জসিম উদ্দিন মনছুরি

বহুল কাক্সিক্ষত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথে গণভোটেরও আয়োজন করা হয়। গণভোটের লক্ষ্য ছিল যদি হ্যাঁ জয়যুক্ত হয় তাহলে রাজনৈতিক দলগুসমূহ যেই বিষয়ে ঐক্যমত্য হয়েছিলো সেসব বিষয়ে সংস্কার ও সংবিধান পরিবর্তন করা হবে। সংস্কার কমিশনে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে আলাপ-আলোচনার পর জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ জারি করে। এর উপর চারটি বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে হ্যাঁ ভোট। যদিও হ্যাঁ ভোটের জন্য জোর প্রচারণা চালিয়েছেন ১১ দলীয় জোট ও বর্তমান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। বিএনপি গণভোটের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থার না নিলেও অবশেষে বিএনপি’র চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গণভোটের পক্ষে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার জন্য জনগণকে বলেছিলেন। গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হওয়ায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলো দেশের জনগণ। গণভোটে যেহেতু হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে সুতরাং চিরাচরিত প্রথাগত রীতিনীতি পরিবর্তন হয়ে সংবিধান সংস্কার হবে। পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগিয়ে যাবে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হওয়ার পরেও শপথ গ্রহণের দিন হঠাৎ করে বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণে বিরত থাকেন। জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের ৭৭ সংসদ সদস্য দুইটি বিষয়ের সদস্য হিসেবে শপথ নেন। জুলাই পরবর্তী সকল দলের চাওয়া পাওয়া ছিল জুলাই সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কার হবে। পরিবর্তিত বাংলাদেশে যাতে সরকার অতীতের মত স্বৈরাচারী হয়ে ওঠতে না পারে। এই বিষয়ে জনগণের গভীর আগ্রহ ও আকাক্সক্ষা ছিল। বিএনপি গণভোট থেকে সরে আসায় সংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ । বিএনপি’র দাবি গণভোট সাংবিধানে স্বীকৃত নয়। প্রশ্ন উঠেছে তাহলে সাংবিধানিকভাবে তারা যে শপথ গ্রহণ করেছেন তা কি বৈধ? সাংবিধানিকভাবে এখনো নির্বাচন হওয়ার কথা ২০২৯ সালে। যদি সংবিধানকে মেনে নিয়ে শপথ বাক্য পাঠ করা হয় তাহলে সে শপথ কি বৈধ? এই নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলের ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। দেশের জনগণ আশা করেছিল যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন গণভোটের বা সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে তারা সংবিধানে ব্যাপক পরিবর্তন এবং আগামীর বাংলাদেশ যাতে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের মত নতুন সরকার স্বৈরাচারী হয়ে না ওঠে। এই আশা নিয়ে জনগণ ব্যাপক আগ্রহে অপেক্ষা করেছিল। কিন্তু বিএনপি সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ না করে জনগণের আশায় জলাঞ্জলি দিয়েছে। অবশ্যই তারা সরকার গঠন করছে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। যদিও শপথ গ্রহণের সময়সীমা এখনো পার হয়ে যায়নি।

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) সূত্রে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ এবং এর প্রস্তাবনাগুলোর পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০টি। অন্যদিকে, সংবিধান সংস্কারের বিপক্ষে অর্থাৎ ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬টি। ইসি সূত্রে আরো জানা যায়, গণভোটে মোট বৈধ ভোটের সংখ্যা ৭ কোটি ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৬টি। বাতিল হয়েছে ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭টি ভোট। সব মিলিয়ে মোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩টি, যা মোট ভোটের ৬০ দশমিক ৮৪ শতাংশ। গণভোটে চারটি প্রশ্নে হ্যাঁ ,না ভোটের আয়োজন করা হয়েছিল।

ক. নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।

খ. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।

গ. সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।

ঘ. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বিএনপি’র এমপিরা শপথ না করায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে।সংবিধানে এই পরিষদের শপথ নেওয়ার বিধান নেই উল্লেখ করে বিএনপি দলীয় সদস্যরা এমপি হিসেবে শপথ নিলেও প্রস্তাবিত এই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সাথে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবেও কাজ করবেন। ৬০ সদস্যের কোরাম হলেই এই পরিষদ কাজ করতে পারে।ওদিকে বিএনপি সংবিধান সংস্কার আদেশের সদস্য হিসেবে শপথ না নিলেও জামায়াত-এনসিপির ৭৭ জন নির্বাচিত সদস্য একই সাথে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন।জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, বিএনপি দুটি শপথ না নিলে সংসদে যাওয়াই তো অর্থহীন।সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণভোটের রায়ের কারণে যদি জুলাই আদেশ বাস্তবায়নযোগ্যই হয়ে যায়, তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজনীয়তাই থাকে না। আবার অন্যদিকে যেসব সদস্যরা শপথ নিয়েছেন তারা নিজেরাই জুলাই আদেশ অনুযায়ী নিজেরাই সংবিধান বানিয়ে ফেলতে পারেন।

এর মাঝেই বিএনপি সরকার গঠনের পর দলীয়করণের লক্ষ্যেই দলীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে ছয়টি সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ করেছেন। এতে দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে তাহলে কি বিএনপি সরকার ঠিক আগের মতই দলীয়করণ, স্বেচ্ছাচারিতা ও নিজেদের সুবিধার্থে সংবিধান সংস্কার করা থেকে বিরত থাকবেন?গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ৬ জন প্রশাসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। যেসব সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর,খুলনা সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, সিলেট সিটি কর্পোরেশন এবং গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন।স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ এর ধারা ২৫ক এর উপধারা (১) অনুযায়ী করপোরেশন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত বা এদের সিটি করপোরেশনগুলোতে পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে।প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, নিয়োগ করা প্রশাসকরা ‘স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ এর ধারা ২৫ক এর উপ-ধারা (৩) অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের মেয়রের ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন। তারা বিধি মোতাবেক ভাতা পাবেন।

এর মাঝে সরকারের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এডভোকেট তাজু ইসলামের নিয়োগ বাতিল করা হয়।আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় ২৩ ফেব্রুয়ারি এই নিয়োগ বাতিলের আদেশ দেন। তাঁর পরিবর্তে নতুন চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অ্যাডভোকেট মো. আমিনুল ইসলাম। ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বরে মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে অ্যাটর্নি জেনারেলের পদমর্যাদায় চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এছাড়া ৯ সচিবের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়।

এরই মাঝে ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদত্যাগপত্র হস্তান্তর করেন। ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক কারণ উল্লেখ করে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাবি ভিসি পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আপদকালীন পরিস্থিতি দূর হচ্ছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক অবস্থা এখন ভালো পর্যায়ে রয়েছে। আমি এখন দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে চাই।’ তিনি আরও উল্লেখ করেছিলেন যে, রাজনৈতিক সরকার যেন তাদের পছন্দমতো প্রশাসন সাজাতে পারে, সেজন্যই তিনি পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

দেশের জনগণ কখনো চাইবে না বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের মত বর্তমান সরকার নিজেদের মত করে প্রশাসনকে নিজেদের লোক দিয়ে সাজিয়ে নিবেন। জনগণ নতুন সরকারের কাছ কাছ থেকে আকাক্সক্ষা করে তারা যেন দলীয়করণের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ না করেন। দেশের জনগণের প্রত্যাশা জনগণের কল্যাণের জন্য সংস্কার ও সংবিধান পরিবর্তন করা একান্ত প্রয়োজন। তা না হলে বিএনপি সরকার জনগণের আস্থা হারাবে। উল্লেখ্য যে বিএনপি সমর্থিত জোট ২১২টি সংসদীয় আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী জোট ৭৭ টি আসল লাভ করে বিরোধীদলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। জনগণের প্রত্যাশা সরকার ও বিরোধীদল মিলেই রাষ্ট্র সংস্কার করবে এবং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।