ড. হাসান তাজদিদ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষুদ্র এক দ্বীপ রাষ্ট্র আমাদের বাংলাদেশ। আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও অমার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। জনৈক জাপানি কৃষিবিদ বলেছিলেন- তোমরা আমাকে একটি বাংলাদেশ দাও আমি তোমাদের দ্বিতীয় জাপান দিব। এশিয়ার উদীয়মান একটি দেশের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান বলেছিলেন- কতিপয় নিয়মতান্ত্রিকতার প্রতিফলন হলেই বাংলাদেশকে অতি দ্রুত সিংগাপুরের মতো উন্নত ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব।
আমাদের এদেশে সম্পদের কমতি নেই। প্রাণীজ, ফলজ, বনজ ও জলজ সম্পদে সমৃদ্ধ এ দেশ। বিশেষত জনসম্পদের এত সহজ প্রাপ্তি পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে মেলা দুস্কর। স্বল্প মূল্যে শ্রম প্রাপ্তির সরল হিসেব কেবল বাংলাদেশের মতোই দেশেই করা যায়। আমাদের অভাব কোথায়? আমাদের অভাব আন্তরিকতায়। আমাদের অভাব দক্ষ পরিচালনার। দেশের রাজনৈতিক শিষ্টাচার দ্বিচারীতায় ভরপুর। আমলাতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত আমাদের দেশ। দেশে আজ ব্যবসার মূলনীতি মজুতদারীতা ও মুনাফাখোরীতে সদা ডুবন্ত। দেশের নির্বাচন পরিচালকগোষ্ঠীর যাচাই-বাছাইয়ে প্রায়শ প্রতারণার স্বীকার দেশের আম-জনতা। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি। বিশ্বের মানচিত্রে নতুন দেশের স্থান পাবার কারণে সত্যিই আমরা স্রষ্টার প্রতি চির কৃতজ্ঞ।
স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত বারোটি নির্বাচন দেশে হয়েছে। দু-একটি নির্বাচন ব্যতিত কোনো নির্বাচনই মাণোত্তীর্ণ হয়নি। আমি-ডামি বা নিশিরাতের নির্বাচন ছাড়া কোনো সংসদই তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। জাতি হিসেবে নিশ্চয়ই এটি দুর্ভাগ্যের। আমাদের দেশ, দেশের জনগণ বারবার গণতন্ত্রকে ধারণ করতে চেয়েছে। গণতন্ত্রের অভিযাত্রী হিসেবে নিজেকে সাজিয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকবারই রণে ভঙ্গ দিয়েছে। কোনো সংসদই তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। কোনো রাজনীতিকই দেশের গণতন্ত্র টেকসই করতে সামান্যতম ভূমিকা রাখতে সচেষ্ট হয়নি কিংবা সে সুযোগও তাকে দেয়া হয়নি।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন হয়নি কখনই। জাতির ললাটে সর্বদা জুটেছে ব্যর্থতার তিলক। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার একটি সামরিক ক্যু-র মাধ্যমে ক্ষমতায় আসীন হয়। দীর্ঘ নয় বৎসর জাতির উপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে থাকে। মেহনতি, শ্রমিক, জনতার রক্তে রজ্ঞিত করে তার হাত। মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়। বাক স্বাধীনতা সীমিত হয়ে আসে। জনমনে তীব্র অসন্তোষ দানা বাধে। জনতা রাজপথে নামে। স্বৈরাচারের বিরূদ্ধে স্লোগান দেয়। সারাদেশ উত্তাল হয়। কার্ফ্যু, মার্শাল ল’ দেয় স্বৈরাচার। উত্তাল প্রতিবাদে ফেটে পড়ে দেশ-জনতা। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিলে যোগ দেয় সাধারণ মানুষ। সব রাজনৈতিক দল এক কাতারে আসে। সম্মিলিত রাজনৈতিক দলের যুগপৎ কর্মসূচি, জনতার নির্ভিক আন্দোলন, পেশাজীবী জনগোষ্ঠীর এক দফা, শ্রমিক শ্রেণির দুর্বার আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার ক্ষমতার মসনদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়।
দেশ এবার গণতন্ত্রের সফল অভিযাত্রার মহাসড়কে পথচলা শুরু করে। দেশের মানুষ গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। দেশে অন্তর্বর্তিকালীন কেয়ার টেকার সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেকদিন পর মানুষ স্বাধীন মতামতের আশায় উজ্জীবিত হয়। নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করবার সুযোগ পায়। দীর্ঘ সময় পর দেশে একটি ভালো নির্বাচন হয়। জনমতের প্রতিফলন ঘটে। গণতন্ত্রের শুরুতেই গণতন্ত্রকে পেরেক বিদ্ধ করে নির্বাচনে পরাজিত দল। বেফাঁস মন্তব্য ছুড়ে মারে। নির্বাচনে সুক্ষè কারচুপির অভিযোগ তোলে। যাহোক দেশ খুড়িয়ে খুড়িয়ে এগিয়ে চলে।
অল্পদিনের মাথায় নতুন ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতার মোহে জড়িয়ে যায়। ক্ষমতার মসনদ টেকসই করতে মরিয়া হয়ে উঠে। অকস্মাৎ কেয়ার টেকার সরকার পদ্ধতি অস্বীকার করে বসে। দেশে আবারও অস্থিরতা শুরু হয়। যারা সরকার গঠন করেছিল তাদেরই মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি হয়। রাজপথে মুখোমুখি হয় তারা। বিরোধীরা এক প্লাটফর্মে সংগঠিত হয়। সরকার একটি অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন করে। জন-আন্দোলনের তীব্রতায় ক্ষমতা ছাড়ে সরকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচনের ব্যবস্থা করে। নির্বাচন হয়। ক্ষমতার পালাবদলও হয়। গণতন্ত্রের অভিযাত্রা নতুন মাত্রা পায়। বিরোধী তথা পরাজিত দল এবার নির্বাচনে পুকুর চুরির অভিযোগ নিয়ে আসে।
এবারের নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদল হয়। এ সরকার তার পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিমালায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে। যা দেশের মানুষ ইতিবাচকভাবে নিতে পারেনি। নির্ধারিত সময়ের আগেই জন-আন্দোলনের তোপের মুখে সরকার জন-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সরকারের পতন হয়।
সাধারণ নির্বাচনে আবারও মসনদ অধিকারীর পরিবর্তন হয়। জাতীয়তাবাদী ও ইসলামি শক্তি ক্ষমতায় আসে। ঘাত-প্রতিঘাতে ক্ষত-বিক্ষত গণতন্ত্র সামনে এগোনোর চেষ্টা করে। সরকারের মেয়াদ শেষ হবার আগেই দেশে অস্থিরতা প্রকট আকার ধারণ করে। সরকারের অবস্থান বিনষ্ট করতে তৎকালীন বিরোধীদল রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের আশ্রয় নেয়।২০০৬ সালে লগি-বৈঠার তাণ্ডবের নজিরবিহীন ঘটনা ঘটায়। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে দেশে সামরিক ক্যু হয়। ফখরুদ্দিন মঈনুদ্দিনের নেতৃত্বে সেনা সমর্থিত সরকার গঠন হয়। গণতন্ত্র এবার প্রকৃতার্থেই হোচট খায়।
দু’বৎসরের সেনা শাসনের অবসান ঘটে একটি নির্বাচনের মাধ্যমে। নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিজয়ী শক্তি। বিজয়ী শক্তি বেপরোয়া হয়। কেয়ার টেকার ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। জাতির উপর জেকে বসে। দেশ রাজনৈতিক দেওলিয়াত্বের আবরণে আটকে যায়। বিরোধী মতের সকল আন্দোলন দমন করে ক্ষমতাসীন সরকার। নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতা হয়। সারাদেশে জ¦ালাও পোড়াও চলে। মেয়াদান্তে অশান্তি ও কারচুপির নির্বাচনে একতরফাভাবে হাতিয়ে নেয় ক্ষমতার মসনদ। গণতন্ত্রের এবার আত্মহত্যার জোগাড় হবার অবস্থা।
এভাবে কেটে যায় পাঁচটি বছর। প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠান করে ক্ষমতাসীন সরকার। ভোটের আগের রাতে ভোট দান কর্ম সম্পন্ন করে। জনগণ এটিকে নিশিরাতের নির্বাচন হিসেবে চিহ্নিত করে। দেশের স্বাধীকার, মানবাধিকার যেন নাই হয়ে যায়। সরকারি সমর্থনের বাইরে সকলের সময় কাটে তটস্থ অবস্থায়। কেটে যায় আরো পাঁচ বৎসর। অনুষ্ঠিত হয় আমি-ডামির নির্বাচন। সকল দিক হতে সরকারের অবস্থা আরো পোক্ত হয়। কোনো আন্দোলন, প্রতিবাদ, সংগ্রাম, প্রতিরোধ কিছুতেই কিছু হয় না। দেশের আশাহত মানুষ ভাগ্যকে মেনে নিয়ে ঠোটে ঠোট চেপে দিন পার করে।
আকস্মিক দেশের মেধাবী ছাত্রসমাজ কোটা আন্দোলনের ডাক দেয়। কোটার অপসারণ. মেধার প্রতিস্থাপন, বৈষম্য মুক্তির আহ্বানে দেশের ছাত্রসমাজ এক হয়। ছত্রিশ দিনের তুমুল আন্দোলনে ক্ষমতাসীনদের তখতে তাউস কেঁপে উঠে। আন্দোলন দমনে ব্যর্থ হয়ে সমঝোতার প্রস্তাব দেয়। দাবি মেনে নিতে রাজী হয়। ততদিনে আন্দোলনে ছাত্র-জনতা দাবি আদায়ে একাকার। দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের স্বৈরাচারী শাসন আর স্বেচ্ছাচারী সরকারের অপসৃয়মানতা জাতি প্রত্যক্ষ করে। দেশবাসী আস্বাদন করে নতুন স্বাধীনতার স্বাদ। ফিরে পায় বাক স্বাধীনতা, মানবাধিকারের স্পর্শ।
দেশে কায়েম হয় অন্তর্বর্তিকালীন সরকার। নতুন স্বাধীনতার লাল সূর্যোদয়ের কিরণ সিক্ত জাতি তাদের আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ গড়বার নতুন স্বপ্নে বিভোর হয়। আন্দোলন, জুলাই সনদ, গণভোট, জাতীয় নির্বাচনের টাইম ফ্রেম নিয়ে রাজনীতিকদের মাঝে কিঞ্চিৎ মত-পার্থক্য থাকলেও ফ্যাসিস্ট পদায়ন বা পূনর্বাসন প্রশ্নে সবাই একমত যে, এ দেশে আর কখনই ফ্যাসিস্টের দাম্ভিকতা মেনে নেয়া হবে না। প্রয়োজনে আবারও জন্ম নেবে জুলাই আন্দোলনের।
দেশ আজ নির্বাচনমুখি। ছাত্র-জনতার দাবির মুখে আগেভাগেই ডাকসু, রাকসু, জাকসু, চাকসু ও জকসুতে নির্বাচন দেয়া হয়। দেশের তরুণসমাজের প্রতিনিধিত্বকারী ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা তাদের স্বাধীন মতামতের প্রতিফলন ঘটায়। সবকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশপ্রেমিক ছাত্রগোষ্ঠী, বিশ্বাসী চেতনার ধারকরা ভূমিধস বিজয়ের স্বর্ণালী সাক্ষাতের স্পর্শে স্নাত হয়। বিশ্বাসের বিজয়ে ধান্দাবাজ, চাঁদাবাজরা হোচট খায়। শাহ জালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাকসু) নির্বাচনের তফসিল হলে বিশ্বাসীদের আরেক ভূমিধস বিজয়ের আতঙ্কে কেঁপে উঠে। নানান অজুহাত ও অযৌক্তিক চাপ প্রয়োগে নির্বাচন বন্ধ করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বাধ্য করে।
আর মাত্র দু’সপ্তাহ। দেশে সাধারণ নির্বাচন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রতিক বরাদ্দ শেষ। সর্বত্র চলছে মিছিল, মিটিং, জনসংযোগ, জনসমাবেশ, নির্বাচনী ক্যাম্পেইন, উঠোন বৈঠক, চায়ের কাপে ঝড়। দেশের তরুনসমাজ দীর্ঘদিন পর ভোট দিবে। ভোটের আনন্দে তারা শিহরিত। দেশ পরিচালনায় তারা আদর্শের প্রতিফলন চায়। স্ট্যান্ডবাজি, চান্দাবাজি, চাপাবাজির আস্ফালন দেখতে চায় না। তার সামন্যতম ইঙ্গিত তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দিয়েছে। তারা নির্বিবাদে আদর্শের প্রবক্তাদের সমর্থন জানিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সংস্কারের ঢেউ লেগেছে। গোটা জাতি অভিভুত- নতুন ছাত্র নেতৃত্বের আদর্শিক দৃঢ়তায়। তাদের সংস্কার কর্মসূচিতে দেশ ও দেশের মানুষ আপ্লুত। সবাই বলছে- এমন ভার্সিটিই তো চাই। দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত ক্যাম্পাস চাই।
গিয়েছিলাম রংপুর বিভাগের প্রান্তিক জিলা নীলফামারীতে। নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটী বন্দরে। সারাদিন ছিলাম। অনেকের সাথেই কথা হলো। রিক্সাওয়ালা, দিনমজুর, মেহনতি মানুষ, শ্রমজীবী, রেল শ্রমিক সবার সাথে। তাদের কথার ধরণটাও খুব আনন্দের, মজার। তাদের অনেককে ভোট সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। চাচা, এবার কী ভাবছেন? মধ্যবয়ষী এক মেহনতি চাচার হাসিমুখের আঞ্চলিক উচ্চারণ ছিল এ রকম- বাউ, হাকাউ এলা কতা হামাক পুচ করিস না বাউ। হামরা লেখাপড়া না জানো বাউ। উমরা ভার্সিটিত পড়ে, উমরা শিক্ষিত ছাওয়াল, উমরা যাক ভোট দিচে হামরা তাকিই ভোট দিমু বাউ।
দেশ-জনতা আজ তারুণ্যের পথে হাঁটছে। তারুণ্যের চিন্তাকে তারা ব্যালটে বাস্তবায়ন করতে চায়। আর তারুণ্যের ভোট অবশ্যই আদর্শের পক্ষে হবে। দেশ-জনতা মনে করছে-আদর্শিক লড়াইয়ে তাদের সাড়া হবে ইতিবাচক। আর তরুণরা বৈষম্যহীনতার প্রতিষ্ঠায় তাদের লক্ষ্য জানিয়ে দিয়েছে স্ব-স্ব সংসদ নির্বাচনে। সবার যেন এক কথা- ডাকসু রাকসু যে পথে/ দেশ যাবে সে পথে।।
লেখক : পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।