ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা শুরু করেছে মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া ইসরাইল ও তার মিত্র আমেরিকা। নতুন করে হামলা বলতে হচ্ছে এ কারণে যে গত জুনে প্রথমে ইসরাইল ও পরে আমেরিকা ইরানের ওপর হামলা চালায়। ১২ দিন পর যুদ্ধ থামে। সে হামলায় ইরানের অনেক সামরিক নেতা ও পরমাণু বিজ্ঞানী নিহত হন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদের পরমাণু স্থাপনা। যদিও আমেরিকা বলেছিল তা পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে। ইরান বলেছিল কিছু ক্ষতি হলেও তাদের স্থাপনা সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। পাল্টা হামলায় ইসরাইলে ব্যাপক ধ্বংসকাণ্ডের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগ্রহে যুদ্ধ ১২ দিন পর বন্ধ হয়। তার পর কেটে যায় কয়েক মাস। আলোচনার টেবিলে ফিরে আসে আমেরিকা ও ইরান। বিষয় ছিল পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ আলোচনা।

তুরস্কে আলোচনার কথা থাকলেও গত মাসে তা শুরু হয় ওমানে। বার্তা সংস্থার খবর হচ্ছে, ওমানের মধ্যস্থতায় তেহরান, ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনা চলছিল। সে প্রক্রিয়া চলাকালেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইলি শাসকগোষ্ঠী ইরানের ওপর হামলা শুরু করে। তাতে দেশটির সবোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অনেক সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। বিশ্বের শান্তিকামী সব দেশ এ হামলা ও ন্যক্কারজনক ঘটনায় ক্ষুব্ধ এবং এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। প্রতিবাদ জানিয়েছে রাশিয়া, চীন, তুরস্কসহ শান্তিকামী নেতৃবৃন্দ। জাতিসংঘ মহাসচিবও নিন্দা করেছেন। এ হামলার ঘটনায় বলতে গেলে বিশ্ববাসী চমকে ওঠে। আমেরিকা আগের মতোই নিষ্ঠুর খেলায় মেতে উঠেছে। গোটাবিশ্ব তার সাক্ষী। জানা যায় বৃহস্পতিবার ২৬ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় অনুষ্ঠিত সর্বশেষ দফার আলোচনা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছিল। কিন্তু এর পর পরিস্থিতি বদলে গেল। পরে শুরু হওয়া তীব্র সামরিক অভিযানে সেই অগ্রগতি আড়ালে পড়ে যায়। এর আগের সপ্তাহে স্টেট অব দ্য ইউনিয়নের ভাষণে ইরান সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকির কথা উল্লেখ করেছিলেন ট্রাম্প। তবে সেখানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কোনো উল্লেখ ছিল না। তিনি বলেছিলেন, ইরানের সম্ভাব্য সামরিক হুমকির বিষয়টি তিনি কূটনীতির মাধ্যমে সমাধান করতে চান। কিন্তু তিনি কথা রাখেননি। ৮টি যুদ্ধ বন্ধ করে নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবিদার ট্রাম্প শেষে নিজেই যুদ্ধবাজ হিসেবে আবির্ভূত হলেন। আর গোটা বিশ্ব তা তাকিয়ে দেখল।

বার্তা সংস্থাগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে শুরু হওয়া এই নতুন যুদ্ধ ইতিমধ্যে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। কারণ, ইরান তাদের উপসাগরীয় প্রতিবেশী ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র আরব দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ার যে আগের অবস্থান ছিল, যুক্তরাজ্য তা থেকে সরে এসেছে। ফলে যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছে। সুতরাং তা আরো কিছু দিন অব্যাহত থাকতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, আমেরিকা ও ইসরাইলের এ হামলার লক্ষ্য হলো ইরানের সামরিক শক্তি ধ্বংস করা, দেশটিকে নেতৃত্ব শূন্য করা এবং রেজিম চেঞ্জ করা। বিগত কয়েক মাস ধরে ইরানে সরকার বিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম করা হলেও তা কাজে আসেনি। এক সময় তা স্তিমিত হয়ে এসেছে। এখন খামেনিসহ নেতৃবৃন্দ ও সামরিক কর্মকর্তাদের শাহদাতের পর তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে লাখো লোকের সমাবেশ প্রমাণ করে তারা ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। ফলে সেখানে নতুন কিছু করা সহজসাধ্য হবে না বলেই বিশ্লেষকদের মত।

আল-জাজিরা জানাচ্ছে, ইসরাইলের ওপর দশম দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে ইসরাইলজুড়ে ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র তথা বাঙ্কারে অবস্থান নিয়েও স্বস্তি পাচ্ছে না ইহুদিবাদীরা। ইরান রবিবার রাতের প্রথম অংশে ইসরাইলে খুব বেশি আক্রমণ না করলেও সোমবার সকাল থেকে ভারী বোমাবর্ষণ করছে। বিভিন্ন এলাকায় বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পশ্চিম জেরুজালেমের কাছে ইসরাইলি শহর বেইত শেমেশে একটি সুরক্ষিত আশ্রয়কেন্দ্রে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করে। এতে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অন্তত নয়জন নিহতের খবর জানা গেছে। আহত হয়েছে আরও অনেকে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুনে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের তুলনায় এখন আরও বেশি ইসরাইলিকে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে।

আল জাজিরা ও বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, চতুর্থ দিনে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরায় তেল শিল্প অঞ্চলে একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আগুন ধরে যায়। ইসরাইলের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে লেবানন তাদের কয়েকটি ইউনিটের সেনা সরিয়ে নিয়েছে। বাহরাইনের শেখ ইসা এলাকায় একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানঘাঁটি ধ্বংস হয়েছে। ফার্স নিউজ এজেন্সি প্রকাশিত ফুটেজে দেখা গেছে, দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে একের পর এক রকেট বিস্ফোরিত হচ্ছে। ফার্স জানিয়েছে, আইআরজিসির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শেখ ইসা অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে একটি কমান্ড ও স্টাফ বিল্ডিং ধ্বংস হয়েছে। জ্বালানির ট্যাংকে বিস্ফোরণ ঘটেছে। ঘটনা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র এখনও কোনো মন্তব্য করেনি।

ওমানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দুকুম বন্দরে একটি জ্বালানি ট্যাঙ্কারে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। কাতারে সোমবার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যা বিশ্বের মোট সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

ইরানে যৌথ হামলার প্রেক্ষাপটে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে দেশে দেশে : পাকিস্তান, ইরাক, বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইরানে হামলাবিরোধী প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে। পাকিস্তানের করাচিতে মার্কিন কনস্যুলেটের সামনে কয়েক শত মানুষ বিক্ষোভ করে ওই ভবনের ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। এ সময় তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীরা গুলি করে। তাতে কমপক্ষে ৯ পাকিস্তানি নিহত হয়েছেন। ইরাকের রাজধানী বাগদাতে মার্কিন দূতাবাসের কাছে বিক্ষোভ করেন বিপুল পরিমাণ ইরাকি। ঢাকায় মার্কিন বিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। ২ মার্চ দিনভর এসব কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এদিন ম্যাসাচুসেটসের বোস্টনে রাস্তায় নামেন বিক্ষোভকারীরা। নিউইয়র্ক সিটির ম্যানহাটনে বিক্ষোভকারীরা একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশের পর শহরের রাস্তায় শান্তিপূর্ণ মিছিল করেন। ‘হ্যান্ডস অফ ইরান নাউ’ (ইরান থেকে হাত সরাও) স্লোগান দিতে দিতে তারা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র- ইসরাইলের সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলেও। লস অ্যাঞ্জেলসে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে ‘নো ওয়ার অন ইরান’ (ইরানে যুদ্ধ নয়) স্লোগান দেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা বন্ধের দাবি জানান। একই ধরনের প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হয়েছে শিকাগো, পোর্টল্যান্ড এবং ম্যাডিসনেও। শহরগুলোতে শান্তিপূর্ণ মিছিল ও সমাবেশে অংশ নিয়ে বিক্ষোভকারীরা যুদ্ধবিরোধী অবস্থান তুলে ধরেন।

ডেমোক্র্যাটদের আশঙ্কা, ট্রাম্প সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ঘোষণা না করায় ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত অন্তহীন এক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। প্রতিনিধি পরিষদের ইন্টেলিজেন্স কমিটির জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট সদস্য জিম হাইমস যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওকে (এনপিআর) বলেন, ‘এসবের শেষ কোথায়? আমরা ইসরাইলিদের সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ইরানে বোমাবর্ষণ করতে পারি। কিন্তু কিসের আশায় আমরা তা করব?’ হাইমস আরও বলেন, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করাটাই কি উদ্দেশ্য? কিন্তু আকাশপথে বোমা হামলা চালিয়ে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উদাহরণ খুব একটা নেই।

দ্য গার্ডিয়ান বলছে, স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই হামলা শুরু করেছেন ট্রাম্প। ইরানে চলমান হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসন শুরুর পর প্রথমবারের মতো রোববার মার্কিন সেনা হতাহতের খবর এসেছে। এতে করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রচণ্ড চাপে পড়েছেন। ইরান নিয়ে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী, তা স্পষ্ট করে ব্যাখ্যার দাবি উঠেছে। ট্রাম্পের সমালোচকেরা হোয়াইট হাউসের কাছে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে আরও স্বচ্ছতা দাবি করছেন। বিরোধী পক্ষ ও বিশ্লেষকদের মতে, এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনার অভাব যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘস্থায়ী এক যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করেছে। অথচ ট্রাম্প বারবার এ ধরনের যুদ্ধ এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

ইরানে হামলার কারণে ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেছে বলে খবর। সেটা বন্ধ থাকলে তেল ও অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে এবং সংকট তৈরি হবে। ইরানে হামলাকে ঘিরে বিশ্বের তেলের বাজার অশান্ত হয়ে পড়তে পারে বলে শংকা বিশ্লেষকদের। উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশের স্থাপনা ধ্বংস হলে তাও তেলের বাজারে প্রভাব ফেলবে। ফলে এ যুদ্ধ সারা বিশ্বের জন্যই অশনি সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ সংঘাতের শেষ কোথায় সেটাই এখন সবার প্রশ্ন। যুদ্ধ দীর্ঘস্থাযী হোক এটা তাই কারো কাম্য নয়। রাশিয়া ও চীনসহ বিভিন্ন দেশের অনুরোধে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এ ব্যাপারে এগিয়ে আসা উচিত।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা এবং এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের পাল্টা হামলার ঘটনায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি বৈঠকে বসেছে বলে খবর। আল-জাজিরা জানায়, বৈঠকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এ সামরিক পদক্ষেপ এমন এক ধারাবাহিক ঘটনার সূচনা করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত কারও নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। বিশ্বের সবচেয়ে অস্থিতিশীল অঞ্চলটিতে এ ঝুঁকি অত্যন্ত গুরুতর বলেও মন্তব্য করেন তিনি। নিরাপত্তা পরিষদ আরো তৎপরতা চালাবে বলে আশা করেন বিশ্লেষকেরা।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।