আসিফ আরসালান
আজকের কলামটি লিখতে গিয়ে দুটো পুরোনা প্রবাদবাক্য মনে পড়ে গেলো। একটি হলো, Morning shows the day, অর্থাৎ সকাল দেখেই বোঝা যায়, সারাটা দিন কেমন যাবে। আরেকটি হলো, All is well
whose end is well, বিষষ, অর্থাৎ সব ভালো যার শেষ ভালো। অনেকেই বলছেন, নির্বাচন ভালো হয়েছে। কোনো গন্ডগোল হয়নি। উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে। এসব কথা আংশিক সত্য। এটুকু বলা যায় যে, সাধারণ জনগণ বা সাধারণ ভোটার এবার ভোট দিতে আগ্রহী ছিলেন এবং তারা ভোট দিয়েছেনও। কিন্তু তার পরেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়। নির্বাচনের আগে যেভাবে বিএনপি নেতারা এবং অধিকাংশ গণমাধ্যম থেকে বলা হয় যে, ভোট দেয়ার জন্য জনগণ নাকি মুখিয়ে আছেন। তাই যদি হবে তাহলে মাত্র ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়লো কেনো? ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও তো ৭ম সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছিলো ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ৮ম এবং নবম সংসদেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোট পড়েছিলো যথাক্রমে ৭৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ৮৭ দশমিক ১ শতাংশ। আমরা শেখ হাসিনার আমলে অনুষ্ঠিত তামাশার নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের শতাংশ দেখাইনি। সুতরাং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রদত্ত ভোটের শতকরা হারের চেয়ে এবার উৎসবমুখর পরিবেশে ‘প্রদত্ত ভোটের হার ২৭ শতাংশ বা ১৫ শতাংশ কম হলো কেনো?’ এগুলো হলো কঠিন বাস্তব। আমরা যে পরিসংখ্যান দিয়েছি সেটি সরকারি এবং নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান।
কেয়ারটেকার সরকারের আমলে প্রদত্ত ভোটের শতকরা হারের তুলনায় সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে ভোটের শতকরা হার কম হওয়া ছাড়াও অন্তত ৩২টি আসনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বা ভোট গণনায় কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। এ ৩২টি সংসদীয় আসনে ভোট পুনরায় গণনা করারও দাবি উঠেছিলো। এসব অভিযোগকে গভীরভাবে খতিয়ে দেখার পূর্বেই ইলেকশন কমিশন অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে ২৪ থেকে ৩২ ঘন্টার মধ্যেই নির্বাচনী ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করেছে এবং এভাবে তাদের হাত মুছে ফেলেছে।
সেনাবাহিনীর ভূমিকা এ নির্বাচনে ছিলো প্রশংসনীয়। তারা ভোট কেন্দ্র থেকে দূরে দলীয় প্রচারকদেরকে আটকে রেখেছিলো। তাই কোনো দলই ভোটারদের ভোটদান করা থেকে বিরত রাখা বা ভোটকেন্দ্রে আসা থেকে বিরত রাখার জন্য জোরজবরদস্তি করতে পারেনি। কিন্তু ১১ দলীয় জোট যেটি অভিযোগ করেছে সেটি হলো ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বা ভোট গণনায় কারচুপি। এসম্পর্কে জোটগতভাবে ১১ দলীয় জোট এবং একাধিক প্রার্থী একাধিক সংবাদ সম্মেলন করে প্রিজাইডিং অফিসারের স্বাক্ষর করা রেজাল্ট শিট সাংবাদিকদের দেখিয়েছেন। সেখান থেকে দেখা গেছে কিভাবে ব্যালট ট্যাম্পারিং করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সহযোগী ১১ দলীয় জোট একটি নিয়মতান্ত্রিক, অহিংস এবং শান্তিপূর্ণ রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তাই তারা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেননি। অভিযোগ করার সময় একটি বিষয় তারা মাথায় রেখেছিলেন যে, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদি স্বৈরাচার ৩টি তামাশার নির্বাচন করেছে। এবার যদি ব্যালট ট্যাম্পারিংয়ের অভিযোগে তারা কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে যান তাহলে গণতন্ত্রে উত্তরণ বাধাগ্রস্ত হবে। গণনা সঠিক হলে তাদের সদস্য সংখ্যা ৭৭ থেকে আরো বৃদ্ধি পেতে পারতো। তবুও অরাজকতা যেনো ফিরে না আসে সেজন্য নিজেদের ক্ষতি স্বীকার করেও তারা ঐ নির্বাচনী ফলাফল মেনে নিয়েছেন।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর যে নির্বাচন হলো সে নির্বাচনে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণ শুরু হয় নেতিবাচক ঘটনা দিয়ে। প্রথমে বিএনপি জোটের সদস্যরা এমপি হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। তারপর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ মোতাবেক সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ গ্রহণে বিএনপিদলীয় জোট সদস্যরা অস্বীকার করেন। তাদের অস্বীকৃতি দেখে জামায়াত জোটের ৭৭ জন সদস্য প্রথমে বলেন যে, তারা এমপি হিসাবে বা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে- অর্থাৎ কোনো পরিষদ বা সংসদের সদস্য হিসাবে শপথ গ্রহণ করবেন না। অতঃপর অকুস্থলেই জামায়াত জোট সদস্যরা তাৎক্ষণিক সভায় মিলিত হন। ঘন্টাব্যাপী বৈঠকের পর জামায়াত জোট সদস্যরা এমপি এবং সংস্কার পরিষদ উভয় সংসদের সদস্য হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন।
বিএনপি জোটের সদস্যরা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ গ্রহণ না করায় জামায়াত জোটের সদস্যরা ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত হন। তাদের ক্ষোভের প্রকাশ হিসাবে তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান বর্জন করেন। ছোটকালে আমরা পত্রিকায় পড়েছি দুটি শব্দ, ‘যাত্রা নাস্তি’। অর্থাৎ যে যাত্রাটি শুভ হলো না। বিএনপি সদস্যদের এ শপথ গ্রহণ না করা শুধুমাত্র জামায়াত জোটের মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বর্জন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন না। তারা মনে করেন, এর ফল হবে সুদূরপ্রসারী।
জামায়াত আমীর বলেন, আমরা প্রতিবাদ করবো সংসদের ভেতরে এবং সংসদের বাইরে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল নিজেদের মধ্যে প্রশ্ন করছেন যে, শুরুতে যে বিষয়টি নিয়ে মতভিন্নতা এবং বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে সেটি রীতিমতো একটি মৌলিক প্রশ্ন। এ মৌলিক প্রশ্নটি সংবিধান এবং বিচার বিভাগের সাথেও সংশ্লিষ্ট।
১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদের দক্ষিণ প্লাজা যখন সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেওয়া না নেওয়ার প্রশ্নে উত্তপ্ত ছিলো তখন একজন আইনজীবী হাইকোর্টে একটি রীট দায়ের করেন। রিটে প্রধানত যে বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো হলো, ‘জুলাই সনদ’ (July Charter) নামে যে নীতিমালা বা ঘোষণা অনুসারে সংস্কার পরিষদ গঠন করা হয়েছে, তা সংবিধানসম্মত কি না। সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ গ্রহণের আইনগত ভিত্তি আছে কি না? সংবিধানে উল্লেখ না থাকা সত্ত্বেও নির্বাহী আদেশে এমন একটি পরিষদ গঠন করা বৈধ কি না। পরিষদ ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় বা সাংবিধানিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারবে কি না সেটিও বিচারিক ব্যাখ্যার জন্য চাওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহে এই রীট আবেদনের শুনানি শুরু হবে।
শপথ গ্রহণ না করার পক্ষে বিএনপির জনাব সালাহ উদ্দিন আহমেদ (বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ কোনো নির্বাচিত সংসদে অনুমোদিত নয়, তাই এটিকে কার্যকর করতে প্রশাসনিক আদেশ জারি করা সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি করে। তিনি আরো বলেন, সংবিধান সংস্কারের ক্ষমতা শুধুমাত্র জাতীয় সংসদের, নির্বাহী বিভাগের নয়। “জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫” জারির মাধ্যমে সংবিধানের স্বাভাবিক সংশোধন প্রক্রিয়া পাশ কাটানো হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সালাহ উদ্দিন আহমেদের মতে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪২ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের একমাত্র পথ সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট। কোনো জাতীয় সনদ বা রাজনৈতিক চুক্তি সরাসরি সাংবিধানিক ক্ষমতা সৃষ্টি করতে পারে না।
সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণের পক্ষে আইনজীবী শিশির মনির যে যুক্তি তুলে ধরেছেন তার সংক্ষিপ্ত সার হলো, এটি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা পূরণের আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি। তার মতে, এ সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংবিধানের আমূল সংস্কার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গণতান্ত্রিকীকরণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব, যা জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠিত করবে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ ও এর সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবগুলোর পক্ষে রায় দিয়েছেন। এ গণভোটের ইতিবাচক ফলের আলোকে শপথ গ্রহণ জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। তিনি আরো বলেন, এ সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংবিধানের ৮৪টি ধারা সংশোধন করার এবং একটি উচ্চকক্ষ গঠনের সুপারিশ রয়েছে।
জনাব সালাহ উদ্দিন ও শিশির মনিরের বক্তব্য ও যুক্তিতর্ক একপাশে রেখেও বলা যায় যে, একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা নিহিত রয়েছে তার জনগণের কাছে। কারণ সংবিধান মোতাবেক রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। সে জনগণ গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ জারি করার পক্ষে রায় দিয়েছেন। এখন সে রায় উপেক্ষা করা রাষ্ট্রের ১৮ কোটি জনগণকে উপেক্ষা করারই শামিল। এ তো সেদিনের কথা। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে ড. ইউনূসের পক্ষ থেকে ড. আলী রিয়াজ সমস্ত রাজনৈতিক দল এবং ৫ জন সংবিধান বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করেছেন। এসব ম্যারাথন আলোচনার পর গণভোট অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। বিএনপি প্রথমে গণভোট অনুষ্ঠানে রাজি ছিলো না। পরে সংস্কার নিয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হলে বিএনপি গণভোটে রাজি হয়। বিএনপির সম্মতিক্রমেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে হ্যাঁ’র পক্ষে ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ ভোট। না’র পক্ষে ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ ভোট। অর্থাৎ গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে ২ কোটি ৫৫ লাখ ৮ হাজার ৮০২ ভোটের ব্যাবধানে।
অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলতে হয়, People have spoken out, অর্থাৎ জনগণ কথা বলেছেন। গণভোট সংসদ সদস্যদের ওপর ম্যানডেটরি বা বাধ্যতামূলক। বিএনপি বলতে চাচ্ছে, তারা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। তাই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা গণভোটেরও ওপরে। কিন্তু যে আদেশের কথা বলা হচ্ছে (জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নাদেশ) সেটি কোনো প্রেসিডেনশিয়াল অধ্যাদেশ নয়। এটি জনগণের সরকারের (ইন্টারিম সরকার) প্রোক্লামেশন। প্রোক্লামেশনের বাংলা করা হয়েছে আদেশ।
সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, প্রেসিডেন্টের এ আদেশ সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। সব কথাতেই বিএনপি সংবিধানকে টেনে আনছে। সংবিধান নিয়ে বেশি কছলালে লেবু কছলানোর মতো তিতা হয়ে যাবে। নাড়ি ধরে টান পড়বে। যে নির্বাচনটি হয়ে গেলো সেটি কোন সংবিধানের কোন আদেশ মোতাবেক হয়েছে? এত সংবিধান সংবিধান করলে তো জাতীয় সংসদ ভাঙার (৬ অগাস্ট ২০২৪) ৩ মাসের মধ্যে ইলেকশন করতে হতো। এখন তো হলো ১৮ মাস পর।
তাই ঐ মুজিববাদি সংবিধানের কথা বাদ দিন। জুলাই বিপ্লব ছিলো ১৮ কোটি মানুষের বিপ্লব। জুলাই সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ ঐ ১৮ কোটি মানুষ থেকে উৎসারিত। এটির বৈধতা হাইকোর্টে রীটের ব্যাপার নয়। জনগণের সার্বভৌমত্বের ব্যাপার।