আসিফ আরসালান

শরীফ ওসমান হাদী গত ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে ইন্তিকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এ হৃদয়বিদারক সংবাদটি পাওয়ার সাথে সাথে বাংলাদেশের সর্বশ্রেণীর মানুষ শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছেন। যে বর্বর নৃশংসতার সাথে তাকে হত্যা করা হয়েছে সে কারণে শোকের পাশাপাশি শোকার্ত জনতার একটি অংশ প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধও হয়ে পড়েন। বিক্ষুব্ধ হয়ে তারা মধ্যরাতে শাহবাগে জমায়েত হন।

অন্যদিকে সরকারের সর্বোচ্চ স্তর থেকে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী শোক বার্তা প্রেরণ করেন। সবগুলী রাজনৈতিক দল তার প্রতি শোক ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। অন্তর্বর্তী সরকার ৯দিন আগে যেদিন ওসমান হাদী গুলীবিদ্ধ হন সেদিন থেকেই তার মৃত্যু পর্যন্ত সম্পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করেন। ঘাতক দল ইতোমধ্যেই চিহ্নিত হয়েছে। তাদেরকে পাকড়াও করার জন্য পুলিশ এবং বিজিবি সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। তাদের হামলার স্টাইল এবং তাৎক্ষণিক দ্রুত প্রস্থান চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, সমগ্র বিষয়টিই সময় নিয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং নিখুতভাবে হত্যাকাণ্ডটি সংঘঠিত হয়েছে। চলন্ত রিকশাকে মোটরবাইক দিয়ে ফলো করা হয়েছে এবং বাইকটি রিকশার ডান পাশে এসে আরোহী হাদীর ডান কানের নিচ দিয়ে গুলীবর্ষণ করে। এ গুলীটি ডান কানের নিচ থেকে মাথার মধ্যে প্রবেশ করে মগজের মধ্য দিয়ে বাঁ পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। তারপরেও হয়তো হাদী সুস্থ হয়ে উঠতে পারতেন। তবে গুলীর একটি ফ্র্যাগমেন্ট মগজের মধ্যে রয়ে যায়। ঐ ফ্র্যাগমেন্ট বের করতে পারলে হয়তো হাদী বেঁচে যেতেন। কিন্তু সেটি আর বের করা সম্ভব হয়নি। তবে মুসলমান হিসাবে আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ যাকে যখন গ্রহণ করবেন বলে নির্ধারণ করে থাকেন তখন ঠিক সেই সময়েই তাকে গ্রহণ করেন।

যে কথা বলছিলাম। ঘাতক দল অর্থাৎ গুলী বর্ষণকারী মাসুদ করিম এবং বাইকের পেছনে অবস্থানকারী আলমগীর শেখের বাইকটি চলন্ত অবস্থায় গুলীবর্ষণ করে এবং গুলী বর্ষণের পরেই দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যায়। রানিং বাইক থেকে এমন সঠিক নিশানায় হিট করাতে এটি প্রমাণিত হয় যে, ঘাতক একজন প্রশিক্ষিত স্যুটার বা স্নাইপার। তাকে যে অনেক পরিকল্পনা করে নামানো হয়েছিলো সেটি বোঝা যায় ঘাতকের পলায়ন এবং চূড়ান্ত গন্তব্য দেখে। ২টা ৩৫ মিনিটে গুলীবর্ষণ করে ঘাতক দ্রুত বেগে বাইক চালিয়ে সাভার যায়। সেখানে পোশাক পরিচ্ছদ এবং বাইক পাল্টে সে আবার রওয়ানা হয়। এর পর সে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট বর্ডার পার হয়ে ভারতে প্রবেশ করে। একটি বাংলা সহযোগীর রিপোর্ট মোতাবেক সে ভারতের মহারাষ্ট্র প্রদেশে আশ্রয় নেয়।

বাংলাদেশ পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী (বাংলাদেশের পত্র পত্রিকায় যেসব সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে) সে অর্থাৎ ঘাতক বাংলাদেশেই রয়েছে। কারণ হিসাবে বলা হয়েছে যে, তার পাসপোর্ট আটক করার পর দেখা যায় যে, বাংলাদেশ থেকে সাম্প্রতিককালে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো প্রমাণ নেই। আমি আশ্চর্য হয়ে যাই যে, এমন নবীশের মতো কথা পুলিশ কিভাবে বলতে পারে। এক্ষেত্রে বলা যায় যে, বাংলাদেশের পুলিশের একাংশ এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এবং ভারতের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বুঝে উঠতে পারেনি। তারা কি জানে না যে, এদেশের ভারতপ্রেমী এবং আওয়ামীদের জন্য বাংলা ভারত ৪ হাজার কিলোমিটারের অভিন্ন সীমান্ত খুলে দেয়া হয়েছে। কিলার মাসুদ করিম এবং তার নেপথ্য প্রভুরা কি এত বেকুব যে, এতবড় একটি অপারেশনের পর কিলার স্থল বা বিমান পথে বৈধভাবে ইমিগ্রেশন পার হয়ে ভারতে যাবে? এ মুহূর্তে ভারতে প্রায় ১ লক্ষ আওয়ামী নেতাকর্মী শেল্টার নিয়েছে। তারা কি সকলে পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে ইমিগ্রেশন পার হয়ে ভারতে ঢুকেছে?

বেলা আড়াইটায় ওসমান হাদীকে গুলী করার সময় বাইকটি রানিং ছিলো। রানিং অবস্থাতেই তারা ঢাকা ছাড়ে। এরপরে ভারতে তাদের পূর্ব নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছতে একাধিকবার পোশাক ও বাইক পরিবর্তন করতে হয়। বাংলাদেশের সীমান্ত ক্রস করার পর তাদের আর এ সতর্কতা অবলম্বনের কোনো প্রয়োজন হয় না।

গত কয়েকদিন থেকে বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে এবং কোনো কোনো সংবাদপত্রে লেখা হচ্ছে যে, হাদীর হত্যাকাণ্ডই ঘাতকদের শেষ অপারেশন নয়। বরং এটি তাদের শুরু। শুক্রবার সকালে একটি বাংলা সহযোগীর প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত খবরে দেখলাম যে, ঘাতকদের হিট লিস্টে নাকি ৫০ জন রয়েছেন। কয়েকটি নামও দেওয়া হয়েছে। এসব নামের প্রতিটি ব্যক্তির একটি বিশেষ রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। এসব ব্যক্তি অন্তত ২টি রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাস করেন। একটি হলো, শেখ হাসিনার মতো ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার আর যেনো বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে আসতে না পারে অথবা জন্ম নিতে না পারে সেটি সুনিশ্চিত করা। দ্বিতীয়টি হলো সাড়ে ১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষকে ভারতীয় গোলামীর শৃঙ্খলে বেঁধে রেখেছিলেন। জুলাই বিপ্লব সে গোলামীর জিঞ্জির ছিন্ন করেছে। আবার যেনো কেউ বাংলাদেশের মানুষের পায়ে ভারতীয় গোলামীর ডাণ্ডাবেড়ী পরাতে না পারে সেজন্য জনগণকে সতর্ক করা।

শহীদ ওসমান হাদী ওপরে উল্লেখিত দুটি আদর্শেই ছিলেন আপোষহীন। মাত্র ৩২ বছর বয়সে তিনি জনগণের নাড়ির স্পন্দনই শুধু শুনতে পাননি, বরং সে স্পন্দন অনুযায়ী জনগণকে সতর্ক করার কাজে নিজেকে ২৪ ঘণ্টা নিয়োজিত রেখেছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন ভোকাল অর্থাৎ মুখর। আরেকটি বিষয়, যেটি প্রবীণ রাজনৈতিক দল এবং প্রবীণ রাজনৈতিক নেতারাও করেননি, শহীদ হাদী সে কাজটি শুরু করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি একটি কালচারাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এটি ছিলো কেবল শুরু। হাদী বড়লোক বা স্বচ্ছল ছিলেন না। তারপরেও তিনি মানুষজনের নিকট থেকে বইপত্র চেয়ে এনে তার লাইব্রেরিটিকে সাজানো শুরু করেছিলেন।

হাদী সঠিক পথেই এগুচ্ছিলেন। জুলাই বিপ্লবের পর প্রয়োজন ছিলো জুলাইয়ের আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য সাংস্কৃতিক বিপ্লব। গণচীনে কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর কমিউনিস্টদের শীর্ষ নেতৃত্ব সে দেশে সাংস্কৃতিক বিপ্লব হয়। সে সাংস্কৃতিক বিপ্লবে করা হয় অনেক পার্জিং বা শুদ্ধি অভিযান। কমিউনিস্ট বিপ্লবে যারা সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন তাদের মধ্যেও অনেককে বহিষ্কার করা হয়। কারণ দেখা যায় যে, বিপ্লবের পর তাদের কেউ কেউ সুবিধাবাদী হয়েছেন এবং কেউ কেউ তলে তলে চিয়াং কাইশেকের সাথে লাইন মেইন্টেইন করছেন। হাদী যে সাংস্কৃতিক সেন্টার স্থাপন করেছেন সেটিও হয়তো একদিন জুলাই বিপ্লবকে পারফেক্ট করার পথে এগিয়ে নিয়ে যেতো। আফসোস, তিনি সবে শুরুটা করেছিলেন। তবে আফসোসের পাশাপাশি আশাবাদের বিষয় এ যে, দৈনিক ‘আমার দেশ’ সম্পাদক আর এক বিপ্লবী ড. মাহমুদুর রহমান কালচারাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা ও এগিয়ে নেয়ার অসমাপ্ত কাজটির দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করেছেন। আমরা ড. মাহমুদুর রহমানের এ অসমাপ্ত কাজটি সফল করতে সক্ষম হন, সে মোনাজাত করি।

বলছিলাম ঘাতকদের হিট লিস্টের কথা। কারা এ ঘাতক? এখন দেশবাসী তাদেরকে ভালোভাবে চিনতে পেরেছেন। তাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। মুখোশ উন্মোচনের পর দেখা যায় যে, এরা আসলে আওয়ামী লীগের রূপ ধারণ করলেও নেপথ্যে থেকে নয় বরং প্রকাশ্যে তাদেরকে মদদ যোগাচ্ছে ইন্ডিয়া। এক্ষেত্রে ভারতের বিজেপি এবং কংগ্রেসের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। আজকে বিজেপি ক্ষমতায় আছে তাই তাদের বাংলাদেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র ও কার্যক্রম দৃশ্যমান। অতীতে কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিলো । তাই তখন তাদের কার্যক্রম ছিলো দৃশ্যমান। আমার কাছে কম করে হলেও ১২টি পুস্তক আছে যেখানে স্পষ্ট লেখা আছে, ১৯৬২ সাল থেকে আওয়ামী লীগ, বিশেষ করে শেখ মুজিবের সাথে শাসক কংগ্রেসের গভীর সখ্য। ভারতের এজেন্ডা ছিলো শেখ মুুজিবকে দিয়ে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন। আওয়ামী ভারত তথা আওয়ামী মুজিব নেক্সাস সম্পর্কে সময় এবং সুযোগ হলে আমি বিস্তারিত আলোচনা করবো।

আজ শুধু এটুকু বলতে চাই যে, ১৯৬২ থেকে ভারত যে মিশন নিয়ে এগিয়ে চলেছে জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকারের তীব্র বিরোধিতা সে মিশনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাসিনার সরকার ছিলো ভারতের গোলাম। তাই তাদেরকে ভায়োলেন্সের আশ্রয় নিতে হয়নি। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নিজ থেকে বিপ্লবী সরকার না হলেও বিপ্লবের বাতাবরণ রয়েছে তাদের চারিদিকে। ১৬ মাস হয়ে গেলো এ সরকার এবং জুলাই বিপ্লবীদেরকে বিন্দুমাত্রও নতি স্বীকার করানো সম্ভব হয়নি। তাই তারা এগিয়ে চলেছে হিট লিস্ট ধরে।

এ হিট লিস্টে আছেন জামায়াতের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ, আমার দেশের ড. মাহমুদুর রহমান, এবি পার্টির মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং ব্যারিস্টার ফুয়াদ হোসেন, জুলাই বিপ্লবের অগ্রনায়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া ও হাসনাত আব্দুল্লাহ, হেফাজতে ইসলামের মওলানা মামুনুল হক, চরমোনাইয়ের হুজুর রেজাউল করিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি সাদিক কায়েম, আবিদুল ইসলাম আবিদ, রাকসুর জিএস সালাহ উদ্দিন আম্মার, আব্দুল হান্নান মাসউদ, ছাত্র নেতা ইয়ামিন মোল্লা প্রমুখ।

হায়াত মউতের মালিক রাব্বুল আলামীন। আমরা সকলেই প্রচণ্ড ভালোবাসতাম শহীদ ওসমান হাদীকে। আমরা যদি ওসমান হাদীর আদর্শকে এগিয়ে নিতে চাই তাহলে ভারত ও আওয়ামী লীগের হত্যার হুমকিকে উপেক্ষা করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে দুঃসাহসিক অভিযাত্রীর মতো। সামনে অনেক পথ। তবে সেই পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। সেই পথে রয়েছে অনেক কাঁটা বিছানো। এখন আমাদেরকে সেই কাঁটা বিছানো পথই মাড়িয়ে যেতে হবে। সামনের লড়াইটি হবে একদিকে যেমন রাজনৈতিক, অন্যদিকে হবে তেমন সাংস্কৃতিক।