মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বোঝার জন্য শুধু সাম্প্রতিক যুদ্ধের খবর পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট নয়; বরং ইতিহাস, কূটনীতি এবং কৌশলগত গতিবিধি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ তাৎক্ষণিক উত্তেজনার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সাত দশক ধরে অবিশ্বাস, কৌশল এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে। ১৯৫৩ সালে মার্কিন সিআইএ সমর্থিত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ইরানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেককে উচ্ছেদ এবং মার্কিন মদদে রেজা শাহ পাহলভীকে ক্ষমতায় বসানোর ঘটনাটি ইতিহাসের পাতায় কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের এহেন চক্রান্ত এবং ইরানকে সেকুলার রাষ্ট্রে পরিণত করার অভিপ্রায়ের বিপরীতে ১৯৭৯ সালে ইরানের বিপ্লব সংঘটিত হয়। বিপ্লবের পর ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তার সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কও অচল অবস্থায় চলে আসে।
তাই মার্কিন ও ইরানের মধ্যকার এ দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বের পেছনে শুধুমাত্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, বরং এর নেপথ্যে আঞ্চলিক প্রভাব, শক্তি ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও রয়েছে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র দেশ যার ওপর যুক্তরাষ্ট্র এখনো পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। অন্যান্য আরব দেশের মতো ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ যেখানে এ অঞ্চলে আমেরিকার প্রধান সহযোগী ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক চালু করেছে সেখানে ইরান এখনো সর্বতোভাবে ইসরাইলকে সবচেয়ে বড়ো শত্রু হিসেবে গণ্য করে। এ সবগুলো বাস্তবতাই ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে সংকট তৈরি করেছে। ইরান সামরিকভাবে যত বেশি শক্তিশালী হবে ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা ততটাই বিপন্ন হবে- এমন আশংকাও মার্কিন নীতি নির্ধারকদের ভেতর ছিল সবসময়ই।
২০০০-এর দশকে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের উদ্বেগ আরো বেড়ে যায়। ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত JCPOA চুক্তি আন্তর্জাতিক মঞ্চে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান তৈরির একটি সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। এ অসাধ্য হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ওবামার সময়ে। এ আলোচনার প্রেক্ষিতে ইরান তার পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম সীমিত করে এবং বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়। এ সময় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বারবারই নিশ্চিত করে যে ইরান চুক্তির শর্ত মানছে। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র একপাক্ষিকভাবে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায় এবং এটি পরিস্থিতিকে কৌশলগতভাবে নতুনভাবে প্রভাবিত করে। আলোচনার জায়গা সংকুচিত হয় এবং আন্তর্জাতিক আস্থা কমে যায়। এমনটা হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম আমলে। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ক্ষমতায় আসেন। তিনি বলেছিলেন যে, ইরানের সাথে তিনি সম্পর্ক পর্যালোচনা করবেন আবারও সংলাপ শুরুর প্রক্রিয়া চালু করবেন। কিন্তু তিনি তার ৪ বছরের মেয়াদকালে এ বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে পারেননি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ২০২৫ সালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষভাবে আলোচনায় বসে, চতুর্থ দফা শেষ হয়ে পঞ্চম দফা শুরু হওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। ঠিক সে সময়ে ইসরাইল ইরানের ভেতরে বিভিন্ন পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় আক্রমণ চালায়। প্রথম হামলার আগেই কূটনৈতিক পর্যালোচনা এবং আলোচনার সম্ভাব্য পথ ধ্বংস হয়ে যায়। এতে ১২ দিনের যুদ্ধে রূপ নেয়, যেখানে ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে প্রতিরক্ষা প্রদর্শন করে। যুদ্ধের প্রতিটি পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে সামরিক ও কৌশলগত সহায়তা দেয়।
এ সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বহুদিন ধরেই অবিশ্বাস, কৌশল আর শক্তির খেলার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ইরান প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। বরং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সে প্রশ্নকে আবার সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে বলে আসছে, তাদের প্রধান উদ্বেগ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। এই ইস্যুতেই নানা নিষেধাজ্ঞা, চাপ, এমনকি সামরিক হুমকিও দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ইরান বরাবর দাবি করে এসেছে, তাদের কর্মসূচি বেসামরিক ও জ্বালানি-কেন্দ্রিক। যেমনটা আগেও বলেছিল- ২০২৫ সালে ইরান ও ইসরাইল-এর মধ্যে যে ১২ দিনের যুদ্ধ হলো, তার আগে পারমাণবিক সংলাপের চতুর্থ দফা শেষ হয়েছিল এবং পঞ্চম দফা শুরুর প্রস্তুতি চলছিল। প্রশ্নটা এখানেই। যদি সত্যিই পারমাণবিক প্রকল্প বন্ধ করাই ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য হতো, তাহলে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার মধ্যেই তো কৌশলগত লাভ ছিল। আলোচনা ভেঙে ফেলে যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করা কি সে ঘোষিত লক্ষ্যকে এগিয়ে নেয়, নাকি অন্য উদ্দেশ্যকে?
এ কারণে অনেকেই মনে করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই ইরানের সাথে সংলাপে কিংবা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে আন্তরিক ছিল না। এগুলো ছিল ইরানকে ব্যস্ত রাখার একটি কূটকৌশল। তারা একদিকে ইরানকে কূটনৈতিক কার্যক্রমে ব্যস্ত রাখতো অন্যদিকে ইসরাইলকে ইরানে হামলা চালানোর গ্রীন সিগন্যাল প্রদান করতো। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক সাড়া পেয়েই ১২ দিনের যুদ্ধকালে প্রথম হামলা চালায় ইসরাইল। আক্রমণ ইসরাইল চালালেও অঞ্চলজুড়ে সামরিক সমন্বয়, ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি এবং কূটনৈতিক অবস্থান দেখে বিশ্লেষকরা তখনও উপলব্ধি করেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশ না নিলেও ইসরাইলকে পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোতে তাদের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং ইসরাইলের প্রতিটি আক্রমণেই এই ঘাঁটিগুলো কমবেশি ব্যবহার হতো।
এবার আর ইসরাইল একা আক্রমণ করেনি। আর আমেরিকাও পরোক্ষ সমর্থন দেয়নি বরং ইসরাইল ও আমেরিকা যৌথভাবেই এ আক্রমণ শুরু করে ফেব্রুয়ারি মাসের একদম শেষ দিনে। এ আক্রমণের আগে থেকেই বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনী তাদের সামরিক প্রস্তুতি নিয়েছিল। একের পর এক রণতরী পাঠিয়েছিল। বিমান প্রেরণ করেছিল। সৈন্য সংখ্যাও বৃদ্ধি করেছিল। ইরানে যে কোনো সময় হামলা হতে পারে সে হুমকিও ট্রাম্প দিয়ে যাচ্ছিলেন নিয়মিতই। অথচ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বারবারই বলছিলেন, ইরান নিজ থেকে কোনো উস্কানি দেয়নি। ইরানের পক্ষ থেকে আমেরিকার জন্য হুমকি সৃষ্টি করা হয়েছিল মর্মে পশ্চিমাদের দাবিও ভিত্তিহীন বলে তিনি উড়িয়ে দেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও পরবর্তীতে এই সত্যটা স্বীকার করেছেন। মূলত যুক্তরাষ্ট্র দখলদার ইসরাইলের স্বার্থে যুদ্ধ শুরু করেছে। আরাকচি আরও জানান, “ইরান হুমকি তৈরি করেনি। এ কারণে আমেরিকা ও ইরানে যে রক্তপাত ঘটানো হচ্ছে তার দায় নিতে হবে সেসব ব্যক্তিকে যারা মনে করে ইসরাইল ফার্স্ট অর্থাৎ যাদের কাছে সব কিছুর আগে ইসরাইলের স্বার্থই বেশি গুরুত্ব পায়।”
আমেরিকা ও ইসরাইল আক্রমণের প্রথম দফাতেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা সাইয়্যেদ আয়াতুল্লাহ আল খামেনিকে হত্যা করে। একইসাথে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক বাহিনীর প্রধানও সেই হামলায় নিহত হন। ইরান তাদের সর্বোচ্চ নেতার এ হত্যাকাণ্ডকে রেডলাইন অতিক্রম হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। কেননা সর্বোচ্চ এ ধর্মীয় নেতা কেবল ইরানের নেতা নন বরং বিশ্বজুড়ে শিয়া মুসলিমদের মূল নেতা বা অভিভাবক হিসেবেই তিনি বিবেচিত হতেন। কোনো ধরনের উস্কানি ছাড়াই ইরানের সার্বভৌমত্ব লংঘন করে যেভাবে হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা হলো, স্বাভাবিকভাবেই ইরান তাতে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ইরানকে দুর্বল করা কিংবা ইরানের শাসকদেরকে হটানোর উদ্দেশ্য থাকলেও কার্যত ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই যৌথ হামলা মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম সক্রিয় সামরিক সংঘাতের সূচনা করেছে। হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো হামলা শুরু করেছে।
যুদ্ধ এখনো চলামন। এখনো পর্যন্ত ইরান হাজারের ওপর মিসাইল ছুড়েছে, ড্রোন হামলাও চালিয়ে যাচ্ছে। এর বিপরীতে ইসরাইল প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা চালু করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো থেকে সামরিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তাতেও কোনো লাভ হচ্ছে না। বর্তমান বাস্তবতায় ইরান তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রমাণ করেছে এবং এমনভাবে পাল্টা প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেছে যা একসময় কেবল ধারণাগত ভয় হিসেবেই বিবেচিত হত। কিন্তু ইরানের সে কল্পিত সক্ষমতা যে বাস্তব তা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিগত ৭-৮ দিনে সবাই অনুধাবন করেছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন এবার শুধু ইসরাইলেই আঘাত করেনি। বরং বাহরাইন, আরব আমীরাত, কাতার, জর্ডান, সৌদি আরবসহ আরব বিশ্বের যেসব ঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবারের হামলা পরিচালনা করেছে, সবগুলো দেশেই ইরানের আক্রমণ চলছে। ইরানের অনেক শহরেই যেমন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল হামলা চালিয়ে দেড় হাজারের বেশি মানুষ হত্যা করেছে। তেমনি ইরানের আক্রমণে ইসরাইলের রাজধানী তেলআবিব, হাইফা, বেইত ইয়াম, বেইত শামেসসহ অনেকগুলো শহর ক্রমশই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। ইরান‑সমর্থিত মিলিশিয়াগুলোও আঞ্চলিকভাবে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। ফলত, যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই। অধিকাংশ দেশের বিমান বন্দর বন্ধ হয়ে গেছে। যাত্রীদের চলাচল থেমে গেছে। স্বাভাবিক ব্যবসা কার্যক্রমও চালু রাখা যাচ্ছে না। তেলের ডিপোগুলোতে ক্রমাগত হামলার কারণে বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। ফলে যুদ্ধটি এখন এক বস্তুগত সামরিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যেখানে আর আগের মতো আলোচনার পরিবেশ নেই।
পাশাপাশি, পশ্চিমা বিশ্ব ও তেলের বাজারকে চাপে ফেলার উদ্দেশ্যে ইরান এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত সংকুচিত করে দিয়েছে। গুটিকয়েক মিত্র দেশ ছাড়া ইরান অন্য কোনো দেশের নৌযানকে হরমুজ দিয়ে যাতায়াতই করতে দিচ্ছে না। অথচ এই প্রণালী দিয়েই বিশ্বজুড়ে তেলের প্রায় ২০ শতাংশ রপ্তানি বহন করে। এর ফলে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই পড়বে না বরং বাংলাদেশসহ প্রতিটি দেশকে এই পরিস্থিতির জেরে ভুগতে হবে। এরই মধ্যে বাংলাদেশে জ¦ালানি তেলের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। যদিও সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে পর্যাপ্ত মজুদ আছে তেলের। কিন্তু সে আশ্বাস জনগণকে স্বস্তি দিতে পারছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে যাতায়াত, খাদ্য, উৎপাদন ও পরিবহণের খরচও বাড়তে পারে। এটা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে। বিকল্প সরবরাহ না মিললে অর্থনৈতিক চাপ আরও জোরালো হবে। সংঘাতের শুরুতে বিভিন্ন অঞ্চলের শেয়ারবাজারে পতন দেখা গেছে, যখন তেলের দাম ও এনার্জি সিকিউরিটির ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক হচ্ছে। ইসরাইলের মতো দেশ ইতোমধ্যেই লকডাউনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা খরচের কারণে সপ্তাহে কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়ছে দেশটি। দেশটির সামরিক ও বেসামরিক কাঠামো এরই মধ্যে মারাত্মভাকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এ পরিস্থিতি আরও প্রলম্বিত হয়, তাহলে সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে যখন প্রতিটি পক্ষ অন্যান্য দেশ বা গোষ্ঠীকে নিজেদের পক্ষে যুদ্ধে নিয়ে আসার চেষ্টা করবে। এরই মধ্যে ইসরাইলীরা কুর্দীদের সিআইএ অংশকে মাঠে নামিয়ে দিয়েছে। ইরানের পক্ষেও হুথি ও হিজবুল্লাহ ধীরে ধীরে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করছে। এমনটা অব্যাহত থাকলে পুরো অঞ্চলের সামরিক ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে এবং আরও বড় সংঘাতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
সবকিছু মিলিয়ে ইরান-ইসরাইল সংঘাত এখন আর কেবল দুই রাষ্ট্রের সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; এটি ধীরে ধীরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে অস্থির করে তুলছে। পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন যুদ্ধ, আঞ্চলিক মিত্রদের সম্পৃক্ততা এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অবস্থান এই সংকটকে বহুমাত্রিক রূপ দিয়েছে। এতে কেবল সীমান্তে নয়, আকাশসীমা, সমুদ্রপথ ও কৌশলগত ঘাঁটিগুলোতেও ঝুঁকি বেড়েছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই সামরিক ব্যয় বাড়ছে, ভুল সমীকরণের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে। এই বাস্তবতায় সামরিক শক্তি প্রদর্শনের চেয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ, আঞ্চলিক সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস দেখায়, যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু এর প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কিন্তু আলোচনার অজুহাতে পশ্চিমাদের প্রতারণার পুনরাবৃত্তির ইতিহাস থাকার কারণে ইরান তাদেরকে আর বিশ্বাসও করতে পারছে না। আবার সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা শাহাদাত বরণ করার কারণে ইরানী জনগণের মধ্যেও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার একটি চাপ রয়েছে।
অন্যদিকে, পশ্চিমারা ইরানের সাবেক নির্বাসিত প্রেসিডেন্ট স্বৈরশাসক শাহ পাহলভীর ছেলেকে নিয়েও বড়ো ধরনের চক্রান্ত করছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি নিজেকে ইরানের নতুন প্রশাসনের প্রধান হিসেবেও ঘোষণা দিয়েছেন। এ ধরনের অপকৌশল ইরানকে পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে আমেরিকার বিরুদ্ধে আরো ক্ষেপিয়ে তুলছে। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যকে নিরাপদ ও সংঘাতমুক্ত করতে হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো বেপরওয়া নেতাকে দিয়ে গ্রহণযোগ্য কোনো সমাধান পাওয়া কঠিন বরং এমন একটি পক্ষকে সক্রিয় হতে হবে যাদের সততার ইতিহাস রয়েছে এবং যাদেরকে সকল পক্ষই বিশ্বাস করে। কেননা, এটি অনস্বীকার্য যে, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে হলে অনতিবিলম্বে উত্তেজনা কমানো এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথে ফিরে আসার কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় এ সংঘাত কেবল সামরিক মানচিত্রই বদলাবে না, বরং পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার ভিত্তি তৈরি করবে।