মো. সাজেদুল ইসলাম

সুস্বাস্থ্যের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছরের মতো এবারও ৭ই এপ্রিল বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালন করা হল। এই দিনটি উদযাপনের উদ্দেশ্য হলো এটা তুলে ধরা যে, শুধু শারীরিক নয়, একজন মানুষের মানসিক ও আবেগগত স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং মানুষের সামগ্রিক সুস্থতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা। বিশ্বজুড়ে দরিদ্র অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করাও এই দিবস পালনের অন্যতম লক্ষ্য।

এই দিবসের ইতিহাস বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ১৯৪৮ সালে প্রথম স্বাস্থ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য একটি বিশেষ দিন নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রথম বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয় ১৯৫০ সালের ৭ই এপ্রিল। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো যেন যথাযথ গুরুত্ব ও কার্যকর পদক্ষেপ পায় তা নিশ্চিত করার জন্য এই দিবস চালু করা হয়। এই উদ্যোগের পেছনে মূল ভূমিকা ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র, জাতিসংঘের সহযোগিতায়।

যদিও এই দিনটি সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়, তবুও বাংলাদেশে ‘কুষ্ঠ’ নামে একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সমস্যা এখনও আমাদের স্বাস্থ্য খাতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এ রোগের কারণে মানুষের যে বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তি হয়, তা বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

দ্য লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল-বাংলাদেশ (টিএলএমআই-বি) এর তথ্য অনুযায়ী, কুষ্ঠ রোগের অধিকাংশ ক্ষেত্র দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া এবং আফ্রিকায় পাওয়া যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২৩টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দেশের একটি তালিকা করেছে, যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে, যেখানে বিশ্বের মোট কুষ্ঠ রোগীর ৯৫ শতাংশ বসবাস করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর মতে, কুষ্ঠ একটি দীর্ঘমেয়াদি সংক্রামক রোগ, যা ’মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপ্রী’ নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। এই রোগ মূলত ত্বক ও প্রান্তীয় স্নায়ু, উপরের শ্বাসনালীর মিউকোসা এবং চোখকে আক্রান্ত করে। শারীরিক বিকৃতির পাশাপাশি কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তিরা সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্যের শিকার হন। তবে কুষ্ঠ নিরাময়যোগ্য এবং প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিলে পংগুত্ব প্রতিরোধ করা সম্ভব। চিকিৎসা না করালে এই রোগ ক্রমাগত এবং স্থায়ী অক্ষমতার কারণ হতে পারে।

টিএলএমআই-বি এর মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪,০০০ নতুন কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হচ্ছে। সময়মতো এবং মানসম্মত চিকিৎসার অভাবে এদের প্রায় ১০ শতাংশ পরবর্তীতে পংগুত্বের সমস্যায় ভোগেন। কুষ্ঠ অন্যান্য রোগের মতোই একটি রোগ, তবে এর সঙ্গে অন্যান্য রোগের একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। তা হলো, অন্য কোনো রোগ থেকে সামাজিক কুসংস্কার কুষ্ঠ রোগে বেশী। এই কুসংস্কারের কারণে কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তিদের মানবাধিকার ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়।

আমাদের সমাজের সাধারণ মানুষের মধ্যে কুষ্ঠ সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। ফলে অনেক রোগী চিকিৎসা নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। কুষ্ঠ ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক পর্যায়ে এখনও একটি বড় ধরনের সামাজিক কুসংস্কারের উৎস হিসেবে রয়ে গেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কুষ্ঠ রোগ ভয়, বিচ্ছিন্নতা এবং ভ্রান্ত ধারণায় আবৃত। আজও এই শব্দটি উচ্চারণ করলেই বিকৃতি, সমাজচ্যুতি এবং প্রান্তিক জীবনের চিত্র সামনে আসে।

কুষ্ঠ রোগ ঘিরে থাকা এই সামাজিক কুসংস্কারের সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে, যা রোগীদের জীবনে গভীরভাবে আঘাত হানে। এটি সামাজিক সমর্থন ও সম্পর্ক হারানোর কারণ হতে পারে। ভয় ও ভুল তথ্যের কারণে অনেক সময় রোগীরা সমাজচ্যুত হন, ফলে তারা সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নিতে এবং অর্থবহ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন না।

কুষ্ঠ রোগের নানা জটিলতা রয়েছে। স্বাস্থ্যগত জটিলতার পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং অন্যান্য নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এই রোগ এখনও শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের পথে বাধা। তারা শিক্ষা ও চাকরি পেতে সমস্যায় পড়েন এবং সামাজিক সম্পর্ক ও কার্যক্রম থেকেও বঞ্চিত হন। কর্মসংস্থানের অভাবে তারা শুধু নিজেদের পরিবারের জন্য নয়, দেশের জন্যও বোঝা হয়ে দাঁড়ান।

এছাড়া, মানসিক চাপ ও মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাও দেখা দেয়। বৈষম্য ও সামাজিক প্রত্যাখ্যানের ভয় মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যার ফলে উদ্বেগ, বিষণ্নতা বাড়ে এবং আত্মসম্মানবোধ হ্রাস পায়।

অতএব, জাতীয় স্বার্থে আমাদের এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। আমাদের “শূন্য কুষ্ঠ” নিশ্চিত করতে হবে, যার মধ্যে থাকবে শূন্য সংক্রমণ ও রোগ, শূন্য পংগুত্ব এবং শূন্য সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্য; নতুন কুষ্ঠ রোগীর দ্রুত শনাক্তকরণ ও সম্পূর্ণ চিকিৎসা; স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্পৃক্ত করে বাড়ি বাড়ি যোগাযোগ জরিপ পরিচালনা; পংগুত্ব প্রতিরোধ ও চিকিৎসা পুনর্বাসন সেবা জোরদার করা; এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সামাজিক কুসংস্কার কমাতে তথ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ কার্যক্রম জোরদার করা।

আমাদের উচ্চমানের, সমন্বিত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে, যা পংগুত্ব প্রতিরোধ ও রোগীদের পুনর্বাসনে সহায়ক হবে। এই সেবার মধ্যে থাকবে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় ও প্রতিক্রিয়ার চিকিৎসা, চোখের যত্ন, ক্ষত ও আলসারের চিকিৎসা, রোগী শিক্ষা, স্ব-যত্ন, সুরক্ষামূলক জুতা ও অন্যান্য উপকরণের ব্যবহার, ফিজিওথেরাপি, পুনর্গঠনমূলক সার্জারি এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক পুনর্বাসন।

এই কৌশল বাস্তবায়নের জন্য সহজলভ্য, কার্যকর এবং টেকসই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা পুরো জনগোষ্ঠীকে আচ্ছাদিত করবে এবং যা সমাজ ও রোগীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। এর অর্থ হলো, সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমেই কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে।

কুষ্ঠবিরোধী কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে সব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনামূল্যে কুষ্ঠ রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা; প্রতিটি স্বাস্থ্যকর্মীকে কুষ্ঠ শনাক্ত ও চিকিৎসায় সক্ষম করে তোলা; কুষ্ঠ সম্পর্কে ভয় দূর করা, প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং মানুষকে চিকিৎসা নিতে উদ্বুদ্ধ করা; এবং সব কুষ্ঠ রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করা নিশ্চিত করা।

কুষ্ঠের মতো একটি সমস্যা মোকাবিলা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। কুষ্ঠ নির্মূল হলে জাতীয় অর্থনৈতিক লাভও হবে। কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) এর অন্তত তিনটি লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পারে: এসডিজি-৩ (সবার জন্য সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ, যার মধ্যে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অন্তর্ভুক্ত), এসডিজি -১০ (অসমতা হ্রাস) এবং এসডিজি ১৭ (লক্ষ্য অর্জনে অংশীদারিত্ব)।

বাংলাদেশের জাতীয় সংবিধানের ১৮ (১) অনুচ্ছেদে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তাই সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আমরা যদি সবার জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে চাই, তবে কুষ্ঠ সমস্যাকে অবহেলা করা যাবে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আশা করি যে, সরকারি ও বেসরকারি সকল অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ শিগগিরই কুষ্ঠমুক্ত হবে।

লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক