ড. আ.ই.ম. নেছার উদ্দিন

বাংলাদেশের বিগত প্রায় দেড়যুগ ইসলামী তাহজীব-তামাদ্দুন তথা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের অনুকূলে কোন অবস্থা বিদ্যমান ছিল না। এ সময়ে দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন ছিল ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকার। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জনগণের মাথার উপর ছেপে বসা এক স্বৈরাচারী শাসক দেশ পরিচালনায় প্রধান ও প্রথম কাজ হিসেবে ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ ধ্বংসের বিষয়কে বেছে নেয়। ভিন্ন দেশীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে ইসলামী মূল্যবোধের সাথে সংশ্লিষ্ট নিদর্শন ও চিহ্নগুলোকে এবং এ গুলোর লালনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দমন নিপীড়নের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দাড়ি, টুপি, মসজিদ-মাদরাসা, পীর মাশায়েখদের খানকা কোন জায়গা ফ্যাসিস্টদের দমন নিপীড়নের থেকে রেহাই পায়নি। বাংলাদেশে আবহমানকাল থেকে প্রতিবছর রমজানুল মোবারকের সময়ে ইসলামী তাহযীব ও তামাদ্দুন তথা ইসলামী সংস্কৃতির ধারক-বাহক ধর্মপ্রান মুসলমানগণ অতিবেশি আবেগপ্রবণ থাকে।

বিগত বছরগুলোতে রমজানের সিয়াম পালন এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট ইবাদাত বদ্দেগীগুলো পালন করার ক্ষেত্রে এবারের রমজানে অনেক অনেক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। এ বিষয়ে একজন সিয়াম পালনকারী প্রতিশ্রুতিশীল একজন মুসলিম ভাইয়ের সাথে বিগত দেড়যুগ ধরে বাংলাদেশের মুসলমানদের সিয়াম পালনের অবস্থা নিয়ে আলাপ করছিলাম। তিনি তার উপলব্ধির কথা আমাকে জানালেন-এবারে মানুষের মধ্যে মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়, তারাবীহ, ইফতার ও সাহরি বিষয়ে মুসলমানদের মধ্যে যে স্বতঃস্ফূর্ততা, উৎসাহ উদ্দীপনা দেখে মনে হচ্ছে সত্যিই বাংলাদেশে মুসলমানরা স্বাধীনভাবে রমজানুল মোবারককে যথার্থভাবে মূল্যায়নের সুযোগ পাচ্ছে।

এ পর্যায়ে এবারের রমজানুল মোবারকের ইবাদতের বিভিন্ন পর্বগুলো নিয়ে খানিকটা তুলনামূলক আলোচনা করলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে। যেমনঃ

১। ইফতার : সিয়াম সাধনার একটি অন্যতম পর্ব ইফতার। রোজাদারদের নিয়ে ইফতার করা রোজার ফযিলত ও বরকতকে বাড়িয়ে দেয়। কোন রোজাদারের ইফতার করানোর সাওয়াব পূর্ণ রোজা পালনকারীর সমান বলে হাদীসে রাসুল (সা.) এরশাদ করেছেন। যে কারণে মুসলমানরা পারিবারিকভাবে, ব্যক্তি পর্যায়ে, প্রতিবেশীদের সাথে ইফতারে শরীক হতে আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকেন। বিগত আওয়ামী দুঃশাসনের সময় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ইফতার আয়োজনের বিরোধিতা করা হয়। তুচ্ছ, তাচ্ছিল্য এবং তির্যক ভাষায় ইফতার আয়োজনকে নিরুৎসাহী করা হয়। এমনকি ইফতার মাহফিল আয়োজনকে ভূড়িভোজ ও জঙ্গীবাদের আস্তানার কর্মকাণ্ড হিসেবে তুলনা করা হয়। ইফতার মাহফিল আয়োজনকে সরকার বিরোধী ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। ইফতার মাহফিল চলাকালীন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলার বহু ঘটনা ঘটেছে এ দেশে। আর এবারে বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে ইফতার মাহফিলের হিড়িক চলছে, যা মুসলমানদের যথার্থ আবেগ-অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটছে এবং এ যেন বিগত স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক রাশ ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।

২। তারাবিহর নামায : রমজানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হচ্ছে তারাবিহর সালাত আদায় করা। মুসলমানরা খুব আন্তরিক ভালোবাসা ও আস্থা নিয়ে এ তারাবিহ সালাত আদায় করে থাকে। কিন্তু বিগত ১৬ বছরে তা ক্রমাগত ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। মসজিদগুলোতে মানুষ ভয়ে যেত না। মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর বিশেষ বাহিনীর লোকেরা জঙ্গী, সন্ত্রাসী ও জামাত-শিবিরসহ নানা নাম করে গ্রেফতার করে নির্মম নির্যাতন করা হতো। তারাবিহর সালাত আদায়কালে গ্রেফতার করা বা তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ফ্যাসিস্ট আঃ লীগের আমলে অহরহ ছিল। এ বছর তা আর নেই। উন্মুক্ত বিহঙ্গের মত মুসলমানরা মসজিদ, এবাদতখানা, বাসা-বাড়ী বা ভবনের ছাদে নির্বিঘ্নে তারাবিহর সালাত উৎসাহ উদ্দীপনা সহকারে আদায় করছে। মানুষেরা যেন নতুন দিনের ঈদগাহে শামিল হচ্ছে। তাদের মনে এখন আর স্বৈরাচারের আক্রমণের আশঙ্কা নেই।

৩। সাহরী খাওয়া : সাহরী খাওয়া সিয়াম পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। রাসুল (সা.) সাহরী খাওয়ার জন্য তাগিদ দিয়ে বলেছেন-তোমরা সাহরী খাও, এর মধ্যে বরকত রয়েছে। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সময় সাহরী খাওয়ার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যুতের লোডশেডিং দিয়ে দেয়া হতো। সাহরীর সময় মুসলমানদের জেগে উঠার জন্য মসজিদে মাইকে বা এলাকাভিত্তিক ডাকাডাকি করা হতো আবহমানকাল থেকে। আওয়ামী আমলে তা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং মুসলমানরা যেন তা নির্বিঘ্নে তা পালন করতে না পারে তার জন্য হুমকি, ধমকি, মারধর করা হয়েছে। ডাকাত বলে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এবারে এক আনন্দঘন পরিবেশে সারা বাংলাদেশে সাহরী খাওয়ার আমল নিরবচ্ছিন্নভাবে মুসলমানরা পালন করে যাচ্ছে। মুসলমানরা যেন সত্যিই নিজ দেশে নির্ভয়ে স্বাধীনভাবে সিয়ামের আমেজ অনুভব করছে। এর আগের বছরগুলোতে যেন পরাধীন কোন দেশে তারা কারাগারে ›িীদ থেকে পালন করেছে।

৪। দ্রব্যমূল্য : বাংলাদেশের দ্রব্যমূল্যের প্রেক্ষাপট যদি বলতে হয় তাহলে বলতে হবে এখানে কিছু অসাধু মানুষ এমনিতেই রমজানে দাম বাড়ানোর প্রবণতা চালায়। বিগত বছরগুলোতে আওয়ামী স্বৈরতান্ত্রিকতায় তাদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেয়া হতো। তুঘলকি কারবার করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরী করে অধিক মূল্য হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। এবারও দু’একটা ক্ষেত্রে এমনটা হয়েছে তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রয়েছে নতুবা দাম কমেছে। নিত্য প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র ও ফলমূলের সরবরাহ পর্যাপ্ত। মানুষ কম মূল্যে স্বস্তির সাথে দ্রব্যাদি সংগ্রহ করছে। এ যেন স্বাধীনতা ও পরাধীনতার এবং স্বৈরাচার ও গণতন্ত্রের মধ্যে বিরাট ব্যবধান।

৫। অফিস-আদালত : এবারের রমজানে সারা দেশে ধর্মীয় একটি অনুভূতি ও আমেজ লক্ষ্য করা গেছে। যা বিগত সরকারের সময় ছিল না। একটি অজানা আশঙ্কা ও ভয় জনগণের মধ্যে কাজ করেছে বিগত বছরগুলোতে। সব অফিস আদালতে দলীয় ক্যাডার ও আওয়ামী প্রেতাত্মাদের দৌরাত্ম্যে মানুষ দিশেহারা ছিল। ফলে ঘুস ও দুর্নীতির মহাৎসব ছিল রমজানেও। এবারে তার ব্যতিক্রম। একদিকে রমজানের আমেজ অন্যদিকে ঘুস-দুর্নীতির রশি যেন টেনে ধরা হয়েছে। সংযমী মনোভাব লক্ষ্য করা যায় সর্বত্র।

এবারে ভিন্ন চিত্রও আছে : এবারের রমজানের আগে থেকেই ভোজ্য তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। রমজানের মধ্যে খুন খারাবি হয়েছে। মব জাষ্টিজের ঘটনা কোথাও কোথাও লক্ষ্যণীয় ছিল। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙ্গা যায়নি বলে মনে হয়। আওয়ামী শূন্যস্থান পূরণ হয়েছে অপর একটি গোষ্ঠীদ্বারা। ইচ্ছাকৃতভাবে আওয়ামী প্রেতাত্মাদের দ্বারা এগুলো সংগঠিত হচ্ছে বলে অনেকের ধারণা।

আলেমদের ঐক্য প্রক্রিয়া : ইসলামী দল ও আলেম ওলামাদের ঐক্য প্রক্রিয়া এবারের রমজানের সিয়াম পালনকে অনেক বেশি ফলপ্রসূ করে তুলেছে। মুসলিম মিল্লাতের ঐক্য প্রক্রিয়া বাংলাদেশে রমজানুল মোবারকে আরও শানিত হলো বলে মনে হয়। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ইসলামী দল ও আলেম-ওলামা, পীর মাশায়েখরা এ দেশে ইসলামী হুকুমত কায়েম করতে পারবে-বলা যায় সেদিন বেশি দূরে নয়। ভিন্ন ধারার আলেম ওলামাদের একত্রে বসা, বক্তৃতা দেয়া এবং একই সুরে কথা বলা রমজানকে যেন সার্থক করে তুলেছে।

সর্বশেষ যে কথা বলতে চাই, রাসুল (সা.) তার জীবদ্দশায় প্রথম যুদ্ধ বদর রমজানে নেতৃত্ব দিয়ে জয় লাভ করেছেন। অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার পর ইসলামী মূল্যবোধ ও ইসলামী ঐতিহ্য যেমন : সালাত, সাওমসহ নানাবিধ কার্যক্রম প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। মুসলমানরা সে রক্তঝরা ইসলামের ধারক ও বাহক। বাংলাদেশে বিগত হাসিনা সরকার ফ্যাসিবাদ কায়েমের মাধ্যমে ইসলামকে নানা মিথ্যা তকমা দিয়ে নাটক সাজিয়ে মুসলমানদের দমন করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু লাভ হয়নি-অভাবনীয়ভাবে সে ফ্যাসিবাদ অবদমিত হয়ে গেছে। এই রমজানুল মোবারক থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার বাংলাদেশে মুসলমানদের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এখনই সময়। এখনই মুসলিম অধ্যুষিত এদেশে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য এই মহামূল্যবান মাস রমাদান কারিমকে কাজে লাগাতে হবে। আল্লাহ তায়ালা কবুল করুন।

লেখক : বিশ্ববিদ্যালয়ের খন্ডকালীন শিক্ষক ও গবেষক।