ড. বি এম শহীদুল ইসলাম
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জামায়াত ইসলামীর বিরল এক “পলিসি সামিট-২০২৬’। গত ২০ জানুয়ারি মঙ্গলবার রাজধানীর অভিজাত হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে প্রায় ৩০টি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ সামিট জনগণের মনে আশার সঞ্চার করেছে। “নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ গড়ার মূলনীতি ও রূপরেখার প্রত্যয়ে অনুষ্ঠিত এ পলিসি সামিট আন্তর্জাতিক মহলে জামায়াত ও বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতের এ পলিসি সামিটকে রাজনৈতিক ও কূটনীতিক মহলে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। ‘পলিসি সামিট’-এ অংশ নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তানসহ প্রায় ৩০টি দেশের প্রতিনিধিগণ। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিগণসহ কূটনীতিকগণ এ সম্মেলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশে এটিই প্রথম “পলিসি সামিট”। ইতিপূর্বে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল এমন সামিটের আয়োজন করতে পারেনি। এ সামিট সমৃদ্ধপূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত ও ইনসাফ ভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ গড়ার এক নতুন ধারণা বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন। পলিসি সামিট অনুষ্ঠানের পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দেশব্যাপী প্রশংসায় ভাসছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে এ নিয়ে যথেষ্ট ইতিবাচক ধারণা ও কৌতুহলের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে আয়োজিত এ সামিট মঙ্গলবার ২০ জানুয়ারি সকালে রাজধানীর অভিজাত মিলনমেলা ‘হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল’-এ অনুষ্ঠিত হয়।
জামায়াতের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, ঐ দিন সকাল থেকেই বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা “পলিসি সামিটে” অংশ নেয়ার জন্য উৎসবমুখর পরিবেশে আগমন করেন। সামিটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, কোরিয়া, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, মালদ্বীপ, ব্রুনাই, কানাডা, শ্রীলঙ্কাসহ প্রায় ৩০টি দেশের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যকে সামনে রেখে এ সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সামিটের শুরুতে ইংরেজি ভাষায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দুর্নীতিমুক্ত ইনসাফ ভিত্তিক ‘সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার মহানায়ক ও পলিসি সামিটের রূপকার’ বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা বাংলাদেশে স্মার্ট রাজনীতির প্রবক্তা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। কূটনীতিক ও অতিথিদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, দেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ এখন শুধু টিকে থাকা নয়, বরং দেশের সার্বিক অবস্থা স্থিতিশীলতার মধ্যে নিয়ে আসা এবং তা নিশ্চিত করা। জামায়ত আমীর এ সময় নির্বাচনকে সামনে রেখে সমৃদ্ধ ও নতুন বাংলাদেশ গড়তে কি ধরনের পলিসি অনুসরণ করা হবে সে বিষয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপরেখা প্রকাশ করেন।
এ ধরনের নতুন উদ্যোগকে বিশেষজ্ঞ মহল ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্যতিক্রমধর্মী আইডিয়া হিসেবে দেখছেন। অনেকেই বলছেন, এমন একটি বুদ্ধিদীপ্ত স্মার্ট সামিটের আয়োজনে সক্ষম জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে সত্যিকার অর্থে দেশের চেহারা পাল্টে যাবে। বিশেষ করে অনুষ্ঠান পরিচালনা, পারিপার্শ্বিক সৌন্দর্য, আমন্ত্রিত অতিথিদের আসন ব্যবস্থাপনা এবং অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় জামায়াতের যেসব পুরুষ ও নারী কর্মীরা দায়িত্ব পালন করেছেন; তাদের কথাবার্তা, বাচনভঙ্গি শব্দচয়ন ও ইংরেজি ভাষা ব্যবহারে যেসব পারদর্শিতা লক্ষ্য করা গেছে তাতে কূটনীতিক মহলসহ কারো বুঝতে বাকি নেই যে, এ রাজনৈতিক দলটি কতটা সুশৃঙ্খল, দক্ষ ও আধুনিক যোগ্যতা সম্পন্ন জনশক্তি নিয়ে দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে বাংদেশের জনগণ জামায়াতকে ক্ষমতায় পাঠালে বাংলাদেশ একটি সুশৃঙ্খল আদর্শ উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
সামিটে ডা. শফিকুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস একটি দীর্ঘ ও অসমাপ্ত সংগ্রামের ইতিহাস-রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক মুক্তি ও মানবিক মর্যাদার সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে ১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষা এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল সামাজিক “ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক মুক্তি”। কিন্তু আমাদের আকাক্সক্ষা সুদীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হলেও সে প্রতিশ্রুতি আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। দেশবাসী মনে করে, এখন উপযুক্ত সময় এসেছে সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য গতিশীলতার সাথে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজে আত্মনিয়োগ করা। ডা. শফিকুর রহমানের চিন্তা-চেতনা ও ধ্যান-ধারণা হচ্ছে-দেশকে সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পলিসি নির্ধারণ করা। তিনি এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় বলেন, গত ১৭ বছরে আমাদের শাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও কর্তৃত্ববাদী শাসন চর্চার কারণে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ দুর্বল হয়ে গেছে। জনগণের নিকট জবাবদিহিতার মানসিকতা কমে গেছে এবং নাগরিকদের কণ্ঠস্বর ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়ে গেছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আবারও জনগণ বিশেষ করে তরুণরা নিজেদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধারের দাবিতে দাঁড়িয়ে গেছে। তরুণদের এ বিজয়ের প্রতি সম্মান দেখাতে হলে প্রয়োজন দেশ গঠনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা। ডা. শফিকুর রহমানের এমন স্মার্ট পরিকল্পনায় দেশবাসী গভীর অন্ধকারের মধ্যে দীপ্তিময় আশার আলো দেখছেন। জামায়াত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে কোন পলিসি নির্ধারণ করে দেশ পরিচালিত হবে, দেশের জনগণ কি ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাবে এবং কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ দিক বাস্তবায়ন করা হবে তা তুলে ধরা হয়। জামায়াত ঘোষিত পলিসির কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ উপস্থাপন করা হলো।
স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন: দেশে বর্তমান স্বাস্থ্য খাত খুবই ভঙ্গুর প্রকৃতির। তাই স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের লক্ষ্য জিডিপি ৬-৮% বরাদ্দ করা হবে বলে পেশ করা হয়। ৬০ বছরের ওপরে এবং ৫ বছরের নিচে সবার জন্য চিকিৎসা ফ্রি করা হবে। প্রেগন্যান্সির সময় নারীদের সকল প্রাথমিক চিকিৎসা ফ্রি করা হবে। ২. সোস্যাল স্মার্ট সিকিউরিটি কার্ড প্রদান: সোস্যাল সিকিউরিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাই নাগরিকদের মাঝে অত্যাধুনিক সোস্যাল স্মার্ট সিকিউরিটি কার্ড প্রদান করা হবে। এ কার্ডের মাধ্যমে নাগরিকগণ একই সাথে জাতীয় পরিচয় পত্র, ট্যাক্স ইনফরমেশন, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক অন্যান্য সুবিধাসমূহ ভোগ করতে পারবেন। ৩. বিদ্যুৎ ও গ্যাস চার্জ ফ্রি করা হবে: জামায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পলিসি হচ্ছে-আগামী তিন বছর পর্যন্ত সব শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির চার্জ সম্পূর্ণ ফ্রি করা হবে। যাতে শিল্প মালিকগণ স্বাচ্ছন্দ্যে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতিশীল ভূমিকা পালন করতে পারে। ৪. কৃষকদের সূদমুক্ত ঋণ প্রদান: কৃষকগণ যাতে উৎপাদন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সে জন্য কৃষকদের মাঝে সুদমুক্ত ঋণ প্রদান করা হবে। ৫. শিক্ষা খাতের উন্নয়ন: শিক্ষা খাতের ব্যাপক উন্নয়নের লক্ষ্যে ৫ লক্ষ গ্রাজুয়েটদের দুই বছর মেয়াদি মাসে ১০ হাজার টাকা করে বিনাসূদে ঋণ দেয়া হবে। এছাড়া বহির্বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার সুবিধার্থে প্রতি বছর ১০০ জন্য শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত লোন দিয়ে সরকারিভাবে পাঠানো হবে। ৬. নারী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন: নারী সমাজের উন্নয়ন ও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষে ইডেন কলেজ ও বদরুন্নেসা কলেজকে একীভূত করে ঢাকায় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য সর্ববৃহৎ ইউমেন্স বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। ৭. বন্ধ কলকারখানা চালু: পলিসি ইতিপূর্বে বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা পুনরায় চালু করা হবে এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ চালুর মাধ্যমে এসব কারখানার ১০% মালিকানা শ্রমিকদের দেয়া হবে। ৮. বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা: জামায়াতের ঘোষণা হচ্ছে-দেশের ৬৪টি জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। ৯. শিশুখাদ্য বিনামূল্যে প্রদান: সামিটে ঘোষণা করা হয় শিশুদের সব ধরনের খাদ্য সরকার কর্তৃক বিনামূল্যে প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে। ১০. প্রসূতি নারীদের বিনামূল্যে সেবা: প্রসূতি ও অন্যান্য নারীদের জন্য ফার্স্ট হ্যান্ডেড প্রোগ্রামের আওতায় প্রসূতি নারী ও মেয়েদের বিনামূল্যে সেবা প্রদান করা হবে।
এছাড়া পলিসি সামিটে আরো কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রাষ্ট্রের জনগণের জন্য প্রদান করার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ ও নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার পলিসি ঘোষণা করা হয়, যা জামায়াতের দেশ গড়ার এসব পলিসি জনগণের মাঝে আশার সঞ্চার করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করছেন। এমনকি সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরাসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক জরিপের প্রতিবেদনে জামায়াতের ক্ষমতায় যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এমনকি ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদনেও আসন্ন নির্বাচনে জামায়াত জয়ী হওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
এমতাবস্থায় উপযুক্ত পলিসি নিয়ে দেশের সর্বস্তরের জনগণ এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ মহলে যেসব নতুন ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে করে উপলব্ধি করা যায় যে, আগামী নির্বাচনে জামায়াত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে জাতিকে একটি দুর্নীতিমুক্ত ইনসাফ ভিত্তিক সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ উপহার দিতে সক্ষম হবে।
লেখক : শিক্ষাবিদ গবেষক ও কলামিস্ট।