॥ কাজী সালাহউদ্দীন ॥
একজন বিচারপতি বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কী করে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত থেকে অসামান্য অবদান রাখতে পারেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ। তার কর্মক্ষেত্র ছিল অপেক্ষাকৃত বিস্তৃত। এ ক্ষেত্রে অন্যদের চাইতে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ ১৯৩৪ সালে কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৩৫ সালে ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য ইংলান্ড যান। ১৯৩৮ সালে ব্যারিস্টারি পাস করে পুনরায় কলকাতা হাইকোর্ট বারে যোগ দেন। ১৯৫১ সালে তিনি যোগ দেন ঢাকা হাইকোর্ট বারে। ১৯৫৫ সালের জুনে ঢাকা হাইকোর্ট বেঞ্চের বিচারক নিযুক্ত হন। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের এডহক বিচারকের দায়িত্ব পান। ১৯৬৪ সালের ১৫ মে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৬৭ সালের ১১ নবেম্বর প্রধান বিচারপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন।
একজন আইনজ্ঞ হিসেবে তার অবস্থান এতটাই উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিল যে, যুগে যুগে তা অম্লান আদর্শ হিসেবে ভবিষ্যৎ বংশধরদের-আইনজীবীদের অনুপ্রেরণার উৎস এবং সত্যের পথে উজ্জীবিত করবে। সরকারের অসহিষ্ণুতা ও স্বৈরাচারী শাসনের কারণে তিনি এগিয়ে এসেছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্তদের পক্ষে। তিনি প্রধান বিচারপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে জাতির সাধুবাদ অর্জন করেছিলেন। তখন থেকে তিনি অকুতোভয়-নির্ভীক বিচারপতি হিসেবে সর্বজন শ্রদ্ধেয়।
নির্ভীক সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি ১৯৬১ সালে যখন রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় একজন বিচারপতি হিসেবে রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকীতে তার ভূমিকা সম্পর্কে ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘ঢাকায় রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের জন্য যে কমিটি গঠিত হয়, বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ তার সভাপতি ছিলেন। তিনি তখন ঢাকা হাইকোর্টের একজন বিচারক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের একজন সদস্য। কমিটি গঠনের জন্য যে সভা আহূত হয় তা এর কমিটির প্রাথমিক কয়েকটি সভা বিশ^বিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষের অফিস কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বিচারপতি মোরশেদ সবকটি সভায় যোগ দিয়েছিলেন। একদিন তিনি বললেন যে, অনুষ্ঠানের জন্য কেউ যেন চাঁদা না তোলে, প্রয়োজনীয় অর্থ তিনিই সংগ্রহ করে দেবেন।
ছাত্রদের কাছেও তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। বিশেষ করে সমাবর্তন মামলার কারণে। সে সময়ে পদাধিকার বলে চ্যান্সেলর হতেন পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন কুখ্যাত গভর্নর মোনায়েম খান। ১৯৬৪ সালের ২২ মার্চ কার্জন হলে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে ছাত্র-শিক্ষকদের প্রবল আপত্তির মুখে মোনায়েম খাঁ গোঁ ধরেন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেনই। এদিকে ছাত্ররা তার হাত থেকে সার্টিফিকেট গ্রহণ করবেন না বলে সিদ্ধান্তে অবিচল। শুরু হয় বিক্ষোভ- পুলিশ ছাত্রদের দশন করার চেষ্টা চালায়। এক পর্যায়ে বিশ^বিদ্যালয় ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন মোনোয়েম খাঁ।
তিনি ছাত্রদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারিসহ নানা রকম নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা নেন। তৎকালীন ছাত্রনেতা ফজলুল হক মনি, আসমত আলীর এম.এ ডিগ্রি বাতিল করেন। রাশেদ খান মেনন, সিরাজুল আলম খানসহ অসংখ্য ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের আদেশ দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ছাত্ররা হাইকোর্টে রীট আবেদন করে। ১৯৬৪ সালের ৮ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের এ আদেশ অবৈধ ঘোষণা করে বিচারপতি মোরশেদ রায় প্রদান করেন। ফলে ছাত্রদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। এমনিভাবে বিচারক থাকা অবস্থায় আইনের চুলচেরা বিশ্লেষণ, মানবিকতা এবং সাহিত্যে এক অপূর্ব মেলবন্ধন স্পষ্ট হয় তার দেয়া প্রতিটি রায়ে। ফুঠে উঠেছে গভীর অভিনিবেশ, প্রজ্ঞা ও পান্ডিত্য। সর্বোপরি তিনি ছিলেন মানবতাবোধসম্পন্ন একজন আলোচিত মানুষ। ১৯১১ সালের ১১ জানুয়ারি পরিশ্চবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় সৈয়দ পরিবারে তার জন্ম। মা আফজালুন নেছা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের ভগ্নি। বাবা সৈয়দ আবদুস সালিক ছিলেন এক সময় বগুডা ও দিনাজপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট।
যুদ্ধ-উত্তর ব্রিটিশ ভারতের মানবতার সেবায় সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ ‘আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম’ সংস্থার মাধ্যমে দুঃস্থদের পাশে দাঁড়ান। সম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিরসনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে ছিলেন তিনি। চল্লিশের দশকের প্রথমার্ধে লেখক হিসেবে সৈয়দ মাহুবুব মোরশেদের পরিচিতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বিখ্যাত গার্ডেন পত্রিকায় বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হলে আরব-বিশ্বে এবং ফিলিস্তিনে তিনি বিশেষভাবে প্রশংসতি হন। ‘স্টেটম্যান’ পত্রিকার কায়দে আজম’ সম্পর্কে প্রকাশিত সমালোচনা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে।
মাহবুব মোরশেদ অত্যন্ত কৃতী ছাত্র ছিলেন। স্কুলের প্রত্যেক শ্রেণীতে তিনি প্রথম হয়েছে। ১৯২৬ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ন হন। ঐ বছর যারা প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেন তাদের মধ্যে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। প্রবেশিকা পাসের পর তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৩১ সালে সেখান থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক হন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক হন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম এ এবং এলএলবি ডিগ্রী গ্রহণ করেন যথাক্রমে ১৯৩২ এবং ১৯৩৩ সালে আইনের স্নাতক পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণী অর্জন করেন।
প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র থাকাকালীন তিনি কলেজ ম্যাগাজিনের সম্পাদক-এর দায়িত্ব পালন করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক প্রতিযোগী ছাত্র দলের নেতা ছিলেন। ৩০-এর দশকে কলকাতা মোহামেডানর স্পোর্টিং ক্লাবের তিনি একজন সংগঠক ছিলেন। চল্লিশের দশকে তার ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত হুমায়ুন কবির, সাহিত্যিক রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ।
কলকাতা থাকা অবস্থায় মাহবুব মোরশেদ যেসব মামলায় খুব নাম করেন তার মধ্যে হালসাবানের অগ্নিকা- মামলা, দমদম বিমানবন্ধর ষড়যন্ত্র মামলা, ভবানীপুর ব্যাংক ডাকাতি মামলা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া এদেশে মন্ত্রী সংঘটিত মামলা আবু মাহমুদ মামলা ঐতিহাসিক মামলা হিসেবে বিবেচিত। একবার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মন্তব্য রেখেছিলেন যে, তিনি একমাত্র বলিষ্ঠ ন্যায়বিচারক এবং পাকিস্তানের নির্ভরশীল উদার ও উচ্চমানের বিচারক।
প্রখ্যাত আইনবিদ মি: বিরেন সরকার তার সম্পর্কে মন্তব্য রেখেছিলেন যে, তিনিই একমাত্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ন্যায্য দাবি আদায়ের ব্যাপারে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ মনে করতেন বিচারকের প্রদান কর্তব্যই হচ্ছে ইইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। ‘গণতন্ত্রই সর্বোচ্চ অধিকার’-অর্থাৎ গণতন্ত্রের প্রতি ছিল তাঁর আগাধ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না বাংলাদেশের স্বাধীনতাও রয়েছে সুদীর্ঘ দিনের ধারাবাহিক ইতিহাস। স্বাধীনতার জন্যে রয়েছে অষংখ্য মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষা, অশ্রু এবং প্রাণ বিসর্জন। ধাপে ধাপে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে হয়েছে। বিচারপতি মোরশেদের মতো আরো অনেকের বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতকে শক্তিমালী করেছে। যাদের ঋণ কোনদিন শোধ হবার নয়।
সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ এটি শুধু একিিট নাম নয়-ইতিহাসের কিংবদন্তি, অবিস্মরণীয় নাম। নতুন প্রজন্মকে তার সম্পর্কে জানাতে হবে-এ জানার মধ্যে বাংলাদেশের সত্যিকার ইতিহাস জানা যাবে। তিনি আমাদের বাতিঘর। অনুপ্রেরণার উৎস। এমন একজন মহান ব্যক্তিকেও আমরা যথাযথ সম্মান জানাতে পারিনি। তার মৃত্যুর চল্লিশ বছরেও তাঁকে ‘একুশে পদক’ বা স্বাধীনতা পদকও (মরণোত্তর) দেওয়া হয়নি। ১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ এই সুন্দর পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। কিন্তু তিনি আছেন আমাদের হৃদয়ে শ্রদ্ধায়-ভালবাসা। আমরা তাঁর অমর আত্মার শান্তি কামনা করছি।