আমাদের অবক্ষয় এখন অতীতের সকল সীমা অতিক্রম করেছে। আমরা এমনই এক হতভাগা ও আত্মঘাতি জাতিতে পরিণত হয়েছি যে, নিজেরাই নিজেদের খাদ্যে বিষ মিশিয়ে খাচ্ছি। ফলমূলে মাত্রাতিরিক্ত ফরমালিনসহ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কেমিক্যাল মিশ্রণ সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এমনকি জীবনরক্ষাকারী ওষুধও আমাদের দেশে এখন নিরাপদ নয়। যে ওষুধ মানুষ জীবন রক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয়, সে ওষুধ নকল ও ভেজাল হওয়ায় জনস্বাস্থ্যই এখন হুমকীর মুখে পড়েছে। কিন্তু এসব অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। ফলে এদের অপতৎপরতা ক্রমেই বাড়ছে বৈ কমছে না।

মূলত, জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে ভেজাল ও নকল ওষুধের কারবারিরা। শহর থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল, সবখানেই ছড়িয়ে পড়ছে নকল ও ভেজাল ওষুধ, যা নিয়ে রোগী ও চিকিৎসকদের মধ্যে উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিছু কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে ভেজাল ও নকলের উপদ্রব এতটাই বেড়েছে যে, চিকিৎসকদের মধ্যে অনেকে ওষুধগুলোর ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। এমনকি কেউ কেউ বন্ধও করে দিয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। তেমনই একটি ওষুধের নাম ‘অ্যালবুমিন ইঞ্জেকশন’, যা মূলত বড় ধরনের অস্ত্রপচার বা গুরুতর আঘাত পরবর্তী চিকিৎসায় রক্তে প্লাজমার পরিমাণ বাড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু ওষুধটির নকল ও ভেজালে এখন বাজার সয়লাব বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্বাস্থ্যখাতের গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা শহর থেকে দেশের প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত সবখানেই ভেজাল ও নকল ওষুধ ছড়িয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে যেসব ওষুধের চাহিদা এবং দাম বেশি, সেগুলোরই নকল ও ভেজাল বাজারে বেশি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে যেসব ওষুধের নকল তৈরি হচ্ছে, সেগুলোতে উপাদান হিসেবে আটা-ময়দা, এমনকি সুজি ব্যবহার করার প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকরা।

২০২৪ সালের মার্চে ঢাকা ও বরিশালে অভিযান চালিয়ে আটা, ময়দা এবং সুজি ব্যবহার করে নকল ওষুধ উৎপাদনকারী একটি দলের পাঁচজন সদস্যকে গ্রেফতার করেছিল গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের কাছ থেকে তখন বিভিন্ন ধরনের প্রায় পাঁচ লাখ নকল অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ধার করা হয়। দলটির সদস্যরা প্রায় দশ বছর ধরে নকল ওষুধ তৈরি ও বিক্রি করে আসছিল বলে জানান পুলিশের কর্মকর্তারা। গবেষক ও চিকিৎসকরা বলছেন, যেসব ওষুধের চাহিদা ও দাম বেশি, বাজারে সেসব ওষুধের নকল বেশি দেখা যাচ্ছে। চাহিদা থাকার পরও বাজারে সহজে পাওয়া যায় না, এমন ওষুধেরও নকল বের হচ্ছে। এক্ষেত্রে দেশে উৎপাদিত ওষুধের পাশাপাশি অনেক বিদেশি ওষুধও নকল হতে দেখা যাচ্ছে। বেসরকারি হিসেবে, দেশে বর্তমানে আড়াই লাখেরও বেশি ওষুধের দোকান রয়েছে। এসব ফার্মেসির মধ্যে বড় একটা অংশেরই অনুমোদন নেই বলে জানা যাচ্ছে। আবার যেগুলোর অনুমোদন রয়েছে, নজরদারির অভাবে সেগুলোর মধ্যে অনেক ফার্মেসি নিয়ম-নীতি মানছে না বলে জানিয়েছেন তারা। নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়াকে জাতীয় স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

গতবছর ঢাকার কোন কোন হাসপাতালে অ্যানেস্থেসিয়া বা চেতনানাশক ওষুধ দেওয়ার পর অন্তত তিনটি শিশুর মৃত্যু হয়। পরে চেতনানাশকে ব্যবহৃত ‘হ্যালোথেন’ পরীক্ষা করে চিকিৎসকরা জানতে পারেন যে, সেগুলোতে ভেজাল ছিল। এ ঘটনার পর দেশের সরকারি-বেসরকারি সকল হাসপাতালে চেতনানাশক ওষুধ হিসেবে হ্যালোথেনের ব্যবহার বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে অভিযান চালাচ্ছেন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। কিন্তু তারপরও কেন নকল ও ভেজাল ওষুধের উৎপাদন এবং বিক্রি বন্ধ হচ্ছে না? প্রাপ্ত তথ্যমতে, দেশীয় ওষুধের পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানে নকল করা হচ্ছে বিদেশি নামিদামি ওষুধও। আর নকল ওষুধ বিপণনের বড় হাট রাজধানীর মিটফোর্ড। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, নকল, ভেজাল ও নিম্মমানের এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ৩৬টি মামলা করা হয়েছে। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ২ কোটি ৬৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩শ টাকা। গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, হুবহু ‘আসল’ মোড়কে গ্যাস্ট্রিক, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগের নকল ওষুধ বাজারে ছাড়ছে সংঘবদ্ধ চক্র।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর ফকিরাপুলকেন্দ্রিক প্যাকেজিং ব্যবসা গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন নামিদামি ওষুধ কোম্পানিগুলো এসব কারখানা থেকে বিভিন্ন ওষুধের মোড়ক তৈরি করে। কিছু প্যাকেজিং কারখানার অসাধুরা অর্ডারের অধিক পরিমাণে মোড়ক তৈরি করে, যা পরে নকলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিক্রি করে দেয়। ফলে এসব মোড়কে নকল ওষুধ বাজারজাত হলেও আসল-নকল চেনার কোনো উপায় থাকছে না। আর রোগ সারানোর বদলে নকল ওষুধ মানুষের জীবনীশক্তিকেই নষ্ট করে দিচ্ছে।

সূত্র বলছে, রোগ সংক্রমণের ব্যাপকতায় বেশ কিছু ওষুধের চাহিদা বাজারে বেশি। গ্যাস্ট্রিক, প্রেসার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ ও অ্যাজমার ওষুধ অন্যতম। অতি মুনাফার লোভে এসব ওষুধ নকল করছে জালিয়াতচক্র। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এমন ৭৯টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা দিয়েছিল ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কাছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

দেশে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ উৎপাদনের জন্য ২৮৪টি কোম্পানির অনুমোদন রয়েছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের। এছাড়া ২৮১টি ইউনানি, ৩৪টি হারবাল ও ২১২টি আয়ুর্বেদিক কোম্পানিকেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইউনানি, হারবাল ও আয়ুর্বেদিক কোম্পানিগুলোর কিছু স্বার্থান্বেষী মালিক তাদের নিজস্ব ওষুধ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন অ্যালোপেথিক কোম্পানির নকল ওষুধ তৈরি করছে।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি ওষুধের সুনাম থাকলেও দেশজুড়ে ওষুধের অবৈধ বাণিজ্যে সীমাহীন নৈরাজ্য চলছে। নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ এবং ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্যে জিম্মি হয়ে পড়েছেন রোগীরা। ক্রেতারা জানতেও পারছেন না তারা টাকা দিয়ে কী ওষুধ কিনছেন। ওষুধ বাণিজ্যের নৈরাজ্য রোধে ক্রেতা সচেতনতার কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। সচেতনতা বাড়াতে নেই প্রচারের সুযোগ। উপরন্তু আইন করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ওষুধ সম্পর্কিত প্রচারের ব্যবস্থাটি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ডাক্তাররাও নতুন ওষুধ সম্পর্কে জানেন না। তাই অতিরিক্ত টাকা খরচ করেও কাক্সিক্ষত সুফল পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। উপরন্তু ভেজাল ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন তারা।

দেশের বৃহত্তর পাইকারি ওষুধের বাজার ঢাকার মিটফোর্ডে ভেজাল, নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির বিরুদ্ধে মাঝে-মাঝেই অভিযান চালায় সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত জালের মতো বিস্তৃত ভেজাল ও নকল ওষুধের নেটওয়ার্কে শত শত কোটি টাকার বিপণন হচ্ছে। শুধু জরিমানা ও অপ্রতুল শাস্তি দিয়ে এই ভেজাল, নকলের দৌরাত্ম্য ঠেকানো যাচ্ছে না। কার্যকর তদারকির অভাবে একই চক্র বারবার সংঘবদ্ধ অপকর্মে জড়িয়ে দেশের সাধারণ মানুষকে সর্বস্বান্ত করছে।

ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের তথ্য মতে, বর্তমানে সারাদেশে নিবন্ধিত ওষুধের দোকানের সংখ্যা ১ লাখ ৫৩ হাজার। এর মধ্যে গত দু’বছরে নতুন নিবন্ধন পেয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারাদেশে লাইসেন্সধারী ফার্মেসির প্রায় সমান পরিমাণ লাইসেন্স ছাড়া ওষুধের দোকান রয়েছে। এ সংখ্যা দেড় লাখের বেশি হবে। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর ও বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির দুর্বলতার কারণে লাইসেন্সবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বহু ফার্মেসি। এসব দোকানের মাধ্যমেই ক্রেতাদের কাছে ভেজাল ওষুধ বিক্রি হয়।

রাজধানীসহ সারা দেশের জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত এসব দোকান বিস্তৃত। প্রাপ্ত তথ্যমতে, দেশে ড্রাগ লাইসেন্সবিহীন ওষুধের দোকান রয়েছে ১২ হাজার ৫৯২টি। তিনি বলেন, নকল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের বিরুদ্ধে সরকার নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। গত অর্থবছরে ভ্রাম্যমাণ আদালত ১ হাজার ৭১৫টি মামলা দায়ের এবং ৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে বিপুল পরিমাণ নকল ওষুধের চালান ধরা পড়ায় ভেজাল ওষুধ নিয়ে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। সম্প্রতি সর্বাধিক সেবন করা দু’টি ট্যাবলেটের বিপুল পরিমাণ নকল ওষুধ উদ্ধার করেছে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় ওয়েস্ট ফার্মাসিউটিক্যাল নামের আয়ুর্বেদি ওষুধ তৈরির কারখানায় তৈরি করা হচ্ছিল মোনাস-১০ ও প্যানটেনিক্স-২০ ট্যাবলেট। ঠাণ্ডা-শ্বাসকষ্ট আর গ্যাস্ট্রিকের চিকিৎসায় বহুল প্রচলিত এ ওষুধ দু’টি তৈরি করা হচ্ছিল আটা-ময়দা আর রং ব্যবহার করে। এগুলো মিটফোর্ড হয়ে কুরিয়ার সার্ভিসে ছড়িয়ে দেওয়া হতো সারা দেশে।

রাজধানীর চকবাজারের একটি কুরিয়ার সার্ভিস থেকে মোনাস-১০ ও প্যানটেনিক্স-২০ নকল ওষুধের চালানটি আটক করে ডিবি লালবাগ বিভাগ। এ সময় একজনকে গ্রেফতারের পর তার তথ্যমতে ফকিরাপুল এলাকা থেকে কারখানাটির মালিককে গ্রেফতার করা হয়। দু’জনের জবানবন্দি অনুযায়ী, রাজধানীর চকবাজার, ফকিরাপুল ও চুয়াডাঙ্গায় অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় ১০ লাখ ৩৪ হাজার ২৮০ পিস নকল প্যানটেনিক্স-২০ ট্যাবলেট ও ১৮ হাজার পিস নকল মোনাস-১০ ট্যাবলেট। এর আগে ১৫ মার্চ চট্টগ্রাম শহরে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির মোড়কে ৩ হাজার ৬৪১ ভেজাল ওষুধ জব্দ করে র‌্যাব। এসব ওষুধের মধ্যে রয়েছে এন্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েডের মতো ওষুধও।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর বৃহত্তর ওষুধের বাজার মিটফোর্ড কেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দেশের মফস্বল শহর ও গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ছে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ। ওষুধ প্রশাসনের নজরদারির অভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধও ব্যবহার করতে হচ্ছে মফস্বলের ক্রেতাদের। এতে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এ ছাড়া বাজার প্রচলিত ওষুধগুলোর নকল ও ভেজাল তৈরি করে মফস্বলের ফার্মেসিগুলোতে অবাধে বিক্রি করা হচ্ছে। এই নকল চক্রের হোতারা মাঝে-মধ্যেই র‌্যাব-পুলিশের অভিযানে ধরা পড়ছে। জেল খেটে আবারও ফিরে আসছে একই পেশায়।

স্বাধীনতার ৫৪ বছরে বাংলাদেশের ওষুধশিল্পে বিস্ময়কর উন্নতি ঘটেছে। তবে এ অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে দুর্বল তদারকির কারণে। স্বাধীনতা উত্তর সময়ে যেখানে বিদেশি ওষুধের ওপর নির্ভরতা ছিল প্রায় শতভাগ, সেখানে ৫০ বছর পর বিশ্বের ১৪৭ দেশে রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদনে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ এখন এক নির্ভরতার নাম। শুধু সাধারণ নয়, বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো এখন ভ্যাকসিন, হৃদরোগ ও ক্যান্সারের ওষুধ, ইনসুলিনসহ বিভিন্ন ধরনের জটিল ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ওষুধ তৈরি করছে। ইতোমধ্যে দেশের অন্তত ১৪টি কোম্পানি বিভিন্ন দেশে নিবন্ধন পেয়েছে। এর মাধ্যমে সেসব দেশে আরও বিপুল পরিমাণ ওষুধ রপ্তানির পথ প্রশস্ত হয়েছে।

দেশের প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ওষুধের বাজারের ৯৭% শতাংশই স্থানীয় ওষুধ কোম্পানিগুলোর দখলে। ১৮ কোটি মানুষের এই দেশের পুরো চাহিদা মিটিয়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে প্রতি বছর। এ গৌরবময় প্রেক্ষাপটের মধ্যেও এক শ্রেণির নকলবাজ ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বিপণন করে সাধারণ মানুষকে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে ভেজাল ওষুধের নেটওয়ার্ক। তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্য প্রশাসনের জোরালো নজরদারি না থাকায় বেপরোয়া ভেজালকারীরা বারবার ফিরে আসছে।

মূলত, ওষুধ হলো এমন রাসায়নিক দ্রব্য যা প্রয়োগে প্রাণিদেহের স্বাভাবিক ক্রিয়া প্রভাবান্বিত হয় এবং যা দ্বারা রোগ নিরাময় হয় বা প্রতিকার হয়, বা পীড়া ও ক্লেশ নিবারণ হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের i (FDA) সংজ্ঞার্থ অনুসারে: ‘দ্রব্যসমূহ যা রোগ নির্ণয়ে, আরোগ্যে (cure), উপশমে (mitigation), প্রতিকারে (treatment), অথবা প্রতিরোধে (prevention) ব্যবহার করা হয়’ এবং ‘দ্রব্যসমূহ (খাদ্য বাদে) যা মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণির শারীরিক গঠন বা ক্রিয়াকলাপকে প্রভাবিত করতে পারে’ সেসবই ওষুধ। কিন্তু বাজারে ভেজাল ও নকল ওষুধের দৌরাত্ম্যে আসল ওষুধ চেনায় দায় হয়ে পড়েছে। ফলে নকল ওষুধ জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

মূলত, সরকার ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উদাসীনতার কারণেই নকলবাজ ওষুধ প্রস্তুতকারীদের অপতৎপরতা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। এমতাবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য নকল ওষুধ প্রস্তুতকারীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ দরকার। বাড়াতে হবে সার্বক্ষণিক নজরদারীও। প্রচলিত আইনে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় না আনা গেলে প্রয়োজনে আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে। এ অসাধুচক্রের হাতে জনস্বাস্থ্যকে জিম্মি করার কোন সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্টরা যত তাড়াতাড়ি বিষয়টি উপলব্ধি করবেন ততই মঙ্গল।

www.syedmasud.com