জাফর আহমাদ
আপনি যদি ভালো কাজ করে যান, আপনার ভালো কাজের প্রভাবে ভবিষ্যত প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম প্রভাবাস্বিত হতে থাকবে আর তার প্রতিফল কিয়ামত পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে আপনার খাতায় জমা হতে থাকবে। যেমন আপনি মানবতার কল্যাণের নিমিত্তে এমন একটি মহান কাজ করেছেন যার থেকে পরবর্তী প্রজন্ম প্রভাবিত বা অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেকে মহৎ কাজে নিয়োজিত করে, সেই প্রজন্মের সকল মহৎ কাজের প্রতিফল আপনিও পাবেন। অথচ তার প্রতিফলের সামান্যতম কম হবে না। যাকে আরবীতে ‘সাদকাতুল জারিয়া’ বলা হয়। তেমনিভাবে যদি আপনি কোন অসৎ কাজ করেন এবং তা থেকে পরবর্তী প্রজন্মও প্রভাবিত হয় এবং নিজেকে অসৎ কাজে জড়িয়ে নেয় তবে তার প্রতিফলও আপনি পেতে থাকবেন। এভাবে কিয়ামত পর্যন্ত প্রজন্ম পরস্পরায় যত অসৎ কাজ সংঘটিত হতে থাকবে তার অংশ আপনি পেতে থাকবেন। আপনার আমলনামার খাতায় যোগ হতে থাকবে। যেমন:
আল্লাহ তা’আল বলেন, “এ কথা সুস্পষ্ট, যে ব্যক্তি ডাহা মিথ্যা কথা বানিয়ে আল্লাহর কথা হিসাবে প্রচার করে অথবা আল্লাহর সত্য আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে তার চেয়ে বড় জালিম আর কে হবে? এ ধরনের লোকেরা নিজেদের তকদীরের লিখন অনুযায়ী তাদের অংশ পেতে থাকবে অবশেষে সেই সময় উপস্থিত হবে যখন আমার পাঠানো ফেরেশতারা তাদের প্রাণ হরণ করার জন্যে তাদের কাছে এসে যাবে। সে সময় তারা (ফেরেশতারা) তাদেরকে জিজ্ঞেস করবে, বলো এখন তোমাদেও সেই মাবুদরা কোথায়, যাদেরকে তোমরা ডাকতে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে? তারা বলবে, সবাই অর্ন্তহিত হয়ে গেছে এবং তারা নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে যে, বাস্তবিক পক্ষেই তারা সত্য অস্বীকারকারী ছিল। আল্লাহ বলবেন: যাও, তোমরাও সেই জাহান্নামে চলে যাও, যেখানে চলে গেছে তোমাদের পুর্বেও অতিক্রান্ত জিন ও মানবগোষ্ঠী। প্রত্যেকটি দলই নিজের পূর্ববর্তী দলের প্রতি অভিসম্পাত করতে করতে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অবশেষে যখন সবাই সেখানে একত্র হয়ে যাবে তখন পরবর্তী প্রত্যেকটি দল পুর্ববর্তী দলের ব্যাপরে বলবে, হে আমাদেও রব! এরাই আমাদের গোমরাহ করেছে, কাজেই এদেরকে আগুনের দ্বিগুণ শাস্তি দাও। জওয়াবে বলা হবে, প্রত্যেকের জন্য দ্বিগুণ শাস্তিই রয়েছে কিন্তু তোমরা জানো না।” (সুরা আরাফ : ৩৭-৩৮) নীচে উল্লেখিত হাদীস থেকেও এই আয়াতের ব্যাখ্যা আরো সুস্পষ্টভাবে জানা যায়।
কারণ সর্বাবস্থায় বিপথগামী মানুষের প্রত্যেকটি দল কোন না কোন দলের পূর্ববর্তী বা পরবর্তি দল ছিল। কোন দলের পূর্ববর্তী দল উত্তরাধিকার হিসেবে যদি তার জন্যে ভুল ও বিপথগামী চিন্তা ও কর্ম রেখে গিয়ে থাকে, তাহলে সে নিজেও তো তার পরবর্তীদের জন্যে একই ধরনের উত্তরাধিকার রেখে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। যদি একটি দলের পথভ্রষ্ট হবার কিছুটা দায়-দায়িত্ব তার পূর্ববর্তীদের ওপর বর্তায়। তাহলে তার পরবর্তীদের পথভ্রষ্ট হবার বেশ কিছু দায়-দায়িত্ব তার নিজের ওপর বর্তায়। তাই আয়াতে বলা হয়েছে প্রত্যেকের জন্যে দ্বিগুণ শাস্তি রয়েছে। একটি শাস্তি হচ্ছে, নিজের ভুল পথ অবলম্বনের জন্যে, অথচ মহান আল্লাহ সৎ পথ অবলম্বনের জন্য নবী, কিতাব পাঠিয়েছেন তাছাড়া তাকে জ্ঞানও দিয়েছেন। এগুলোর পাশাপাশি আল্লাহর পথের আহবানকারীরা রাত দিন তাকে সৎ পথের দিকে আহবান করেছে। কিন্তু দুনিয়ার মোহে অন্ধ হয়ে সৎ পথকে প্রত্যাখ্যান করেছে। আর দ্বিতীয় শাস্তি হচ্ছে, অন্যদেরকে ভুল পথ দেখাবার। তার পরিবার, তার সমাজ ও আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব. পরিচিত-অপরিচিত লোকজন তাকে দুনিয়ার লোভে অনুসরণ করেছে। তাদের গোমরাহীর দায়-দায়িত্বও তার উপর বর্তাবে। ফলে দ্বিতীয় শাস্তিও তাকে পেতে হবে। একটি শস্তি নিজের অপরাধের এবং অন্য শাস্তিটি অন্যদের জন্যে পূর্বাহ্নের অপরাধের উত্তরাধিকার রেখে আসার।
এই বিষয়টি হাদীসে নিম্নোক্তভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। জারির ইবনে আবদুল্লাহ রা: থেকে বর্ণিত।তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: “যে ব্যক্তি ইসলামে কোন উত্তম বা ভালো কাজের প্রথা চালু করল এবং মৃত্যুর পরও সে অনুযায়ী আমল করা হলো, তবে ওই আমলকারীর সমপরিমাণ সওয়াব তার আমলনামায়ও লেখা হবে; অথচ আমলকারীদের সওয়াব থেকে বিন্দুমাত্র কমানো হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন মন্দ বা বিভ্রান্তিকর প্রথা (বিদা’আত) করল এবং তার মৃত্যুর পরও যদি সে অনুযায়ী আমল করা হয়, তবে ওই আমলকারীর সমরিমণ পাপের বোঝা তার ওপরও বর্তাবে; অথচ আমলকারীর পাপের বোঝা থেকেও বিন্দুমাত্র কমানো হবে না।” (মুসলিম, কিতাবুল ইলম, সুনানে তিরমিযি, কিতাবুল ইলম) অন্য একটি হাদীসে হযরত ইবনে মাসউদ রা: থেকে মারফু হাদীসে বর্ণিত, “এই দুনিয়ায় যে ব্যক্তিকেই অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়, সেই অন্যায় হত্যাকাণ্ডের পাপের একটি অংশ হযরত আদম আ: এর সেই প্রথম সন্তানটির আমলনামায় লিখিত হয়, যে তর ভাইকে হত্যা করেছিল। কারণ মানুষ হত্যার পথ সে-ই সর্বপ্রথম উন্মুক্ত করেছিল।” (বুখারী : ৩১০০, কিতাবুল আম্বিয়া, বাবু খালকি আদামা... ... ও মুসলিম)
এ থেকে জানা যায় যে ব্যক্তি দল কোন ভুল চিন্তা বা কর্মনীতির ভিত রচনা করে সে কেবল নিজের ভুলের ও গোনাহের জন্য দায়ী হয় না বরং দুনিয়ায় যতগুলো লোক তার দ্বারা প্রভাবিত হয় তাদের সবার গোনাহের দায়িত্বের একটি অংশ তার আমলনামায় লিখিত হতে থাকে। তাছাড়া এ থেকে এ কথাও জানা যায় যে, প্রত্যেক ব্যক্তির নেকী বা গোনাহের দায়-দায়িত্ব কেবল তার নিজের ওপরই বর্তায় না বরং অন্যান্য লোকদের জীবনে তার নেকী ও গোনাহের কি প্রভাব পড়ে সে জন্যেও তাকে জবাবদিহি করতে হবে।
উদাহরণ স্বরূপ একজন ব্যাভিচারী কথাই ধরা যাক। যাদের শিক্ষা ও অনুশীলনের দোষে, যাদের সাহচর্যের প্রভাবে, যাদের খারাপ দৃষ্টান্ত দেখে এবং যাদের উৎসাহ দানের ফলে ঐ ব্যক্তির মধ্যে যিনা করার প্রবণতা সৃষ্টি হয়, তারা সবাই তার যিনাকারী হয়ে গড়ে উঠার ব্যাপারে অংশীদার। আবার ঐ লোকগুলোও পূর্ববর্তী যেসব লোকদের কাছে থেকেই কুদৃষ্টে, কুচিন্তা, কুসংকল্প ও কুকর্মের প্ররোচনা উত্তরাধিকার হিসেবে লাভ করে তাদের কাঁধে পর্যন্ত ও তার দায়-দায়িত্ব গিয়ে পৌঁছায়। এমনকি এ ধারা অগ্রসর হতে হতে প্রথম ব্যক্তিতে গিয়ে ঠেকে যে সর্বপ্রথম ভ্রান্ত পথে যৌন লালসা চরিতার্থ করে মানব জাতিকে ভুল পথে পরিচালিত করেছিল। এ যিনাকারীর আমলনামায় এ অংশটি তার সমকালীনদের ও পূর্ববর্তী লোকদের সাথে সম্পর্কিত। এছাড়া সে নিজেও নিজের যিনা ও ব্যভিচারের জন্যে দায়ী।
মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে ভালো-মন্দের পার্থক্য করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল, তাকে যে বিবেকবোধ দান করা হয়েছিল আত্মসংযমের যে শক্তি তার মধ্যে গচ্ছিত রাখা হয়েছিল, সৎলোকদের কাছ থেকে সে ভালো-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায়ের যে জ্ঞান লাভ করেছিল, তার সামনে সৎলোকদের যেসব দৃষ্টান্ত সমুজ্জল ছিল, যৌন অসদাচারের অশুভ পরিণামের ব্যাপারে তার যেসব তথ্য জানাছিল-সে সবের কোনটিকেও সে কাজে লাগায়নি। উপরন্ত সে নিজেকে কামনা বাসনার এমন একটি অন্ধ আবেগের হাতে সোপর্দ করে দিয়েছিল যে কোন প্রকারে নিজের আকাক্সক্ষা চরিতার্থ করাই ছিল যার অভিপ্রায়। তার আমলনামায় এ অংশটি তার নিজের সাথে সম্পর্কিত। তারপর এ ব্যক্তি যে গোনাহ নিজে করেছে এবং যাকে স্বকীয় প্রচেষ্টায় লালন করে চলেছে, তাকে অন্য লোকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে শুরু করে। নিজের সন্তান-সন্ততি,আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের অন্যান্য লোকদের সামনে সে নিজের চরিত্রের একটি কুদৃষ্টান্ত স্থাপন করে এবং অসংখ্য লোকের চরিত্র নষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তি বংশধরদের মধ্যে এর প্রভাব চলতে থাকে দীর্ঘকালব্যাপী। ইনসাফের দাবি হচ্ছে, এ ব্যক্তি সমাজ দেহে যেসব বিকৃতি সৃষ্টি করলো সেগুলো তারই আমলনামায় লিাখত হওয়া উচিত এবং ততদিন পর্যন্ত লিখিত হওয়া উচিত যতদিন তর সরবরাহ করা অসৎবৃত্তি ও অসৎকাজের ধারা দুনিয়ায় অব্যাহত থাকে।
সৎকাজ ও পূণ্যকর্মের ব্যাপারটিও অনুরূপ। আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে আমরা নেকীর ও সৎকাজের যে উত্তরাধিকার লাভ করেছি তার প্রতিদান তাদের সবার পাওয়া উচিত, যারা সৃষ্টির শুরু থেকে নিয়ে আমাদের যুগ পর্যন্ত ওগুলো আমাদের কাছে পৌঁছানোর ব্যাপরে অংশ নিয়েছেন। এ উত্তরাধিকার নিয়ে তাকে সযত্নে হেফাজত করার ও তার উন্নতি বিধানের জন্যে আমরা যেসব প্রচেষ্টা চালাবো ও পদক্ষেপ গ্রহণ করবো তার প্রতিদান আমাদেরও পাওয়া উচিত। তারপর নিজেদের সৎপ্রচেষ্টার যেসব চিহ্ন ও প্রভাব আমরা দুনিয়ায় রেখে যাবো সেগুলোও আমাদের সৎকাজের হিসেবের খাতায় ততদিন পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে নিখিত হওয়া উচিত যতদিন এ চিহ্ন ও প্রভাবগুলো দুনিয়ার বুকে অক্ষত থাকবে, মানব জাতীর বংশধরদের মধ্যে এর ধারাবাহিকতা চলতে থাকবে এবং আল্লাহর সৃষ্টিকূল এর দ্বারা লাভবান হতে থাকবে।
প্রতিটি বিবেকবান ব্যক্তিই একথা স্বীকার করবেন যে, কুরআন মাজীদ প্রতিদানের এই যে পদ্ধতি উপস্থাপন করেছে একমাত্র এ পদ্ধতিতেই সঠিক ও পূর্ণ ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এ সত্যটি ভালভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম হলে যারা প্রতিদানের জন্যে এ দুনিয়ায় বর্তমান জীবনকেই যথেষ্ট মনে করেছে তাদের বিভ্রান্তি সহজে দূর হয়ে যেতে পারে। আজ যে ব্যক্তি ভাল বা মন্দ কিছু করেছে তার মৃত্যুর সাথে সাথেই তা বন্ধ হয়ে যাবে না বরং তার প্রভাব চলতে থাকবে আগামী শত শত বছর পর্যন্ত। হাজার হাজার, লাখো লাখো বরং কোটি কোটি মানুষের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়বে। এর প্রভাব চলা ও বিস্তৃত হওয়া পর্যন্ত তার আমলনামার পাতা খোলা থাকবে। সেখানে জমা হতে থাকবে তার উত্তম ও ভ্রান্ত কাজের প্রতিফল শত শত, হাজার হাজার ও লাখো লাখো বছর পর্যন্ত।
লেখক : ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।