নাজমুন নাহার নীলু

রমযান মাস এমন এক মাস যা বার বার ফিরে এসে মুসলিম সমাজকে সচেতন করে।কারণ সওয়াব লাভের মাস, সিয়াম পালনের মাস, কুরআন নাজিলের মাস, লাইলাতুল কদরের মাস। ফলে মুসলিম সমাজে শুরু হয় নতুন মওসুম। সিয়াম সাধনা, আধ্যাত্মিক অনুশীলন তথা তাকওয়া অর্জনের প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়ে সত্য,ন্যায় ও নেকির কাজে প্রতিযোগিতা ।যাতে নেকির ফসল তুলতে পারে মু’মিন। নৈতিক মান এতটা মজবুত করে তোলে যে নিজের আত্মিক উন্নতির পাশাপাশি মানবকল্যাণে তার মন দরদী হয়ে ওঠে।

রমযান : হযরত আবু হুরায়রা রা, বর্ণনা থেকে জানা যায় -

১. রমযান মাস বরকতময় মাস।

২. রমযান মাসে রোজা ফরয।

৩. আকাশের দুয়ার সমূহ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

৪. জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

৫. বড় বড় শয়তান গুলোকে আটকে রাখা হয়।

৬. এ মাস হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।

৭. এ মাসের কল্যাণ থেকে যে বঞ্চিত থাকলো সে সত্যিই বঞ্চিত হলো।

৮. একজন ঘোষণাকারী ডেকে ডেকে বলতে থাকে

“হে কল্যাণের আকাক্সক্ষী,অগ্রসর হয়ে আস এবং হে অকল্যাণের বাসনা পোষণকারী বিরত হও,——-।”

৯. প্রত্যেক রাত্রিতে ঐভাবে আহ্বান করা হয়।

(এসব বৈশিষ্ট্যগুলো তিরমিযি,নাসায়ী, বায়হাকি, মুসনাদে আহমেদ বর্ণনা করা হয়েছে।)

এছাড়াও বিভিন্ন বর্ণনা থেকে রমযান মাসের মাহাত্ম্য উপলব্ধি করা যায়।

রামাদানের গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে বুখারী ও মুসলিম হাদীসে হয়রত আবু হুরায়রা রা, থেকে বর্ণনায় আরো পাওয়া যায় -

১. আদম সন্তানের নেক আমলের সওয়াব রমযান মাসে ১০গুণ হতে সাতশত গুণ বাড়িয়ে দেবেন।

২. আল্লাহ পাক যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে বাড়িতে দিবেন।

৩. রোজাদারের দুটি আনন্দ ইফতারের সময় দ্বিতীয়টি মুমিনের সাথে সাক্ষাৎ লাভের সময় পাবেন।

৪. রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিশকের সুগন্ধি হতে উত্তম।

৫. রোজাদার বেহুদা ও অশ্লীল কথাবার্তা এবং চিৎকার ও হট্টগোল না করে।

৬. অন্যকেউ করলে বলে আমি রোযাদার।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত রোজা শাফায়াত করবে আল্লাহ নিকট রোজা কবুল করার জন্য। কুরআন শাফায়াত করবে।বলবে আমি তাকে নিদ্রা মগ্ন হতে বাধাদান করছি। (বুখারী ও মুসলিম)

ব্যর্থ রোজা-হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, যে মিথ্যা কথা ও মিথ্যা আমল পরিত্যাগ করে না। (বুখারী)

নৈতিক দিক : রমযান মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ব্যক্তির নৈতিক মানের প্রশিক্ষণের দিক। আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্থক্য হলো মানুষ উন্নত মানবিক গুণাবলীর বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন তাই সে আশরাফুল মাখলুকাত। এই গুণাবলী একজন মুসলিমের মধ্যে যাতে অক্ষুন্ন থাকে এজন্য মহান আল্লাহ পাক রমযান মাসে তাঁর রহমতের দরজা উন্মুক্ত করে দেন যাতে মানুষ সিয়াম সাধনার মাধ্যমে নৈতিক গুণাবলীকে পরিশুদ্ধ করতে পারে। তাই রোজার আসল উদ্দেশ্য হলো কুপ্রবৃত্তি দমন করা। মিথ্যা, হিংসা, লোভ, ক্রোধ, সুদ, ঘুষ, পাপাচার, চুরি-ডাকাতি, ব্যাভিচার, অশ্লীলতা,অন্যায় এসব থেকে নিজেকে মুক্ত করে সৎভাবে জীবনযাপনের পাশাপাশি ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনেও ভূমিকা পালন করতে পারে। আল্লাহ পাক বলেন, “মহিমান্বিত রমযান মাস, এতে মানব জাতির পথ প্রদর্শক এবং সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে” (বাকারা : ১৮৫)। কুরআন নাজিলের এ মাসে কুরআনের নির্দেশ পালন করতে হলে ব্যক্তিগত ভাবে নৈতিক চরিত্র তাকে এমনভাবে গঠন করতে হবে সামনে লোভনীয় সব উপায় উপকরণ থাকা সত্ত্বেও সেগুলো ভোগ করবে না বা হস্তগত করবে না। রমযানে দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধি করে অধিক মুনাফা অর্জন করার চেষ্টা, কিংবা সুষ, ঘুষ লেনদেন অথবা ঝগড়া, ফ্যাসাদ সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে বড় ধরনের ঝামেলায় জড়িয়ে পড়া আবার মদ,জুয়া কিংবা ব্যাভিচারে লিপ্ত হওয়া এসব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে তওবা করার ফলে ব্যক্তি যেমন আত্মশুদ্ধির সুযোগ পায়। তেমনি সামাজিক ভাবে বয়কট করা হলে সমাজের শৃঙ্খলা বজায় থাকে। এ নৈতিক দিকটির দিকে কুরআন দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছে সত্য মিথ্যার সুস্পষ্ট পার্থক্যকারী এই কুরআন। সৎ পথের সন্ধান পেতে হলে কুরআনে কি বলা হয়েছে তার জন্য কুরআন বেশি বেশি করে পড়া ও জানা। তাই তো রমযানে কুরআন তেলাওয়াতের মধ্যে রয়েছে সওয়াব।

মানবিক দিকগুলো তখনি পরিপূর্ণতা লাভ করে যখন একজন মুসলমান আল্লাহর নির্দেশগুলো মানার চেষ্টা করবে। রমাদান সে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বার বার ফিরে এসে সেই সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।তাই আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরয করা হলো, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (সূরা আল বাকারা : ১৮৩)

আধ্যাত্মিক দিক : তাকওয়া অর্জনের মধ্যে রয়েছে রমযানের আধ্যাত্মিক দিক। প্রশ্ন তাকওয়া মূলত কী?

মাওলানা আকরম খাঁ তার বাংলা তাফসিরে তাকওয়ার ব্যাখ্যায় বলেছেন,”আভিধানিক হিসেবে তাকওয়া শব্দের অর্থ হচ্ছে নিরাপত্তা বা নিরাপদ হইয়া থাকার জন্য চেষ্টা পাওয়া। প্রত্যেক অন্যায় অনির্দিষ্টকর ও জঘন্য কাজ,কথা এবং ভাব চিন্তা, অবিশ্বাস ও অন্ধবিশ্বাস হইতে আত্মরক্ষা করার মনোভাবকে তাকওয়া বলা হয়। এককথায় এর সুসংগঠিত অনুবাদ হচ্ছে পরহেজগার বা পরহেজ করিয়া চলার অভ্যাস।এ অভ্যাসে অভ্যস্ত যাহারা,আরবীতে তাহাদিগকে মুত্তাকী বলা হয়।”

হযরত ওমর রা, হযরত ওবায় ইবনে কাব রা, কে জিজ্ঞেস করলেন তাকওয়া কী? হযরত ওবায় ইবনে কাব রা, একটি উদাহরণ পেশ করলেন-একটি কন্টকাকীর্ণ, কাঁটাযুক্ত পরিবেষ্টিত সুরু পথ দিয়ে চলার সময় একজন নিজের পোশাক এবং দেহকে কাঁটার আঘাত থেকে যেভাবে বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করে, তেমনি দুনিয়ার যাবতীয় অশ্লীল, অন্যায়, মন্দ থেকে বাঁচিয়ে চলার যে চেষ্টা অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশগুলো পরিপালন এবং নিষেধগুলো বর্জন করে চলার নামই তাকওয়া। একমাত্র আল্লাহর ভয়ের ফলেই মানুষ মন্দ কাজ পরিত্যাগ করতে পারে। রোযা মুমিনের মধ্যে সে ধরনের আধ্যাত্মিক শক্তি যাতে তৈরি করতে পার সেজন্য রমযানের তারাবির, ই’তিকাফ, সাদকাতুল ফিতরসহ রমযানের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে সে প্রচেষ্টাই করে থাকেন মুসলিম।

মানুষের মধ্যে কুপ্রবৃত্তি বিদ্যমান। এ কুপ্রবৃত্তির ফলে সে রমযানেও অন্যায় করে ফেলে।তাই কুপ্রবৃত্তিকে দমন করতে পারাই তাকওয়া অর্জনের সার্থকতা। কুপ্রবৃত্তি সম্পর্কে কুরআন তিনটি পর্যায়ের কথা বলছে, ১. নাফসুল আম্মারা -মন্দ কাজের আদেশকারী। “নিশ্চয়ই নাফস মন্দ কাজের নির্দেশ দিয়ে থাকে।” (সূরা ইউসুফ : ৫০)২.নাফসুল লাওয়ামাহ্ -ভৎসনাকারী নাফস (বিবেক বলা হয় যাকে) “আমি আরও শপথ করছি ভৎসনাকারী আত্মার” (আল কিয়ামাহ : ৩) ৩.নাফসুল মুৎমায়িন্নাহ -প্রশান্ত আত্মা-সৎকর্মে উন্নতি ও আল্লাহর নৈকট্যের চিন্তা করতে থাকে। “হে প্রশান্ত! আত্মা চলো তোমার রবের দিকে।” (সূরা ফজর : ২৭)

নফসে মুৎমায়িন্নাহ্ পর্যায়ে পৌঁছাতে রমযান মু’মিনকে তাগাদা দেয় বা উৎসাহিত করে। এজন্য ঈমানদার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায় আল্লাহর নৈকট্যে লাভের। লাইলাতুল কদরের রাত্রি তালাশের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক দিকের যেমন সুযোগ দেয় মুমিনকে, তেমনি ই’তিকাফ সবচেয়ে বড় পাওয়া। একজন রোজাদার যখন তাকওয়া অর্জনের জন্য আত্মিক উন্নতির পরিশুদ্ধির প্রচেষ্টা চালায় তখন তার মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি সৃষ্টি হয়। পবিত্র কুরআনে এ প্রশান্তিকে সাকীনাহ্ বলা হয়েছে। যা বলতে বুঝায় মনের স্হীরতা, প্রশান্তি ও দৃঢ় চিত্ত। পবিত্র কুরআনে ৩টি সূরার ৬টি আয়াতে সাকীনাহ্ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।বলা যায় নফসে মুৎমায়িন্নাহ্ বা প্রশান্ত আত্মা যা মূ’মিনের চিত্তকে প্রশান্তিতে ভরে দিয়ে আধ্যাত্মিকতার এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। যেখানে শুধু আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ব্যক্তি দুনিয়ার মোহ, লোভ, হিংসা, গীবত, কালোবাজারি, মজুমদারী,সুদ,ঘুষ থেকে শুরু করে কবীরা, সগীরা সকল ধরনের গুনাহ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করবে আল্লাহর ভয়ে। রমযান মাস তাই আধ্যাত্মিক দিকের অন্যতম প্রশিক্ষণও বটে।

রমযান গুনাহ মাফের মওসুম এ সময়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিকের উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালানো মধ্যে রয়েছে ইমানদারের কল্যাণ।এই কল্যাণ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এমনকি রাষ্ট্রীয় জীবনে বহমান হয়ে থাকে প্রবাহিত নদীর মতো। শুধু কল্যাণ আর কল্যাণ। মহান আল্লাহ পাক বলেন,

“রোজা আমারই জন্য, আমি নিজ হাতে এর প্রতিদান দেব”- হাদীসে কুদসি। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, বুখারি (১৯০৪) ও মুসলিম (১১৫১) শরীফে বর্ণিত হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আদম সন্তানের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য, শুধু রোজা ছাড়া; কারণ তা আমার জন্য এবং আমিই এর প্রতিদান দান দিব।

আলহামদুলিল্লাহ, রমযান আমাদের জন্য বয়ে আনুক শান্তি।

লেখক : প্রাবন্ধিক।