এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী

আমেরিকা ও জায়নবাদী ইহুদীদের বর্বরোচিত যৌথ আগ্রাসনে সারাবিশ্বে সোয়া দু’শ কোটি মুসলিমের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। ইসলামী চিন্তাচেতনা হেফাজতের ক্ষেত্রে পাহাড়ের মত অটল, আধ্যাত্মিক চেতনা ও দৃঢ়নীতির অভিভাবক, মুসলিম বিশ্বের অন্যতম নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী হোসেইনি খামেনি শনিবার মানবতার দুশমন ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় শাহাদাত বরণ করেন। মৃত্যুর সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।

তিনি সারাজীবন অবিরাম ও অক্লান্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সাঁইত্রিশ বছর ধরে ইরানের রাজনৈতিক এ আধ্যাত্মিক জগতের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মর্যাদা সমুন্নত রেখে শাহাদাত বরণ করেছেন। এ আধ্যাত্মিক নেতা তাঁর শান্ত ও ধীরস্থির এবং সাধারণ জীবনাচরণের মাধ্যমে গোটা ইরানকে একটি আদর্শিক সুতোয় গেঁথে রেখেছিলেন, গণমানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন একজন বিশ্বস্ত অভিভাবক হিসেবে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল তাঁর শাহাদাতের খবর জানিয়েছে। আলী খামেনি শাহাদাতের পূর্বে ভোরে তাঁর কার্যালয়ে কাজ করছিলেন। ইরান সরকার ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও ৭ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে। আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি- ইরানীরা জান দেবে তবু আমেরিকার অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবে না। দাস হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মাথা উঁচু রেখে মৃত্যুকেই তারা অধিক মর্যাদার বলে বিশ্বাস করে ইরানী জাতি। ছোট একটি দেশ। কিন্তু কী প্রবল আত্মবিশ্বাস আর কঠিন মনোবল। এ জাতির ইতিহাস বলে সারা পৃথিবী এক হয়েও এ দেশটিকে কখনো কোন আগ্রাসী শক্তি টলাতে পারেনি, মাথা নোয়াতে পারেনি। দিনের পর দিন তাদের বিরুদ্ধে অবরোধ দিয়েছে, হুমকি দিয়েছে, আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছে, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত করতে চেয়েছে, কিন্তু কোন লাভ হয়নি। অকুতোভয় বীরের জাতি, ওরা কখনো মাথা নোয়ায়নি আর ভবিষ্যতেও তা হবে না। ইরানের সাহসী সার্দুলেরা সকল ইহুদী শক্তি ও পরাশক্তির বিরুদ্ধে অটল থেকে বার বার সেটা প্রমাণ দিয়েছে। ইরান রক্ত দিয়ে, ধৈর্য দিয়ে, আর সকল অসম্ভবকে সম্ভব করার মধ্য দিয়ে যে সাহস দেখিয়েছে, মুসলিম মিল্লাতের জন্য তাদের এ বীর গাঁথা এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ছিলেন বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদ ও জায়নবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় ও আপোসহীন কণ্ঠস্বর। আজীবন তিনি মজলুমদের পক্ষে লড়াইয়ে সন্মুখে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে নির্যাতিত মুসলিমদের পক্ষে তিনি ছিলেন এক সুদৃঢ় আশ্রয় ও অভিভাবক। সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি তাঁকে হত্যার মাধ্যমে ন্যায়ের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতে চেয়েছে। কিন্তু তিনি নিজ মাতৃভূমি রক্ষায় লড়াই করতে করতে শাহাদাত বরণ করেছেন যা প্রমাণ করে, সত্যের সৈনিকরা কখনো মাথা নত করে না।

আলী খামেনি চিরদিন বেঁচে থাকবেন মুসলিম মিল্লাতের মাঝে এক অনুকরণীয় ও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে, আধ্যাত্মিক নেতা ও রাজনৈতিক অভিভাবক হিসেবে। যিনি সুন্নীদের ব্যাপারে বিজ্ঞোচিত মন্তব্য করেছিলেন। সুন্নিদের অপমান করা হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি মনে করতেন-শিয়াদের মধ্যে যারা সুন্নিদের আবেগ নিয়ে কটূক্তি করে, তারা আসলে ইসলামের শত্রু এবং ব্রিটিশ বা পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার চর। মুসলিমদের মাঝে কোন ধরনের বিভাজনের রেখা টানতে দেননি অথবা কখনো তা উসকে দেননি।

তিনি একজন শিয়া নেতা হওয়া সত্ত্বেও ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইসলামিক জিহাদ-এর মতো সুন্নি সশস্ত্র গ্রুপগুলোকে বছরের পর বছর ধরে সামরিক ও আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে এসেছিলেন। ভূ-রাজনীতিতে সুন্নিদের স্বার্থে নিজেরা অনেক ঝুঁকি পর্যন্ত গ্রহণ করেছিলেন, তবুও মুসলিম ঐক্যে ফাঁটল সৃষ্টি হতে দেননি।

সাহসী কন্ঠের এমন প্রজ্ঞাবান আধ্যাত্মিক নেতাকে হারিয়ে বিশ্বের মুসলিম সমাজ আজ মর্মাহত। আমরা আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও অভিশপ্ত ইহুদী দালালদের জানিয়ে দিতে চাই যে, এমন আদর্শবাদী বিশ্বনেতাদের চাইলেই শেষ করা যায় না। একজন আলী খামেনীর শাহাদাতের রক্তকণা থেকে জন্ম নেবে হাজারো আলী খামেনী, ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ পবিত্র রমাদান মাসে তাঁর শাহাদাতকে কবুল করুন। সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা আর মানবতার দুশমন ইসরাইলের মরণঘণ্টাকে ত্বরান্বিত করুন।

লেখক : আইনজীবী ও প্রাবন্ধিক।