১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন থেকেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক কখনোই মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অবশ্য স্বাধীনতা পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার দিল্লির সাথে অসম গাঁটছাড়া বেঁধেছিলো। ১৯৭২ সালে গৃহীত আমাদের রাষ্ট্রীয় সংবিধান ছিলো ভারতীয় সংবিধানের ছায়াকপি। ইসলাম ও মুসলিম জাতীয়তা পাকিস্তান আন্দোলনের মূল চেতনা এবং সে চেতনার ভিত্তিতেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছিলো। ১৯৭২ সালে ১৯ মার্চ বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও শান্তি বিষয়ক চুক্তি (মৈত্রী চুক্তি), ২৮ মার্চ প্রথম বাণিজ্য চুক্তি, ১১ নভেম্বর অভ্যন্তরীণ নৌপথ অতিক্রম ও বাণিজ্য প্রটোকল চুক্তি, ৩০ ডিসেম্বর সাংস্কৃতিক সহযোগিতা চুক্তি এবং ১৯৭৪ সালের ১৬ মে স্থল সীমানা চুক্তি স্বাক্ষর করে উভয় দেশ। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চুক্তি হলো ১৯৭২ সালের ২৫ বছর মেয়াদি মৈত্রী চুক্তি। যা ২৫ সালা গোলামী চুক্তি হিসাবেই আখ্যা পেয়েছে। এছাড়াও ১৯৭৪ সালের স্থল সীমানা চুক্তি (ছিটমহল ও বেরুবাড়ি বিনিময় সংক্রান্ত)। মূলত, স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সাথে যেসব দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেছিলো সেসব ছিলো ভারতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট একপাক্ষিক চুক্তি। এমনকি শেখ মুজিব তনয়া শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারতের সাথে যত চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে, সবই অতীত বৃত্তে বৃত্তাবদ্ধ। সকল চুক্তিতেই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে। একতরফাভাবে লাভবান হয়েছে ভারত। আর এ বিষয়ে শেখ হাসিনার আত্মস্বীকৃতিও রয়েছে।

এসব চুক্তির মধ্যে ১৯৭৪ মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি ছিলো খুবই উল্লেখযোগ্য। যা স্থল সীমানা চুক্তি হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। বস্তুত, চুক্তিটি স্বাধীন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পাদিত গুরুত্বপূর্ণ একটি দ্বি-পক্ষীয় আন্তর্জাতিক চুক্তি। এটি ১৯৭৪ সালের মে মাসের ১৬ তারিখে নয়াদিল্লিতে সম্পাদিত এবং বাংলাদেশের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। চুক্তির মুখবন্ধে বলা হয়, ‘এ চুক্তিটি দু’দেশের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব, আন্তরিক মনোভাব ও পারস্পরিক বিশ্বাস, আর সবার ওপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী এ দুজন মহান রাষ্ট্রনায়কের শান্তি ও সম্প্রীতির অন্তর্দৃষ্টির প্রতীক’। এ চুক্তির অন্যতম বিষয় ছিল সমঝোতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যকার স্থল-সীমানা নির্ধারণ সম্পন্ন করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ চুক্তি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব মেনে ইনসাফ ও সমতার ভিত্তিতে হয়নি বরং একতরফাভাবে ভারতের স্বার্থই রক্ষা করা হয়েছে। আর এ জন্য বিসর্জন দিতে হয়েছে আমাদের সার্বভৌমত্বও।

স্মরণযোগ্য যে, তিনবিঘা করিডোর হলো বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে একটি স্বতন্ত্র ভূমি যা ভারতের মালিকানাধীন তিনবিঘা জায়গার মধ্যে অবস্থিত। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলে যাতায়াতের সুবিধার্থে এটি বাংলাদেশকে ইজারার মাধ্যমে দেওয়া হয়। এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জ মহকুমা ও বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার সীমান্তে অবস্থিত। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৬ মে ১৯৭৪-এর ইন্দিরা গান্ধী-শেখ মুজিবুর রহমান চুক্তি অনুসারে ভারত ও বাংলাদেশ তিনবিঘা করিডোর ও দক্ষিণ বেরুবাড়ীর সার্বভৌমত্ব পরস্পরের কাছে হস্তান্তর করে। ফলে উভয়দেশেই তাদের ছিটমহলে যথাক্রমে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ও দক্ষিণ বেরুবাড়ীর যাতায়াত সুবিধা তৈরি হয়। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ চুক্তি অনুসারে সাথে সাথেই দক্ষিণ বেরুবাড়ী ভারতের কাছে হস্তান্তর করে। তবে ভারত তিনবিঘা করিডোর বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করার ক্ষেত্রে ভারতের সংবিধান সংশোধনের বাহানা তুলে তা বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করেনি। পরবর্তীতে প্রবল জনমতের চাপে সরকারের চাপের পর ২০১১ সালে ভারত বাংলাদেশের কাছে ইজারা দেয় এবং শর্ত আরোপ করে যে, একই সময়ে দক্ষিণ বেরুবাড়ী ভারতের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। এমনই ছিলো বাংলাদেশের সাথে ভারতের বন্ধুত্ব।

১৯৯৬ সালে মুজিব তনয়া ক্ষমতায় এসে ভারতের সাথে ত্রিশাসালা গঙ্গা পানি চুক্তি করে। কিন্তু গঙ্গার পানির নায্য হিস্যা আদায়ে এ চুক্তি করা হলেও চুক্তির শর্ত মোতাবেক আমরা পানি পাইনি। আওয়ামী লীগ সরকার চুক্তি করেই তাদের দায় শেষ করেছে। কিন্তু চুক্তির শর্ত মোতাবেক পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে তাদের কোন তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি বরং চুক্তি নিয়েই তারা তৃপ্ত থেকেছে। এভাবেই স্বাধীনতার পর ৫৪ বছরে ভারতের সাথে মোট ৯৩ টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। আর অধিকাংশ চুক্তিই একতরফাভাবে ভারতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট।

আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের সখ্যতার অংশ হিসাবেই ২০০৬ সালের ১/১১-এর প্রেক্ষাপট এবং একটি সাংবিধানিক কেয়ারটেকার সরকারের পতন ঘটে। ফলে একটি অসাংবিধানিক জরুরি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে ২ বছর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয় এবং সে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবেই ২০০৮ সালে পাতানো ও সমঝোতার নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনা হয়। আর এ অভিযোগ কোন আওয়ামী বিরোধী মহলের নয় বরং খোদ আওয়ামী লীগের মরহুম সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল এ বিষয়ে আত্মস্বীকৃতি দিয়েছেন। আর এভাবেই আওয়ামী বাকশালীরা দেশের ক্ষমতার মসনদ দখল করেছিলো।

এর পরের ঘটনা কারোরই অজানা নয়। সাজানো ও পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর দেশে অপশাসন-দুঃশাসন চালিয়েছে। নিজেদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত বা চিরস্থায়ী করার জন্য আদালতের দোহাই দিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি বাতিল করে দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে। জনপ্রশাসন, বিচারবিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও শিক্ষা প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের সকল অঙ্গ প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করে সারাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জুলুম-নির্যাতন, হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, অপহরণ, গুপ্তহত্যা, গুম ও আয়না ঘরে আটকের মাধ্যমে দেশকে রীতিমত আতঙ্কের জনপদে পরিণত করা হয়েছে। আর এসব করা হয়েছে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায়।

২০১৪ সালের নির্বাচনে এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নিতে না চাইলে প্রতিবেশী দেশ ভারতের হস্তক্ষেপে দলটিকে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। আর এ কাজে নিয়োজিত করা হয়েছিলো দেশটির বিদেশ সচীব শ্রীমতি সুজাতা সিংকে। তথাকথিত এ নির্বাচনে ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে বিনাভোটেই আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিলো। এ সরকারকে শর্তহীনভাবে সমর্থন দিয়েছিলো আমাদের নিকট প্রতিবেশী ভারত। ২০১৮ সালের নৈশ ভোটের দেশটির সমর্থন পেয়েছিলো আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির ডামি নির্বাচনের অকুণ্ঠ সমর্থকও ছিলো বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত। আর আওয়ামী লীগের তামাশা ও ভাঁওতাবাজির নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সরকারকে টিকিয়ে রাখার কারণে আওয়ামী নেত্রী ভারতকে সবকিছু উজার করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা ভারতকে যা দিয়েছি, তা তারা কখনোই ভুলতে পারবে না’। মূলত, তিনি ভারতের সেবাদাসী হিসাবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে দীর্ঘ পরিসরে দেশে অপশাসন দুঃশাসন চালিয়েছেন।

তবে ভারতের মদদে ক্ষমতায় থাকলেও আওয়ামী লীগের শেষ রক্ষা হয়নি বরং এক অনিবার্য বাস্তবতায় ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের তোপে তাদেরকে লজ্জাজনকভাবে ক্ষমতা হারাতে হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের মিত্রশক্তি প্রতিবেশী ভারত তা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়নি বরং তারা পতিতদের সে দেশে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার সাথে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এমনকি দেশটি আওয়ামী লীগকে দৃশ্যপটে ফিরিয়ে আনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করছে। কিন্তু সরকারের শক্ত অবস্থানের কারণে তারা আপাতত সফল হয়নি। ফলে দেশটি ঢাকায় নতুন মিত্রের সন্ধানে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যাচ্ছে যে, তারা তাদের দ্বিতীয় পছন্দ ও আওয়ামীলীগের বিকল্প হিসাবে বিএনপিকেই বেছে নিয়েছে এবং ইতোমধ্যেই দলটির শীর্ষনেতার সাথে একটি সমঝোতায় উপনীত হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

মূলত, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোক ও ঢাকায় তার জানাযায় দেশটির বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের উপস্থিতির মাধ্যমে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সম্ভাব্য সরকারের প্রতি ভারত নতুন ধরনের বার্তা দিয়েছে বলেই পর্যবেক্ষক মহল ধারণা করছেন। ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে ‘ভারত-বাংলাদেশ উত্তেজনা চরমে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ‘ভারত ও বাংলাদেশ কি সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে পারবে?’- উপশিরোনামে এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান। ওই প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছেন উইলসন সেন্টারে সাউথ এশিয়া ইন্সটিটিউটের সাবেক এ পরিচালক। এতে বাংলাদেশ অংশে তিনি লিখেছেন, সম্প্রতি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ক্রিকেট লিগ আইপিএলের (ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ) সম্প্রচার নিষিদ্ধ করেছে। কলকাতা নাইট রাইডার্স দল থেকে বাংলাদেশী তারকা ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে সরিয়ে দেওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মাত্র গত মাসেই দলে যোগ দিয়েছিলেন মোস্তাফিজ। তাকে সরিয়ে দেওয়ার নেপথ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কারণ জানানো হয়নি। তবে এটি নাকি ভারতের মূল ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ সংস্থার নির্দেশে করা হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল ঘোষণা দিয়েছে, আসন্ন টি-২০ বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো ভারতে খেলতে যাবে না তারা। এ অঞ্চলের মানুষ ক্রিকেট-পাগল। উল্লেখযোগ্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এ খেলা এখানে সাধারণত ঐক্যের বন্ধন তৈরি করে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপড়েনের গভীরতা কতটা তা সাম্প্রতিক এসব ঘটনা প্রমাণ করে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সম্পর্কের এ অবনতির শুরু। তবে ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার প্রাক্কালে এ টানাপড়েন এখন বিশেষভাবে সংকটময় অবস্থায় পৌঁছেছে। একের সঙ্গে অন্যের এ উত্তেজনার পেছনে রয়েছে দুদেশের ভেতরকার কিছু মৌলিক ধারণা। জনগণ বিশ্বাস করেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে হস্তক্ষেপ করে আসছে ভারত। অন্যদিকে অনেক ভারতীয় মনে করেন, শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতবিরোধী শক্তিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এ দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে আরও কঠোর করেছে। ভারত হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে। তাকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে এবং ঢাকার দাবির পরও তাকে হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে যা ঢাকার অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে বা বার বার তারা এ বিষয়ে তাগিদ দিচ্ছে। ২০২৪ সালের প্রতিবাদ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে কয়েকশ মানুষ নিহত হওয়ার দায়ে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে নভেম্বরে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত।

ভারতের বরাত দিয়ে মাইকেল কুগেলম্যান লিখেছেন, নির্বাচিত যেকোনো সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত তারা। ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচনে সম্ভাব্য বিজয়ী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) টানাপড়েনের সম্পর্ক থাকলেও দলটি এখন দিল্লির কাছে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গত মাসে মৃত্যুবরণ করার পর তার ছেলে তারেক রহমানকে উষ্ণ সমবেদনা বার্তা পাঠিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ঢাকায় খালেদা জিয়ার জানাযায়ও যোগ দেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর। এতে বোঝা যায়, বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সম্ভাব্য সরকারের প্রতি ভারত নতুন ধরনের বার্তা দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি বাংলাদেশের আগামী প্রধানমন্ত্রীও হতে পারেন। তিনি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। এটা হতে পারে পরোক্ষভাবে ভারতের প্রতি ইঙ্গিত যে, তিনি সরকার গঠন করলে তার সরকার দেশের সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেবে।

এখন প্রশ্ন হলো, দেশের ভেতরের রাজনৈতিক বাস্তবতা কি দু’দেশের জন্যই আপসের সুযোগ সীমিত করে দেবে? বাংলাদেশের প্রভাবশালী দলগুলো ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততার বিরোধী। এটা ঢাকায় নতুন সরকারের রাজনৈতিক পরিসরকে সংকুচিত করতে পারে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য এ ঝুঁকি তুলনামূলক কম। কারণ তিনি দেশে এখনও অত্যন্ত জনপ্রিয়।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকতে পারে, তবে তা কেবল ‘সমঅধিকারভিত্তিক’ হতে হবে। অক্টোবরে তারেক রহমান বলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে ঠাণ্ডা-এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাংলাদেশিরা। তাই আমাকে আমার দেশের মানুষের পাশেই দাঁড়াতে হবে। অতএব, বাংলাদেশের নির্বাচন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি সুযোগ এনে দিলেও, সে পথ তৈরি হবে কেবল তখনই, যদি উভয় দেশই রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়ার সাহস দেখায়।

সার্বিক দিক বিবেচনায় এ সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায় যে, আওয়ামী লীগকে অতিদ্রুততার সাথে পুনর্বাসনে ব্যর্থ হয়ে দিল্লি এখন ঢাকায় নতুন মিত্রের সন্ধান করছে। আর এক্ষেত্রে তারা বিএনপিকেই আপাতত বিকল্প মনে করছে। আর বিএনপিও আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সমর্থন প্রত্যাশী বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে বিএনপির একথা মনে রাখা জরুরি যে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী চেতনাই হচ্ছে দলটির আদর্শ। তাই শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সে আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়া মোটেই ইতিবাচক হবে না বরং তা দলটিকে গণবিচ্ছিন্ন করবে বলেই পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা। এমনকি তা দলটির বিলুপ্তির কারণও হতে পারে।

www.syedmasud.com