সাইদুর রহমান
সুন্দরবন কেবল বাংলাদেশের গর্ব নয়; এটি বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং বৈশ্বিক বাস্তুসংস্থানের এক অপরিহার্য স্তম্ভ। ১৯৯২ সালে ‘রামসার সাইট’ এবং ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ হিসেবে ঘোষিত এই বন, তার প্রতিটি রেঞ্জের জন্য অনন্য। বিশেষ করে সাতক্ষীরা রেঞ্জ-যা বনভূমিতে প্রবেশের সবচেয়ে স্বল্প পথ-পর্যটকদের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। পদ্মা সেতুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংযোগ ব্যবস্থা পরিবর্তিত হলেও এই সুবিধা পর্যটন খাতে রূপান্তরিত হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের ভৌগোলিক সুবিধা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ বিশ্বমানের। নদীর জাল, দ্বীপ এবং ম্যানগ্রোভ বনজীবী পরিবেশ পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা বয়ে আনে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, লোনা পানির কুমির, হরিণ, বাঁদর এবং ৪০০টিরও বেশি দ্বীপ এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদকে বিশ্বমানের পর্যটন অভিজ্ঞতায় পরিণত করে। গবেষণা দেখিয়েছে যে বনের জটিল কাঠামো পর্যটকদের অ্যাডভেঞ্চার অনুভূতি ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে এবং বাস্তুসংস্থানের ধারাবাহিকতা তাদের অভিজ্ঞতা ২১ শতাংশ সমৃদ্ধ করে। এই প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য কেবল পর্যটককে আকৃষ্ট করে না, বরং সুন্দরবনের টেকসই ব্যবস্থাপনায়ও সহায়ক।
সাতক্ষীরা রেঞ্জ বর্তমানে ২০ বছরের ‘ইকোট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান’ বাস্তবায়নের একটি মডেল ক্ষেত্র। সৌরচালিত নৌকা ব্যবহার শব্দদূষণ প্রায় ৭৫ শতাংশ কমিয়েছে। প্রতিটি প্রবেশপথে স্মার্ট টিকিটিং এবং পর্যটক ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরাপত্তা ও বন ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের টুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে প্রশিক্ষিত প্রায় ২০০ জন স্থানীয় জনবল এই খাতের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। যদি একটি ‘Sundarban Tourism Research & Training Cell’ স্থাপন করা হয়, তবে এটি পর্যটন ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণকে আরও প্রসারিত করতে সক্ষম হবে।
সুন্দরবনের চারপাশের প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের জীবন বন-নির্ভর। টেকসই পর্যটন এই জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং আয়ের নতুন পথ তৈরি করে। হস্তশিল্প, ইকো-স্মারক বিক্রয় এবং ক্ষুদ্র পর্যটন গ্রামগুলো স্থানীয় অর্থনীতি মজবুত করতে সহায়ক। পর্যটন খাতের সম্প্রসারণ প্রায় ৫,০০০ জনকে সরাসরি কর্মসংস্থানে যুক্ত করতে পারে এবং জাতীয় জিডিপিতে ৩ শতাংশ অবদান রাখতে সক্ষম। এই সম্ভাবনা বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি ছাড়া বাস্তবায়িত হলে, স্থানীয় মানুষের বন-নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
পর্যটনকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব রাখতে সুন্দরবনে কঠোর নিয়মাবলী প্রযোজ্য। অনুমতি ফর্ম ভ্রমণের তিন দিন আগে পূরণ করতে হবে। আগ্নেয়াস্ত্র, ফাঁদ, বিষ বা ধারালো হাতিয়ার বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আবর্জনা নির্দিষ্ট বিনে জমা এবং অপসারণ বাধ্যতামূলক। নৌযানের ক্ষেত্রে দিনে সর্বোচ্চ ১৫০ জন এবং রাতের জন্য ৭৫ জন পর্যটক সীমা নির্ধারিত। একা চলাফেরা, উচ্চশব্দে মাইক ব্যবহার এবং বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এই নিয়মগুলো মান্য করাই সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রধান শর্ত।
সাতক্ষীরা রেঞ্জকে কেন্দ্র করে ‘খুলনা-সুন্দরবন-মোংলা-কুয়াকাটা’ করিডোর গড়ে তোলা সম্ভব, তবে সরকারের সমন্বয়হীনতা, অনুমতি প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং বেহাল অবকাঠামো এই সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে ৩২.৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণই প্রধান চ্যালেঞ্জ, তথ্যের অভাব ৭.৭ শতাংশ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ ৫.৮ শতাংশ। পরিবেশবান্ধব ইকো-রিসোর্ট নির্মাণ এবং বিদেশি পর্যটকদের জন্য সহজ ভিসা প্রক্রিয়া এগুলো সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারানো হচ্ছে, যা কার্যকর নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে রক্ষা করা সম্ভব।
এই পরিস্থিতি কেবল সাতক্ষীরা রেঞ্জের জন্যই নয়, বরং সমগ্র সুন্দরবনের টেকসই ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করছে। পর্যটন বোর্ড এবং বনবিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থা না থাকা একদিকে যেমন বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ কমাচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যটকরা অন্য গন্তব্যের দিকে ঝুঁকছে। বিদেশি পর্যটকরা উন্নত সেবা, নিরাপত্তা, স্যানিটেশন এবং আধুনিক আবাসনের অভাবে বিমুখ হচ্ছে।
এক্ষেত্রে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। সাতক্ষীরা রেঞ্জকে ‘বিশেষ পর্যটন অঞ্চল’ ঘোষণা করা হলে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে বড় ধরনের সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত হবে। ভ্রমণের পারমিট বা পাস প্রদানের পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা স্থানীয় পর্যায়ে ন্যস্ত করা এবং পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটালাইজ করা অতি প্রয়োজন। পাশাপাশি, স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করে পর্যটন খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, ব্যাংকগুলোর সহজ ঋণ সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানের ইকো-রিসোর্ট নির্মাণ জরুরি।
সুন্দরবন কেবল একটি পর্যটন গন্তব্য নয়; এটি বাংলাদেশের জীবন্ত ঐতিহ্য। সচেতন ও দায়িত্বশীল পর্যটন, আন্তর্জাতিক প্রচারণা এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ই পারে এই বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখতে। সাতক্ষীরা রেঞ্জকে কেন্দ্র করে নীতিনির্ধারকরা যদি দ্রুত উদ্যোগ নেন, তাহলে বাংলাদেশ কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে না, বন সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।