আবু মালিহা
বছর ঘুরে রমাদান ফের আমাদের দ্বারপ্রান্তে। ঈমানের মৌলিক ভিত্তির মধ্যে রামাদান অন্যতম। অর্থাৎ তৃতীয় স্তম্ভ। রোজা বলা হয় ফার্সিতে আর আরবিতে হচ্ছে সওম। কোরআনের ভাষা হচ্ছে আস-সাওম। অর্থ আত্ম সংযোগ, কঠোর সাধনা, অবিরাম চেষ্টা ও বিরত থাকা ইত্যাদি। এর সমার্থক আল ইসমাক, ইসলামী পরিভাষা। এর সাধারণ অর্থ হল সাওমের নিয়মে সুবহে সাদেক থেকে সব ধরনের পানাহার ও যৌন উপভোগ থেকে বিরত থাকা। এই রমজান উপলক্ষে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআন মাজীদে ঘোষণা করেন ‘হে ঈমানদারগণ, সিয়াম ফরজ করা হয়েছে। যেমনি ভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর যেন তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পারো (সূরা বাকারা-১৮৩)। এখানে মূল উদ্দেশ্য হিসেবে ঈমানদারদের তাক্বওয়া অর্জনের কথা বলা হয়েছে। যা পূর্ববর্তী নবী রাসুলদের বিধানেও রোজা ফরজ ছিল।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে রোজার গুরুত্ব সম্পর্কে আরো বলেন রামাদান ঐ মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে যা পুরোটাই মানুষের জন্য এমন সুস্পষ্ট উপদেশে পরিপূর্ণ যে, তা সঠিক পথ দেখায় এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য পরিস্কার ভাবে তুলে ধরে। তাই এখন থেকে যে ব্যক্তি এ মাস পায় তার অবশ্যই কর্তব্য, সে যেন পুরো মাস রোজা রাখে। আর যে অসুস্থ বা সফরে থাকে সে যেন অন্য সময় ঐ দিনগুলোর রোজা আদায় করে নেয়। আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ তাই চান, যা কঠিন তা তিনি চান না। তোমাদেরকে এ জন্যই এ নিয়ম দেয়া হয়েছে, যাতে তোমরা রোজার সংখ্যা পুরা করতে পারো আর যে হেদায়েত আল্লাহ আমাদেরকে দিয়েছেন এর জন্য তোমরা আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশ করতে পারো এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে পারো (সূরা বাকার ১৮৫)। ঈমানদারদের জীবনে রমজানের প্রভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ মাস আগমনের পূর্বে রজব মাসে চাঁদ দেখার সাথে সাথে রাসূল (সা) যে দোয়াটি পাঠ করতেন তা হচ্ছে ‘হে আল্লাহ তুমি আমাদেরকে রজব ও শাবান মাসকে বরকতময় করে দাও এবং রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দাও। (আল্লাহুম্মা বারাক লানা ফি রাজাবা ও শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রমাদান)। এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (স:) বলেন, মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ বলেছেন, আদম সন্তানের প্রতিটি আমল তার নিজের জন্য, রোজা ছাড়া। কারণ তা আমার জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান দিব। আর রোজা ঢাল স্বরূপ। কাজেই তোমাদের কেউ যখন রোজা রাখে সে যেন অশ্লীল কাজ না করে, শুরগোল না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা তার সাথে ঝগড়া করে তাহলে তার বলা উচিত আমি রোজাদার। যার হাতে মোহাম্মদের প্রাণ, তার কসম। রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশরের চাইতেও সুগন্ধি যুক্ত। রোজাদারের দুটি আনন্দ যা সে লাভ করবে। একটি হচ্ছে সে ইফতারের সময় খুশি হয়। আর দ্বিতীয় আনন্দটি সে লাভ করবে যখন তার রবের সাথে সাক্ষাত করবে ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম এ রেওয়ায়েত করেছেন। আর এখানে সহীহ বুখারীর মূল পাঠ দেওয়া হয়েছে। ইমাম বুখারীর আর এক রিওয়াতে বলা হয়েছে-রোজাদার আমারই কারণে তার আহার, পানীয় ও যৌন কামনা ত্যাগ করেছে। রোজা আমার জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান দেব। আর নেকিগুলির সোয়াব দশ গুণ হবে। ইমাম মুসলিম এক রেওয়াতে বলেছেন বনে আদমের প্রতিটি আমলের সওয়াব বাড়ানো হয়, এক নেকির সওয়াব দশ গুন থেকে সাতগুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। মহান আল্লাহ বলেন তবে রোজা ছাড়া। রোজার সওয়াবের কোন সীমা নেই। কারণ রোজা হচ্ছে আমার জন্য এবং আমিই এর প্রতিদান দিব। রোজাদার আমারই জন্য যৌন কামনা ও আহার ত্যাগ করে। রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ। একটি আনন্দ হচ্ছে ইফতারের সময়। আর দ্বিতীয় আনন্দটি হবে তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময়। তার মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের চাইতেও সুগন্ধিযুক্ত। বিশেষ করে মুসলিম সমাজে এ রোজার গুরুত্ব এতই ব্যাপক যে গোটা সমাজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের সুযোগ করে দেয়। যার প্রভাব সুস্পষ্টভাবে সমাজে প্রতিফলিত হয়। রাসুল (স:) অন্য হাদিসে বলেছেন যে অশ্লীলতা বেহায়াপনা ও গালিগালাজ ছাড়তে পারলো না তার রোজা রাখার কোন প্রয়োজন নেই। পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে রোজার ঢাল স্বরূপ। বাস্তবিক অর্থেই রমজানের মাধ্যমে মানব জীবনে অর্থাৎ ঈমানদারদের চরিত্র যদি কোন পরিবর্তন সূচিত না হয়। অর্থাৎ চুরি, ডাকাতি, সুদ, ঘূষ জুলুম, বেইনসাফি, অন্যায়, অত্যাচার সহ এ সমস্ত গর্হিত কাজ ও ও জুলুমবাজি মানব চরিত্র থেকে দূর করা না যায় এবং কলুষ চরিত্রের কোন শুভ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অর্জনের সৌভাগ্য না ঘটল, তবে এ হেন রোযা রাখায় তার কোন সফলতা আসবেনা দুনিয়াতে, না আখেরাতে। তাই রমজান মানব জীবনের আধ্যাত্ম চেতনার এক গৌরবময় দিক যা মানব কল্যাণে তাকে মহত্তর কাজে অংশ গ্রহণের সুযোগ করে দিয়ে এবং মহান আল্লাহর কাছে পরম প্রিয় বান্দা হিসেবে হাজির হবে। যখন আখেরাতে রোযাদারদের জন্য পুস্কার ঘোষণা আসবে যে, ‘যারা রোযাদার, তারা রাইয়ান দরজা দ্বারা বেহেসতে প্রবেশ কর’ (আল-হাদিস) সত্যিই তখন তার চাইতে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি আর কে হবে? মুসলিমদের জীবন বা ইসলামী চেতনা বৈরাগ্যবাদের মত নয়। ইসলাম সার্বজনীন এবং তা দুনিয়ার জীবনে মহত কল্যানময় সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে হেদায়াত স্বরূপ এসেছে। আর সে আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য রসুল (স.) নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিটি ক্ষেত্রে।
অন্য হাদীসে রসুল (স.) বলেছেন আবু হুরায়ারা রা: থেকে বর্ণিত। নবী (স.) বলেছেন: যে ব্যক্তি পূর্ণ ঈমান সহকারে ও সওয়াব লাভের প্রত্যাশায় রমজানের রোযা রাখে তার পূর্বের সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (বুখারী)।
পবিত্র রমজান মাসে ইমানদারদের যেন শয়তান কোনরূপ ওয়াসওয়াসা দিতে না পারে সেজন্য তাদের আটক রাখা হয়। আবু হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ (স.) বলেন: যখন রমজান মাস আসে জান্নাতের দরজা সমূহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদেরকে শৃঙ্খলিত করে রাখা হয়। (বুখারী)
রমজানে সাধারণত মুমিনদের মানসিক একটি পরিবর্তন ঘটে। দয়ার্দ্র চেতনার উন্মেষ ঘটে এবং দরদীমন বিগলিত হয়ে পড়ে সকলের জন্য। একে অন্যকে সহযোগিতা করা, ইফতার করানো, বিপদে সহযোগিতা করা, সর্বদাই জন কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখা, রোযাদারদের ইফতার করানো সহ সব ধরনের সৌহার্দ্যপূর্ণ আন্তরিক ভালোবাসা সৃষ্টি করে নেক আমলের প্রতিযোগিতার এক আল্লাহ প্রেমের চেতনা ফুটে উঠে। যা সর্বদাই মানসিক কর্মকান্ডে পরিলক্ষিত হয়। এতে করে সমাজে নান্দনিক এক বেহেসতী পরিবেশ যেন সৃষ্টি হয়। মুসলিম সব ভাই ভাই, তারই জলন্ত উদাহরণ রমজানুল মোবারক তা অত্যন্ত উজ্জল ভাবে ফুটে ওঠে। ইসলামতো তাই যা, মানবতার কল্যাণে নিজেকে সবসময় আত্ম নিবেদিত করে এবং নিজের জন্য যা কল্যাণ কামনা করে, অন্যের জন্যেও তাই করে। অন্য হাদীসে রসুল (স.) বলেছেন ‘মুমিন সেই ব্যক্তি, যে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তার অন্য ভাইয়ের জন্যও তাই পছন্দ করে।
রমজানের গুরুত্ব আরেকটি কারণে বহুগুনে বেড়ে গেছে। এ মাসেই কুরআন নাযিল হয়েছে। যা দুনিয়া বাসীর হেদায়তের জন্য। তাই কুরআনের কারণেই রমজান এত মহিমান্বিত হয়েছে। মানব জীবনের বিশেষভাবে ইমানদার মুসলিমের জন্য এ মাস গুনাহ মাফের মাস। নিজেকে পাক পবিত্র করার মাস। মহান আল্লাহ এ মাসকে ৩টি স্তরে ভাগ করেছেন প্রথম দশদিন রহমতের, দ্বিতীয় দশদিন মাগফেরাতের এবং শেষ দশক অর্থাৎ তৃতীয় দশদিন নাজাতের হিসেবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যে কেহ এ মাসকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে, সেই দুনিয়া ও আখেরাতে পূণ্যবানদের অন্তরভূক্ত হবে এবং চিরস্থায়ী জান্নাতের ওয়ারিস হবে বলে আল্লাহ ওয়াদা করেছেন।
তাই রসুল (স.) রমজান মাসে যেসব নেক আমলের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন, সেগুলি হলো- রাসুলুল্লাহ (স.) কে প্রশ্ন করা হলো, “ কোন সাদাকাহ উত্তম? তিনি বলেন, রমাদ্বান মাসে সাদাকাহ করা।” (তিরমিযি-৬৬৩)
রসুল (স.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়লা দানশীল, তিনি দানশীলতাকে ভালবাসেন। তিনি মহানুভব, তিনি মহানুভবতাকে পছন্দ করেন।” (বায়হাকী-৩৪৮০)।
কোরআনের মাসে সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্য পবিত্র মাহে রমজান হচ্ছে উৎকৃষ্ট সময়। বেশি করে তেলাওয়াত ও অর্থসহ বুঝে পড়া খুবই দরকার। জীবনকে কুরআনের রঙে রঙিন করার জন্য বেশি বেশি উপলব্ধি সহ নেক আমল করা অপরিহার্য। তাই কোরআন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে তারতীল সহকারে পাঠের নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ তায়লা বলেন- কোরআন পাঠ কর সুবিন্যস্ত ভাবে ও স্পষ্ট করে (সুরা মুযযামিল- ৪)।
অতএব তাক্বওয়া অর্জনের মাস হিসেবে পবিত্র রমজানকে আমরা গভীর আত্ম মনোনিবেশের সাথে প্রতিটি হক আদায় করা। এবং কুরআনের আদেশ নিষেধকে বাস্তব জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করে নতুন করে ঢেলে সাজাবার চেষ্টায় আমরা যেন ব্রতনিষ্ঠ হই, সে ব্যাপারে সচেতন হওয়া এবং মহান আল্লাহর রেজামন্দি হাসিলের জন্য রমজানের শেষ দশককে বেশি গুরুত্ব প্রদান করা। যেখানে রয়েছে ‘লাইলাতুল কদরে’র মত মহা সৌভাগ্যের রজনী। যা আমাদের তাকদিরকে পরিবর্তন করে পূণ্যবানদের কাতারে শামিল করে দিতে পারে। বিশেষ করে রমজানের হক দায়িত্ব গুলোর মধ্যে যা রয়েছে- যেমন: মানুষে মানুষে সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে জোরদার করা। অন্যায় ও জুলুম থেকে মানুষকে বিরত রাখা। অশ্লীল ও বেহায়াপনা সহ গর্হিত সকল কাজ বন্ধ করা। রোযাদারদের বেশী বেশী ইফতার করানো। ধনি-গরীব নির্বিশেষে সকলের জন্য কল্যাণ কামনা করা। আখলাকিয়াত বা চারিত্রিক বৈশিষ্টের উন্নতি সাধন করা। হালাল রুজী রোজগার তালাশ করা। মানসিক গুনের উৎকর্ষ বিধান করা সহ সামাজিক নৈতিক শৃঙ্খলার উন্নতি ঘটিয়ে মার্জিত রুচিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রসুল (স.) এর আদর্শকে আঁকড়ে ধরে জীবনের সর্বাঙ্গীন সফলতার মঞ্জিলে পৌঁছানোর যাবতীয় কর্ম তৎপরতায় ব্যাপৃত থাকা। যদি আমরা এভাবে জীবনের প্রতিটি শাখায় ইসলামী জীবন দর্শনকে উদ্দেশ্য বানিয়ে লক্ষে পৌছানর দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তবেই আশা করা যায়, রমজানের মহা সাওগাতে অবগাহন করে আমরা ধণ্য হব এবং শান্তি সুখের সমাজ উপহার দিতে পারব বলে আশা করা যায়।