॥ জাফর আহমাদ ॥
বিরানব্বই পার্সেন্ট মুসলিমের দেশে কুরআনের শাসন নাই, দেশের প্রখ্যাত ইসলামী স্কলার, আলেম ও ওলামাগণ ব্যক্তিগতভাবে ইসলাম পালনে অত্যন্ত মনোযোগী। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম পালন হোক, দেশের অর্থনীতি, আইন-কানুন, অফিস-আদালত ইসলাম অনুযায়ী চলুক তা তারা পছন্দ করে বটে কিন্তু তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য চেষ্টা-সাধনা করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন না। অথচ এগুলো প্রতিষ্ঠা করা সালাত ও সাওমের মতোই ফরয বিধান। যেমন: আল্লাহ তা’আলা বলেন,“তিনি তোমাদের জন্য দীনের সেই সেসব নিয়ম-কানুন নির্ধারিত করেছেন যার নির্দেশ তিনি নুহকে দিয়েছিলেন, এবং যা এখন আমি তোমার কাছে ওহীর মাধ্যমে পাঠিয়েছি। আর যার আদেশ দিয়েছিলাম আমি ইবরাহিম, মুসা ও ঈসাকে। তার সাথে তাগিদ করেছিলাম এই বলে যে, এ দীনকে কায়েম করো এবং এ ব্যাপারে পরম্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” (সুরা শুরা : ১৩)
এ আয়াতের মাধ্যমে একটি কথা অত্যন্ত সুস্পষ্ট তা হলো, দীন কায়েমের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাজটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, শেষ নবী মুহাম্মাদ (সা:), হযরত নুহ (আ:), হযরত ইবরাহিম (আ:), মুসা (আ:) ও ঈসা (আ:) তা করেছেন। প্রথমে হযরত নুহ (আ:) এর নাম উল্লেখ করার কারণ হলো, মহাপ্লাবনের পর তিনিই ছিলেন বর্তমান মানব গোষ্ঠীর সর্বপ্রথম পয়গাম্বর। তারপর নবী (সা:) এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি শেষ নবী। তারপর হযরত ইবরাহিম (আ:) এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, আরবের লোকেরা যাঁকে নেতা বলে মানতো। সর্বশেষ হযরত মুসা এবং ঈসার কথা বলা হয়েছে যাদের সাথে ইহুদী ও খৃষ্টানরা তাদের ধর্মকে সম্পর্কিত করে থাকে। এর উদ্দেশ্য এ নয় যে, শুধু এই পাঁচজন নবীকেই উক্ত দীন কায়েমের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। বরং পৃথিবীতে যত নবীই এসেছেন সকলেই একই দীনের কাজ করেছেন। সর্বোপরি কথা হলো, দীন প্রতিষ্ঠার কাজটি কোন ঐচ্ছিক কাজ নয় বরং এটি প্রত্যেকের জন্য বাধ্যতামূলক কাজ ছিল, আছে এবং থাকবে।
যেহেতু দীন প্রতিষ্ঠা করা ফরয, সেহেতু সর্বপ্রথম দীন সম্পর্কে আমাদেরকে বিস্তারিত জানতে হবে। আয়াতে বলা হয়েছে যে, ‘শারা’আ লাকুম মিনাদ দীনা’ অর্থাৎ “তোমাদের জন্য নির্ধারিত করেছেন।” এখানে শারা’আ শব্দের আভিধানিক অর্থ রাস্তা তৈরি করা এবং পাভিাষিক অর্থ পদ্ধতি, বিধি ও নিয়ম-কানুন রচনা করা। আল্লাহই বিশ^ জাহানের সব কিছুর মালিক, তিনিই মানুষের প্রকৃত অভিভাবক এবং মানুষের মধ্যে যে বিষয়েই মতভেদ হোক না কেন তার ফয়সালা করা তাঁরই কাজ। কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের মৌলিক সত্য বর্ণিত হয়েছে যে, স্বাভাবিকভাবেই তিনিই শাসক, তাই মানুষের জন্য আইন ও বিধি-বিধান রচনার এবং মানুষকে এই আইন ও বিধি দেয়ার অনিবার্য অধিকার তাঁরই। আর এভাবে তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। দীন হলো আনুগত্যের বিধান।
দীন মানে কারো নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে তার আদেশ-নিষেধের আনুগত্য করা। দীন মানে জীবন বিধান বা জীবনাচার, পন্থা, পদ্ধতি যা অনুসরণীয় বা অনুসরণযোগ্য। বান্দার জন্য তার মালিকের আইন অবশ্য অনুসরণীয়, যার অনুসরণ না করা বিদ্রোহের শামিল। যে ব্যক্তি তা অনুসরণ করে না সে প্রকৃতপক্ষে তার মালিকের আধিপত্য, সার্বভৌমত্ব, আনুগত্য এবং দাসত্ব অস্বীকার করে।
উল্লেখিত আয়াতে দীনের এই বৈশিষ্ট্য মন্ডিত এ আইনই সেই আইন যার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল নুহ, ইবরাহিম ও মুসা (আ:)কে এবং এখন মুহাম্মদ (সা:)কে সে নিদের্শই দান করা হয়েছে। এ বাণী থেকে কয়েকটি বিষয় প্রতিভাত হয়। এক, আল্লাহ এ বিধানকে সরাসরি সব মানুষের কাছে পাঠাননি, বরং মাঝে মধ্যে যখনই তিনি প্রয়োজন মনে করেছেন এক ব্যক্তিকে তাঁর রাসুল মনোনীত করে এ বিধান তার কাছে সোপর্দ করেছেন। দুই, প্রথম থেকেই এ বিধান এক ও অভিন্ন। এমন নয় যে, কোন জাতির জন্য কোন একটি দীন নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং অন্য সময় অপর এক জাতির জন্য তা থেকে ভিন্ন ও বিপরীত কোন দীন পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আল্লাহর পক্ষ থেকে একাধিক দীন আসেনি। বরং যখনই এসেছে এই একটি মাত্র দীনই এসেছে। তিন, আল্লাহর আধিপত্য ও সার্বভৌমত্ব মানার সাথে সাথে যাদের মাধ্যমে এ বিধান পাঠানো হয়েছে তাদের রিসালাত মানা এবং যে অহীর দ্বারা এ বিধান বর্ণনা করা হয়েছে তা মেনে নেয়া এ দীনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। জ্ঞান-বুদ্ধি ও যুক্তির দাবিও তাই। কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত তা আল্লাহর তরফ থেকে বিশ^াসযোগ্য হওয়া সম্পর্কে ব্যক্তি নিশ্চিত না হবে ততক্ষণ সে এই আনুগত্য করতেই পারে না।
আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “তার সাথে তাগিদ করেছিলাম এই বলে যে, এ দীনকে কায়েম করো এবং এ ব্যাপারে পরম্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলবী এ আয়াতের অনুবাদ করেছেন “দীনকে কায়েম করো” আর শাহ রফিউদ্দীন ও শাহ আবদুল কাদের অনুবাদ করেছেন, “দীনকে কায়েম রাখো” এই দু’টি অনুবাদই সঠিক। আরবী ইকামাত শব্দের অর্থ কায়েম করা ও কায়েম রাখা উভয়ই। নবী-রাসুলগণ (আ:) এ দু’টি কাজ করতেই আদিষ্ট ছিলেন। তাঁদের প্রথম দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল, যেখানে এই দীন কায়েম নেই সেখানে তা কায়েম করা। আর দ্বিতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল যেখানে তা কায়েম হবে কিংবা পূর্ব থেকেইই কায়েম আছে সেখানে তা কায়েম রাখা। এ কথা সুস্পষ্ট যে, কায়েম করা এবং তা ধরে রাখার জন্য ক্রমাগত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ কায়েম করে অবসর গ্রহণ করার কোন সুযোগ নেই।
কায়েম করার কথাটি যখন কোন বস্তুগত বা দেহধারী জিনিসের জন্য ব্যবহৃত হয় তখন তার অর্থ হয় উপবিষ্টকে উঠানো। যেমন কোন বস্তুকে উঠানো। কিংবা পড়ে থাকা জিনিসকে উঠিয়ে দাঁড় করানো। যেমন বাঁশ বা কোন থাম তুলে দাঁড় করানো অথবা কোন জিনিসের বিক্ষিপ্ত অংশগুলোকে একত্র করে সমুন্নত করা। যেমন কোন খালি জায়গায় বিল্ডিং নির্মাণ করা। অবস্তুগত জিনিস তার জন্য যখন কায়েম করা শব্দ ব্যবহার করা হয় তখন তার অর্থ হয় আহ্বান, কার্যে পরিণত করা, প্রচলন ঘটানো এবং কার্যত চালু করা। এই ব্যাখ্যার পর এ কথা বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয় যে, নবী-রাসুল (আ:) যখন এই দীন কায়েম করার ও রাখার যে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, তার অর্থ শুধু এতটুকুই ছিল না যে, তাঁরা নিজেরাই কেবল এ দীনের বিধান মেনে চলবেন এবং অন্যদের কাছে তার তাবলীগ বা প্রচার করবেন, যাতে মানুষ তার সত্যতা মেনে নেয়। বরং তার অর্থ এটিও যে মানুষ যখন তা মেনে নেবে তখন আরো অগ্রসর হয়ে তাদের মাঝে পুরো দীনের প্রচলন ঘটাবেন, যাতে সেই অনুসারে কাজ আরম্ভ হতে এবং চলতে থাকে।
এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে দাওয়াত ও তাবলীগ এ কাজের অতি আবশ্যিক প্রাথমিক স্তর। এই স্তর ছাড়া দ্বিতীয় স্তরে আসতেই পারে না। কিন্তু প্রত্যেক বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিই বুঝতে পারবেন এই নির্দেশের মধ্যে দীনের দাওয়াত ও তাবলিগকে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বানানো হয়নি, দীনকে কায়েম করা ও কায়েম রাখাকে উদ্দেশ্য বানানো হয়েছে। দাওয়াত ও তাবলীগ অবশ্যই এ উদ্দেশ্য সাধনের মাধ্যম, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নয়। নবী রাসুলদের (আ:) মিশনের একমাত্র উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল দীনের বাস্তবায়ন। রাসুলুল্লাহ (সা:) এর ২৩ বছরের রিসালাত যুগ ছিল দীন কায়েমের যুগ। এই জন্য তিনি তাবলীগ ও তলোয়ার উভয়টির সাহায্য গ্রহণ করেছেন এবং সারা আরবে তিনি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়ন করেছেন। যা আকীদা-বিশ^াস, ইবাদাত থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত কর্মকান্ডে, সামাজিক চরিত্র, সভ্যতা ও সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতি, রাজনীতি ও ন্যায় বিচার এবং যুদ্ধ ও সন্ধিসহ জীবনের সমস্ত দিক ও বিভাগে পরিব্যপ্ত ছিল।
দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পর পরই আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “এ বিষয়ে বিভেদ সৃষ্টি করো না।” কিংবা “তাতে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ো না।” দুনিয়ার স্বার্থে তথা নেতৃত্ব, পদপদবী ও সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতিকে কেন্দ্র করে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা পক্ষান্তরে কুফুরীকে সাহায্য করার শামিল। এ কথাটি সুরা আলে ইমরান : ১০৩ নং আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রুজ্জু মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” উপড়ে উল্লেখিত সুরা শুরার ১৩নং আয়াতের শেষের দিকে আল্লাহ তা’আলা আরো মারাত্বকভাবে উল্লেখ করেছেন যে, “আল্লাহ যাকে ইচ্ছা আপন করে নেন এবং তিনি তাদেরকেই নিজের কাছে আসার পথ দেখান যারা তাঁর প্রতি রুজু হয়।” মহান আল্লাহ দীন কায়েমের নির্দেশ দেয়ার পর এ কথাটি বলেন। যারা দীন কায়েমের প্রশ্নে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তারা দীনের সুস্পষ্ট রাজপথ থেকে সিটকে পড়ে। এরা নির্বোধ তাই নিয়ামতকে মূল্য দেয়ার পরিবর্তে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে। তাই আল্লাহ তাদেরকে দীনের জন্য বাছাই করেন না। -এরা মূলত দুর্ভাগা।
লেখক : ব্যাংকার।