পৃথিবীতে আমাদের বসবাসের ধরনটা কেমন? এমন প্রশ্নে ‘স্বরূপ’ অন্বেষণের একটা চেষ্টা আছে। কেউ কি পৃথিবীতে চিরকাল বসবাসের যোগ্যতা রাখেন? তারপরও ক্ষণিকের এ পৃথিবীত কত স্বপ্ন, কত নিমার্ণ, কত যুদ্ধ, কত ধ্বংস। দর্শন ও কাব্যের বিস্তারও কম হয়নি। কেউ বলেছেন, মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে। কেউ বলেছেন, অশ্রু ফেলোনা হেরিয়া হে মালি দৈন্য তোমার মালঞ্চের। আর ইংরেজ কবিতো পৃথিবীর জীবনকে সময়ের সাথে তুলনা করেছেন। বলেছেন Time, You Old Gypsyman. জীবন যেন এক বৃদ্ধ যাযাবর। আরও কথা আছে, ভাবনা আছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন-মুসাফির! মোছ্ এ আঁখি-জল ফিরে চল্ আপনারে নিয়া। আপনি ফুটেছিল ফুল গিয়াছে আপনি ঝরিয়া।
কবি ও দার্শনিকের শব্দমালায় উপলদ্ধির বিষয় আছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, মানুষ অনেক সময়ই উপলদ্ধি করার মত সুস্থ অবস্থায় থাকেনা, বরং অমানবিক কর্মকাণ্ডে বিপর্যয় ঘটিয়ে যায়। গাজা-ট্র্যাজেডির পেছনে কি কোনো সুস্থ মানুষ যুক্ত থাকতে পারে? আসলে মানুষ চিরজীবী নয়, পৃথিবীটাও রিচস্থায়ী নয়। মানুষ ও পৃথিবীর লয় ঘটবেই। নেতানিয়াহু হয়তো বিষয়টা বুঝতে পারছেন না, তাঁর মুরব্বি ট্রাম্পের ঘটেও সে জ্ঞান নেই। তবে নজরুলের গানটা ওদের অন্ধকারে আলো জ্বালাতে পারে- মুসাফির। মোছ্ এ আঁখি-জল ফিরে চল্ আপনারে নিয়া।
বিশে^র তাবৎ নেতাদের এখন গানটি শোনা উচিত। অবয়বের মানুষগুলো যদি একটু হৃদয়বান মানুষ হয়ে উঠতো।
নজরুল ঠিকই বলেছেন-মানুষ আসলেই মুসাফির, Time, You Old Gypsyman. কিন্তু বর্তমান সভ্যতার মুসাফিরদের চালচলনটা কেমন? ঈদের এই মওসুমে ফিলিস্তিনিরা কেমন আছেন, ইসরাইলের আচরণ-ই বা কেমন? গাজাতো ইসরাইলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এক কৃষ্ণ-নগরী। এমন ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই ফিলিস্তিনি জনগণ ঈদ পালনের প্রস্তুতি নিয়েছে। আবারও যুদ্ধাপরাধী ইসলাইলের নৃশংস হামলা। ঈদরে দিনেই আরও ধ্বংস, আরও হত্যা। কী চমৎকার ঈদ-উপহার বর্তমান সভ্যতার। সভ্যতার শাসকা এখন দু’হাতে তালি দিলে দিতেও পারেন। কারণ তাঁদের এমন আমলের কোনো তুলনা হয় না। তবে আমলের যিনি হিসেব নিবেন, তাঁর রাডারে সব কিছুই ধরা পড়বে।’ ভালো-মন্দ সবকিছু, অণুপরিমাণ হলেও। তবে জুলুম নামের অপকর্মের মন্দফল শুধু পরলোকে নয়, ইহলোকেও কিছুটা ভোগ করতে হবে। বাইবেল ও তাওয়াতের পণ্ডিতরা বিষয়টা জানেন। তাঁরা পথভ্রষ্টদের সতর্ক করতে পারেন। তাহলে তো পৃথিবীতে জুলুমের মাত্রা কিছুটা হলেও কমতে পারে। পবিত্র রমযান মাসেও ফিলিস্তিনিদের জীবন কেটেছে দুঃসহ কষ্ট ও যন্ত্রণার মধ্যে। রোজার মধ্যেও খাবার নেই, ইফতার নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই তাঁদের। তবে আছে হামলা, ধ্বংস ও মৃত্যু। তাইতো অভিশাপ বর্তমান সভ্যতা ও তার শাসকদের প্রতি। অভিশাপের দাবানলে ওদেরও কিছুটা পোড়া উচিত। বিলাসীজীবন যাপনে কিছুটা ছন্দপতন প্রয়োজন। নয়তো পথভ্রষ্ট মানুষ মনে করবে ওরাই আসল প্রভু। প্রকৃত প্রভুর আসলে ওদের ঠাঁই হবে কেমন করে? নমরুদ্দ, ফেরাউনের হয়নি। নেতানিয়াহ ও ট্রাম্পের হবে কেমন করে? দাম্ভিক আদ ও মাসুদ জাতির ধ্বংসের ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে। নতুন দাম্ভিকদের ধ্বংসের কাহিনীও লিপিবদ্ধ হবে ইতিহাসে। এর ব্যত্যয় ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই।
মানুষ আসলেই মুসাফির। প্রাচ্য-প্রতীচ্য, কালো, ধলো, ধনী-গরীব সবার ক্ষেত্রেই এ বিষয়টি সমান সত্য। কোনো মানুষ চিরজীবী নয়। পৃথিবীও নয় চিরস্থায়ী। পৃথিবীতে স্বল্পসময়ের জীবন মুসাফিরের। মৃত্যর পর সব কর্মের জন্য মহাপ্রভুর কাছে জবাবদিহি করতে হবে প্রতিটা মানুষকে। বিশেষ সুবিধার কোনো সুযোগ নেই সেখানে যেটা লক্ষ্য করা যায় বর্তমান ভ্রষ্ট সভ্যতার মানুষের জীবনে আসলে সমস্যার সৃষ্টি হয় নিজেকে না জানার কারণে, ¯্রষ্টাকে না জানার কারণে। বিভ্রান্ত মানুষ মনে করে পৃথিবীটাই তার জন্য সবকিছু। ফলে সে হয় ভোগতাদী। তার আরও সম্পদ প্রয়োজন, সে জন্য আরও ক্ষমতা প্রয়োজন। এ পথেই মানুষ হয় কর্তৃত্ববাদী, ফ্যাসিবাদী। এমন পথ আসলে ধ্বংসের পথ। এক সময় সে ভুলে যায়, সে যে একজন মুসাফির। বরং সে মনে করে, পৃথিবীতে সে চিরকাল থাকবে। অতএব তার প্রয়োজন অনেক সম্পদ ও অনেক ক্ষমতা। এ পথে মানুষ কতটা জালেম ও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে, সে হিসাব রাখার সক্ষমতা থাকে না পথচ্যুত মানুষদের। এ পথের পথিক শুধু প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী ও রাজনীতিবিদরা নন, সমাজের ক্ষমতাবান ছোট-বড় মানুষদের মধ্যেও এমন চরিত্র লক্ষ্য করা যায়। তবে এক সময় তাদের পতন ঘটে। মুখোমুখি হতে হয়ে শাস্তির। এর কারণ, মানুষ তার মুসাফির পরিচয়টা ভুলো যায়। এ প্রসেঙ্গে ইতিহাসের বহু ঘটনা তুলে ধরা যায়। পতিত শেখ হাসিনার ঘটনা আজকে না-ই বা বললাম। আজ না হয় একুশ বছর আগের একটি অধ্যায়ের কথা উল্লেখ করি। সেটা খুলনার এরশাদ শিকদারের অধ্যায়। একুশ বছর আগে ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে এরশাদ শিকদার যুগের অবসান ঘটে। দীর্ঘদিন মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল স্বর্ণকমল, ৪ ও ৫ নম্বর ঘাট এলাকা ও বরফকল।
সময়ের সাথে সাথে জৌলুস হারিয়েছে এরশাদ শিকদারের বিলাস ভবন ‘স্বর্ণকমলের’। দর্শনার্থীদের চাপে ও নানা বিরূপ মন্তব্যে স্বর্ণকমলে বসবাস অসম্ভব হয়ে পড়েছিল পরিবারের সদস্যদের। পরিচয়ও দিতে চান না এরশাদ শিকদারের সন্তানরা। তাদের জীবনে ঘটে গেছে বড় ছন্দপতন। ১৯৯৯ সালের নবেম্বরে গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসে এরশাদ শিকদারের নৃশংসতার নানা কাহিনী। তার নামে ৪৩ মামলা বিচারাধীন ছিল। এর অধিকাংশই হত্যা মামলা।
নি¤œ আদালতের বিচারে সাতটি হত্যা মামলায় তার ফাঁসির দ-াদেশ হয় এবং চারটি মামলায় যাবজ্জীবন সাজা হয়। ২০০৪ সালের ১০ মে মধ্যরাতে খুলনা জেলা কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। পরে নগরীর টুটপাড়া কবরস্থানে এরশাদ শিকদারের লাশ দাফন করা হয়। ইতিহাস বলে, পৃথিবীর স্বৈরাচারী ছোট বড় দাম্ভিক নেতারা যখন ‘মুসাফির’ পরিচয়টা ভুলে গেছেন, তখনই শুরু হয়েছে তাঁদের পতনের অধ্যায়। উদাহরণটা আমরা লক্ষ্য করেছি এরশাদ শিকদারের জীবনে এবং অবশ্যই পতিত শেখ হাসিনার জীবনেও।
পৃথিবীতে শুধু নেতিবাচক উদাহরণ নয়, আছে ইতিবাচক উদাহরণ। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় নওগাঁর পোরশা উপজেলা সদরের কথা। পথিকদের সমস্যার কথা চিন্তা করে ১১৭ বছর আগে তৎকালীন জমিদার খাদেম মোহাম্মদ শাহ তৈরি করেছিলেন একটি মাটির ঘর। নাম দিয়েছিলেন ‘মুসাফিরখানা’। তবে মাটির ঘরটি এখন দোতলা ভবনে রূপান্তরিত হয়েছে। দূর-দূরান্তের পথিকদের এখনো স্বাগত জানানো হয় আগের মতোই। পথিকদের রাতদিন থাকার পাশাপাশি খাবারের ব্যবস্থাও করেছিলেন জমিদার খাদেম মোহাম্মদ শাহ। খাওয়া-দাওয়া সবই একেবারে বিনামূল্যে। পরিচালনা সব ধরনের খরচ চালানোর জন্য তিনি মুসাফিরখানায় দান করেছিলেন ৮০ বিঘা জমি। দানকৃত ওই ৮০ বিঘা জমির আয় থেকে মুসাফিরখানার সব খরচ বহন করা হয়। উপলব্ধি করা যায়, জমিদার খাদেম মোহাম্মদ শাহ-এর জীবনদর্শন ও ঈমান-আকিদা ছিল বিশেষ বৈশিষ্ট্যে ম-িত। পতিত শেখ হাসিনা কিংবা এরশাদ শিকদারের সাথে যার কোনো মিল ছিল না। তিনি বিশ^াস করতেন মানুষ চিরজীবী নয়, পৃথিবীও নয় চিরস্থায়ী। ক্ষণিকের এ জীবনকে তিনি মুসাফিরের জীবন হিসেবেই বিবেচনা করতেন। ১১৭ বছর আগের তাঁর সে মাটির মুসাফিরখানা এখনো আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে যাচ্ছে। জমিদার খাদেম মোহাম্মদ শাহ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন অনেক আগে। তবে তাঁর বিশ^াসের ঝা-া এখনো উড্ডীন রয়েছে প্রিয় বাংলাদেশের জমিনে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানটি আবার স্মরণ করা যায় এখানেÑ
মুসাফির! মোছ্ এ আাঁখি-জল
ফিরে চল আপনারে নিয়া
আপনি ফুটেছিল ফুল
গিয়াছে আপনি ঝরিয়া ॥