মোহাম্মদ ইউনুছ
শোষণ ও বৈষম্যহীন, দুর্নীতি ও পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত একটি রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যেই দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। আপামর ছাত্র-জনতার বীরত্বপূর্ণ লড়াই এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র অর্জন করি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হয়ে গেলেও বাংলার মানুষ স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল আজও পায়নি।
যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, তারাই বারবার জনগণের অধিকার হরণ করেছে। আজ স্বাধীন দেশেই খুন, গুম নিত্যদিনের ঘটনা। যুবক, ডেসটিনি, ইউনিপে-এর মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হয়েছে। ২০১১ সালে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারির মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। ২০১১-১২ সালে বেসিক ব্যাংকে ৪৫০০ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি হয়। ২০১২-১৩ সালে জনতা ব্যাংকসহ চারটি ব্যাংক থেকে বিসমিল্লাহ গ্রুপ ১২০০ কোটি টাকা লোপাট করে। এনট্যাক্সের মাধ্যমে জনতা ব্যাংকের ৫৫০৪ কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারিও এর উদাহরণ। এসব দুর্নীতি ও লুটপাটের একটিরও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয়নি। বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষ। ডক্টর দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের টাস্কফোর্স রিপোর্ট অনুযায়ী শেখ হাসিনার আমলে অন্তত ২৩৪ কোটি মার্কিন ডলার দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়েছে, আর তার বোঝা বইতে হয়েছে জনগণকে।
অথচ আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় স্পষ্টভাবে বলা আছে-রাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা, যেখানে আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা; কর্মসংস্থান ও ন্যায্য মজুরি; বিশ্রাম ও বিনোদন; এবং সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা এসব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারিনি। উন্নয়ন ও অধিকার নিয়ে ভাবনার বদলে আজও আমরা বিভাজনের রাজনীতিতে সময় নষ্ট করছি। রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরকে গালাগালি ও বিষোদ্গারে ব্যস্ত। অনেকেই রাজনীতিকে জনগণের সেবা নয়, বরং পেশা, ধান্দা কিংবা রাতারাতি অর্থ কামানোর মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে।
স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ পেতে হলে রাজনীতি হতে হবে জনগণের কল্যাণে। বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করে সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। রাজনীতিবিদদের জনগণের শাসক নয়, সেবক হতে হবে। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে সব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। যাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, কিংবা যাদের কোনো দৃশ্যমান সামাজিক অবদান নেই, তাদের দলীয় পদ বা নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশ প্রায় তিন দিক থেকে ভারতের দ্বারা বেষ্টিত। ভারতের সঙ্গে আমাদের সীমান্ত প্রায় ৪০৯৬ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটার। স্বাধীনতার পর থেকে ভারত আমাদের সঙ্গে প্রকৃত প্রতিবেশীর মতো আচরণ না করে প্রভুত্বসুলভ আচরণ করে আসছে। ক্ষমতালোভী কিছু রাজনৈতিক দলের সহযোগিতায় তারা এ দেশে প্রভাব বিস্তার করেছে। Human Rights Support
Society (HRSS)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিএসএফের গুলীতে ৩০৫ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন।
১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ৩০ বছরের চুক্তি হলেও বাস্তবে বাংলাদেশ ন্যায্য হিস্যা পায়নি। শুষ্ক মৌসুমে পানি না দিয়ে বর্ষাকালে হঠাৎ পানি ছেড়ে দিয়ে আমাদের প্লাবিত করা হচ্ছে। বাণিজ্য ক্ষেত্রেও চরম বৈষম্য বিদ্যমান। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি ছিল ৯ বিলিয়ন ডলার, অথচ রপ্তানি মাত্র ১.৫৬ বিলিয়ন ডলার। কোনো পূর্ব ঘোষণা ও যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই তৃতীয় দেশে পণ্য পরিবহনে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করে ভারত বাংলাদেশের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাবেরই প্রকাশ ঘটিয়েছে।
বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ভারতের বিতর্কিত ভূমিকা ও দেশীয় কিংবা আন্তর্জাতিক মহলে অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনকে প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। ভারত এ দেশে তাদের অনুগত মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও দালাল শ্রেণী তৈরি করে মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিভাজন সৃষ্টি করে নিজেদের স্বার্থ আদায় করছে।
এই প্রেক্ষাপটে সব দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক শক্তিকে মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা জরুরি। প্রতিটি সেক্টর থেকে দুর্নীতি নির্মূল করতে হবে। নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বদলে আত্মমর্যাদাশীল ও শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি, ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলাই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।