতম নাগরিক অধিকারটুকু পায় না। চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে। এসব ছিন্নমূল মানুষকে মূলধারায় নিয়ে আসতে না পারলে টেকসই উন্নয়ন আলোর মুখ দেখবে না।

ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার শুধু রাষ্ট্রের বাহিনীকে নিয়ে মত্ত ছিল। কারণ তাদের আকাক্সক্ষা পূরণ করতে না পারলে ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব ছিল না। সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস আমেরিকায় জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ভাষণে বাংলাদেশের ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গঠন ও মানুষের মৌলিক অধিকারের কথা বলেছেন, যা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে যেখানে হাজারো মানুষ রাস্তায় মানবেতর জীবনযাপন করে, সেখানে তাদেরকে বাদ দিয়ে কীভাবে বাংলাদেশে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে তা বোধগম্য নয়।

মেট্রোরেল উন্নয়নের প্রতীক। অথচ বাতির নিচে অন্ধকার। মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে, পিলারের পাশে, সড়কদ্বীপের রেলিংয়ের ভেতর ও পাশের ফুটপাতে আশ্রয় নিয়েছে শত শত গৃহহীন ছিন্নমূল মানুষ। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে চোখ ভুলালেই পলিথিনের মোড়ানো ঝুপড়ি ঘর দেখা যায়। রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন, মালিবাগ আনসার ক্যাম্প, মহাখালী, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, মতিঝিল, কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা ও বেড়িবাঁধসহ সর্বত্রই ঠিকানাবিহীন এসব মানুষের ঘর দেখা যায়। এসব ঘরের বাসিন্দারা স্বাধীন দেশে বসবাস করলেও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। কখন যে ট্রাক, বাস কিংবা রেল জীবন কেড়ে নেয় তার গ্যারান্টি নেই। ঢাকায় যখন রাত গভীর হয়, মানুষের কোলাহল থেমে আসে, তখন ছিন্নমূল মানুষের ঠিকানা হয়ে ওঠে ফুটপাত, গাছতলা কিংবা মেট্রোরেলের নিচের অন্ধকার আশ্রয়। তাদের ঘুম, জাগরণ আর প্রাত্যহিক প্রাকৃতিক প্রয়োজন-সবই সেরে নিতে হয় এই মহানগরের ফাঁকা জায়গাগুলোতে। অবাধে গড়িয়ে পড়া প্রস্রাবের পানি ভিজিয়ে দেয় পথঘাট, ছড়িয়ে পড়ে তীব্র দুর্গন্ধ। এতে স্বাভাবিক চলাচল হয়ে ওঠে দুরূহ। পরিণামে তিলোত্তমা এই নগরী ধীর ধীরে জনস্বাস্থ্যের এক ভয়াবহ হুমকিতে পরিণত হচ্ছে।

রাজধানী ঢাকায় ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর পেছনে রয়েছে বহু বছরের অবহেলা, বঞ্চনা আর রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা। এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা তিন-চার দশক ধরে ফুটপাতকেই ঘর ভেবে বেঁচে আছেন। ফুটপাতেই তাদের বিয়ে, ফুটপাতেই সংসার গড়া, ফুটপাতেই সন্তান জন্ম-জীবনের সব অধ্যায় লেখা হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। অথচ আজও তাদের জন্য নেই কোনো স্থায়ী আবাসনের নিশ্চয়তা। দুঃখজনক হলেও সত্য রাষ্ট্রর পক্ষ থেকে এ নির্মম বাস্তবতা বদলাতে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। একদিকে ঢাকার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ওঠে একের পর এক অট্টালিকা, অন্যদিকে সে শহরেই ছিন্নমূল মানুষের কপালে জোটে না ন্যূনতম আশ্রয়ের ছায়া। উন্নয়নের আলো যত উজ্জ্বল হয়, মানবিকতার অন্ধকার যেন তত গভীর হয়। ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসন এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি।

রাজধানীসহ দেশের সব বিভাগীয় শহরে তাদের জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে, যেন কোনো মানুষকে আর রাত কাটাতে না হয় ফুটপাতে। তাদেরকে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন আন্তরিক ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ। বিশেষ করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, সবার জন্য শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা, চিকিৎসাসেবাকে নাগালের মধ্যে আনা, কিশোরদের গ্যাং ও মাদক থেকে রক্ষার স্বার্থে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান এবং নাগরিক ও সামাজিক অধিকার সুরক্ষা করা প্রয়োজন। তারা আমাদের করুণার পাত্র নয়, ন্যায্য অধিকার চায়; দান নয়, সম্মান চায়, অবহেলা নয়, অন্তর্ভুক্তি চায়। তারা সমাজের বোঝা নয়, তারাও রাষ্ট্রের নাগরিক, দেশের সম্পদ। সুতরাং মানবিক সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ছিন্নমূল মানুষের আর্তনাদ বন্ধ করা প্রয়োজন।

লেখক : প্রাবন্ধিক।