মনসুর আহমদ

আধিপত্য শব্দটি অধিপতি থেকে উদ্ভুত, যার অর্থ প্রভু বা মালিক। এক সময় ভারতের মালিক ছিল মুসলমানরা। তখন ভারতের মালিকানা বা আধিপত্য ছিল মুসলমানদের হাতে। কিন্তু পলাশী যুদ্ধের পরে ইংরেজদের চক্রান্ত ও সহায়তায় ভারতের আধিপত্য চলে যায় হিন্দুদের হাতে। পলাশী যুদ্ধের পরে প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে বাঙালী হিন্দুরা যুক্ত বাংলার প্রশাসনিক প্রায় সব পদগুলো অধিকার করে বসে ছিল এবং তারা বিরাট জমিদার গোষ্ঠীতে পরিণত হয়ে রাজস্ব বিষয়ক সকল কর্মই কুক্ষীগত করে ফেলেছিল। তারা চেয়েছিল বাংলায় মুসলমান শাসনের পরিসমাপ্তি। শ্রী মজুমদারের ভাষায়, “হিন্দু জমিদারেরা নবাবের উপর সন্তুষ্ট ছিল না। অতএব তারা বাংলার মসনদ থেকে মুসলমান নবাবকে সরিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠবে একং মুসলমানী শাহী লুপ্ত করতে ব্যগ্র হয়ে উঠবে, মোটেই বিচিত্র নয়।তখন নতুন দিগন্তের দ্বার খুলে গেছে এবং পশ্চিমের খোলা দ্বার দিয়ে যারা বাংলার তথা উপমহাদেশের বুকে থাবা বিস্তারের জন্য শনৈঃ শনৈঃ অগ্রসর হচ্ছে, সেই ইংরেজদের সঙ্গে মিতালিতে হিন্দুরা মত্ত হয়ে পড়বে, তাও বিচিত্র নয়। কারণ শাসনদণ্ডের হাত ফের হলে হিন্দু সমাজই লাভবান হবে বেশি মুসলমানদের চেয়ে। প্রভুত্ব যদি আর কারও মানতেই হয়, তা হলে ইংরেজদের ও মুসলমানদের মধ্যে হিন্দু সমাজের মধ্যে কোনও পার্থক্য ঠেকেনি বরং এই প্রভু বদলের মাধ্যমে উচ্চাভিলাষী হিন্দু সমাজ নিজের মঙ্গল ও উন্নতির পথই সন্ধান করে ছিল। এটাই ছিল মুসলমানী শাসন আমলের পরিসমাপ্তি সাধনে বাংলার উচ্চ বর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের অপ্রত্যাশিত ভূমিকা।”

এক সময় ইংরেজদের কারসাজিতে হিন্দুদের হাতে ভারতের আধিপত্য চলে গেল। ফলে হিন্দু ও ইংরেজদের কবল থেকে মুক্তি লাভের জন্য মুসলমানরা রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু করল। রাজনৈতিক আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসক বিষয়ক আইন অনুসারে ১৯৩৭ সালে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তার ফলে কংগ্রেস সাতটি প্রদেশে মন্ত্রী সভা গঠন করতে সক্ষম হয়েছিল।মন্ত্রী সভা গঠন করে হিন্দুরা মুসলমানদের সাথে আধিপত্য চলিয়ে ছিল তা ছিল খুব বেদনা দায়ক। প্রায় সাতশো বছর পর এই প্রথম ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে হিন্দুরা উন্মত্ত হয়ে ওঠে এবং নিরীহ মুসলমানদের উপর নির্মম অত্যাচার চালায়।

কংগ্রেস হিন্দু সংখ্যা গুরু প্রদেশে এমন শাসন পদ্ধতি অবলম্বন করে যে মুসলমানদেরকে কার্যকর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ উভয় কাজ থেকে বেদখল করে দেয়া হয়। হিন্দু সংখ্যা গরিষ্ঠ শাসিত প্রদেশে মুসলমান মন্ত্রীদের মর্যাদা ভৃত্যের বেশি কিছু ছিল না। কংগ্রেস হিন্দু সংখ্যা গরিষ্ঠ প্রদেশগুলোতে মন্ত্রীসভা গঠন শেষ করে মুসলিম সংখ্যাগুরু প্রদেশগুলোর দিকে নজর দিল। যে সমস্ত প্রদেশগুলিতে কংগ্রেস সরকার গঠন করেছিল সে সমস্ত প্রদেশে স্থানীয় কংগ্রেস কমিটিগুলো সমানতরাল সরকার হিসেবে কাজ করতে থাকে। এ সমস্ত প্রদেশের হিন্দু জনসাধারণের মনে ধারণা জন্মে যে হিন্দু রাজত্ব কায়েম হয়ে গেছে।

ভারতীয়দের আধিপত্যের ধারা চলমান। ভারত দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় রাষ্ট্র,ভৌগোলিক আয়তন, জনসংখ্যা,অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিÑসব দিক থেকেই। এ বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রশ্ন আলোচিত: ভারতীয় আধিপত্য কি বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক? এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্রিক নয়; বরং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

১. ভৌগোলিক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা : বাংলাদেশ প্রায় তিন দিক থেকে ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত। এই ভৌগোলিক অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশকে ভারতের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে, বিশেষ করে স্থলপথ, নদীপথ ও ট্রানজিট ইস্যুতে। কোনো বড় রাষ্ট্র যখন তার প্রতিবেশী ছোট রাষ্ট্রের চারপাশে অবস্থান করে, তখন শক্তির অসমতা থেকে আধিপত্যের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নদীর পানিবণ্টন, অভিবাসন ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারতের প্রভাব বাংলাদেশের জন্য কখনো কখনো চাপে পরিণত হয়েছে।

২. নদীর পানিবণ্টন ও পরিবেশগত ঝুঁকি : ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি হলো অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন। ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তা চুক্তির অচলাবস্থা এবং উজানে একতরফা অবকাঠামো নির্মাণ বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ ও জীবিকায় বিরূপ প্রভাব ফেলেছে, এমন অভিযোগ বহুদিনের। ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন রয়েছে। পানি বণ্টন চুক্তি সত্ত্বেও বাস্তব প্রয়োাগ নিয়ে প্রশ্ন ও অসন্তোষ দেখা যায়। অভ্যন্তরীণভাবে এটি পানি নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। পানির মতো জীবনঘনিষ্ঠ সম্পদে একতরফা সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

৩. অর্থনৈতিক সম্পর্ক: সুযোগ ও ঝুঁকি : ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। তবে বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের বিপক্ষে। ভারতীয় পণ্যের সহজ প্রবেশের বিপরীতে বাংলাদেশের রপ্তানিতে নন-ট্যারিফ বাধা, মানদণ্ড ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, এমন অভিযোগ আছে। আবার বিদ্যুৎ আমদানি, ট্রানজিট ও অবকাঠামোতে ভারতের অংশগ্রহণ উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করলেও, অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।

৪. নিরাপত্তা ও সীমান্ত ইস্যু : সীমান্ত হত্যা, চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ, এসব ইস্যু দুই দেশের জন্যই উদ্বেগের। তবে সীমান্তে শক্তি প্রয়োগ ও মানবাধিকার প্রশ্নে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশের সমাজে সমালোচনা আছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সমস্যার সবচেয়ে গুরুতর ও আলোচিত দিক হলো সীমান্ত হত্যা। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ ((BSF) কর্তৃক বাংলাদেশী নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নিরাপত্তা সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, তা যেন সমতার ভিত্তিতে হয়, এই প্রত্যাশা জোরালো।

৫. অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাবের অভিযোগ : অভিযোগ রয়েছে যে ভারত অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে। নির্বাচন, নীতিনির্ধারণ বা কৌশলগত সিদ্ধান্তে বাহ্যিক প্রভাবের ধারণা থাকলে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। যদিও কূটনীতিতে পারস্পরিক স্বার্থ থাকে, তবু অতিরিক্ত প্রভাব গ্রহণযোগ্য নয়।

৬. আঞ্চলিক রাজনীতি ও শক্তির ভারসাম্য : দক্ষিণ এশিয়ায় চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার উপস্থিতি বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে বহুমুখী কূটনীতি অবলম্বন করতে হয়। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে অন্যান্য শক্তির সঙ্গেও ভারসাম্য রক্ষা করা বাংলাদেশের কৌশলগত স্বার্থে জরুরি। একক আধিপত্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করতে পারে।

৭. বাংলাদেশের করণীয় : ভারতীয় আধিপত্যের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের করণীয়গুলো হলো- স্বার্থভিত্তিক কূটনীতি: আবেগ নয়, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার। অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ: বাণিজ্য ও বিনিয়োগে বিকল্প অংশীদার খোঁজা। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক জোট: বিমসটেক, আসিয়ান সংযোগ, ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: নদী, সীমান্ত ও বাণিজ্য আলোচনায় তথ্যভিত্তিক অবস্থান। জনস্বার্থ ও স্বচ্ছতা: চুক্তি ও সহযোগিতায় জনআস্থা নিশ্চিত করা।

উপসংহার : ভারতীয় আধিপত্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক- এমন বলা সরলীকরণ হবে। ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও অংশীদার; সহযোগিতা থেকে বাংলাদেশ লাভবানও হয়েছে। তবে শক্তির অসমতা থেকে ঝুঁকি বাস্তব, বিশেষত পানিবণ্টন, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে। তাই বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত, ভারতের সঙ্গে সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বার্থের ভারসাম্য নিশ্চিত করে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া। শক্তিশালী কূটনীতি ও বহুমুখী সম্পর্কই একমাত্র পথ, যাতে আধিপত্য নয় সহযোগিতাই সম্পর্কের ভিত্তি হয়।