ইয়াসিন মাহমুদ
তারুণ্যের আকাক্সক্ষাকে কেউ উপেক্ষা করতে পারে না। কারণ, তরুণদের কেউ সহজে দমাতে পারে না। আর সেই তরুণদের হৃদয়ে যদি থাকে স্বদেশপ্রেম; মাটি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা। দায়বোধ পূরণের অভিপ্রায়- তাহলে তো কথা থাকে না। নৈতিক মূল্যবোধে যেসব তরুণের ভিত্তি মজবুত তাদেরকে তো কোনোভাবে আটকানো যায় না। কোনো প্রলোভনের ফাঁদে তারা সহজে আটকে থাকে না। যারা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে; সিদ্ধান্ত নিয়েছে গোলামীর জিঞ্জির থেকে দেশকে মুক্ত করবে- তারা জীবন দিয়ে হলেও সেই আগ্রাসন রুখে দিবে। আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ, শরীফ ওসমান হাদী সেই পথ দেখিয়ে গেছেন।
আমরা যদি একটুখানি পেছনে ফিরি, আমাদের অতীত ইতিহাসে চোখ বুলাই তাহলে সহজেই খুঁজে পাবো অবশেষে দেশপ্রেমিকরাই জয়ী হয়। সাময়িক সময় নায়ককে ভিলেন বানালেও শেষমেষ সমাপ্তিতে নায়কই তার আসনে ফিরে আসে। নায়কের জয় হয়।
১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে সর্বশেষ চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তরুণদের ভূমিকা ঐতিহাসিক। এর মানে দাঁড়ায় তরুণদের কোনোভাবে অবজ্ঞাÑঅবহেলা করার সুযোগ নেই।
তরুণদের ভিতর ব্যাপক পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ফল দেখলে তরুণদের মনোভাবনা যে পরিবর্তন হয়েছে তা সহজে অনুমেয়। এই তরুণদের লক্ষ্য পরিবর্তন। একটি বিপ্লবের আকাক্সক্ষা তাদের চোখেমুখে। কী তাদের চাওয়া-পাওয়া? বিগত ১৭ বছর সর্বশ্রেণির মানুষদের বোবা বানানোর আয়োজন ছিল। মানুষের কথা বলার অধিকার ছিল না। দেশ নিয়ে, দেশের মানুষের স্বার্থে কথা বললে গুম-খুন জুটে যেত কপালে এবং এই চিত্র ছিল হরহামেশা। তৎকালীন আওয়ামী সরকারের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ শুধু ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস নয়- গ্রাম থেকে শহরের প্রতিইঞ্চি মাটিতে তাদের আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি, ছিনতাই, জবরদখলসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত ছিল। তরুণরা চব্বিশের জুলাইয়ে জীবন দিয়েছে এই সব জুলুমের অবসান ঘটাতে। তারা চায় ইনসাফের বাংলাদেশ, সাম্য-ন্যায়ের বাংলাদেশ।
ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার্থীরা তাদের ভোটের মাধ্যমে তাদের কাক্সিক্ষত নেতৃত্ব বাছাই করেছে। ডাকসু, জাকসু, রাকসু, চাকসু, সর্বশেষ জকসুর নির্বাচনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলকে বিজয়ী করেছে তারা। কেন শিক্ষার্থীরা ছাত্রশিবিরকে বেছে নিয়েছে সে প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন ক্যাম্পাসগুলোর সচেতন শিক্ষার্থীরা। এখনকার শিক্ষার্থীরা আগের তুলনায় অনেক বেশি স্মার্ট বলে আমি মনে করি। তারা অনেক অ্যাডভান্স। এই মেধাবী তরুণ-তরুণীরা এই দেশ নিয়ে বেশি সচেতন। দেশ নিয়ে তারা অনেক বেশি ভাবেন। তাদের যে দেশপ্রেম। দেশ নিয়ে চিন্তাভাবনা, ওয়েলকাম না জানানোর কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছি না। এই তরুণ মেধাবী বন্ধুরা ছাত্রশিবিরকে বেছে নিয়েছে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়, তাদের ডিপার্টমেন্ট, তাদের ক্যাম্পাস লাইফ ও তাদের ক্যারিয়ার গঠনের সুযোগ পাবার আশায়। সর্বোপরি এই দেশের কল্যাণে তারা যেন আগামীতে ভূমিকা রাখতে পারে সেই সবক লাভের আশায়। এর চেয়ে বেশি কিছু পাবার আশা তাদের ভেতরে নেই বললেই চলে। ইতোমধ্যে ডাকসু, জাকসু, রাকসু, চাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শিক্ষাবান্ধব কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আর এই কর্মসূচির মাধ্যমে ছাত্রশিবিরে শিক্ষার্থীরা আরো বেশি ঝুঁকে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। প্রতিটি ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবির প্যানেল জয়ী হবার পেছনে ছাত্রবান্ধব বা ছাত্রকল্যাণমূলক কর্মসূচি ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
ছাত্রসংসদের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়বে কিনা এই প্রশ্নের তর্কবিতর্ক রয়েছে। নানা ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে নানা পক্ষ। তবে আমার ধারণা ছাত্রসংদের এই নির্বাচনী হাওয়া জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। যে তরুণ-তরুণীরা চাঁদাবাজ, ছিনতাই, মাদকের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানকে স্পষ্ট করেছে তারাই আগামী নির্বাচনেও এই চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের বয়কট করবে এটা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। মনে হয় এই তরুণÑতরুণীরা শুধু ন্যায়Ñইনসাফের পক্ষ নিয়ে কিংবা নিজেরা ভোট দেবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষান্ত হবে না। বরং তারা নিজ নিজ এলাকায় ন্যায়Ñইনসাফের প্রতীক দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ক্যাম্পেইনে নামবে, জনসচেতনায় অংশ নেবে। সর্বোপরি জামায়াত-সমর্থিত জোটের বিজয় ছিনিয়ে আনতে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা রাখবে-সেই দৃশ্য অবলোকন করছি।
কেন জামায়াত সমর্থিত জোট বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তার একমাত্র কারণÑ আদর্শ ও কমিটমেন্ট রক্ষার ক্ষেত্রে অনড় ও অবিচল থাকার প্রত্যয়।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির অন্যতম কারণ হলো-ছাত্রদের নিয়ে তাদের পর্যাপ্ত কর্মসূচি ছিল না। আদর্শের প্রতিও তাদের আপসকামিতা লক্ষ্য করা গেছে। তাদের অধিকাংশ কমিটিতে অছাত্রে ভরপুর। অনেকের বহু আগে ছাত্রত্ব শেষ হলেও এখনো ছাত্রসংগঠনে সম্পৃক্ত রয়েছেন। এর কারণও ওপেন-সিক্রেট। তারা আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় ডেডিকেট ছিলেন। দলের কর্মসূচি তারাই পালন করেছেন। এখন সুসময়ের অপেক্ষায়। এখন ক্যাম্পাসগুলোর কমিটিতে টিকে থাকতে পারলে নিয়োগ বাণিজ্য, টেণ্ডারবাণিজ্যসহ নানা লাভের গুড় পাওয়া যাবে। এ ছাড়াও আরো অনেক কারণ নিহিত রয়েছে। এখনকার তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গিকে তারা ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ দিকে ছাত্রশিবিরের নিয়মিত কমিটি গঠন অব্যাহত থাকার কারণে নেতৃত্বে নতুন মুখ আসার সুযোগে তারা শিক্ষার্থীদের চাহিদা ও দৃষ্টিভঙ্গি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছে। ছাত্রশিবিরের বিজয়ের এটিই অন্যতম ম্যাকানিজম।
দেখুন, জকসুর নির্বাচনে বেশ হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। জকসুর নির্বাচনটি দফায় দফায় পিছিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ। সবার ভেতরে একটা ধারণা কাজ করছিল-বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান একজন নির্যাতিত নেতা। দীর্ঘদিন প্রবাস জীবনযাপন করে দেশে ফিরছেন। এদিকে সর্বশ্রেণির মানুষের প্রিয় মুখ আপসহীননেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তিকাল। সব মিলিয়ে সবার ভেতরে একটা ইমোশন কাজ করতে পারে। স্বয়ং তারেক রহমানসহ বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা জকসুর নির্বাচনটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন। এখানে জেতাটা তাদের খুব প্রয়োজন। বিএনপি ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ একটি মনিটরিং সেল জকসু নিয়ে বেশ দৌড়ঝাঁপ দেয়। অবশেষে জকসুতেও ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল পরাজিত হলো। তাদের এই পরাজয়ের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ অনেক কারণ রয়েছে। প্রত্যক্ষ কারণের একটি হলোÑছাত্রদলের নেতারা চাঁদাবাজি, ছিনতাই, সন্ত্রাসীকর্মকাণ্ডসহ নানা অপকর্মে সম্পৃক্ত এবং শিক্ষার্থীদের মন জয় করার জন্য যে ধরনের মিশনÑভিশন থাকতে হয় তার সিকিভাগ তারা থ্রো করতে পারেনি।
এবার বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত জোটের নমিনিদের অবস্থান ও কর্মসূচি বিষয়ক কিছু কথা বলা দরকার। বিভিন্ন সংসদীয় আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রয়েছে। সাথে আছেন বিএনপির একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী। একই আসনে বিএনপি সমর্থিত জোটের প্রার্থী। অনেক জায়গায় দেখা গেছে বিএনপির এক মনোনীত প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি। অন্যদিকে তাদের জোটের শরীক দলের প্রার্থীকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে বয়কটের ডাক দিয়েছে। বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত একাংশের দাবি বিগত আওয়ামী সরকারের সময় তারা আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন। অথচ তাদের বাদ দিয়ে একেবারে নতুন মুখকে নমিনি করার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত সমর্থিত জোটের মধ্যে বেশ সখ্যতা ও হৃদ্যতা দেখা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে বেশ উদারতার পরিচয় দিতে দেখা যাচ্ছে। অনেক জায়গায় তাদের জোটের শরীকদের আসনে তাদের প্রার্থীকে ফরম তুলতেও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং জামায়াত প্রার্থীকে প্রত্যাহার করে জোটের প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে মাঠ পর্যায়ে।
মরহুম বেগম খালেদা জিয়া সর্বমহলে গ্রহণীয় ব্যক্তি ছিলেন। ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে তার কণ্ঠস্বর ছিল উচ্চ। বিএনপির এখনকার নেতৃত্বের মাঝে এমন গুণাবলীর শূন্যতা রয়েছে বলে অনেকেরই ধারণা।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন। আজকের বাংলাদেশ এবং পূর্বের ১৭ বছর বাংলাদেশের রাজনীতি স্বচক্ষে বুঝার ও জানার সুযোগ হয়নি। পাশাপাশি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সবাই তাকে ওয়েলকাম জানিয়ে জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বকে এগিয়ে নিবে কিনা সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে বিএনপিকে যেভাবে জনগণ চেয়েছিল সেই বিএনপি হয়ে উঠতে পারেনি দলটি। অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দল, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, খুন-খারাবিসহ জনবিরোধী ও ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যাপক প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে জনমনে।
বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রশ্নে যেমন আপসহীন ছিলেন; ঠিক তেমনি ইসলাম প্রশ্নে ছিলেন নো কম্প্রোমাইজ। বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব ইসলামোফোবিয়াকে প্রমোট করার কাজে বেশি ব্যস্ত।
নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। বিএনপি সমর্থিত ও জামায়াত সমর্থিত উভয় জোটও এখন নির্বাচনী মাঠে ছুটে বেড়াচ্ছে। এদিকে বিভিন্ন সংস্থা নির্বাচনী হালচাল নিয়ে গবেষণা করছে। একেক গবেষণায় একেক তথ্য উঠে আসছে। তবে সর্বোপরি জামায়াত সমর্থিত জোটের সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন অধিকাংশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
দিন দিন ভোটের মাঠ আরো জমে উঠবে। আর এই মাঠকে ভোট উৎসবে পরিণত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এই দেশের মানুষের দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রত্যাশা- একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু ভোটের। নির্বাচন কমিশন যদি নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে আপস করে তাহলে জনগণের দুর্ভোগের দিন আরো দীর্ঘ হবে। দীর্ঘ হবে আজাদীর লড়াই। আর এমন দুর্যোগ ও দুর্ভোগ কারো কাম্য নয়।
দেশে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনতে সুষ্ঠু ভোটের বিকল্প নেই। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও সুষ্ঠু ভোটের সদিচ্ছা ছাড়া এটা সম্ভব নয়। আর ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণই নির্ধারণ করবে তাদের আগামীর নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ। একটি জনআকাক্সক্ষার বাংলাদেশ দেখার অপেক্ষায় সবাই।
জনগণের বুকে আর কেউ যেন চাবুক না মারতে পারে। জগদ্দল পাথর হয়েও কেউ বসাতে না পারে। বুক ভরে সবাই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারে সেই আকাক্সক্ষা সবার মনেপ্রাণে।
লেখক : কবি ও গবেষক।