জসিম উদ্দিন মনছুরি

বহুল কাক্সিক্ষত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দুইটি ব্যালেটে সকাল সাড়ে সাতটা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর পর সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার নির্বাচনে জনগণ ব্যাপক উৎসাহে ভোটযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে প্রায় লক্ষাধিক সেনাবাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। সকাল থেকে সেনাবাহিনী, বিজেবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। বড় ধরনের কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ৫৯.৪৪ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়। ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে বিএনপি জোট ও জামায়াত জোটের মধ্যে লড়াইয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেছে বিএনপি সমর্থিত জোট ২১০টি আসন এবং জামাত সমর্থিত জোট ৮১ টি আসনে জয়লাভ করে। নির্বাচনে কিছু অভিযোগ ছাড়া সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। জমায়াতে ইসলামী জোটের অভিযোগ কিছু কিছু কেন্দ্রে ভোট গণনার সময় ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর তথ্য পাওয়া গেছে। নির্বাচনে প্রায় ৫৩টি আসনে জমায়াত জোট ও বিএনপি জোটের ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র ৫ থেকে ১০ হাজার। নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী জোট ৪৩.৯% ভোট এবং বিএনপি জোট ৪৬.৬% ভোটে জয় লাভ করে। লক্ষ্য করলে দেখা যাচ্ছে যে, দুই জোটের ভোটের পার্থক্য মাত্র ২.৭%।

যেহেতু গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে সুতরাং সংসদ হবে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট। পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষে ভোটের পার্সেন্টেজ বিবেচনায় জামায়েত ইসলামী ৪৪ জন এবং বিএনপি ৪৬ জন এবং অন্যান্য ১০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারে। বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে জয়লাভ করায় ইতোমধ্যে তাদেরকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য দেশের কতিপয় রাষ্ট্রও তাদেরকে শুভেচ্ছা জানান। চ্যালেঞ্জের এই নির্বাচনে হ্যাঁ জয়যুক্ত হওয়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে। যদিও এই নির্বাচনে দেখা গেছে পরাজিত প্রার্থী ও বিজয়ী প্রার্থীদের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময়ের অভাবনীয় দৃশ্য। এরপরও নির্বাচনের পর সম্ভাব্য সরকারি দল বিএনপির নেতাকর্মীদের দ্বারা বিরোধী দলের উপর বেশ কিছু হামলার ঘটনা ঘটেছে যা কখনো কাম্য ছিলো না। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী এই নির্বাচন জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। জনগণের আশা ছিলো হানাহানি রেষারেষি এবং ত্রাসের রাজত্ব কায়েম না করে সরকারি দল ও বিরোধী দল মিলে রাজনৈতিক সৌহার্দ্যে জনগণের জন্য কাজ করবে। নির্বাচিতরা জনগণের আশা আকাক্সক্ষা পূরণ করে জনগণের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হবে। জুলাই সনদে যেহেতু হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে সেই দিক চিন্তা করলে দলীয় প্রধান ও সরকার প্রধান একজন হতে পারবে না। এবার দেখার বিষয় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন নাকি দলীয় প্রধান হন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে তারেক রহমানই হবেন আগামীর প্রধানমন্ত্রী। সরকারি দল থেকে স্পিকার নিয়োগ করলেও বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

হ্যাঁ এর পক্ষে জনগণ ব্যাপকভাবে সমর্থন দেন

সদ্য অনুষ্ঠিত গণভোটের ফল প্রকাশে একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়ার পর তা সংশোধন করেছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রথমে প্রকাশিত তথ্যে কয়েকটি আসনে অস্বাভাবিক কাস্টিং হার দেখানো হয়, যা নিয়ে আলোচনা শুরু হলে পরে সংশোধিত ফলাফল প্রকাশ করা হয়। প্রাথমিক ফলাফলে জানানো হয়, দেশব্যাপী প্রায় ৬২ দশমিক ৪৭ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ এবং ২৯ দশমিক ৩২ শতাংশ ভোটার ‘না’ ভোট দিয়েছেন। অধিকাংশ আসনে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও ১১টি আসনে ‘না’ ভোট বিজয়ী হয়।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে আয়োজিত এ গণভোটে প্রথমে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে মোট ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ এবং ‘না’-এর পক্ষে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ ভোট দেখানো হয়। ২৯৯টি সংসদীয় আসনে গড় কাস্টিং হার প্রকাশ করা হয়েছিল ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। পরে সংশোধিত ফলাফলে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৬৬০ এবং ‘না’-এর পক্ষে ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬ ভোট দেখানো হয়। একই সঙ্গে গড় কাস্টিং হার ৬০ দশমিক ৮৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। ইসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কারিগরি ত্রুটির কারণে তথ্য প্রদর্শনে এসব অসঙ্গতি দেখা দিয়েছিল, যা যাচাই-বাছাই শেষে সংশোধন করা হয়েছে। ইসি সূত্রে জানা যায়, গণভোটে মোট বৈধ ভোটের সংখ্যা ৭ কোটি ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৬টি। বাতিল হয়েছে ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭টি ভোট। সব মিলিয়ে মোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩টি, যা মোট ভোটের ৬০ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

এবারের নির্বাচনে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৫ জন ভোটার ছিল। পোস্টাল ব্যালেটে নিবন্ধন করা ভোটারের সংখ্যা ও উল্লেখযোগ্য। ইসি সূত্রে জানা গেছে ১৫ লাখ ২৮ হাজার ১৩১ জন পোস্টাল ভোটে নিবন্ধন করেছিল। তাদের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১২ লাখ ২৪ হাজার ১৮৮ জন, যা মোট নিবন্ধনকারী অনুমোদিত ভোটারের ৮০ দশমিক ১১ শতাংশ।

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর এবারে তারা প্রথম উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংসদীয় আসন ও জোট গত ৪৩. ৯% এবং এককভাবে প্রায় ৪০% ভোটে জয়লাভ করেন।

এবার দেখার বিষয় জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী জুলাই সনদের আকাক্সক্ষায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সরকারি দল কি রকম ভূমিকা পালন করে? জুলাই সনদ কতটুকু বাস্তবায়ন করবে তাও দেখার বিষয়। আশা করি জন আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে সরকারি দল ও বিরোধীদল জনগণের অধিকার আদায়ের কাজ করবে। জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দল হিসেবে সংসদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে সরকারকে জনগণের অধিকার আদায়ের বাধ্য করবে।

অবশ্যই বিরোধিতা যেন হয় গঠনমূলক ও সংশোধনের জন্য। জনগণ আর প্রথাগত বিরোধিতা জুলুম, নিপীড়ন ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান চায়। রেষারেষি মুক্ত সরকার ও বিরোধী দল দেখতে চায়। জনগণের প্রত্যাশা ফ্যাসিবাদী সরকারের মত জনগণ যেন আর জুলুম, নির্যাতন ও অধিকার বঞ্চিত না হন। আশা করি এই বিষয়টি মাথায় রেখে সরকারি দল ও বিরোধীদল জনগণের জন্য কাজ করবে। জুলাই সনদের ভিত্তিতে ব্যাপক সংস্কার করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।