বাংলাদেশে বহুল প্রতীক্ষিত একটি নির্বাচন হয়ে গেল গত ১২ ফেব্রুয়ারি। ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এবারই প্রথম বাংলাদেশের মানুষ কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেল। বলতে দ্বিধা নেই, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনটি বাহ্যত বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংঘটিত হলেও কার্যত এ আন্দোলনের মাধ্যমে নাগরিকদের মনে বিগত সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী আমলের যাবতীয় অপ্রাপ্তি দূরীকরণের একটি সুপ্ত কামনাও ছিল। নাগরিকদের নানামুখী প্রত্যাশার মধ্যে অন্যতম একটি প্রত্যাশা ছিল ভোট প্রদানের স্বাধীনতা এবং সুযোগ লাভ। কারণ আওয়ামী লীগ আমলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে যে নির্বাচনগুলো হয়েছিল তা ছিল নিতান্তই প্রহসনমূলক এবং জনগণ তাতে ভোট প্রদানের সুযোগই পায়নি।

বেশ কিছু কারণেই এবারে নির্বাচনটি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এবার ৪ কোটি তরুণ ভোটার ছিল যারা প্রথমবারের মতো ভোট প্রদানের সুযোগ পেয়েছেন। এর বাহিরে জুলাই শহীদ এবং আহতদের কথা আলাদা করে বলতে হয়। সারাদেশে ফ্যাসিবাদের পরিসমাপ্তি এবং গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তার বাস্তব চিত্রায়নের জন্য একটি সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দরকার ছিল। জাতিকে একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করে গণতন্ত্রের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের কোনো বিকল্প ছিল না।

এবারের নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করতে গেলে শুরুতেই যে কথাটি বলতে হয় তা হলো বাংলাদেশের মানুষ অনেকদিন পর আবার নতুন করে ভোট প্রদানের সুযোগ পেলেন। এবারের ভোট প্রদানের দৃশ্যায়ন ছিল রীতিমতো ঈদের উৎসবের মতো। রাজধানী ঢাকা প্রায় ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। ঈদের সময় ঠিক যেভাবে মানুষ লঞ্চে, ট্রেনে টইটুম্বুর হয়ে নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে গমন করেন; এবারের নির্বাচনেও তারা ঠিক সেভাবেই আনন্দের সাথেই নিজ নিজ এলাকায় গিয়েছেন। ভোট প্রদান করেছেন। এর বাইরে, শহরে বন্দরে এমনকি প্রতিটা গ্রামে অসংখ্য মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন; প্রথমবারের মতো ভোট প্রদানের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হল শুধুমাত্র ১৮ বছরের তরুণেরাই এবার প্রথম ভোট দিয়েছে তা কিন্তু নয়। আমি অনেক চল্লিশোর্ধ মানুষকেও এবারই প্রথম ভোট প্রদান করতে দেখেছি। কারণ ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে যাদের বয়স ১৮ হয়েছিল তাদের কেউই আসলে আর ভোট প্রদান করার সুযোগ পাননি; যদিও মাঝখান থেকে তাদের জীবনের প্রায় ১৭ থেকে ১৮টি বসন্ত চলে গিয়েছে।

নির্বাচনের দলীয় ফলাফলের চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ কিছু ফলাফল রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো, এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ ফ্যাসিবাদকে পুরোপুরি প্রত্যাখান করেছে। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ব্যাপক পরিসরে ‘নো বোট নো ভোট’ ক্যাম্পেইন চালালেও জনগণ তাতে কর্ণপাত করেনি। তারা বিপুল হারে ভোট প্রদান করেছে। বিগত তিনটি প্রহসনমূলক নির্বাচনের কলংক মাড়িয়ে এবার সার্বিক টার্ন আউটের পরিমাণ প্রায় ৬০ শতাংশ অতিক্রম করেছে। গণভোটে মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। বিএনপি গোপনে না ভোটের পক্ষে প্রচারনা চালালেও তারা সফল হয়নি-যা এবারের নির্বাচনের আরেকটি অর্জন। আর তৃতীয় অর্জন হলো শুধু আওয়ামী ফ্যাসিবাদ নয়, জনগণ ফ্যাসিবাদের দোসর জাতীয় পার্টিকেও প্রত্যাখান করেছে।

এক কথায় বলতে গেলে, জাতীয় পার্টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও এবারের নির্বাচনে রংপুর শহরের মতো আসনে পরাজিত হয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে পরাজিত হয়েছেন মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এবং লালমনিরহাটে মশিউর রহমান রাঙার মতো সিনিয়র নেতারা। মূলত ৯০ এর পতনের পর জাতীয় পার্টি মূলত উত্তরবঙ্গ কেন্দ্রিক হয়ে যায়। এরশাদ সাহেবের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টি উত্তরবঙ্গ থেকে সংকুচিত হয়ে রংপুর জেলাতেই সীমিত হয়ে যায়। এবার সেই রংপুরের ৬টি আসনের ৬টিতেই জামায়াত ও ১১ দলীয় জোট জয় পেয়েছে। জামায়াত জিতেছে ৫টা আসনে আর এনসিপির আখতার হোসেন জিতেছে রংপুর ৪ আসনে। জাতীয় পার্টির তৃতীয় বা চতুর্থ দল থেকে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তারা ফ্যাসিবাদের দোসর ছিল। গৃহপালিত বিরোধী দল ছিল। আর এবারের নির্বাচনের আগ দিয়ে জুলাই অভ্যুত্থান এবং গণভোট নিয়ে একাধিকবার প্রবল আপত্তিজনক মন্তব্য করেছিলেন জিএম কাদের ও ব্যারিস্টার পাটোয়ারি। জনগণ তাদেরকে নির্বাচনে প্রত্যাখান করেছে। তাই অবস্থাদৃষ্টে বলাই যায় যে, জাতীয় পার্টি এখন বিলুপ্তি হওয়ার পথে।

নির্বাচনে কিছু সহিংসতা হয়েছে; কিছু ভোট জালিয়াতির ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু সত্যি কথা হলো প্রতিটা দলের নেতৃবৃন্দই ভোটগ্রহণের সময় শেষ হওয়া পর্যন্ত বড় কোনো অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপন করেননি। বরং তারা সবাই নির্বাচনের পরিবেশের ব্যাপারে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। যদিও ভোট গ্রহণকালে কিছু সমস্যা যে হয়নি তা নয়। কিন্তু এরশাদ আমলের নির্বাচনের তুলনায় কিংবা আওয়ামী লীগ আমলের তিনটি প্রশ্নবোধক নির্বাচনের তুলনায় এ অনিয়মগুলো আহামরি কোনো ঘটনা নয় বলেই হয়তো রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সেগুলো খুব ফলাও করে প্রচার করেননি। রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রগুলোতে সেনাবাহিনীকেও খুব সক্রিয় ভূমিকা পালনরত অবস্থায় দেখা গেছে।

তবে সার্বিক বিচারে এবারের নির্বাচনে আসলে অনেকগুলো অসংগতিই হয়েছে। বিভিন্ন আসনের ফল প্রকাশ শুরু হওয়ার পর দেখা গেছে নির্বাচনী ফলাফল যথাযথভাবে প্রচার করা হচ্ছে না। অনেক কেন্দ্রেই পোলিং এজেন্টরা সাক্ষরসহ ভোটের বিস্তারিত হিসাব দেয়ার পরও সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কর্মকর্তারা সেগুলো ঘোষণা করছিলেন না। কিছু কিছু আসনে জনগণের চাপে ফলাফল ঘোষণা করলেও বেশিরভাগ আসনে ফলাফল ঘোষণা নিয়ে বিলম্ব করার সার্বিক একটি অপপ্রয়াস লক্ষ্য করা গিয়েছিল। এক্ষেত্রে বারবারই আমার মনে পড়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের কথা। যেখানে মাত্র কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রীর ভোট প্রদানের পর দু-তিন চলে গেলেও নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। তখন অনেকেই বলেছিলেন যে, ছাত্রশিবির জয়ী হতে যাচ্ছে বলেই নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হচ্ছে না। কেউ কেউ এমন আশঙ্কাও করেছিলেন যে, নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার অসৎ নিমিত্তেই ফলাফল ঘোষণা করা হচ্ছে না এবং সেখানে মেকানিজম চালানো হচ্ছে। যদিও পরবর্তীতে ছাত্রদের চাপে নির্বাচনী ফলাফল আর আঁটকে রাখা যায়নি। একটি পর্যায়ে ফলাফল ঘোষণা করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়। আর সেই ফলাফল পুরোপুরি ছাত্রশিবিরের পক্ষেই গিয়েছিল।

কাছাকাছি একটি বাস্তবতা আমরা এবারে সংসদ নির্বাচনেও প্রত্যক্ষ করেছি। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কমপক্ষে ৫৮টি আসনের খোঁজ পাওয়া গেছে যেখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা সর্বনিম্ন দেড় হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৪০০০ ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন। অনেকের ধারণা, এ আসনগুলোতে জামায়াতের প্রার্থীদের পরিকল্পিতভাবে হারিয়ে দেয়া হয়েছে। এমনকি রাজধানীতেও যেখানে হাজার হাজার সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকরা ছিলেন; সেখানেও ঢাকা-৬, ঢাকা-৭, ঢাকা-৮, ঢাকা-১৩ কিংবা ঢাকা-১৭ এই আসনগুলোতে ফলাফল দীর্ঘসময় আঁটকে রাখা হয়েছিল। অনেকটা সময় পর ঢাকা-৪, ঢাকা-১৫ এবং ঢাকা-১৬ আসনে জামায়াতের প্রার্থীদের জয়ী হিসেবে ঘোষণা করার পর আবার প্রতিপক্ষ বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থী এবং তার সমর্থকেরা সে ফলাফল বাতিল করার দাবি করেছেন এবং স্ব স্ব অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ থেকে নিজেদের বিজয়ী বলে দাবি করেছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় পোলিং এজেন্টের দেয়া তালিকা নিয়ে এখানে জামায়াতের নেতৃবৃন্দ কমিশনে যাওয়ার পর অবশেষে এই আসনগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতের প্রার্থীদের জয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ দৃষ্টান্তগুলো প্রমাণ করে যে, ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে বড়ো ধরনের চক্রান্ত হয়েছে। তাছাড়া ভোট গ্রহণের সময়ও অনেক আসনেই জামায়াত ও অন্যান্য স্বতন্ত্র প্রার্থীর এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হয়নি। একাধিক মিডিয়ায় দেখা গেছে, অনেকগুলো কেন্দ্রেই অসচেতন ও দুর্বল ভোটারদের জোর করে ধানের শীষে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। ঢাকা-৮ আসনের একটি কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসের স্ত্রীর সরাসরি ভোট গণনার কার্যক্রমে অংশ নেয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

এবারের নির্বাচনে একটি বড়ো অনিয়ম ও পরিকল্পিত কারসাজি দেখেছি মিডিয়ার তরফ থেকেও। নির্বাচনের কয়েকদিন আগে থেকেই মূলধারার বেশ কিছু টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়া একপেশেভাবে বিএনপি’র পক্ষে ক্যাম্পেইন করতে শুরু করে। নির্বাচনের দিন কয়েক আগেই জামায়াতকে কমপ্লিটলি ব্ল্যাকআউট করে ফেলা হয়। নির্বাচনের দুদিন আগে ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াত আমীরের ব্যক্তিগত ব্যবসার টাকা নিয়ে বিমানে যাতায়াতকে কেন্দ্র করে জঘন্য অপপ্রচার চালানো হয়। একাধিক অনলাইন মিডিয়াকে জামায়াতের বিরুদ্ধে নিউজ করে সেগুলো আবার স্পন্সরড করে প্রচার করতেও দেখা গেছে। বলা যায়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অনেকগুলো মিডিয়া মিলে জামায়াতের বিরুদ্ধে ও বিএনপির পক্ষে এক ধরনের ক্যু সংঘটিত করেছে। নির্বাচনের দিনেও সে একই ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা গেছে। ফলাফল ঘোষণার সময় এগিয়ে আসার সাথে সাথে দেখা যায়- অনেক মিডিয়াই পোলিং এজেন্ট বা নির্বাচনী কর্মকর্তাদের দেয়া কোনো তালিকার রেফারেন্স ছাড়াই বিভিন্ন আসনে বিএনপি প্রার্থীদের বিজয়ী হিসেবে আগাম ঘোষণা করে দিচ্ছে অথচ তখনও পর্যন্ত ভোট গণনাই শেষ হয়নি। মিডিয়াগুলোর এই পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ ইতিহাস নিশ্চয়ই মূল্যায়ন করবে।

একটি বিষয় পরিষ্কার। আর তাহলো জনগণ এবার ভোট দিতে চেয়েছিল এবং বিপুলসংখ্যক জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে তথা গণভোটে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে রায় প্রদান করেছিল। ফলাফলে তা উঠেও এসেছে। অথচ বিস্ময়কর হলেও সত্য; সংস্কারের পক্ষে যে জোটটি অবস্থান নিয়েছিল মেকানিজমের মাধ্যমে তাদেরকে আবার আসন কম দেয়া হয়েছে। এ বাস্তবতায় আমার আশংকা, যদি সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী সংসদে উচ্চকক্ষ তৈরি করতেও হয় তাহলেও যেন বিএনপির বাইরে অন্য দলগুলোর সদস্যসংখ্যা খুব বেশি না হয় তা নিশ্চিত করা হয়েছে। আর এ জন্যই অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বিএনপিকে দু’শতাধিক আসনে জিতিয়ে দেয়া হয়েছে এবং প্রতিপক্ষ ১১ দলীয় জোটকে ৮০টিরও কম সিট দেয়া হয়েছে। অথচ ভোট প্রাপ্তির বিচারে দু জোটের পার্থক্য কিন্তু খুব বেশি নয়।

এতসব নিয়ম এবং অসংগতির পরও আমরা আশা করছি যে বাংলাদেশ আর কখনো সেকেলে এবং বস্তাপঁচা রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করবে না। জুলাই অভ্যুত্থানে জীবন দানকারী দু’হাজারেরও বেশি শহীদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে রাজনীতিবিদেরা একটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবেন। তারা আর নতুন করে প্রতিহিংসা এবং প্রতিশোধের রাজনীতিতে ফিরবেন না। বাংলাদেশের নির্বাচন পরবর্তী একটি স্বাভাবিক ট্রেন্ড হলো এখানে বিজয়ী প্রার্থীর সমর্থকেরা পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়, লুটতরাজ করে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এরই মধ্যে বিভিন্ন জেলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের নৈরাজ্যকর কার্যক্রমের তথ্য আসতে শুরু করেছে। আমরা এ ধরনের তো রাজনীতির পরিসমাপ্তি চাই। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, জামায়াতের পক্ষে এবার দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ ভোট দিয়েছে। বলা যায়, বিএনপির ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলেছে জামায়াত। আর জামায়াত কখনোই জাতীয় পার্টির মতো গৃহপালিত বিরোধী দল হবে না। একটি সংঘটিত ও গুছানো বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত ও সংসদ সদস্য হওয়া জুলাই যোদ্ধারা বিএনপির আগামীর যাত্রাকে খুবই চ্যালেঞ্জিং করে তুলবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সচেতন নাগরিকেরা বিএনপিকে প্রতিটি মুহূর্তে চাপের ওপর রাখবে বলেই আমার বিশ্বাস।

এবারের নির্বাচনের একটি বাস্তব কিন্তু মর্মান্তিক সত্য হলো, বেসামরিক প্রশাসন এবং গণমাধ্যম বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। বেসামরিক প্রশাসন দৃশ্যত একটি দলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আর ফলাফল আসতে শুরু করার পর যখনই বিএনপির বিজয়ের সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়েছে এরপর থেকে তারা আরো বেশি করে বিএনপির দিকে ঝুঁকে যায় এবং এগারো দলীয় জোটকে কোণঠাসা করার সর্বোচ্চ প্রয়াস চালায়। কেননা ততক্ষণে তাদের বিশ্বাস চলে এসেছিল যে, নির্বাচনী কার্যক্রমে এখন যদি কোনো অন্যায়ও তারা করে ফেলেন তাহলেও এজন্য তাদেরকে কোনো ধরনের বিচার বা জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হবে না। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পেয়েছি যে, যত বড়ো ক্ষমতাবানই হোক না কেন- আইন এবং জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে কেউই থাকতে পারে না। যদি রাষ্ট্র এবং সরকার কারো অন্যায়ের বিচার করতে না পারে তাহলে জনগণই তাদেরকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসার বা প্রয়োজনে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার সক্ষমতা রাখে। ফলে, আমি আশা করবো বেসামরিক প্রশাসন, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহল ও গণমাধ্যম সকলেই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আর অসুস্থ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবেন না। বরং তারা সবাই মিলে সামনের দিনগুলোতে জাতি গঠনে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন।